নেতাজী সুভাষচন্দ্র বসু:
কক্ষপথচ্যুত এক
ধূমকেতুর দহন
ইতিহাস সব সময় বিজয়ীদের দ্বারা লেখা হয়, কিন্তু কিংবদন্তি লেখা হয়
মানুষের রক্তে আর আবেগের স্পন্দনে।
নেতাজী সুভাষচন্দ্র বসু ভারতবর্ষের স্বাধীনতা সংগ্রামের মানচিত্রে
এমন একজন মানুষ,
যিনি কেবল একজন স্বাধীনতা সংগ্রামীই ছিলেন না—
- ছিলেন এক জ্বলন্ত দর্শন।
- এক অশান্ত বজ্র।
- জীবন্ত আগ্নেয়গিরি।
- তিনি ছিলেন এক কালজয়ী মেরুদণ্ড।
যখন আমরা ‘নেতাজী’ বলি, তখন কেবল একটা উপাধি
উচ্চারিত হয় না।
উচ্চারিত হয়—
- এক অপরাজেয় জেদ।
- এক অদম্য আদর্শ।
- হিমালয়সম এক ব্যক্তিত্ব।

তিনি জন্মেছিলেন সময়ের প্রয়োজন হয়ে, সময়ের সীমা মানার জন্য নয়।
“যদা যদা হি ধর্মস্য গ্লানির্ভবতি ভারত।
অভ্যুত্থানম্ অধর্মস্য তদাত্মানং সৃজাম্যহম্।।
পরিত্রাণায় হি সাধুনাং বিনাশয় চ দুষ্কৃতাম।
ধর্মসংস্থাপনার্থায় সম্ভবামি যুগে যুগে।।”
নেতাজী সুভাষচন্দ্র বসু ছিলেন এমন একজন মানুষ—
- যাকে শুধু বিপ্লবী বলা অসম্পূর্ণ।
- রাষ্ট্রনায়ক বলা অল্প।
- আর রাজনীতিক বলা তো একপ্রকার অবমাননা।
আজকের পৃথিবীতে আমরা সাহসের গল্পের বই পড়ি, ভিডিও দেখি, সিনেমায় দেখি।
আর দেখি সাহসের অপব্যবহার।
কিন্তু এমন এক সময় ছিলো,
যখন সাহস মানে ছিল মৃত্যুকে চোখে চোখ রেখে বলা— “আমি থামবো না।”
নেতাজী সেই সাহসের নাম।
তিনি যে গদি আঁকড়ে রাজনীতি করতে আসেননি, এ বিষয়টা আজ
অনেক ভারতবাসীর কাছেই স্পষ্ট।
তিনি এসেছিলেন আত্মবিসর্জনের মহোৎসবে শামিল হতে।
সাহস কি বক্তৃতায় জন্মায়
নাকি সিদ্ধান্তে?
নেতাজীর জীবন বোঝার প্রথম শর্ত—
তাঁকে রোমান্টিক বিপ্লবী হিসেবে দেখা বন্ধ করা।
কারণ রোমান্টিসিজমে আবেগ থাকে, কিন্তু আত্মবলিদানের হিসেব থাকে না।
নেতাজী ছিলেন সম্পূর্ণ হিসেবি—
তিনি জানতেন কোন পথে গেলে মৃত্যু নিশ্চিত।
তবুও সেই পথেই তিনি হাঁটতেন।
দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের অস্থির সময়ে ইউরোপ থেকে পূর্ব এশিয়ার দিকে তাঁর যাত্রা
কোনো অ্যাডভেঞ্চার ছিল না, এ ছিল সচেতন আত্মনিবেদন।

সাগরের বুকে মৃত্যুর মুখোমুখি:
সেই অবিশ্বাস্য স্পর্ধা
১৯৪৩ সালে উত্তাল আটলান্টিক পেরিয়ে এসে ভারত মহাসাগরের
ভয়াল-ভয়ঙ্কর বুকে দাঁড়িয়ে থাকা সেই মুহূর্ত—
যা কল্পনাতেই বুক কাঁপিয়ে দেয়।
দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের দামামা তখন সর্বত্র।
যুদ্ধের আগুনে ফুটছে সমুদ্রও।
জার্মান সাবমেরিন ‘ইউ-১৮০’ থেকে জাপানি সাবমেরিন ‘আই-২৯’-এ যাওয়ার
সেই রোমহর্ষক দৃশ্যটা ভাবলে আজও গায়ের লোম খাড়া হয়ে যায়।
চারিদিকে পাহাড় প্রমাণ ঢেউ।
যুদ্ধ জাহাজের গর্জন আর প্রকৃতির রুদ্ররূপ।
এই ভয়ংকর পরিস্থিতি দেখে প্রাণের মায়ার হাল ছেড়ে দিয়ে
জার্মান ক্যাপ্টেন যখন বলেছিলেন— “আমাদের ফিরে যাওয়াই উচিত।”
তখন সেই মৃত্যুপুরীতে দাঁড়িয়েও এক বাঙালি যুবক অবিচল কণ্ঠে বলেছিলেন—
“আমি ৯০ দিন পাড়ি দিয়ে এখানে ফিরে যাওয়ার জন্য আসিনি।”
অতএব, আবেদ হাসানকে সঙ্গে নিয়ে সেই উন্মাদ সমুদ্রে রবার ডিঙিতে করে
এক সাবমেরিন থেকে অন্য সাবমেরিন যাওয়ার যে দুঃসাহস তিনি দেখিয়েছিলেন,
তা কোনো সাধারণ মানুষের পক্ষে সম্ভব তো নয়ই, কল্পনাতেও অস্বস্তি হয় ও বুক কাঁপে।

(সে মানুষ হিন্দু হোক, মুসলমান হোক, কিংবা হোক
বৌদ্ধ, জৈন বা খ্রিস্টান–
যদি তাঁর উদ্দেশ্য হয় সমাজের উন্নতি, জাতির কল্যাণ
কিংবা দেশের মঙ্গল,
তবে সেই কর্মই হওয়া উচিৎ সকল ধর্মের প্রকৃত সাধনা।
যে কাজ মানুষের মঙ্গলের জন্য, তা কোনো এক ধর্মের
সীমায় আবদ্ধ নয়;
বরং তা প্রতিটা ধর্মেরই মূলমন্ত্র হওয়া উচিৎ।
প্রকৃত ধর্ম কখনও বিভাজনের দেয়াল নয়, বরং মিলনের সেতু।
যে মানুষ সত্য ও সেবার পথে চলে, সেই প্রকৃত ধর্মাবলম্বী।
পড়ুন সেই মহামানবের অপার দূরদর্শীতার কাহিনী।
Click: স্বামী বিবেকানন্দ– বিশ্বমঞ্চে আলোড়ন সৃষ্টির সেই মুহুর্ত!)
তাঁর এই সিদ্ধান্তের কথা ভেবে জার্মান ক্যাপ্টেন বিস্ময়ে হতবাক হয়ে
বলেই ফেলেছিলেন— “এই লোকটা পাগল।”
হ্যাঁ তিনি পাগলই ছিলেন—
তিনি পাগল না হলে আমাদের শ্বাস-প্রশ্বাস নেওয়াটাও থাকতো ইংরেজদের হাতের মুঠোয়।
আজ আমরা সমুদ্র তীরে দাঁড়িয়ে সেলফি তুলি, আনন্দ করি, উত্তেজিত হয়ে পড়ি।
কিন্তু উত্তাল মাঝসমুদ্রের সেই ভয়াল-ভয়ঙ্কর রূপ ঠিক কেমন?
মৃত্যু সেখানে কতটা তুচ্ছ, যে সেই পরিস্থিতিতে না পড়েছে, জানবে কিভাবে হাড়েহাড়ে?
এই জন্যই তো নেতাজী সুভাষচন্দ্র বসু পৃথিবীর ইতিহাসে এক বিরল প্রজাতি।
নেতাজী সুভাষচন্দ্র বসু:
কেন এরকম মানুষ
আজ জন্মায় না?
এই প্রশ্নটা আমরা আবেগ থেকে করি, কিন্তু উত্তরটা কাঠামোগত।
আজকের পৃথিবী সাহসী মানুষ চায় না।
পৃথিবী চায় ব্যবস্থাপনায় দক্ষ মানুষ।
নেতাজী সুভাষচন্দ্র বসু ছিলেন ব্যবস্থার বাইরে দাঁড়িয়ে, ব্যবস্থাকে ভেঙে
মাটি করে দেওয়ার মানুষ।
তিনি নিজের জন্য কোনোও নিরাপত্তা চাননি, চেয়েছিলেন জাতির আত্মসম্মান।
আজ আমরা লড়াই করে মরি পদ-পদবী, পরিচিতি আর ক্ষমতার জন্য।

নেতাজী লড়েছিলেন এক শান্তির ভবিষ্যতের জন্য, যা ছিলো অদৃশ্য।
যেটা তিনি নিজেই হয়তো দেখতে পাবেন না।
এই ধরনের মহামানব কোনো সভ্যতার উৎপাদন নয়, সভ্যতার প্রশ্নচিহ্ন..???
ক্ষমতা যখন সহজ ছিল,
কেন তিনি প্রত্যাখ্যান করলেন?
ক্ষমতার মোহ বনাম
ত্যাগের কাঁটা পথ:
অনেক ঐতিহাসিক ও গবেষকের মতে, অতুলনীয় নেতাজী সুভাষচন্দ্র বসু
চাইলে হয়তো স্বাধীন ভারতের প্রথম প্রধানমন্ত্রী হতে পারতেন।
কারণ, ক্ষমতা তো এমনিতেই এসে তাঁর কাছে মাথা নিচু করে দাঁড়িয়েছিলো।
আধুনিক ভারতের রাজনীতির সমীকরণ বলে,
তাঁর জনপ্রিয়তা এবং সাংগঠনিক শক্তি ছিল প্রশ্নের অতীত।
কিন্তু কেন তিনি সেই মসৃণ পথ ছেড়ে, অনিশ্চিত ও দুর্গম পথ বেছে নিলেন?
এখানেই লুকিয়ে আছে তাঁর দার্শনিক গভীরতা।
নেতাজী সুভাষচন্দ্র বসু ছিলেন স্বামী বিবেকানন্দের ভাবশিষ্য।
তাঁর কাছে ক্ষমতা ছিল এক তুচ্ছ মায়া।
আর. বি. সি তাঁর রক্তে থাকলেও, গদি জড়িয়ে পড়ে থাকার মত হীনমন্যতা
তাঁর রক্তেই বাইরে ছিলো।

তিনি জানতেন, দেশের জন্য লড়তে গেলে নিজেকে নিঃশেষ করে দিতে হয়।
আজাদ হিন্দ ফৌজ গঠন করা।
লক্ষ লক্ষ মানুষকে এক সূত্রে গাঁথা—
এ শুধুমাত্র এক দক্ষ সংগঠকের কাজ নয়, এ এক ঋষিকল্প নেতার আত্মত্যাগ।
নিজের স্বপ্নকে, রাতের ঘুমকে, এবং ব্যক্তিগত সুখকে গলা টিপে হত্যা করে
(শুনুন) তিনি নিজের রক্ত দিয়ে ভারতের মানচিত্র আঁকতে চেয়েছিলেন,
জাতি-ধর্ম নির্বিশেষে প্রতিটা ভারতবাসীর হৃদয়ে।
তিনি জানতেন, শাসন ক্ষমতা দিয়ে দেশ স্বাধীন হয় না।
দেশ স্বাধীন হয় আত্মবলিদানের আগুনে ঝলসে।
তিনি জানতেন, ব্রিটিশ শাসনের কাঠামোর ভিতর ঢুকে পরিবর্তন মানে হবে আপোষ।
কিন্তু দুর্ভাগ্যবশতঃ এই আপোষ তাঁর অভিধানেই ছিলো না।
আর ঠিক এই জন্যেই তিনি সহজ পথ বেছে নেন নি,
তিনি বেছে নিয়েছিলেন সবচেয়ে অনিশ্চিত ও সবচেয়ে বিপদজ্জনক পথ।
সত্য সামনে এলে
সব সরকারই অস্বস্তিতে পড়ে:
একজন মানুষ যখন প্রতীক হয়ে ওঠে, তখন তাঁর অস্তিত্ব আর ব্যক্তিগত থাকে না।
নেতাজীর ক্ষেত্রে এই সমস্যা আরও গভীর।
কারণ তিনি ছিলেন এমন একজন, যাকে কোনো সরকারই পুরোপুরি
নিজের করে নিতে পারে নি।
- কারণ নেতাজী মানে প্রশ্ন।
- নেতাজী মানে বিবেক।
- আর আপোষহীনতা।
এমন একজন মানুষ জীবিত থাকলে, ক্ষমতায় থাকা বাকি সাধারণ সবাইকে তো
অস্বস্তিতে থাকতেই হয়।
এই কারণেই নেতাজি সম্পর্কিত বহু তথ্য, বহু সাক্ষ্য, বহু স্মৃতি রয়ে গেছে
ধূসর এলাকায়।
পরিচয় প্রমাণ করা কেন
কখনো কখনো অভিশাপ হয়:
ইতিহাসে এমন উদাহরণ বিরল নয়,
যেখানে একজন মানুষ নিজের পরিচয় জানে,
কিন্তু সমাজ তা মানতে অস্বীকার করে।
পরিচয় শুধু মুখের কথা নয়, পরিচয় একটা রাজনৈতিক স্বীকৃতি।
যে সময়ে দেশ স্বাধীনতার পর নতুন ক্ষমতার সমীকরণে ব্যস্ত,
সে সময় কেউ যদি ফিরে এসে প্রশ্ন তোলে— “এই স্বাধীনতার পথই কি একমাত্র পথ ছিল?”
তবে সেই প্রশ্ন অস্বস্তিকর হয়ে ওঠে।
(পড়ুন) নেতাজী নিজে এ বাস্তবতা বোঝার মতো যথেষ্ট দূরদর্শী ছিলেন।
এই বাস্তবতা সামনে রেখে এমন ধারণাও উড়িয়ে দেওয়া যায় না যে,
তিনি ক্ষমতা বা স্বীকৃতির পথে হয়তো না ফেরার সিদ্ধান্তই নিয়েছিলেন।
পরিব্রাজক মন:
রাজনীতির উর্ধ্বে আত্মসন্ধান
নেতাজীকে বুঝতে হলে তাঁকে শুধু বিপ্লবী নয়,
একজন গভীর আধ্যাত্মিক অনুসন্ধানকারী হিসেবেও দেখতে হবে।
তিনি বিশ্বাস করতেন— আসল মুক্তি আসে ভিতর থেকে।
স্বামী বিবেকানন্দ তাঁর চিন্তায় গভীর প্রভাব ফেলেছিলেন।
রাষ্ট্র, ক্ষমতা, পদ— এসব তাঁর কাছে ছিলো সাময়িক।
তিনি এমন এক জীবন চেয়েছিলেন, যেখানে মানুষের জন্য কাজ থাকবে,
কিন্তু ব্যক্তিগত স্বার্থ থাকবে না।
এই জন্যই তিনি কখনো “গদি’র রাজনীতি” করেন নি।
ক্ষমতা তাঁর লক্ষ্য ছিলো না।
ছিলো কেবল একটা মাধ্যম— তাও প্রয়োজন হলে।

(বিবেকানন্দ কিভাবে মারা যান তা জানতে হলে আগে তাঁর সেই লড়াইটা
আমাদের রক্তে মিশিয়ে অনুভব করতে হবে।
কারণ সব লেখা শুধু সাধারণভাবে পড়ে অনুভব করার নয়।
মানুষ যখন সাফল্যের শিখরে পৌঁছতে শুরু করে,
তখন সে ‘সাফল্য’ একটা ছাঁকনির মতন হয়ে যায়।
- কে সেই সাফল্যে প্রকৃত আনন্দ পেল।
- কে শুভাকাঙ্ক্ষী।
- আর কেউ বা ভিতরে ভিতরে ঈর্ষাকাতর হয়ে পড়ল।
সবগুলোই ছেঁকে বেরিয়ে আসে।
পড়ুন বিবেকানন্দের সেই যন্ত্রণার ইতিহাস।
Click: স্বামী বিবেকানন্দের বিশ্বজয়ের আড়ালে এক
অজানা যন্ত্রণার ইতিহাস!)
যে মানুষ নিজের স্বপ্ন
হত্যা করতে পারে,
সে-ই ইতিহাস গড়ে
সবচেয়ে কঠিন ত্যাগ কি জানেন?
নিজের ব্যক্তিগত সুখ, স্বপ্নকে হত্যা করে অন্যের জন্যে ভাবা।
আজকের দিনে যাঁদের একনামে “বোকা বা নির্বোধ” বলা হয়।
নেতাজি সুভাষচন্দ্র বসু ব্যক্তিগত জীবনে যা হারিয়েছেন—
তা সাধারণ মানুষ কল্পনাও করতে পারে না।
নিরাপত্তা, পরিবার, স্বাভাবিক জীবন, সুখ-স্বাচ্ছন্দ ইত্যাদি।
সবকিছু বিসর্জন দিয়ে তিনি বেছে নিয়েছিলেন এক অনিশ্চিত ভবিষ্যত।
কারণ তিনি জানতেন—
একজন মানুষের স্বপ্নের চেয়ে, একটা জাতির মুক্তি বড়।
এই মহান ত্যাগ আজকের দিনে বিরল।
কারণ আজ আমরা ত্যাগের বদলে সুবিধার হিসেব করি।
অন্তরালের ট্রাজেডি:
কেন তিনি ফিরলেন না?
নেতাজির অন্তর্ধান কেবল একটা রহস্য নয়, এটা ভারতের ইতিহাসের
এক গভীর, দীর্ঘশ্বাসে ভরা ও অপূরণীয় ক্ষত।
স্বাধীনতার পরের সেই টালমাটাল সময়ে,
যখন দেশ সবেমাত্র স্বাধীনতার স্বাদ পেয়েছে, তখন নেপথ্যে কাজ করছে
অসংখ্য রাজনৈতিক ও কূটনৈতিক সমীকরণ।
নতুন রাষ্ট্রের ভিত গড়ার ব্যস্ততায়, অতীতের বহু প্রশ্ন ইচ্ছাকৃত অমীমাংসিত
থেকে গিয়েছিলো।
নেতাজীর সহচরদের স্মৃতিকথা ও যুদ্ধ-পরবর্তী অভিজ্ঞতা থেকে একটা বাস্তবতার
আভাস পাওয়া যায়— পরিচয় মানে রাজনৈতিক স্বীকৃতি।
আর সেই স্বীকৃতি আদায় কখনো কখনো নিজের অস্তিত্ব রক্ষার চেয়েও কঠিন
যুদ্ধ হয়ে ওঠে।
ভাবলে বিস্ময় জাগে—
যে মানুষটা স্বাধীনতার সংগ্রামকে আন্তর্জাতিক ও সশস্ত্র স্তরে পৌঁছে দিয়েছিলেন,
বিশ্ব রাজনীতির নিষ্ঠুর দাবার চালে তাঁর গায়েই ‘যুদ্ধপরাধী’ হিসেবে চিহ্নিত করার নিকৃষ্ট প্রচেষ্টা ও আলোচনা চলেছিলো।
এই প্রেক্ষাপটে,
যে সময়ে একদিকে লালবাহাদুর শাস্ত্রীর রহস্যময় মৃত্যু, কিংবা ডঃ হোমি ভাবার দুর্ঘটনা—
সেই সময়কার বৈশ্বিক ষড়যন্ত্রের ইঙ্গিত দিচ্ছিল।
সেই পরিস্থিতিতে সুভাষ চন্দ্রের প্রকাশ্যে আসা কেবল ব্যক্তিগত ঝুঁকি ছিলো না,
তা ছিল এক সম্ভাব্য কূটনৈতিক বিস্ফোরণ।
আজকের মত সোশ্যাল মিডিয়ার লাইভ বা ফেসবুক পোস্ট এর যুগ তখন ছিলো না,
যে তিনি এসে বলবেন— “আমিই তোমাদের সুভাষ।”

ইতিহাসের সেই সময়ে,
নীরবতা অনেক সময় বেঁচে থাকার একমাত্র ভাষা হয়ে ওঠে।
আর সেই নীরবতার মধ্যেই হয়তো নেতাজীর অন্তর্ধানের ট্র্যাজেডি
লুকিয়ে আছে— একটা প্রশ্ন, যার উত্তর ইতিহাস আজও সম্পূর্ণ দিতে পারেনি।
নেতাজী সুভাষচন্দ্র বসু:
মেরুদণ্ড সোজা রাখার পাঠ
আজকের পৃথিবীতে যখন আদর্শের আকাল।
যখন নীতি বিক্রি হয় সস্তা জনপ্রিয়তার কাছে, তখন সুভাষচন্দ্র বসু আমাদের
মেরুদণ্ড সোজা করার রসদ জোগান।
- তিনি কেবল বাঙালির আইকন নন,
- তিনি বিশ্বমানবতার এক জ্বলন্ত উদাহরণ।
- তিনি শিখিয়ে গেছেন যে, দেশপ্রেম কোনো পেশা নয়, এটা একটা সাধনা।
(দেখুন) নেতাজী আমাদের শিখিয়েছেন যে,
সমুদ্র যত উত্তালই হোক, লক্ষ্যে পৌঁছানোর জেদ থাকলে ঢেউও হার মানে।
তিনি ফিরে আসেননি ঠিকই, কিন্তু তার আদর্শ আজও ভারতের
প্রতিটা ধূলিকণায় মিশে আছে।
যে সিংহাসন তিনি অবলীলায় ত্যাগ করেছিলেন,
সেই সিংহাসন আজ তাঁর পায়ের কাছে নগণ্য।
কারণ তিনি মানুষের হৃদয়ে এমন এক সিংহাসন তৈরি করেছেন,
যার গদি পরিবর্তন কোনোদিনও হবে না।
তাই আজ নেতাজি ইতিহাসের পাতায় বন্দি নন,
তিনি আমাদের বিবেকের কাঠগড়ায় দাঁড়িয়ে থাকা এক অমোঘ সত্য।
বর্তমানের চোরাবালি:
আদর্শের অবক্ষয় ও
আগামী দিনের সংকট
বর্তমান প্রজন্ম আজ এক অদ্ভুত গোলকধাঁধায় বন্দি।
প্রযুক্তির চকমকি আলো আর সোশ্যাল মিডিয়ার অন্তহীন স্ক্রলিংয়ের নেশায়
আমরা ধীরে ধীরে এমন এক ভার্চুয়াল জগতে আসক্ত হয়ে পড়ছি,
যেখানে গভীর চিন্তার চেয়ে সস্তা বিনোদন অনেক বেশি দামী।
আমরা আজ ‘লাইক’, ‘শেয়ার’ আর ‘ভাইরাল’ হওয়ার ইঁদুর দোড়ে শামিল হতে গিয়ে
নিজেদের অজান্তেই হারিয়ে ফেলছি আমাদের আদর্শের মেরুদণ্ড।
আমাদের আসক্তি আজ আমাদের বিচারবুদ্ধিকে আচ্ছন্ন করে ফেলেছে;
আমরা ইতিহাস খুঁজি না, খুঁজি কেবল উত্তেজনা।
আজকের প্রজন্মের কাছে হিরো মানেই বড় পর্দার কোন রঙিন চরিত্র।
যাদের বীরত্ব কেবল স্টুডিওর গ্রিন স্ক্রীনেই সীমাবদ্ধ।
যতটা আবেগ একজন ফিল্মি নায়ক-নায়িকাকে দেখে আমাদের মধ্যে জন্ম নেয়,
ততটা নেতাজীকে নিয়ে নয়।

বিষয়টা কিছুটা এমন—
যেন ফিল্মি হিরোই আসল হিরো, কারণ তাঁদের ত্যাগ করতে হয় না,
কেবল ত্যাগের অভিনয় করতে হয়।
স্কুল কলেজের পাঠ্য বইয়ে নেতাজীকে গুটিকয়েক অধ্যায়ে বন্দি করে রাখা হয়েছে,
কিন্তু তাঁর সেই জ্বলন্ত দর্শন আজ কোনো তরুণ-তরুণীকে কি সেভাবে উদ্বুদ্ধ করে?
সিস্টেম আজ আমাদের এমনভাবে তৈরি করছে যাতে, আমরা দক্ষ কর্মী হতে পারি,
কিন্তু বিদ্রোহী বা আত্মত্যাগী হতে ভয় পাই।
পারলে আমাদের সন্তানদেরও সেই পথ থেকে আমরা পিছিয়ে নিয়ে আসি।
নতুন নেতাজীর প্রতীক্ষায়:
নেতাজির বীরত্ব আজ অধিকাংশের কাছে কেবল ২৩ শে জানুয়ারি বা
১৫ ই আগস্ট ছুটির দিন, কয়েকটা হোয়াটসঅ্যাপ স্ট্যাটাসে সীমাবদ্ধ।
তাঁকে জানানোর বা বোঝার প্রকৃত প্রচেষ্টা আজ বড়ই দুর্বল।
ভবিষ্যতে যদি আবার কোনো কালো মেঘ ভারতের আকাশকে ঢেকে দেয়,
যদি জাতি আবার কোনো চরম সংকটের মুখোমুখি দাঁড়ায়—
তবে ভারত কোথায় পাবে সেই আপষহীন নেতাজিকে?
যে প্রজন্ম স্ক্রিনের হিরোকে দেখে হাততালি দিতে অভ্যস্ত হয়ে পড়ছে,
তারা কি পারবে মৃত্যুকে চোখে চোখ রেখে বলতে— “আমি থামবো না।”
নেতাজী কোনো অলৌকিক জাদু মন্ত্রে আকাশ থেকে পড়বেন না।
ভারত যদি আবার তাঁর মত কাউকে ফিরে পেতে চায়, তবে আগে আমাদের
নিজেদের ভিতরের সেই ভীরুতা আর আসক্তিকে পুড়িয়ে ছাই করতে হবে।
আর সেই মানসিকতা যেদিন আমাদের মজ্জায় ফিরে আসবে,
সেদিনই হয়তো ইতিহাসের কোনো এক বাঁকে, ভারত আবার খুঁজে পাবে
তার হারানো মহানায়ককে, সেই সিংহপুরুষকে।
“স্বাধীন করলে অক্সিজেনটা তাইতো সুখের চাষ,
বাহাত্তরটা স্পন্দনেই নেতাজী সুভাষ।
দুর্নীতির জঙ্গলে আজও কৃতঘ্নরা’ই হাসে,
হিমালয়ে পোকামাকড়, তাতে কি যায় আসে।”
—————————–
(যেখানে ব্রিটিশ সাম্রাজ্য কাঁপছিল মাত্র একজন
মানুষের গলার আওয়াজের ভয়ে।
ভয়টা ঠিক কি পরিমানে, এই লেখার মধ্যে দিয়ে
আপনারা বুঝে নেবেন।
চট্টগ্রামের সেই সূর্য, যাকে নেভাতে তারা বেছে নিয়েছিল
ইতিহাসের নিকৃষ্টতম পথ।
কি সেই পথ?
কতটা ভয় পেত ব্রিটিশরা তাঁকে?
শেষ পর্যন্ত কি করা হয়েছিলো তাঁর সাথে?
পড়ুন– Click: …ব্রিটিশদের সেই চরম নৃশংসতা আর বঙ্গোপসাগরে
তলিয়ে যাওয়া এক অজানা ইতিহাস!)
[লেখাটা প্রয়োজনীয় মনে হলে অবশ্যই শেয়ার করে
সমাজের অন্যদেরও পড়তে, জানতে সুযোগ করে দেবেন।
ইমেইল আইডি দিয়ে আমাদের বাঙালির পরিবারের একজন
প্রিয় মানুষ হয়ে উঠুন।
চলুন বাঙালিকে বিশ্বের দরবারে বারবার তুলে ধরি—
চিন্তা, চেতনা আর শব্দের শক্তিতে— একসাথে, সবাই মিলে।
বিশ্ব জানুক—
আমাদের ভারত কি?
বাঙালি কি?
বাংলা শব্দের ক্ষমতাই বা কি?
আপনাদের মূল্যবান মন্তব্য জানাবেন।]
Articlesবাংলা Bangla Articles, Quotes & Prose-Poetry / বাংলা প্রবন্ধ, উক্তি ও গদ্য-কবিতা।
