আমাদের দৈনন্দিন জীবনের অতি সাধারণ সব অভ্যাস—
এক কাপ চা পান করা, হাতে একটা কলম তুলে নেওয়া বা মোবাইলের ডেটা রিচার্জ করা।
কিন্তু এর প্রতিটার পিছনে লুকিয়ে আছে GST-সহ বিভিন্ন পরোক্ষ করের
এক অদৃশ্য অর্থনীতির গল্প।
আপনি যখন সকালে ঘুম থেকে উঠে টুথপেস্ট ব্যবহার করছেন বা রাতে শোয়ার আগে
একটা মশা তাড়ানোর কয়েল জ্বালাচ্ছেন, তখন অজান্তেই আপনি রাষ্ট্রের অংশীদার হচ্ছেন।
কিন্তু এই অংশীদারিত্বের হিসেবটা কি সমান্তরাল?
নাকি এখানে লুকিয়ে আছে এক গভীর বিভাজন?
ট্যাক্সের চক্রব্যূহ:
সাধারণ মানুষের পকেট থেকে
রাষ্ট্রের কোষাগার
আমরা সবাই জানি— ট্যাক্স দিতে হয়।
কিন্তু খুব কম মানুষ জানে,
- কতটা দিতে হয়।
- কতবার দিতে হয়।
- আর না বুঝেই বা কতখানি চলে যায়।
বর্তমান অর্থনৈতিক কাঠামোয় পরোক্ষ কর (Indirect Tax) বা GST- এর জাল
এমনভাবে বিছানো যে, কর আয়ের অনুপাতে নয়— খরচের উপরেই বসে,
ফলে একজন দিনমজুর থেকে শুরু করে একজন উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা
একই দামের প্রোডাক্টে একই কর বহন করে।

এখানেই লুকিয়ে আছে এক গভীর ‘অদৃশ্য বিভাজন।’
আয়কর বা প্রত্যক্ষ কর কেবল একটা নির্দিষ্ট আয়ের উপরে মানুষ দেয়,
কিন্তু পরোক্ষ কর দিতে হয় একজন ভিক্ষুককেও— যখন সে নিজের শরীর পরিষ্কার রাখতে
একটা সাবান কেনে।
রাষ্ট্র এখানে আয়ের হিসেব দেখে না, কেবল খরচের উপর চাবুক চালায়।
একটা ৫ টাকার বিস্কুটের প্যাকেট হোক বা ১০০০ টাকার জুতো,
প্রতিটা পণ্যের গায়ে লেখা থাকে ‘Inclusive of all taxes’.
একজন মধ্যবিত্ত মানুষ যখন তার মাসিক আয়ের সিংহভাগ খরচ করেন,
তখন তার আয়ের একটা বড় অংশ সরাসরি বা পরোক্ষভাবে রাষ্ট্রের কোষাগারে চলে যায়।
অর্থনীতিবিদদের বিশ্লেষণ অনুযায়ী—
একজন মানুষ যখন পেট্রোল-ডিজেল কেনেন,
(যা বর্তমানে GST কাঠামোর বাইরে থাকে, এবং এতে কেন্দ্রের Excise ও রাজ্যের VAT জড়িত,
ফলে অনেক ক্ষেত্রে মোট করের হার ৫০% এর কাছাকাছি পৌঁছায়), রান্নার গ্যাস সংগ্রহ বা
মোবাইল রিচার্জ (১৮% GST) করে— তখন প্রতিবারেই অধিকাংশ মানুষ অজান্তে
মোটা অঙ্কের কর প্রদান করেন।
দৈনিক ও বার্ষিক হিসেব:
দৈনিক হিসেবে: যদি একজন ব্যক্তি প্রতিদিন গড়ে ১০০ টাকাও কর বাবদ
দিয়ে থাকেন (সরাসরি পণ্য মূল্যের ট্যাক্স এবং জ্বালানির উপর থাকা কর মিলিয়ে),
তবে মাসে তা দাঁড়ায় ৩০০০ টাকা।
বার্ষিক চিত্র: বছরে এই অংকটা দাঁড়ায় ৩৬,০০০ টাকা।
এখানে একটা ধারণাগত হিসেব ধরে নেওয়া যাক—
এটা কোনো সরকারি পরিসংখ্যান নয়, বরং দৈনন্দিন খরচে লুকিয়ে থাকা করের ব্যাপ্তি
বোঝানোর জন্য একটা গাণিতিক উদাহরণ মাত্র।
ধরা যাক, ১৪০ কোটি মানুষের মধ্যে যদি ১০০ কোটি মানুষও প্রতিদিন গড়ে
মাত্র ১০ টাকা কর দেয়, তবে প্রতিদিন সরকারের ঘরে জমা হয় ১০০০ কোটি টাকা।
আর বছরে এই অংকটা দিয়ে দাঁড়ায় প্রায় ৩.৬৫ লক্ষ কোটি টাকা—
যা সাধারন মানুষের কল্পনার বাইরে এবং দেশের বাজেটের এক বিশাল অংশ।
কিন্তু এটা কেবল একটা নূন্যতম গাণিতিক উদাহরণ মাত্র; বাস্তব চিত্রটা
এর চেয়েও অনেক বেশি বড়।
সরকারি তথ্য ও সাধারন উদাহরণ:
সরকারি তথ্য অনুযায়ী বর্তমানে ভারতের মাসিক GST সংগ্রহ প্রতি মাসে প্রায়
১.৭৫ লক্ষ কোটি টাকা ছাড়িয়ে যায়।
আর বছরে কেবল GST থেকেই আদায় হয় ২০ লক্ষ কোটি টাকারও বেশি।
এর সঙ্গে জ্বালানি তেলের উপর আকাশ ছোঁয়া কর এবং অন্যান্য শুল্ক যোগ করলে
সেই টাকার পরিমান এতটাই বিশাল যে, সাধারণ মানুষের হিসাবের
সাধারণ কল্পনাকেও হার মানায়।
একটা সাধারন উদাহরণ দিয়ে বিষয়টাকে আর একটু পরিষ্কার করে বোঝা যাক:
ধরুন আপনি বাজার থেকে একটা কলম কিনলেন যার দাম ১০ টাকা।
এই কলম বানাতে কারখানায় কাঁচামাল, শ্রম, বিদ্যুৎ— সব মিলিয়ে খরচ পড়ে
প্রায় ২ টাকা।
বাকিটা বিভিন্ন কর, মুনাফা এবং বিতরণ খরচে যায়— এটা প্রায়শই উদাহরণস্বরূপ হিসেব,
যা Illustrative মাত্র।
এই তথ্য কোন নির্দিষ্ট কোম্পানির নয়; শিল্প জগতের সাধারণ উৎপাদন ব্যয়
ধারণা থেকে জানা যায়—
কমদামের ভোগ্য পণ্যের প্রকৃত উৎপাদন ব্যয় বিক্রয় মূল্যের তুলনায় অনেক কম হয়।

তাহলে বাকি টাকা ৮ টাকা
কোথায় যায়?
বাকি ৮ টাকার একটা বড় অংশ খরচ হয় কর, কোম্পানির মুনাফা, ডিস্ট্রিবিউশন
এবং বিজ্ঞাপনে।
তাই মাশুল গুনতে হয় সাধারণ মানুষকে।
তবে করের বোঝা এভাবে বিছানো যে, কাঁচামাল থেকে শুরু করে বিক্রি পর্যন্ত
প্রতি ধাপে সরকার তার ভাগ বুঝে নেয়।
অর্থাৎ, পরোক্ষ করের মাধ্যমে, যা আমরা আলাদা করে দিই না, কিন্তু প্রোডাক্টের
দামের মধ্যেই মিশে থাকে।
ফলে কর দেওয়া হচ্ছে— কিন্তু অনুভব করা হচ্ছে না।
আর যেটা অনুভব করা হয় না, সেটাকেই মানুষ সবচেয়ে কম প্রশ্ন করে।
এখানেই প্রথম প্রশ্নটা উঠে আসে—
আমরা কি জানি, আমাদের দৈনন্দিন জীবনে আমরা ঠিক কতবার ট্যাক্স দিচ্ছি?
GST: প্রতিদিনের জীবনে কর,
চোখে না পড়লেও সর্বত্র
একজন সাধারন মানুষ সকাল থেকে রাত পর্যন্ত যে কাজগুলো করেন তার প্রায়
প্রতিটাতেই কোনো না কোনো কর জড়িয়ে-পেঁচিয়ে থাকে।
- চা-বিস্কুট সাবান টুথপেস্ট— ভোগ্য পণ্যের দামে কর।
- মোবাইল রিচার্জ, ইন্টারনেট, বিদ্যুৎ— পরিষেবা কর।
- বাস, ট্রেন, জ্বালানি— পরিবহন ও জ্বালানি শুল্ক।
- ব্যাংক চার্জ, বীমা— আর্থিক পরিষেবায় কর।
এগুলো আলাদা করে কর বলে আদায় করা হয় না।
এগুলো দামের মধ্যে ঢুকিয়ে নেওয়া হয়।
তাই বাস্তবতা হলো ট্যাক্স এড়ানো প্রায় অসম্ভব।
আর এর সঙ্গে যদি আবার আয়কর যোগ হয়, তাহলে করের বোঝা আরো মোটা হয়।
(ভারতের বন আইন আমাদের সামনে আজ যে বৈপরীত্য তুলে ধরে,
তার দার্শনিক ব্যাখ্যা প্রায় আড়াই হাজার বছর আগেই পাওয়া যায়।
চলুন একটু গভীরে গিয়ে দেখি— কেন একজন সাধারণ মানুষ যদি রান্নার তাগিদেও
জঙ্গল থেকে দু-চারটে শুকনো ডাল কেটে আনে,
তাহলে বন আইন সঙ্গে সঙ্গে দাঁত-মুখ খিঁচিয়ে তেড়ে আসে।
কিন্তু একই দেশে যখন বড় শিল্প আসে…
পড়ুন কি এর ভিতরের আসল সত্য–
Click: ভারতের বন আইন: ডাল কাটলে অপরাধ, বন কাটলে উন্নয়ন- রহস্য কি?)
ট্যাক্স দেওয়া মানে কি?
এটা কি শুধু বাধ্যবাধকতা?
রাষ্ট্র চালাতে, রাজ্য চালাতে টাকা লাগে— এটা অস্বীকার করার কোন জায়গা নেই।
প্রশাসন, প্রতিরক্ষা, আইন-শৃঙ্খলা, পরিকাঠামো— সবকিছুর জন্য অর্থ প্রয়োজন।
সেই অর্থের প্রধান উৎসই ট্যাক্স।
তাই ট্যাক্স দেওয়া নিজে কোনো অন্যায় নয়।
বরং ট্যাক্স হলো একটা সামাজিক চুক্তি যেখানে—
- নাগরিক দেবে অর্থ।
- রাষ্ট্র দেবে নিরাপত্তা, পরিষেবা ও সুযোগ।
এখানেও একটা প্রশ্ন থেকে যায়।
প্রশ্নটা হল— এই চুক্তিটা কি বাস্তবে ভারসাম্যপূর্ণ?
আমরা কি ট্যাক্সের বদলে
সমান পরিষেবা আদৌ পাই?
এই প্রশ্নের উত্তরে এক কথায় দেওয়া যায় না।
এই প্রশ্নের উত্তর এক কথায় দিলে রাষ্ট্রবিজ্ঞানও দুঃখ পাবে।
আর দু কথায় দিলে বাস্তবতা রেগে যাবে।
কারণ উন্নয়ন আছে— এটা কেউ অস্বীকার করতে পারে না।
আমরা এখন এমন যুগে বাস করি যেখানে,
- বড় রাস্তা আছে—
কিন্তু সেই রাস্তায় পৌঁছানোর জন্য ছোটো রাস্তা অনেক জায়গায় নেই। - ফ্লাইওভার আছে—
যাতে শহরের গতি বাড়ে,
কিন্তু তার নিচে থাকা জীবনের গতি বদলায় না। - ডিজিটাল পরিষেবা এসেছে—
ফর্ম অনলাইনে ভরতে হয়।
কিন্তু ভুল হলে ঠিক করার জন্য অফিসে গিয়ে লাইনে দাঁড়াতে হয়। - ব্যাঙ্কিং পৌঁছেছে গ্রামের মানুষ পর্যন্ত—
একাউন্ট আছে, কিন্তু নিয়মিত আয় নেই।
আর ঋণ পেতে গেলে কাগজের পাহাড়। - বিদ্যুৎ পৌঁছেছে—
সংযোগ আছে, মিটার আছে,
কিন্তু সরবরাহ অনিয়মিত, কিন্তু বিল নিয়মিত।
সবার জন্য উন্নয়ন এক নয়:
উন্নয়ন সত্যি হয়েছে।
শুধু একটা ছোটো সমস্যা—
এই উন্নয়ন সবার জীবনে সমানভাবে কাজ করে না।
- সরকারি স্কুল আছে—
ভবন আছে,
মিড ডে মিলের রান্নাঘর আছে,
কিন্তু পর্যাপ্ত শিক্ষক নেই, শিক্ষা ব্যবস্থা নেই,
আর শেখার পরিবেশ অসমান। - সরকারি হাসপাতাল আছে—
এমার্জেন্সি বোর্ড ঝুলছে, ডাক্তারের নাম লেখা,
কিন্তু শয্যা সীমিত,
আর ওষুধ প্রায়ই বাইরের দোকানের।
শহর আর গ্রামের তফাৎ এখন আর দূরত্বে নয়, তফাৎটা সুযোগে।
শহরে সমস্যা হলে অ্যাপ খুলে সমাধান খোঁজা যায়।
গ্রামের সমস্যা হলে এখনো সুপারিশ আর ভরসার ওপর নির্ভর করতে হয়।
এখানে সমস্যা এই নয় যে উন্নয়ন হয়নি।
সমস্যা হলো— উন্নয়নে এমনভাবে হয়েছে,
যেন সে নিজেই বেছে নেয়,
কার জীবনে গভীরে ঢুকবে,
আর কার জীবনে শুধু ছুঁয়ে যাবে।
একটা ফ্লাইওভার দারুন সুবিধা দেয় —যার গাড়ি আছে।
যার যাত্রাপথ শহরের মূল স্রোতে।

কিন্তু যার জীবন পরিষেবা খোঁজার, তার জন্য সেই সুবিধা অনেক সময়
দূর থেকেই দেখা যায়।
- একটা অনলাইন পরিষেবা অসাধারণ—
যার স্মার্ট ফোন আছে,
ইন্টারনেট স্থিতিশীল,
আর ডিজিটাল ভাষা বোঝার সুযোগ আছে। - যার এসব নেই,
তার কাছে পরিষেবাটা এখনো “ডিজিটাল”—
মানে নাগালের বাইরে।
ফলে উন্নয়ন বাস্তব।
দেখতেও ঝকঝকে।
উদ্বোধনের দিনের ছবিতেও সুন্দর।
শুধু একটা প্রশ্নই থেকে যায়—
এই উন্নয়ন কি মানুষের জীবন বদলানোর জন্য, না কি পরিসংখ্যান সাজানোর জন্য?
ট্যাক্সের বোঝা, ক্ষমতার ভারসাম্য
এক্ষেত্রে বলে রাখা ভালো—
গরিব বা সাধারণ মানুষের আয় সব সময়ই চোখে পড়ে, তাই ট্যাক্সের কারাগারে
তারা আজীবন বন্দী।
সে খেতে পাক বা না খেয়েই মারা যাক, করের বোঝা ‘বেতাল’ হয়ে ঘাড়ে
চেপে থাকবেই।
আর ধনীরা জানে, কিভাবে সম্পদ আইনের কাঠামোর ভিতরে সাজাতে হয়।
কিভাবে আইনের সূক্ষ্ম ফাঁক-ফোকর ব্যবহার করে ট্যাক্স সাশ্রয় করতে হয়।
আর সরকারও এক্ষেত্রে বেশি উচ্চবাচ্য বা কর্তৃত্ব ফলাতে পারে না,
কারণ—
- ধনীরা অর্থনীতির মেরুদণ্ড।
- তারা বিনিয়োগ করে।
- ইন্ডাস্ট্রি চালায়।
- চাকরি দেয়।
- উৎপাদন করে।
- নীরবে রাজনীতির খরচ মেটায়।
বেশি ট্যাঁ-ফো করলেই বিপদ!
সরকার জানে—
কার ঘাড়ে হাত রাখলে চিৎকার হবে।
আর কার ঘাড়ে রাখলে কেউ শুনবে না।
“বিনিয়োগ বাড়বে এই যুক্তিতে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে কর্পোরেট ট্যাক্সের হার
কমানো হয়েছে বারবার, অথচ সাধারণ মানুষের প্রতিদিনের ব্যবহার্য জিনিসের
উপর GST-এর বোঝা অনেক ক্ষেত্রেই অপরিবর্তিত অথবা আরও বেড়েছে।
মুষ্টিমেয় কয়েকজনের জন্য ছাড়ের উৎসব, আর কোটি কোটি মানুষের জন্য
বাধ্যতামূলক করের বোঝা— এটাই বর্তমান অর্থনীতির নির্মম বৈপরীত্য।”
(ব্রিটিশ লুণ্ঠনের ইতিহাস ও তার বিচার করলে দেখা যায়, ইতিহাস বড়ই
বিচিত্র এক আদালত।
এখানে জয়ীরাই আইন লেখে, আর পরাজিতদের রক্ত দিয়ে
সেই আইনের কালি তৈরি হয়।
আজ আমরা যে ঝকঝকে লন্ডন, বাকিংহাম প্যালেস বা
অক্সফোর্ড-কেমব্রিজের আভিজাত্য দেখি, তার প্রতিটা ইটের নিচে
চাপা পড়ে আছে কয়েক কোটি ভারতীয় কৃষকের হাহাকার,
আর লুণ্ঠিত সম্পদের দীর্ঘশ্বাস।
ভাবতে পারেন?
পড়ুন– Click: লন্ডন ও অক্সফোর্ডের আভিজাত্যে ভারতীয় রক্ত:
ব্রিটিশ সভ্যতার এক অপ্রকাশিত সত্য!)
একই ভারতে ৩ টে ভারত:
এই জায়গায় এসে একটা বড় সামাজিক সত্য স্পষ্ট হয়ে ওঠে—
একটা দেশের ভৌগোলিক মানচিত্র এক হলেও, তার অর্থনৈতিক মানচিত্র এক নয়।
আজকের ভারতে অল্প কিছু বৃহৎ কর্পোরেট গোষ্ঠী আছে—
যাদের সম্পদ, আয় এবং অর্থনৈতিক প্রভাব বিপুল।
(পড়ুন) ফোর্বস ও হুরুন ইন্ডিয়া রিচ লিস্ট (ধনী তালিকা) অনুযায়ী বর্তমানে দেশে
বিলিয়নিয়র বা অতি ধনীর সংখ্যা প্রায় ১৬০ থেকে ২০০ এর বেশি।
এরা শুধু ধনী নয়— এরা সেই শ্রেণী যাদের সিদ্ধান্ত বিনিয়োগ এবং উপস্থিতি দেশের
মূল অর্থনৈতিক প্রবাহকেই প্রবাহিত করে।
এই গোষ্ঠীর শীর্ষে থাকা শিল্পপতিদের সম্পদ বৃদ্ধির হার বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়—
তাদের সম্পদ বছরে কয়েক লাখ কোটি পর্যন্ত বাড়ছে।
গাণিতিকভাবে হিসেব করলে দেখা যায়,
শীর্ষ শিল্পপতিদের ক্ষেত্রে সম্পদ বৃদ্ধির হার প্রতি মিনিটে কয়েক হাজার থেকে লক্ষাধিক
টাকার সমমূল্যে পৌঁছাতে পারে—
বিশেষ করে শেয়ার ও বাজারমূল্যের পরিবর্তন ধরলে।
এটা কোন নৈতিক রায় নয়।
এটা কেবল অর্থনীতির একটা বাস্তব হিসেব।
এটাই প্রথম ভারত—
শীর্ষ ১ শতাংশের ভারত (The Elite Empires)
যারা প্রায় বিদ্যুৎ গতিতে ধনী হয়ে উঠছে।
যাদের ব্যবসা ও জীবন-যাপন বিশ্ববাজারের গতির সঙ্গে তাল মিলিয়ে চলে—
যেখানে দেশের সীমানা গুরুত্বপূর্ণ নয়, সুযোগটাই প্রধান।
এই প্রভাবশালী শিল্পগোষ্ঠীগুলো দেশের মূল পরিকাঠামো, পুঁজি প্রবাহ এবং বড় অর্থনৈতিক
সিদ্ধান্তের কেন্দ্রে অবস্থান করে।
এর পাশেই আছে আর একটা ভারত—
একটা তুলনামূলকভাবে ছোটো কিন্তু শক্তিশালী ও উচ্চ মধ্যবিত্ত শ্রেণীর ভারত।
এই শ্রেণীটা উন্নয়নের সুবিধার সবচেয়ে বেশিটা ভোগ করে—
ভালো রাস্তা, ডিজিটাল পরিষেবা, বেসরকারি শিক্ষা, উন্নত স্বাস্থ্যব্যবস্থা।
এই মানুষগুলোর জীবনযাপন, উন্নয়নের মডেলের সঙ্গে অনেকটাই সঙ্গতিপূর্ণ।
এটাই দ্বিতীয় ভারত—
মধ্যবিত্ত ও ভোগক্ষম স্তরের
এক শহুরে ভারত (The Two Crore Club).
(সংখ্যার হিসেবে যাদের নিয়ে মতভেদ আছে, এখানে আনুমানিকভাবে Two Crore Club বলা হয়েছে।)
দেশের সমৃদ্ধির দ্বীপে বসবাস করা সেই প্রায় ২ কোটি মানুষ,
যাদের আয় তুলনামূলকভাবে স্থিতিশীল, যারা উন্নয়নের মডেলের ভিতরে কোনোরকমে
নিজেদের জায়গা করে নিয়েছে।
এই শ্রেণীই আধুনিক সুযোগ-সুবিধার সবচেয়ে দৃশ্যমান ভোক্তা—
যাদের কাছে উন্নয়ন মানে কাগজের পরিসংখ্যান নয়, বরং প্রতিদিনের জীবনে পাওয়া সুবিধে।
আর তারপর আসে তৃতীয় ভারত—
সংখ্যায় সবচেয়ে বড় কিন্তু কণ্ঠে সবচেয়ে নীরব।
এই বিশাল সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষ—
যাদের জীবন এখনও অনিশ্চয়তা, কম আয়ের চাপ, মুদ্রাস্ফীতি ও পরোক্ষ
করের বোঝায় জর্জরিত।
যারা প্রতিদিন খরচের মধ্যেই ট্যাক্স দেন,
কিন্তু সেই ট্যাক্সের বিনিময় নিরাপত্তা ও সুযোগ পান খুবই অল্প বা সীমিতভাবে।
(চিকিৎসকদের লেখা প্রেসক্রিপশন পড়ে উদ্ধার করা বহু ক্ষেত্রে
অসম্ভব হয়ে পড়ে—
এই অভিযোগ নতুন কিছু নয়।
আপনার হাতে থাকা ডাক্তারের ওই চিরকুটটা কি জীবন ফিরিয়ে দেওয়ার মন্ত্র,
না কি নিঃশব্দে মৃত্যুর দিকে টেনে নেওয়ার এক গোপন সংকেত?
জানতে হলে পড়ুন– Click: প্রেসক্রিপশন বা ওষুধের: দেহ ভর্তি শুধু ইংরিজি,
ভবিষ্যতের মৃত্যু কি তবে বাড়বে?)
এটাই তৃতীয় ভারত—
নিম্নবিত্ত ও শ্রমিক শ্রেণীর ভারত
(The Silent Majority).
এরা সংখ্যার দিক থেকে সবচেয়ে বড়, অথচ প্রভাবের দিক থেকে সবচেয়ে দুর্বল।
যাদের হাড়ভাঙা শ্রম আর দৈনন্দিন খরচের উপর দেওয়া GST বা পরোক্ষ করে
রাষ্ট্রের চাকা ঘোরে।
কিন্তু যাদের জীবনে উন্নয়নের ফল পৌঁছয় ধীরে, অসমভাবে—
আবার অনেক সময় পৌঁছয়ই না।
এটা কোনো সরকারি পরিসংখ্যান নয়, বরং একটা ধারণাগত হিসেব।
ধরা যাক– প্রায় ১০০ কোটি মানুষ গড়ে মাত্র ১০ টাকা করে প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষ কর দেয়।
এমনকি অতি দরিদ্র মানুষও যখন নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্য কেনে,
সেই খরচের মধ্যেই কর দিয়ে দেয়।
তবে কার কর কতটা– তা নির্দিষ্টভাবে মাপা যায় না।
তবু এই ধারণাগত সংখ্যাটুকুই বুঝিয়ে দেয়—
রাষ্ট্রের দৈনন্দিন চলমান খরচের আসল ও অসহনীয় ভারটা পড়ে সাধারণ মানুষের উপরেই।

অক্সফাম ও ওয়ার্ল্ড ইনইকুয়ালিটি
ল্যাবের রিপোর্ট অনুযায়ী, ভারতের শীর্ষ ১ শতাংশ মানুষের হাতে দেশের মোট সম্পদের
৪০% শতাংশরও বেশি রয়েছে।
এই তথ্য কোন রাজনৈতিক ভাষণ নয়, যে মিথ্যের বন্যা বয়ে যাবে।
এটা বৈশ্বিক গবেষণার ফলাফল।
অর্থনীতির ভাষায় এই বাস্তবতাকে বলা হয়—
(পড়ুন) ‘K-Shaped Growth’ বা ‘K-Shaped Recovery’.
এর মানে—
একই সময়ে শীর্ষস্তরের মুষ্টিমেয় একদল মানুষ দ্রুত উপরের দিকে উঠে যাচ্ছে,
আর নিম্ন ও মধ্যবিত্তরা নিচের দিকেই আটকে থাকছে।
এটা কাউকে দোষারোপ নয়।
এটা কোন ব্যক্তির বিরুদ্ধে অভিযোগও নয়।
এটা একটা অর্থনৈতিক কাঠামোর ফল— যেখানে উন্নয়ন আছে,
কিন্তু তার গতিপথ সবার জন্য এক নয়।
এবং সেখানেই প্রশ্নটা আবার ফিরে আসে— একই দেশের নাগরিক হয়েও,
আমরা কি সত্যিই একই ভারতের অংশ?
শেষ কথা: GST
মানুষের পকেট থেকে নেওয়া ওই টাকাগুলো যখন GST বা কর হিসেবে
সরকারের ঘরে কালবৈশাখী হয়ে চলে যায়, তখন সরকারের দায়িত্ব হয় সেই টাকাকে
জনকল্যাণে আশীর্বাদে রূপান্তরিত করা।
কিন্তু বাস্তবতা হলো, উন্নয়নের সুফল চুঁইয়ে চুঁইয়ে একদম নিচের স্তরে পৌঁছতে
পৌঁছতে তা অনেক সময় বাষ্পীভূত হয়ে যায়।
ভারত আজ এক অদ্ভুত সন্ধিক্ষণে।
একদিকে আমরা মহাকাশে পাড়ি দিচ্ছি।
দ্রুততম ক্রমবর্ধমান অর্থনীতির তকমা পাচ্ছি, আর অন্যদিকে দেশের এক বড় অংশ
আজও দারিদ্র্যের অন্ধকারে গলা পর্যন্ত ডুবে বসে আছে।
এই ‘সমৃদ্ধির দ্বীপ’ এবং ‘দারিদ্র্যের কাদা’—
এই দুইয়ের মধ্যবর্তী দূরত্ব যতদিন না মোটামুটি কমবে,
ততদিন যে কোনো জিডিপি (GDP) গ্রোথ সাধারণ মানুষের কাছে কেবল একরাশ
অর্থহীন সংখ্যা ছাড়া আর কিছুই নয়।

সাম্প্রতিক তথ্য বলছে ২০২৫-২৬ অর্থবছরে ভারত সরকারের
প্রত্যক্ষ কর সংগ্রহের পরিমাণ ২০ লক্ষ কোটি টাকা ছাড়িয়ে গেছে,
যা রাষ্ট্রের শক্তিশালী অর্থনৈতিক অবস্থানের প্রমাণ দেয়।
কিন্তু মুদ্রার উল্টো পিঠ হলো—
সরকার একদিকে যেমন প্রত্যক্ষ কর থেকে ২০ লক্ষ কোটি টাকা আয় করে
শক্তির পরিচয় দিচ্ছে,
অন্যদিকে তেমনই সাধারণ মানুষের প্রতিদিনের
কেনাকাটা (GST) থেকেও প্রায় সমপরিমাণ বা তার বেশি অর্থ সংগৃহীত হচ্ছে—
সময়সূচকভাবে সম্পূর্ণ তুলনা নয়, শুধুমাত্র বোঝানোর জন্য।
অর্থাৎ দেশের অর্থনীতি যতটা না ধনীদের ট্যাক্সে চলে, তার চেয়ে কোন অংশে কম
চলে না সাধারণ মানুষের ৫ টাকার বিস্কুট বা ১০ টাকার কলমের ট্যাক্সে।
কাদা থেকে দেশকে টেনে তোলার জন্য বড় বড় শিল্পপতির দরকার নেই,
দরকার সেই সাধারণ মানুষের ক্ষমতায়ন— যাদের ছোটো ছোটো কয়েক টাকার ট্যাক্সে রাষ্ট্র
তার মেরুদণ্ড সোজা করে দাঁড়িয়ে আছে।
উন্নয়ন তখনই সার্থক হবে, যখন ২ টাকার কলম ১০ টাকায় কেনার কষ্টটা
সাধারণ মানুষ উন্নত জীবন আর সুরক্ষিত ভবিষ্যতের মধ্যে দিয়ে ফিরে পাবে।
(Articlesবাংলা – আমাদের, আপনাদের পরিবার।
ইমেল আইডি দিয়ে আমাদের সাথে যুক্ত হন।
ফলে যখনই এই ব্লগে কোনো নতুন লেখা পোস্ট করা হবে,
সবার আগে আপনিই পাবেন নোটিফিকেশন।
লেখাটা ভালো লাগলে,
শেয়ার করে বন্ধুদের পড়ার সুযোগ করে দিন।
মূল্যবান মন্তব্যে জানান কেমন লাগলো।)
Articlesবাংলা Bangla Articles, Quotes & Prose-Poetry / বাংলা প্রবন্ধ, উক্তি ও গদ্য-কবিতা।



