ব্রিটিশ শাসন:
চরম বর্বরতার অজানা অধ্যায়
মাস্টারদা সূর্য সেন:
ইতিহাস বিজয়ী পক্ষ লেখে, কিন্তু বিজয়ীদের সেই ইতিহাসের ভাঁজে ভাঁজে চাপা পড়ে থাকে
কান্না, হাহাকার আর অমানবিক অত্যাচারের গল্প।
ব্রিটিশ শাসনামলে ভারতবর্ষ থেকে তারা কেবল রাশি রাশি ধন-সম্পদ, (পড়ুন) কোহিনূর কিংবা
মসলিন লুট করেনি; তারা সুপরিকল্পিতভাবে পদদলিত করেছিল এদেশের মানুষের
মান মর্যাদা ও ঐতিহ্যকে।
সভ্যতার মুখোশ পরে আসা সেই ‘সাহেব’দের আসল চেহারাটা ছিলো ঠিক কতটা হিংস্র
আর পাশবিক, তা কল্পনা করা আজও কঠিন।
পাশবিক লেখার পাশাপাশি এটা জানানোও উচিত যে, পশুরাও এই নৃশংসতায়
এক্ষেত্রে লজ্জা পায়।
আজ আপনাদের সামনে তুলে ধরবো ব্রিটিশদের সেই নির্মমতার এক চরম অধ্যায়—
যেখানে ব্রিটিশ সাম্রাজ্য কাঁপছিল মাত্র একজন মানুষের গলার আওয়াজের ভয়ে।
ভয়টা ঠিক কি পরিমানে, এই লেখার মধ্যে দিয়ে আপনারা বুঝে নেবেন।
চট্টগ্রামের সেই সূর্য, যাকে নেভাতে তারা বেছে নিয়েছিল ইতিহাসের নিকৃষ্টতম পথ।
মাস্টারদা সূর্য সেন:
শিক্ষক থেকে বিপ্লবীর পথ
মাস্টারদা সূর্য সেন জন্মেছিলেন ১৮৯৪ সালের ২২শে মার্চ চট্টগ্রামের একটা ছোটো গ্রামে।
পেশায় তিনি ছিলেন গণিতের শিক্ষক।
কিন্তু শিক্ষকের আড়ালে লুকিয়ে ছিল এক (পড়ুন) বিপ্লবী।
ভারতীয় স্বাধীনতা সংগ্রামের প্রেক্ষাপটে তিনি ব্রিটিশ শাসনের বিরুদ্ধে সক্রিয় ভূমিকা নেন।
পেশায় শিক্ষক হলেও তাঁর নেশা ছিল একটাই— মাতৃভূমিকে শৃঙ্খল মুক্ত করা।
তিনি নেতৃত্ব দেন অনুশীলন সমিতির বিপ্লবী কার্যক্রমে, যা মূলত চট্টগ্রামের অস্ত্রাগার দখল
এবং ব্রিটিশ প্রশাসনের উপর প্রভাব বিস্তার করার জন্য পরিকল্পিত ছিল।
১৯৩০ সালের এপ্রিল মাসে মাস্টারদা সূর্য সেন-এর নেতৃত্বে চট্টগ্রাম অস্ত্রাগার দখলের
অভিযান অনুষ্ঠিত হয়।
আর এই দখলই ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের ভিত নাড়িয়ে দিয়েছিল।
আইরিশ ইস্টার বিদ্রোহের আদলে গড়া সেই বিদ্রোহ প্রমাণ করে দিয়েছিলো যে,
গোরাদের অপরাজেয় ভাবমূর্তিটা আসলে কাঁচের মতো ভঙ্গুর।
জালালাবাদ পাহাড়ের রক্তক্ষয়ী যুদ্ধ থেকে শুরু করে দীর্ঘ পলাতক জীবন—
সূর্যসেন হয়ে উঠেছিলেন ব্রিটিশদের রাতের ঘুম কেড়ে নেওয়া এক দুঃস্বপ্ন।
(ব্রিটিশ লুণ্ঠনের ইতিহাস ও তার বিচার করলে দেখা যায়,
ইতিহাস বড়ই বিচিত্র এক আদালত।
এখানে জয়ীরাই আইন লেখে, আর পরাজিতদের রক্ত দিয়ে
সেই আইনের কালি তৈরি হয়।
আজ আমরা যে ঝকঝকে লন্ডন, বাকিংহাম প্যালেস বা অক্সফোর্ড-কেমব্রিজের
আভিজাত্য দেখি, তার প্রতিটা ইটের নিচে চাপা পড়ে আছে কয়েক কোটি
ভারতীয় কৃষকের হাহাকার, আর লুণ্ঠিত সম্পদের দীর্ঘশ্বাস।
পড়ুন সেই অজানা সত্য– Click: লন্ডন ও অক্সফোর্ডের আভিজাত্যে ভারতীয় রক্ত:
ব্রিটিশ সভ্যতার এক অপ্রকাশিত সত্য!)
সেই অভিশপ্ত রাত:
১৯৩৪ সালের ১২ ই জানুয়ারি
১৯৩৩ সালে নেত্র সেনের বিশ্বাসঘাতকায় মাস্টারদা ধরা পড়েন।
গ্রেপ্তারের সময় এবং কারাগারে তার সঙ্গে যে আচরণ করা হয়েছিল তা ছিলো
কল্পনার অতীত, নৃশংসতায় পরিপূর্ণ।
প্রহসনের বিচারে তাকে ফাঁসির দণ্ড দেওয়া হয়।
কিন্তু ব্রিটিশ প্রশাসনের ভিতরে তখন এক অদ্ভুত আতঙ্ক গোটা হৃদপিণ্ডকে
চারিদিক থেকে ঘিরে ধরেছে।
চট্টগ্রাম কারাগারের চার দেয়াল থর থর করে কাঁপছে।
গোয়েন্দা রিপোর্ট বলছে, মাস্টারদা সূর্য সেনকে যদি সাধারন নিয়মে ফাঁসি দেওয়া হয়
এবং তিনি যদি ফাঁসির মঞ্চে দাঁড়িয়ে শেষবারের মতো সেই রণধ্বনি– ‘বন্দেমাতরম’
উচ্চারণ করেন, তবে জেলের ভিতরে থাকা শত শত রাজবন্দী সেই ধ্বনিতে উজ্জীবিত হয়ে
তুমুল বিদ্রোহ শুরু করে দেবে, এমনকি জেলের দেওয়াল, গরাদ ভেঙে ফেলার উপক্রম হবে।
সামান্য এক রোগা পাতলা মানুষের কন্ঠস্বরকে ঠিক কতটা ভয় পেলে একটা শক্তিশালী সাম্রাজ্য
এমন নীচ পরিকল্পনা করতে পারে, তা ভাবলে আজও গায়ে কাঁটা দেয় ও গর্বও হয়।
ইতিহাস থেকে জানা যায়, সূর্যসেনকে এবং তার সঙ্গীদের শৃঙ্খলাবদ্ধভাবে আটকানো হয়
এবং ফাঁসির দন্ড দেওয়া হয় ১৯৩৪ সালে।
হাতুড়ি আঘাত এবং
কণ্ঠরোধের ঘৃণ্য চেষ্টা:
ব্রিটিশ পুলিশ ও কারারক্ষীরা সিদ্ধান্ত নিল, মাস্টারদার কণ্ঠকে স্তব্ধ করে দিতে হবে
ফাঁসির আগেই।
- ফাঁসির মঞ্চে নিয়ে যাওয়ার আগে শুরু হলো এক নারকীয় তাণ্ডব।
- ভারী লোহার হাতুড়ি দিয়ে পিটিয়ে মাস্টারদার চোয়াল থেঁতলে দেওয়া হলো।
- এর আগে একের পর এক তার দাঁতগুলো উপড়ে ফেলা হলো।
- রক্তে ভেসে যাচ্ছিল জেলের মেঝে।
উদ্দেশ্য একটাই— তিনি যেন কথা বলতে না পারেন।
তিনি যেন কিছুতেই ‘বন্দেমাতরম’ ধ্বনি উচ্চারণ করে বিপ্লবের আগুন জ্বালাতে না পারেন।
কল্পনা দত্তের স্মৃতিচারণ এবং পরবর্তীকালে চট্টগ্রাম অস্ত্রাগার লুণ্ঠন নিয়ে ঐতিহাসিক
নথিপত্রে এই নৃশংসতার বর্ণনা পাওয়া যায়।
যখন তাকে ফাঁসির মঞ্চে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে তখন তিনি প্রায় সংজ্ঞাহীন,
শরীরটা রক্তাক্ত মাংসপিণ্ড ছাড়া আর কিছুই ছিলো না।
কথা বলা তো দূর, নিঃশ্বাস নেওয়াই ছিলো দুরূহ।
তবুও ব্রিটিশদের ভয় কাটেনি।
শেষে অর্ধমৃত, নিথরপ্রায় দেহটাকেই তারা ফাঁসির দড়িতে ঝোলালো।
শেষ বিদায়: মাটিহীন এক সমাধি
ব্রিটিশদের ভীরুতা এখানেই শেষ হয়নি।
তারা জানত, যদি সূর্যসেনের মৃতদেহ সাধারণ মানুষের হাতে পড়ে,
তবে তাঁর প্রতিটা রক্তবিন্দু থেকে হাজার হাজার সূর্যসেন জন্ম নেবে।
চট্টগ্রামের মাটি তাঁর মৃতদেহ ছুঁলে সেখানে বিপ্লবের তীর্থস্থান তৈরি হবে।
তাই তারা মাস্টারদার মৃতদেহ তাঁর স্বজনদের হাতে তুলে দেওয়ার সাহসটুকুও পায়নি।
তাই গভীর রাতে ব্রিটিশরা তাঁর মৃতদেহটা লোহার খাঁচায় ভরে ভারী পাথরের সাথে বেঁধে,
বঙ্গোপসাগরের অতল গহ্বরে ডুবিয়ে দেয়।

যে মাটির জন্য তাঁর আগুন-লড়াই, আত্মত্যাগ, সেই মাটিতেই তাঁর কোনো সমাধি নেই,
কোনো চিহ্ন নেই।
কিন্তু ব্রিটিশরা জানতো না—
সমুদ্রের বিশালতা যেমন মাপা যায় না, তেমনি মানুষের হৃদয়ে গেঁথে যাওয়া দেশপ্রেমের
কোনো সমাধি হয় না।
মাস্টারদা সূর্য সেন:
সত্যতা যাচাই,
ইতিহাসের বয়ান
অনেকে প্রশ্ন করতে পারেন:
এই ঘটনা কি সত্যিই, না কি নিছক আবেগ ও জনপ্রিয় কাহিনীতে প্রচলিত।
চট্টগ্রাম বিদ্রোহের অন্যতম প্রধান সেনাদলের নায়ক সূর্যসেনের ঘনিষ্ঠ সহযোদ্ধা কল্পনা দত্ত
তাঁর স্মৃতিকথায় এই নির্মমতার কথা উল্লেখ করেছেন।
এছাড়া সমকালীন অনেক নথিপত্রে এবং জেলের ভিতরে থাকা বন্দীদের বয়ানে
এই পৈশাচিকতার ইঙ্গিত পাওয়া যায়।
ব্রিটিশরা তাদের নিজস্ব অফিশিয়াল রেকর্ডে এই নিষ্ঠুরতার কথা চেপে গেলেও,
ইতিহাসের সত্য কখনো চাপা থাকে না।
ফাঁসির আগে বন্দীর উপর শারীরিক নির্যাতনের প্রমাণ তৎকালীন জেলের নথিতেও
পরোক্ষভাবে উঠে এসেছে।
তবুও এক্ষেত্রে জানিয়ে রাখা ভালো— বিপ্লবীদের প্রতি তাদের শাস্তি প্রায়শই অত্যন্ত কঠোর
এবং রাজনৈতিক উদ্দেশ্য প্রণোদিত ছিলো।
কিন্তু প্রতিটা ভয়াবহ বর্ণনা যা জনপ্রিয় কাহিনীতে প্রচলিত, সেগুলো প্রামাণ্য নথি দ্বারা
সমর্থিত কি না, তা যাচাই করা আবশ্যক।
কেন এই ইতিহাস জানা প্রয়োজন?
আজ আমরা যখন স্বাধীন ভারতে দাঁড়িয়ে সাফল্যের কথা বলি,
তখন আমাদের মনে রাখা উচিত এই স্বাধীনতার ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপিত হয়েছিল
মাস্টারদা সূর্য সেন এর মতো মহামানুষের হাড় আর রক্ত দিয়ে।
(পড়ুন) ব্রিটিশরা আমাদের কেবল সম্পদহীন করেনি, তারা আমাদের মেরুদন্ড ভেঙে দিতে চেয়েছিল।
কিন্তু সূর্যে হাত দিলে যা হয়— তিনি প্রমাণ করে গেছেন,
- হাতুড়ির আঘাতে দাঁত ভেঙে দেওয়া যায়।
- চোয়াল থেঁতলে দেওয়া যায়।
- দেশের মাটি থেকে ছুঁড়ে বঙ্গোপসাগরেও ফেলে দেওয়া যায়।
কিন্তু আদর্শ অদম্য, তাই তাকে স্তব্ধ কোনোভাবেই করা যায় না।
সূর্যকে নেভানো কি সম্ভব?
বঙ্গোপসাগর থেকে বাঙালির হৃদয়ে
সূর্য সেনের সেই ভাঙা চোয়াল আর রক্তাক্ত মুখের অবয়ব আসলে ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের
সভ্যতার গালে এক বিশাল চপেটাঘাত।
সূর্য সেন এর জীবন ও সংগ্রাম আমাদের শিক্ষা দেয়:
সাহস নেতৃত্ব ও আত্মত্যাগের শক্তি কিভাবে বিপুল সাম্রাজ্যকেও চ্যালেঞ্জ দিতে পারে।
কিভাবে গুঁড়িয়ে দেওয়া যায় ঔদ্ধত্যের পর্বত।

বঙ্গোপসাগরের নোনা জলে তার দেহ মিশে গেলেও, তাঁর আদর্শ আজও বাংলার প্রতিটা দেশ
প্রেমিকের শিরা-ধমনীতে বয়ে চলেছে।
ব্রিটিশরা তাকে মাটি দিতে চায়নি, কারণ তারা ভয় পেয়েছিল যে,
সেই মাটিই না আবার আগ্নেয়গিরি হয়ে ওঠে।
আর তারা ভুলে গিয়েছিল— সূর্যকে কখনো জলে ডুবিয়ে নিভিয়ে দেওয়া যায় না।
(আমরা সবাই জানি— ট্যাক্স দিতে হয়।
কিন্তু খুব কম মানুষ জানে,
- কতটা দিতে হয়।
- কতবার দিতে হয়।
- আর না বুঝেই বা কতখানি চলে যায়।
এক্ষেত্রে বলে রাখা ভালো—
গরিব বা সাধারণ মানুষের আয় সব সময়ই চোখে পড়ে, তাই ট্যাক্সের কারাগারে
তারা আজীবন বন্দী।
সে খেতে পাক বা না খেয়েই মারা যাক, করের বোঝা ‘বেতাল’ হয়ে ঘাড়ে
চেপে থাকবেই।
আর ধনীরা জানে, কিভাবে সম্পদ আইনের কাঠামোর ভিতরে সাজাতে হয়।
কিভাবে আইনের সূক্ষ্ম ফাঁক-ফোকর ব্যবহার করে ট্যাক্স সাশ্রয় করতে হয়।
সরকারি তথ্য অনুযায়ী বর্তমানে ভারতের মাসিক GST সংগ্রহ প্রতি মাসে প্রায়
১.৭৫ লক্ষ কোটি টাকা ছাড়িয়ে যায়।
পড়ুন ভিতরের আসল গল্প– Click: GST-র চক্রব্যূহ: একই ভারতের ভিতরে
তিনটে ভারত– কিভাবে সম্ভব?)
Articlesবাংলা Bangla Articles, Quotes & Prose-Poetry / বাংলা প্রবন্ধ, উক্তি ও গদ্য-কবিতা।



