সুভাষচন্দ্র বসু প্রতিষ্ঠিত আজাদ হিন্দ ফৌজ থেকে লুট করা জনগণের সম্পদ
ঠিক কি হয়েছিলো শেষ পর্যন্ত?
কারা আত্মসাৎ বা তছনছ করেছিলো এই টাকা?
আজ তা ক্রমশ প্রকাশ্য।
ইতিহাসের মাঝে দাঁড়িয়ে
থাকা এক নিষিদ্ধ প্রশ্ন:
ইতিহাসের বাঁকে কিছু দীর্ঘশ্বাস থাকে,
যা কয়েক দশক পার হওয়ার পরও শান্ত হয় না।
১৯৪৫ সালের সেই তপ্ত অগাস্টে যখন ভারতবর্ষ স্বাধীনতার প্রহর গুনছে,
ঠিক তখনই এক গভীর ষড়যন্ত্রের মেঘ ঘনিয়ে এসেছিলো দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার আকাশে।
সেটা শুধু এক কিংবদন্তি নেতার অন্তর্ধানের কাহিনী নয়,
বরং একটা স্বাধীন রাষ্ট্রের কোষাগার লুট হওয়ার এক অতিপ্রাকৃত আখ্যান।

স্বাধীনতার ইতিহাস আমরা সাধারণত দু’ভাবে শুনেছি—
একটা হলো পাঠ্য বইয়ে বসিয়ে রাখা পরিষ্কার গল্প,
আর একটা হলো আবেগে ভরা স্লোগান, বক্তৃতা ইত্যাদি।
কিন্তু ইতিহাসের আসল সত্য অনেক সময় এই দুইয়ের মাঝখানে দাঁড়িয়ে থাকে।
না পুরোপুরি বলা হয়, আবার না পুরোপুরি অস্বীকার করা হয়।
নেতাজি সুভাষচন্দ্র বসু ও আজাদ হিন্দ সরকারের সম্পদের গল্প
ঠিক তেমনি এক অস্বস্তিকর অধ্যায়।
এটা কোনো রোমাঞ্চকর ট্রেজার হান্টের গল্প নয়,
আবার শুধুই রাজনৈতিক অপবাদও নয়।
এটা হলো প্রশ্ন—
যে অর্থ সাধারন মানুষ নিজের বিশ্বাস থেকে দিয়েছিলো,
স্বাধীনতার পরেও তার পূর্ণ হিসাব কেন কখনো সামনে এলো না?
যে সম্পদ গড়ে উঠেছিলো বাংলার সাধারণ ঘরের মায়ের শেষ সম্বল,
মঙ্গলসূত্র আর শ্রমিকের ঘামের বিনিময়ে,
সেই বিপুল ঐশ্বর্য আজ কোথায়?
যে অর্থের লক্ষ্য ছিলো শুধুমাত্র ভারতের মুক্তি, তা কি শেষ পর্যন্ত ঢুকেছিল কোনো ব্যক্তিগত সিন্দুকে?
আজাদ হিন্দ ফৌজের সেই রহস্যময় সম্পদের সুলুকসন্ধানে আজও
গায়ে কাঁটা দেয়।
একটা জাতির যজ্ঞ:
সোনার তুলাদণ্ড
ও মানুষের ভালোবাসা
১৯৪৩ সালে নেতাজি সুভাষচন্দ্র বসু যখন ‘আজাদ হিন্দ সরকার’ গঠন করেন,
তখন সেটা কেবল একটা বিদ্রোহী সেনাবাহিনী ছিলো না,
সেটা ছিলো এক বাস্তব, সার্বভৌম রাষ্ট্রের ঘোষণা।
আজাদ হিন্দ সরকারের ছিলো নিজস্ব প্রশাসন, নিজেদের সংগঠিত সেনাবাহিনী
এবং আলাদা অর্থনৈতিক কাঠামো।

এই অর্থব্যবস্থার কেন্দ্রবিন্দু ছিলো— “আজাদ হিন্দ ব্যাঙ্ক।”
এটা কোনো নামমাত্র বা প্রতীকী প্রতিষ্ঠান ছিলো না;
এই ব্যাঙ্কের মাধ্যমেই পরিচালিত হতো স্বাধীনতার যুদ্ধের বাস্তব খরচ।
এই অর্থ এলো কোথা থেকে?
প্রশ্নের উত্তরটা খুব সাধারণ, কিন্তু ভারী।
এই অর্থ এসেছিল সাধারণ মানুষের কাছ থেকে।
দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় থাকা ভারতীয় প্রবাসীরা—
- শ্রমিক।
- ছোটো ব্যবসায়ী।
- গৃহিণী।
- বৃদ্ধ মানুষ প্রভৃতি।
তারা কেউ বাধ্য হয়ে দেয়নি।
কেউ ভবিষ্যতের লাভের আশায় দেয়নি।
তারা দিয়েছিলো কারণ বিশ্বাস করেছিলো—
এই (পড়ুন) মানুষটাই সেই যোগ্য মানুষ, যিনি সত্যিই স্বাধীনতা আনতে চাইছেন, পারেন।
- কেউ তিলতিল করে নিজের জমানো টাকা দিয়েছিলো।
- কোনো মানুষ তার স্ত্রীর গয়না খুলে দিয়েছে।
- আবার কেউ জীবনের শেষ সঞ্চয়টুকুও তুলে দিয়েছিলো নিঃসঙ্কোচে।
আর ঠিক আজাদ হিন্দ সরকারের হাতে বিপুল অর্থ ও মূল্যবান সম্পদ
জমা হওয়ার এটা একটা বড় কারণ।
সুভাষচন্দ্র বসু:
ভালবাসার ওজন
১৯৪৫ সালের ২৩শে জানুয়ারি ছিলো নেতাজীর উপস্থিতিতে উদযাপিত
তাঁর শেষ জন্মদিন।
ওই দিনটা ছিলো ব্রিটিশের বুক কাঁপিয়ে রেঙ্গুনে আজাদ হিন্দ ফৌজের
শক্তির এক চরম বহিঃপ্রকাশ।
সেদিন দেশপ্রেমিক ভারতীয় সমাজ তাঁদের প্রিয় নেতাকে সোনা দিয়ে ওজন করেছিলো।
সুভাষচন্দ্র বসু-র আপত্তি সত্ত্বেও মানুষ প্রায় ৮৫ কেজি সোনা ঢেলে দিয়েছিলো
তুলাদণ্ডের এক পাল্লায়।
(আমরা এমন এক বিপজ্জনক সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে,
যেখানে প্রকৃতির কার্বন শোষণের ক্ষমতার তুলনায় কয়েক গুণ
বেশি বিষাক্ত গ্যাস আমরা প্রতিদিন বায়ুমন্ডলে ছড়িয়ে দিচ্ছি।
২০৩০-৩১ সালের মধ্যে যদি আমরা বৈশ্বিক কার্বন
নিঃসরণ অন্তত অর্ধেক করতে না পারি
তবে পৃথিবীর জলবায়ু ব্যবস্থা একাধিক বিপজ্জনক
‘টিপিং পয়েন্ট’-এর দিকে অপ্রতিরোধ্যভাবে এগিয়ে যাবে,
যেখান থেকে ক্ষয়ক্ষতি বড় অংশেই আর উল্টানো সম্ভব হবে না।
তবে কি হতে চলেছে আমাদের ভবিষ্যৎ?
এর কি কোনো সমাধান আদৌ নেই?
পড়ুন– Click: জলবায়ু সংকট চরমে:
গাছ লাগালেও কি শেষ রক্ষা পাবো আমরা?)
——————————
সর্বস্ব দান:
সিঙ্গাপুর ও ব্রহ্মদেশের ব্যবসায়ীরাও কোটি কোটি টাকা দান করেছিলো।
বর্তমান ইয়াঙ্গুনের একজন অত্যন্ত ধনী গুজরাটি মেমন ব্যবসায়ী
হাবিবুর রহমান মেমন (যিনি আব্দুল হাবিব মারফানি নামেই বেশি পরিচিত)
নেতাজীর আদর্শে অনুপ্রাণিত হয়ে, তিনি তাঁর কয়েক প্রজন্মের উপার্জিত প্রায়
১ কোটি টাকা (তৎকালীন সময়ে যা এক বিশাল অঙ্ক) এবং সোনা-দানা সমস্ত কিছু
আজাদ হিন্দ ফৌজের তহবিলে দান করেছিলো।
সেই ঐতিহাসিক
মুহূর্তটা ছিল এমন:
নেতাজীর এক ভাষণে উদ্বুদ্ধ হয়ে হাবিব মারফানি মঞ্চে উঠে তাঁর হাতে একটা থালা ভর্তি সোনা, হিরে এবং চাবি তুলে দেয়।
তাঁর সরাসরি মন্তব্য ছিলো,
“আজ থেকে আমি আমার সমস্ত স্থাবর-অস্থাবর, সম্পত্তি
আজাদ হিন্দ সরকারকে দান করলাম।”
এই অভূতপূর্ব ত্যাগের জন্য নেতাজি তাকে ‘সেবক-ই-হিন্দ’ উপাধিতে ভূষিত করেছিলেন।
সুভাষচন্দ্র বসু:
সম্পদের পরিমাণ
হিসেব বলছে,
তৎকালীন সময়ে আজাদ হিন্দ ব্যাঙ্কে নগদ ৩০ কোটি টাকা
এবং প্রায় ২,৯০০ টা বিশুদ্ধ সোনার মোহর ছিল।
এর বাইরে ছিলো হিটলার, মুসোলিন এবং জাপানি প্রধানমন্ত্রী
তোজোর দেওয়া মূল্যবান সব উপহার সামগ্রী।
অমূল্য রত্নভাণ্ডার
১৮, ৪০০ ক্যারেটের সেই রহস্য:
আজাদ হিন্দ ফৌজের কোষাগারে থাকা সম্পদের মধ্যে সবচেয়ে বিস্ময়কর ছিলো একটা ১৮, ৪০০ ক্যারেটের বিশুদ্ধ পান্না।
এর চেয়েও বড় সম্পদ ছিলো ১৭০০ বছরের পুরনো একটা শুদ্ধ পান্নার বুদ্ধমূর্তি।
(অনুসন্ধানকারীদের তথ্য অনুযায়ী)
কিছু নির্ভরযোগ্য উৎস বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়—
জমি, গয়না এবং নগদ অর্থ মিলিয়ে এই পুরো সম্পত্তির বর্তমান আন্তর্জাতিক
বাজার মূল্য প্রায় কয়েক হাজার কোটি টাকা
(এই অঙ্কের পরিমাণ নিয়ে মতভেদ আছে)।
এই বিপুল অর্থ ও সম্পদ একটা সদ্য স্বাধীন দেশের অর্থনীতি
বদলে দেওয়ার জন্য যথেষ্ট ছিলো।
যুদ্ধের সময়
এই কোষাগরের ভূমিকা:
এই সম্পদ দিয়েই—
- সেনাদের রসদ জোগাড় হয়েছে।
- পোশাক অস্ত্র ও ওষুধ কেনা হয়েছে।
- প্রচার ও কূটনৈতিক কাজ হয়েছে।
- এবং আনুষঙ্গিক আরো কিছু।
এগুলো কোনো লুটের ধন ছিলো না।
ছিলো যুদ্ধ চালিয়ে দেশ স্বাধীন করার জ্বালানি।
সুভাষচন্দ্র বসু নিজে এই অর্থকে কোনোদিন, কখনো ব্যক্তিগত
সম্পত্তি হিসেবে দেখেননি।
১৯৪৫: পরিস্থিতির মোড় ঘোরে
১৯৪৫ সালে যুদ্ধের গতিপথ বদলাতে শুরু করে।
জাপানের পরাজয় প্রায় নিশ্চিত হয়ে ওঠে।
এ সময়ে সুভাষচন্দ্র বসু সিদ্ধান্ত নেন—
তিনি নতুন আন্তর্জাতিক সহায়তার সন্ধানে বেরোবেন।
তাঁর সঙ্গে ছিলো আজাদ হিন্দ সরকারের কোষাগারের একটা অংশ।
- কিছু সুটকেস।
- ভারী।
- নীরব।
এরপরে ঘটে সেই ঘটনা—
যেটা আজও ইতিহাসে সবচেয়ে বিতর্কিত।
অর্থাৎ ১৯৪৫ সালের ১৮ই আগস্ট (পড়ুন) তাইহোকু বিমানবন্দরে
সেই কথিত বিমান দুর্ঘটনার পর শুরু হয় ইতিহাসের কুৎসিততম অধ্যায়।
তাইওয়ানের আকাশ:
যেখানে কোনো চিতা জ্বলে ওঠেনি
ইতিহাসের ধুলো ঝাড়লে অনেক সময় এমন সত্য বেরিয়ে আসে,
যা গোটা সাজানো ইমারতকে ধসিয়ে দিতে পারে।
১৯৪৫ সালের ১৮ই আগস্ট তাইহোকু বিমানবন্দরে যে আগুনের গল্প
আমাদের দশকের পর দশক শোনানো হয়েছে,
সমসাময়িক গবেষণায় তা এখন এক বিরাট মিথ্যা হিসেবে প্রমাণিত।

গবেষক সৈকত নিয়োগী এবং সংশ্লিষ্ট মহলের অনুসন্ধানে
এক চাঞ্চল্যকর তথ্য উঠে এসেছে—
তৎকালীন তাইওয়ান সরকারের গোপন তদন্ত রিপোর্ট অনুযায়ী,
ঐ দিন তাইহোকুতে আদৌ কোনো বিমান দুর্ঘটনা ঘটেনি।
ইংল্যান্ডের অনুরোধে করা রিপোর্ট এতদিন ব্রিটিশ আর্কাইভে বন্দি ছিলো।
প্রশ্ন ওঠে যদি কোনো বিমান দুর্ঘটনাই না ঘটে থাকে,
তবে নেতাজির মৃত্যুর প্রশ্ন আসে কোথা থেকে?
আর যদি মৃত্যুই না ঘটে থাকে, তবে রেনকোজি মন্দিরের সযত্নে রাখা
ওই চিতাভস্ম কার?
মুখার্জি কমিশন ২০০৫ সালেই এই সত্যের ইঙ্গিত দিয়েছিল,
কিন্তু ২০০৬ সালে রাজনৈতিক কৌশলে সেই রিপোর্টকে
আঁস্তাকুড়ে নিক্ষেপ করা হয়।
আজ যখন সেই অকাট্য প্রমাণ রাষ্ট্রপতি দ্রৌপদী মুর্মুর দরবারে পৌঁছেছে,
তখন সময় এসেছে চোখে চোখ রেখে প্রশ্ন করার:
কাকে আড়াল করতে এই কয়েক দশকের সাজানো নাটক?
রেনকোজির চিতাভস্ম কি তবে কেবলই এক বিদেশি নাগরিকের অবশেষ,
যাকে সুভাষচন্দ্র বসু-র নামে ভারতে এনে আসল সত্যকে চিরতরে
ভস্মীভূত করার চেষ্টা চলছে?
বিমান দুর্ঘটনা ও প্রথম অমিল:
বিমান দুর্ঘটনার পর বলা হয়— নেতাজী আর নেই।
সরকারি তথ্য অনুযায়ী—
জাপানের তাইহোকু বিমানবন্দর থেকে সর্বমোট প্রায় ৮ কেজি বিশুদ্ধ সোনা
ও ৩ কেজির একটু বেশি সোনা ধাতুর মিশ্রণ উদ্ধার হয়েছিলো,
যা নেতাজী ধারণাকৃত সম্পদের তুলনায় খুবই অল্প এবং তা ছিলো
আজাদ হিন্দ ফৌজের তহবিলের একটা অত্যন্ত ছোটো অংশ।
অর্থাৎ বিমান থেকে কিছু সোনা, মূল্যবান বস্তু ও কয়েকটা সুটকেস উদ্ধার হয়।
যা সরকারিভাবে কম দেখানো হলেও ছিলো অনেকটাই বেশি।
ঐতিহাসিক তথ্য, জাস্টিস মুখার্জি কমিশন এবং গবেষক
অনুজ ধরের বিশ্লেষণ অনুযায়ী এর পিছনে ৩ টে অত্যন্ত শক্তিশালী সম্ভাবনা কাজ করে:

১. একটা সাজানো বিভ্রান্তি
(The Decoy Theory)
তদন্তকারীদের একটা বড় অংশের মতে, ১৯৪৫ সালের ১৮ই আগস্টের ওই
বিমান দুর্ঘটনাটা ছিলো একটা সুপরিকল্পিত ‘আই-ওয়াশ’ বা লোক দেখানো ঘটনা।
সুভাষচন্দ্র বসু চেয়েছিলেন ব্রিটিশদের চোখে ধুলো দিয়ে আত্মগোপন করতে
(সম্ভবত সোভিয়েত ইউনিয়নে)।
সেই পরিকল্পনা অনুযায়ী, বিশ্বস্ত অনুগামীদের দিয়ে
ওই বিমানে সোনা-সম্পদ ভর্তী সুটকেসগুলো পাঠানো হয়েছিলো,
যাতে ব্রিটিশরা বিশ্বাস করে যে নেতাজি সত্যিই ওই বিমানে ছিলেন এবং INA-এর সম্পদও পুড়ে ছাই হয়ে গেছে।
সম্পদের দায়িত্বে থাকা ব্যক্তিরা:
সেই বিমানে নেতাজীর অত্যন্ত ঘনিষ্ঠ কিছু জাপানি সেনা আধিকারিক
এবং INA-এর সদস্য ছিলেন।
কর্নেল হাবিবুর রহমান:
[আজাদ হিন্দ ফৌজের (INA) একজন অত্যন্ত বিশ্বস্ত সহযোগী,
অন্যতম উচ্চপদস্থ সেনা কর্মকর্তা এবং নেতাজীর ব্যক্তিগত সচিব]।
তিনি ওই বিমানে ছিলেন এবং তিনিই পরবর্তীকালে বিমান দুর্ঘটনার একমাত্র
ভারতীয় সাক্ষী হিসেবে নিজেকে দাবি করেন।
জাপানি আধিকারিকরা:
জাপানি সেনাবাহিনী (হিকারি কিকান) INA-এর সম্পদের
ট্রাস্টি হিসেবে কাজ করছিলো।

সুভাষচন্দ্র বসু নিজে বিমানে না থাকলেও,
ঐ সোনা টোকিওতে জাপানি হেডকোয়ার্টারে পৌঁছে দেওয়ার দায়িত্ব ছিলো
এই আধিকারিকদের উপর, যাতে যুদ্ধের পরবর্তী পর্যায়ের খরচ চালানো যায়।
টোকিওতে হঠাৎ
ফুলে-ফেঁপে ওঠা সম্পত্তি:
আজাদ হিন্দ সরকারের প্রচার মন্ত্রী ছিলেন এস আই আর
এবং সদস্য এম রামামূর্তি।
অনুজ ধর এবং অন্যান্য গবেষকদের মতে—
এম রামামূর্তি টোকিওতে যুদ্ধের পর হঠাৎ করেই বিপুল সম্পত্তির
মালিক হয়ে বসেন।
তৎকালীন টোকিওতে নিযুক্ত ভারতীয় মিশনের প্রধান কে কে চেল্লুর
এবং পরবর্তীতে এম জে দেশাই সরকারিভাবে নেহেরু সরকারকে
জানিয়েছিলেন যে, এম রামামূর্তি এবং তার ভাই হঠাৎ করে
অবিশ্বাস্যভাবে, অস্বাভাবিক বিত্ত-বৈভবের মালিক হয়ে উঠেছেন।
শুধু তাই নয়, নেহেরু সরকারের নিজস্ব গোয়েন্দা সংস্থা (IB) এক চাঞ্চল্যকর রিপোর্টও দিয়েছিল এ বিষয়ে।
(ফাইল নং- 25/INA/54-S).
গোয়েন্দা তথ্যে পরিষ্কার বলা হয়েছিলো যে, রামামূর্তি যুদ্ধের সময়কার
আজাদ হিন্দ ফৌজের সেই বিপুল সোনা ও রত্ন ভাণ্ডারের বড় একটা অংশ
কালোবাজারে বিক্রি করে ব্যক্তিগত ব্যবসা ও বিলাসিতায় বিনিয়োগ করছেন।
——————————-
( আমরা ভাবি আমরা “পৃথিবীর উপরে” বাস করি।
কিন্তু সত্যিটা হল– আমরা আসলে পৃথিবীর এক পাতলা খোসার ভিতরে,
একটা জীবন্ত গোলকের সামান্য উপরের স্তরে ভেসে আছি।
আমাদের পায়ের নিচে এমন এক জগৎ আছে,
যেখানে আলো প্রবেশের অনুমতি নেই।
আমাদের চোখে দেখা পৃথিবী যতটা পরিচিত,
ঠিক ততটাই অপরিচিত আমাদের পায়ের নিচের পৃথিবী।
ততটাই রহস্যঘন আমাদের ভূ-গর্ভ।
চলুন এবারে ধাপে ধাপে নামি পৃথিবীর গভীরে যতটা পারা যায়।
পড়ুন সেই রোমহর্ষক যাত্রা– Click:
আমাদের পায়ের তলায় আগুন: জ্বলছে এক রহস্যঘন পৃথিবী! )
—————————–
জাপানের সর্তকতা:
জাপানি গোয়েন্দা সংস্থাগুলো তৎকালীন ভারত সরকারকে এ বিষয়ে ৩ বার সতর্ক করে জানিয়েছিলো যে, (পড়ুন) INA-এর সম্পদের ট্রাস্টি হিসেবে পরিচিত এই ব্যক্তিরা টোকিওতে সোনার বার এবং গয়না ভাঙিয়ে নগদ অর্থ তছরুপ করছেন।
বর্তমান ভারত সরকারের (পড়ুন) ডিক্লাসিফায়েড ফাইল (যেমন 25/INA/54-S)
বিশ্লেষণ করলে এই লুণ্ঠন ও গোয়েন্দা সতর্কবার্তার গুরুত্বপূর্ণ ইঙ্গিত পাওয়া যায়।
টোকিও থেকে ভারতীয় মিশনের প্রধানরা বারবার রামামূর্তি ও আই আর এর
সোনা বিক্রির খবর পাঠাচ্ছিলো।

তখন সেই ফাইলগুলো নেহেরুর টেবিলে পৌঁছেছিলো,
কিন্তু তৎকালীন নথি অনুযায়ী তিনি কোনো ব্যবস্থা নেননি।
অত্যন্ত রহস্যজনকভাবে তৎকালীন নেহেরু সরকার
সব জেনেও এর বিরুদ্ধে কোনো আইনি পদক্ষেপ তো নেয়ইনি;
বরং রামামূর্তিকে জাপানে ভারতীয়দের স্বার্থ রক্ষায় নিযুক্ত রাখা হয়েছিলো
এবং আই আরকে সরকারী উচ্চপদে নিযুক্ত করে পুরস্কৃত করলেন।
ষড়যন্ত্রের করিডোর:
মাউন্টব্যাটেন এবং নেহেরু সমীকরণ
ইতিহাসের তথ্য বলছে ১৯৪৪ সালে জওহরলাল নেহেরুর সিঙ্গাপুর সফর
ছিলো অত্যন্ত রহস্যময়।
অভিযোগের তীর সরাসরি নেহেরুর দিকে।
গবেষকদের মতে লর্ড মাউন্টব্যাটেনের সাথে এই বিপুল সম্পত্তির
ভাগাভাগি নিয়ে তাঁদের মধ্যে একটা অলিখিত সমঝোতা হয়েছিল।
এমনকি এই ষড়যন্ত্রে বিশ্বাসঘাতক আইআর, রামামূর্তি এবং
শাহনওয়াজ খানের মতো ব্যক্তিদেরও পরোক্ষ ভূমিকা ছিলো বলে
তথ্য-প্রমাণ উঠে আসে।
সেই কারণেই কি মাউন্টব্যাটেনের নির্দেশে সিঙ্গাপুরে গিয়েও
আজাদ হিন্দ স্মৃতিসৌধে একটাও ফুল দেননি নেহেরু?
এমনকি যখন ব্রিটিশরা সেই পবিত্র স্মৃতিসৌধ গুঁড়িয়ে দিলো,
তখনো ভারতের এই হবু প্রধানমন্ত্রীর কন্ঠে প্রতিবাদের সুর শোনা যায় নি।
- দেশপ্রেমের চেয়ে লুন্ঠিত সম্পদের ভাগাভাগি কি তবে সেদিন
বড় হয়ে দাঁড়িয়েছিলো? - নাটকীয় দেশপ্রেমের আড়ালে তবে কি লুকিয়ে ছিলো ভয়ঙ্কর
লালসাগ্রস্থ কালো হৃদয়ের কিছু মানুষ?
কয়লা বনাম কাঞ্চন:
একটা নিষ্ঠুর প্রহসন
১৯৫২ সালে যখন জাপান থেকে একটা রহস্যময় বাক্স ভারতে ফিরে আসে,
তখন দেশবাসী আশায় বুক বেঁধেছিল।
কিন্তু বাক্স খুলতেই দেখা গেল মাত্র ১১ কেজি সোনা, সাথে মেশানো ছিলো
প্রচুর পরিমাণে পোড়া ছাই আর কয়লা, যা ছিলো এক পূর্বপরিকল্পিত, সাজানো প্ল্যান।
বিজ্ঞান কি বলে?
(সোনার গলনাঙ্ক)
বিজ্ঞানের সাধারণ নিয়ম অনুযায়ী সোনার গলনাঙ্ক হল ১০৬৪° সেলসিয়াস।
বিমান দুর্ঘটনায় যে ধরনের আগুন লাগে (অ্যাভিয়েশন ফুয়েল বা পেট্রোল),
তার সর্বোচ্চ তাপমাত্রা বড়জোর ৮০০° থেকে ১০০০° সেলসিয়াস হতে পারে।
অর্থাৎ সোনা গলে দলা পাকিয়ে যেতে পারে, কিংবা অন্য ধাতুর সাথে মিশে
ধূসর বর্ণ ধারণ করতে পারে, কিন্তু সোনা কোনোদিন পুড়ে ছাই বা কয়লা হয় না।
সোনা কোনো জৈব পদার্থ নয়।
বাক্সে কয়লা ও ছাই পাওয়া মানেই হলো, সেখানে সোনা বাদে অন্য কিছু
পোড়ানো হয়েছিল।
এটাই লুন্ঠনের প্রথম অকাট্য প্রমাণ।
শাহনওয়াজ কমিটির
রিপোর্টে কি ছিলো?
১৯৫৬ সালে নেহেরু সরকার গঠিত শাহনওয়াজ কমিটি যখন
টোকিওতে ওই সম্পদ পরীক্ষা করতে যায়, তখন কমিটির সদস্য এবং
নেতাজীর মেজদাদা ‘সুরেশ চন্দ্র বসু’ জাপানি স্বর্ণকারদের
জেরা করে জানতে পারেন যে—
আসল সোনা সরিয়ে সেখানে অন্য কিছু পোড়ানো হয়েছিলো।
অর্থাৎ ষড়যন্ত্র ও প্রমাণ লোপাটের বিষয়টা নথিবদ্ধ।
আদর্শের মুখোশ:
এখন এখানে একটা গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন উঠে আসে:
যে নেহেরুর নেতৃত্বাধীন শাসনামলের বিরুদ্ধে আজাদ হিন্দ ফৌজের সম্পদ আত্মসাৎ
ও প্রমাণ লোপাটের অভিযোগ ইতিহাসে বারবার উঠে আসছে—
আবার সেই নেহেরুই শাহনওয়াজ কমিটি গঠন করে ভারতের বাক্সে আসা সোনা,
ছাই, কয়লা, টোকিওতে তদন্তে পাঠালো।
আসলে এই ঘটনাটা হলো রাজনীতির ইতিহাসে সবথেকে চতুর চাল।
নেহেরু কেন এমন করলেন?
এর পিছনে রয়েছে
৩ টে অত্যন্ত গভীর কারণ:
১. লোক দেখানো স্বচ্ছতা
(Eye-Wash):
১৯৪৫ থেকে ১৯৫৬— এই দীর্ঘ সময় ধরে ভারতের জনমানসে
এবং সংসদের ভিতরে আজাদ হিন্দ ফৌজের সম্পত্তি আর
নেতাজীর অন্তর্ধান নিয়ে প্রবল ক্ষোভ তৈরি হয়েছিলো।
নেহেরু জানতেন, যদি তিনি কোনো তদন্ত না করেন, তবে সম্পূর্ণ দায়ভার
তাঁর উপরেই এসে পড়বে।
তাই নিজের পছন্দের মানুষ শাহনওয়াজ খান-কে দিয়ে তিনি একটা
কমিটি গঠন করেন, যাতে তদন্তের রিপোর্ট তাঁর মনের মতই হয়।
২. “ক্লিন চিট” পাওয়ার কৌশল:
নেহেরু খুব ভালো করেই জানতেন যে ওই বাক্সে কি আছে।
তিনি শাহনওয়াজ কমিটিকে টোকিওতে পাঠিয়েছিলেন আসলে
চুরির তদন্ত করতে নয়,
বরং “বিমান দুর্ঘটনার তত্ত্ব” এবং “সম্পদ পুড়ে যাওয়ার কাহিনী”-তে
আইনি শিলমোহর দিতে।

শাহনওয়াজ খানও ঠিক তাই করেছিলো—
রিপোর্টে লিখে দিয়েছিলো যে সোনা পুড়ে গেছে এবং নেতাজির মৃত্যু হয়েছে।
৩. নিজের পিঠ বাঁচানো:
যদি কোনো নিরপেক্ষ আন্তর্জাতিক সংস্থাকে দিয়ে তদন্ত করানো হতো,
তবে চুরির বিষয়টা ফাঁস হয়ে যেত।
কিন্তু নিজের ক্যাবিনেটের মন্ত্রী বা ঘনিষ্ঠ লোককে দিয়ে কমিটি বানালে,
রিপোর্ট নিজের কন্ট্রোলে রাখা যায়।
অর্থাৎ নেহেরু নিজেই বিচারক সেজে নিজেকে নির্দোষ প্রমাণ করার
একটা ব্যবস্থা করেছিলেন।
ঐতিহাসিক মোড়:
এই কমিটির ভিতরেই কিন্তু বিদ্রোহ হয়েছিল।
নেতাজির দাদা সুরেশ চন্দ্র বসু (যিনি ওই কমিটির সদস্য ছিলেন),
তিনি যখন দেখলেন শাহনওয়াজ খান আর নেহেরু মিলে
সত্যকে ধামাচাপা দিচ্ছেন, তখন তিনি ওই রিপোর্টে সই করতে
অস্বীকার করে আলাদা ‘ডিসেন্ট নোট’ লেখেন।
সেখানেই তিনি সরাসরি বলেছিলেন —
এই কমিটি আসলে মিথ্যে ছড়ানোর জন্য তৈরি করা হয়েছে।
মানে সার কথা হলো এমন—
চোর নিজেই যখন পুলিশের ড্রেস পড়ে তদন্ত করতে যায়,
তখন তদন্তের ফল যা হওয়ার তাই হয়েছিলো।
সম্পদ আগেই লোপাট হয়েছিল।
কমিটির কাজ ছিলো শুধু সেই লোপাটের উপর একটা
বৈধ পর্দা টেনে দেওয়া।
——————————–
( চীন কি সত্যিই কোনো ‘আলাদিনের আশ্চর্য প্রদীপ’ পেয়েছিল–
যার জোরে দেশটা কয়েক দশকের মধ্যেই বিশ্ব অর্থনীতির
অন্যতম শক্তিতে পরিণত হয়েছে?
যা দেশের উন্নতির জন্য, ভালোর জন্য, তা শত্রু হোক বা মিত্র,
সবার থেকেই গ্রহণ করা উচিত।
ভারত কি এই পথ অনুসরণ করতে পারে না?
পড়ুন– Click: চীনের অর্থনৈতিক উত্থান:
“আলাদিনের প্রদীপ”– উপমার আড়ালে আসল গল্প! )
———————————-
লুণ্ঠিত আজাদ হিন্দ:
ইতিহাসের কাঠগড়ায়
বিশ্বাসঘাতকের মুখোশ
আজাদ হিন্দ ফৌজের সেই কয়েক হাজার কোটি টাকার ঐশ্বর্য
কেবল সোনা বা হিরে ছিলো না,
তা ছিলো কয়েক লক্ষ ভারতবাসীর স্বাধীনতার শেষ রক্তবিন্দু।
বিজ্ঞানের নিয়মকে বুড়ো আঙ্গুল দেখিয়ে সোনা হয়তো সেদিন
‘ছাই আর কয়লা’ হয়ে গিয়েছিলো,
কিন্তু ইতিহাস নথিতে বিশ্বাসঘাতকতার দাগ মিরজাফরের মতন
কোনোদিন মোছে না।
যে সম্পদ দিয়ে একটা পরাধীন জাতির ভাগ্যলিপি নতুন করে লেখা যেত,
সেই সম্পদ আজ কারো ব্যক্তিগত বিলাসিতা কিংবা বিদেশের কোনো
গোপন সিন্দুকের অন্ধকার কুঠুরিতে বন্দি।
কিন্তু মনে রাখতে হবে, প্রকৃতির বিচার বড়ই নিষ্ঠুর।

শহীদের চোখের জল আর বীরের রক্তের উপর দাঁড়িয়ে যারা নিজেদের
ঐশ্বর্যের প্রাসাদ গড়েছে, মহাকাল তাদের ক্ষমা করেনি।
হাড়েহাড়ে সে প্রমাণ বা ফল তাঁরা পেয়েছে, হয়তো আরও বাকি আছে পাওয়া।
একজনের পাপের ফল বহু ক্ষেত্রে তাঁর পরবর্তী প্রজন্মকেও
ভুগে যেতে হয়।
যারা চোর হয়েও তদন্তকারী সেজেছিল, যারা সত্যের টুঁটি টিপে ধরেছিলো
মাউন্টব্যাটেনের সাথে হাত মিলিয়ে—
ইতিহাসের আদালতে আজ তাঁদের মুখোশ ছিঁড়ে পড়েছে।
সেই লুণ্ঠিত রাজকোষ হয়তো আজ হারিয়ে গেছে,
কিন্তু বিশ্বাসঘাতকতার সেই ‘ছাই’ আজও ভারতের আকাশে উড়ে বেড়াচ্ছে,
যা আগামী প্রজন্মের প্রতিটা নিঃশ্বাসে প্রশ্ন তুলবে—
“আমাদের পূর্বপুরুষদের ত্যাগের আমানত কোথায়?”
সত্য হয়তো সাময়িকভাবে চাপা পড়ে থাকে, কিন্তু আজ না হোক কাল,
সেই আগ্নেয়গিরির উদগিরণ হবেই, আর সেদিন বিশ্বাসঘাতকদের কোনো
সিংহাসনই রক্ষা পাবে না।
( বি: দ্র: এই লেখা বিভিন্ন গবেষণা, ডিক্লাসিফায়েড নথি
ও ঐতিহাসিক বিশ্লেষণের ভিত্তিতে রচিত।
এখানে উত্থাপিত কিছু বিষয় আজও বিতর্কিত ও বিচারাধীন ইতিহাসের অংশ। )
[লেখাটা প্রয়োজনীয় মনে হলে অবশ্যই শেয়ার করে
সমাজের অন্যদেরও পড়তে, জানতে সুযোগ করে দেবেন।
ইমেইল আইডি দিয়ে আমাদের বাঙালির পরিবারের একজন
প্রিয় মানুষ হয়ে উঠুন।
চলুন বাঙালিকে বিশ্বের দরবারে বারবার তুলে ধরি—
চিন্তা, চেতনা আর শব্দের শক্তিতে— একসাথে, সবাই মিলে।
বিশ্ব জানুক—
আমাদের ভারত কি?
বাঙালি কি?
বাংলা শব্দের ক্ষমতাই বা কি?
আপনাদের মূল্যবান মন্তব্য অবশ্যই জানাবেন।]
Articlesবাংলা Bangla Articles, Quotes & Prose-Poetry / বাংলা প্রবন্ধ, উক্তি ও গদ্য-কবিতা।



