বিরসা মুন্ডা:
মৃত্যুর চেয়েও ভয়ংকর
এক নাম
বিরসা মুন্ডা ছিলেন এমন এক বিদ্রোহের নাম, যাকে মৃত্যুর পরেও ভয় পেয়েছিল ব্রিটিশরা।
ভারতের স্বাধীনতা সংগ্রামের ইতিহাসে বহু বিপ্লবীর আত্মবলিদানের কথা আমরা শুনেছি,
কিন্তু খুব কম মানুষই আছেন,
যাঁদের প্রভাব মৃত্যু পেরিয়েও শাসকদের চরম অস্বস্তিতে ফেলেছিল।
তাঁর মৃত্যু যেন ব্রিটিশ শাসনের কাছে শেষ কথা ছিল না—
বরং ছিল এক নতুন ভয়ের শুরু।
ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের সূর্য তখন মধ্য গগণে।
যে সাম্রাজ্যের দাপটে গোটা ভারত থরথর করে কাঁপত,
সেই সাম্রাজ্য কিনা যমের মত ভয় পেয়েছিল মাত্র ২৫ বছরের এক আদিবাসী যুবককে!
শুধু জীবিত অবস্থায় নয়,
মানুষটা মারা যাওয়ার পরেও ব্রিটিশ সরকার তাঁর কবর পর্যন্ত পাহারা দিতে বাধ্য হয়েছিল।
একজন মৃত মানুষকেও
এত ভয় কেন?
বাস্তবতা হল, ব্রিটিশরা বন্দুকের গুলি বা অন্য অস্ত্রকে ভয় পায়নি,
তাঁরা ভয় পেয়েছিল সেই বিশ্বাসকে—
যা বিরসা মুন্ডা তাঁর জাতির মনে গভীরভাবে বুনে দিয়েছিলেন।
বিরসা শুধু একজন রক্ত-মাংসের মানুষ ছিলেন না,
তিনি ছিলেন ‘ধরতি আবা’ বা পৃথিবীর পিতা।
ব্রিটিশরা ভেবেছিল মাটির নিচে তাকে চাপা দিলেই বুঝি বিপ্লব শেষ হয়ে যাবে।
কিন্তু তাঁরা জানত না, কিছু মানুষ বীজের মত হয়—
যাদের পুঁতে ফেললে তারা আরও হাজার গুণ শক্তি নিয়ে অরণ্য ফুঁড়ে বেরিয়ে আসে।
রাঁচির কারাগারে যখন তাঁর নিথর দেহ পড়েছিল,
তখন ব্রিটিশ অফিসারদের বুকের মধ্যে আতঙ্ক তৈরি হচ্ছিল—
“যদি মানুষ বিশ্বাস না করে যে সে মারা গেছে?”
কারণ এই মানুষটাকে তাঁর অনুসারীরা শুধু নেতা বলে মানত না,
তাঁরা বিশ্বাস করত, তিনি ঈশ্বরের অবতার।
আমরা দেখেছি—
- প্রায় অশিক্ষিত।
- অর্ধশিক্ষিত।
- শিক্ষিত।
- উচ্চশিক্ষিত।
যুগে যুগে এমন সব নেতা হয়ে রাজ্য, দেশ শাসন করতে।
কিন্তু প্রকৃত নেতৃত্ব দেওয়ার ক্ষমতা ওটিকয়েক নেতার মধ্যেই
এ যাবৎকাল পর্যন্ত দেখা গেছে।
(দেখুন) বিরসা মুন্ডা প্রমাণ করে গেছেন,
প্রকৃত নেতৃত্বের গুণ যেমন শুধু পুঁথিগত বিদ্যায় থাকে না,
আবার লম্বা-চওড়া ফাঁকা আওয়াজেও থাকে না।
নেতৃত্বের এক অনন্য ব্যাকরণ:
প্রকৃত নেতৃত্ব টিকে থাকে মূলত ৩টে গভীর সত্তায়:
নিখাদ সততা:
বিরসা মুন্ডা নিজের সুখ বা বিলাসের জন্য নয়,
নিজের জাতির অস্তিত্ব ও সম্মানের জন্য লড়াই করেছিলেন ভেতর থেকে।
তাঁর সততা এতটাই হিমালয়সম ছিল যে,
হাজার হাজার মানুষ তাঁর এক ইশারায় জীবন দিতেও বিন্দুমাত্র কুণ্ঠাবোধ করেনি।
অজেয় সাহস:
সামনে সর্বশক্তিমান ব্রিটিশ বাহিনী, আর হাতে সামান্য তীর-ধনুক।
এই অসম লড়াইয়ে নামার জন্য যে কলিজা লাগে,
তা কোনও দামী ডিগ্রি বা টাকা দিয়ে কেনা যায় না।
বিরসা মুন্ডার ভেতরের সাহসের আগুন তাই বাইরের বাগাড়ম্বরকে ছাপিয়ে গিয়েছিল।
দূরদর্শী স্বপ্ন:
তিনি শুধু বর্তমানের কথা ভাবেননি,
তিনি চেয়েছিলেন তাঁর জাতি যেন প্রজন্মের পর প্রজন্মের দাসত্ব থেকে মুক্ত থাকে।
এই দূরদর্শিতাই তাকে একজন সাধারন মানুষ থেকে ভগবানে রূপান্তরিত করেছিল।
আসল কথা হল, মানুষ সব বোঝে—
কোন সুরটা শুধুমাত্র বাইরের, আর কোন সুরটা ভেতর থেকে বেজে ওঠে।
আর যারা বিরসা মুন্ডার মত ভেতর-বাইরে এক হতে পারেন, তারাই অনন্য, ব্যতিক্রম।
নেতাজী, বিরসামুন্ডারূপী অবতাররা যখন চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে যান—
নেতৃত্ব মানে ক্ষমতা নয়, নেতৃত্ব মানে আত্মত্যাগ,
যা হাজার হাজার বছর পরেও কোটি মানুষের রক্তে শিহরণ জাগায়,
ইতিহাস কেবল তাদেরই মাথা নিচু করে প্রণাম জানায়।
উলিহাতুর দরিদ্র ঘরে জন্ম:
১৮৭৫ সালের ১৫ই নভেম্বর, বর্তমান ঝাড়খণ্ডের উলিহাতু গ্রামে জন্ম হয় বিরসা মুন্ডার।
তিনি ছিলেন মুন্ডা আদিবাসী সম্প্রদায়ের সন্তান।
পরিবার ছিল অত্যন্ত দরিদ্র।
তিনি বৃহস্পতিবার জন্মেছিলেন বলে মুন্ডা রীতিনীতি অনুযায়ী
তাঁর নাম রাখা হয়েছিল “বিরসা,” যা তাঁর আদিবাসী সত্তাকে আরও স্পষ্টভাবে তুলে ধরে।
ছোটবেলা থেকেই তাকে এক গ্রাম থেকে অন্য গ্রামে ঘুরে বেড়াতে হয়েছে।
তবে ছোটবেলা থেকেই তাঁর মধ্যে ছিল অদ্ভুত নেতৃত্বের গুণ।
গ্রামের লোকজন বলত,
ছেলেটার কথা বলার ভঙ্গি আর চোখের দৃষ্টিতে যেন এক অদ্ভুত আত্মবিশ্বাস আছে।
কিছুদিন তিনি জার্মান মিশনারি স্কুলেও পড়াশোনা করেন।
সেখানে খ্রিস্টধর্মের শিক্ষা পান।
কিন্তু অল্প দিনেই তিনি বুঝতে পারেন,
এই ধর্মান্তকরণের প্রক্রিয়ার মধ্যে তাঁর নিজের সংস্কৃতি ধীরে ধীরে হারিয়ে যাচ্ছে।
আর সেখান থেকেই তাঁর ভিতরে জন্ম নেয় প্রতিরোধের বীজ।
ধরতি আবা: কেন তাকে
ভগবান বলে মানত মানুষ?
কিশোর বয়সেই বিরসা নিজের সম্প্রদায়ের মধ্যে ধর্মীয় ও সামাজিক সংস্কারের ডাক দেন।
তিনি বলতেন—
- নিজেদের ঐতিহ্য ভুলে যেও না।
- বিদেশি ধর্মের প্রভাব থেকে দূরে থাকো।
- মদ্যপান ও কুসংস্কার ত্যাগ করো।
- সিংবোঙ্গা বা এক ঈশ্বরের উপাসনা করো।
এই কথাগুলো দ্রুত গতিতে তাঁর সমাজে ছড়িয়ে পড়ে।
মুন্ডা সমাজের হাজার হাজার মানুষ তাকে অনুসরণ করতে শুরু করে।
তখন থেকেই তিনি পরিচিত হন এক বিশেষ নামে— “ধরতি আবা” অর্থাৎ পৃথিবীর পিতা।
তাঁর অনুসারীরা বিশ্বাস করত, তিনি ঈশ্বরেরই এক অবতার,
যিনি তাঁদের রক্ষা করতে এসেছেন।

প্রথম কারাবাস ও
আগুনের প্রত্যাবর্তন:
সরকারবিরোধী প্রচার ও মানুষকে বিদ্রোহে উসকানির অপরাধে
১৮৯৫ সালে ব্রিটিশরা বিরসাকে প্রথমবার গ্রেফতার করে।
বিচারে তাঁকে ২ বছরের সশ্রম কারাদণ্ড দেওয়া হয়েছিল।
ব্রিটিশদের ধারণা ছিল, জেলে ঢুকিয়ে দিলেই এই ছেলের তেজ কমে যাবে,
ভয় পেয়ে যাবে বা দমে যাবে।
কিন্তু হল ঠিক এর উল্টোটা।
১৮৯৭ সালে হিরক জয়ন্তী উপলক্ষ্যে জেল থেকে মুক্তি পেয়ে তিনি যখন অরণ্যে
ফিরে যান, তখন তাঁর ভেতরের বিদ্রোহ দাবানলে রূপ নেয়।
এই কারাবাস যেন তাঁকে আরও দৃঢ় করেছিল।
উলগুলান: আদিবাসী আত্মার
এক অগ্নিগর্ভ চিৎকার
১৮৯৯ সালের সেই অভিশপ্ত বড়দিন।
যখন গোটা ব্রিটিশ সাম্রাজ্য উৎসবে মত্ত,
ঠিক তখনই অরণ্যের বুক চিরে বেজে উঠল রণশিঙা।
এই বিদ্রোহের মূল কারণ ছিল—
- ব্রিটিশদের ভূমি দখল নীতি।
- জমিদার ও মহাজনদের অত্যাচার।
- আদিবাসীদের জমি থেকে উচ্ছেদ।
অর্থাৎ ব্রিটিশরা সে সময়ে ‘পার্মানেন্ট সেটেলমেন্ট’ বা চিরস্থায়ী বন্দোবস্তের মাধ্যমে
আদিবাসীদের ‘খুন্তকাঠি’ (যৌথ মালিকানা) ব্যবস্থা নির্দ্বিধায় ধ্বংস করে দিচ্ছিল।
বিরসা তখন প্রথম বুঝতে পারেন—
শিকল ভাঙতে হলে আগে মেরুদন্ড সোজা করতে হবে।

বিরসা স্পষ্ট ঘোষণা করেন,
“আবুয়া ডিসুম, আবুয়া রাজ।”
অর্থাৎ আমাদের দেশ, আমাদের শাসন।
তাঁর বিদ্রোহের মূল গান ছিল—
“সায়ব সায়ব এক তপি রে…(সব সাহেবের টুপি একরকম, অর্থাৎ সব ব্রিটিশরাই শোষক।)
“কাটুয়া রে কাটুয়া,” (অর্থাৎ কাটো, তাদের বিনাশ করো।)
ফলে তাঁর আকাশ-বাতাস আন্দোলিত করা ডাকে শুরু হয় এক বিশাল আদিবাসী বিদ্রোহ,
যার নাম ছিল উলগুলান— অর্থাৎ “মহা-অশান্তি” বা “মহাবিপ্লব।”
তাঁর আহ্বানে হাজার হাজার আদিবাসী মানুষ তীর-ধনুক,
কুড়াল আর লাঠি নিয়ে ব্রিটিশদের বিরুদ্ধে লড়াই শুরু করে।
তাঁদের আক্রমণের ভঙ্গি দেখে ব্রিটিশরা এই বিদ্রোহকে এতটাই ভয় পেয়েছিল যে,
তাঁরা বিরসাকে ধরার জন্য বিশেষ অভিযান শুরু করে।
কিন্তু আদিবাসীদের কাছে এটা শুধুমাত্র তীরের বিরুদ্ধে বন্দুকের লড়াই ছিল না,
এটা ছিল শোষণের বিরুদ্ধে শোষিতের শেষ আর্তনাদ!
দিকু: ঘরের শত্রু যখন বিভীষণ
উলগুলানের এই অগ্নিগর্ভ চিৎকারের লক্ষ্য কেবল সাদা চামড়ার ব্রিটিশরা ছিল না।
বিরসা তাঁর অনুসারীদের চিনিয়ে দিয়েছিলেন আসল শত্রু কারা।
আদিবাসী মুন্ডা ভাষায় যাদের বলা হত ‘দিকু’ (Diku).
অর্থাৎ তাঁর লড়াই ছিল আরও এক ভয়ংকর শক্তির বিরুদ্ধে, যাদের আদিবাসীরা ডাকত দিকু।
সাধারণ মানুষের কাছে ব্রিটিশরা ছিল দূরের শত্রু।
কিন্তু এই দিকু বা শোষক জমিদার ও মহাজনেরা ছিল ঘরের পাশের চেনা শত্রু।
তাঁরা ভারতীয় হয়েও ব্রিটিশদের স্বার্থে নিজেদের ভাইদের উপর অকথ্য নির্যাতন চালাত।
ব্রিটিশদের প্রত্যক্ষ মদতে এই বিভীষণরাই আদিবাসীদের ‘খুন্তকাঠি’ বা পৈতৃক জমি কেড়ে নিয়েছিল।
বিরসা বুঝেছিলেন বাইরের শত্রু তাড়ানোর আগে,
ঘরের এই দালালদের মুখোশ খুলে দেওয়া অত্যন্ত জরুরী।
আধ্যাত্মিক বিপ্লব
ও ‘নতুন ধর্ম’:
বিরসা জানতেন, ব্রিটিশদের আধুনিক অস্ত্রের সামনে শুধু তীর-ধনুক যথেষ্ট নয়।
মানুষের মনে অজেয় শক্তি প্রয়োজন।
তাই তিনি নিজের শিকড়ে ফিরে এসে ‘বিরসাইত’ ধর্মের প্রবর্তন করেন।
তিনি নিজেকে ঈশ্বরের দূতসুলভ আধ্যাত্মিক নেতা হিসেবে তুলে ধরেছিলেন।
এটা ছিল এক বিশাল মনস্তাত্ত্বিক বিজয়।
মানুষ যখন তাকে “ভগবান” হিসেবে মন-প্রাণ বা আত্মা থেকে গ্রহণ করল,
তখন মৃত্যুভয় তাঁদের মন থেকে চিরতরে মুছে গেল।
হাজার হাজার মানুষ তাঁর এক ডাকে জীবন দিতে প্রস্তুত হয়ে গেল।
———————-
( এপস্টিন ফাইলস: জেফ্রি এপস্টিনের মৃত্যুর পর অনেকেই ভেবেছিল—
তাঁর সাধের বা স্বপ্নের (দেখুন) অপরাধপুরীর দ্বীপও শেষ হয়ে যাবে।
কিন্তু বাস্তবে ঘটনা যেন উল্টোদিকে এগোতে থাকে।
বলা হয়েছিল দ্বীপটা এখন খালি।
কিন্তু বিভিন্ন সূত্রে নানা দাবি সামনে আসতে থাকে—
প্রশ্ন উঠতে শুরু করে মাটির ৫০ ফুট নিচে এমন কি ছিল,
যা তড়িঘড়ি করে চিরতরে ধামাচাপা দেবার চেষ্টা চলছে?
পড়ুন হাড়হিম করা সেই ষড়যন্ত্র ও অপরাধের কাহিনী,
যা গোটা বিশ্বজুড়ে তোলপাড় হচ্ছে।
Click: পর্ব–২ এপস্টিন ফাইলস: এই রহস্যের পিছনে লুকিয়ে আছে কোন ভয়ংকর সত্য? )
ডম্বারি পাহাড়ের সেই
গোপন রক্ত স্নান:
১৯০০ সালের ৯ই জানুয়ারি।
ডম্বারি পাহাড়ের উপর বিরসা যখন হাজার হাজার সমবেত মানুষ নিয়ে সভা করছিলেন,
তখন ব্রিটিশ বাহিনী অতর্কিতে হামলা চালায়।
নির্বিচারে গুলি চালানো হয় বৃদ্ধ, নারী ও শিশুদের ওপর।
কোনও সতর্কবার্তা ছাড়াই ব্রিটিশ প্রশাসনের উচ্চপদস্থ কর্মকর্তাদের নির্দেশে সশস্ত্র
বাহিনী তাঁদের ওপর গুলিবর্ষণ করে।

প্রথমত: সম্পূর্ণ অপ্রস্তুত অবস্থা।
দ্বিতীয়ত: রাইফেলের সামনে আদিবাসীদের তীর, বর্শা বা অন্যান্য হাতিয়ার নিয়ে লড়াই সম্ভব ছিল না।
ব্রিটিশদের এই নৃশংস আক্রমণে শত শত আবালবৃদ্ধবণিতা মর্মান্তিকভাবে মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়ে।
অনেকেই পাহাড়ের নিচে খাদে পড়ে প্রাণ হারায়।
ব্রিটিশরা তাঁদের নথিপত্রে মাত্র ১১-১২ জনের মৃত্যুর কথা স্বীকার করেছিল,
যা তাঁরা সবসময় করে থাকে।
আজও ডম্বারি পাহাড়ের পাথরে রক্তের দাগ ইতিহাস হয়ে আছে ,
সেই গণহত্যার নীরব সাক্ষী হয়ে দাঁড়িয়ে আছে।
অনেকে একে ‘আদিবাসী জালিয়ানওয়ালা বাগ’ বলে উল্লেখ করেন,
যা ঘটেছিল পাঞ্জাবের ‘জালিয়ানওয়ালাবাগ’ (১৯১৯) -এর ঠিক ১৯ বছর আগে।
ব্রিটিশ বীরত্বের কঙ্কাল:
বীর বনাম কাপুরুষের লড়াই
ইতিহাসের সবচেয়ে বড় পরিহাস দেখুন—
যারা নিজেদের ‘সভ্য’ বলে দাবি করত।
যারা সারা বিশ্বকে ‘শিষ্টাচার’ শেখাতে চেয়েছিল,
সেই ব্রিটিশ বাহিনীর বীরত্ব সেদিন ডম্বারি পাহাড়ের খাদে মুখ থুবড়ে পড়েছিল।
অস্ত্রের দাপট বনাম
আত্মিক শক্তি:
শত শত সশস্ত্র সৈনিক।
হাতে আধুনিক লি-মেটফোর্ড রাইফেল, আর সামনে কারা?
একদল অর্থনগ্ন আদিবাসী, যাদের হাতে স্রেফ বাঁশের ধনুক আর পাথর।
একে কি ইতিহাস যুদ্ধ বলে?
একে বলা হয় ‘কাপুরুষোচিত গণহত্যা।’
ব্রিটিশদের সাহস এতটাই ঠুনকো ছিল যে,
মাত্র ২৫ বছরের এক যুবকের তীরের ফলার সামনে দাঁড়ানোর ক্ষমতা পর্যন্ত তাঁদের ছিল না।
তাই তাঁদের প্রয়োজন হয়েছিল দূর থেকে আধুনিক রাইফেলের গুলি চালানো,
আর অতর্কিতে হামলা করার।
ভয়ের মুখোশ যখন ‘বিজয়’:
ব্রিটিশরা সেদিন ডম্বারি পাহাড়ে জিতে যায়নি,
বরং তাঁরা নিজেদের ভয়ের প্রমাণ দিয়ে গিয়েছিল।
যারা ভয় পায়, তাঁরাই নিরস্ত্র মানুষের ওপর পেছন থেকে গুলি চালায়।
যারা কাপুরুষ, তারাই লাশের সংখ্যা লুকিয়ে রাখতে নথিপত্রে কারচুপি করে।
১১-১২ জনের মৃত্যুর গল্প শুনিয়ে তাঁরা আসলে বিশ্বকে নয়,
নিজেদের বিবেককে সান্ত্বনা দিতে চেয়েছিল।
কারণ তারা জানত,
আদিবাসীদের রক্তে ভেজা ঐ পাহাড়ের প্রতিটা ধূলোকণা তাঁদের সাম্রাজ্যের
পতনের ঘণ্টা বাজিয়ে ছেড়ে দিয়েছে।
ইতিহাসের বিচার:
আজ ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের সেই দাপট নেই, সেই গর্জনও নেই।
কিন্তু আজও যখন কোনও মানুষ ডম্বারি পাহাড়ের পাদদেশে দাঁড়ায়,
তখন সে ব্রিটিশদের স্মৃতির ওপর আন্তরিক ঘৃণা ছুঁড়ে দেয়,
আর বিরসা মুন্ডার চিতার ভস্মকে কপালে তিলক হিসেবে পরে।
এখানেই বিরসার জয়।
ব্রিটিশরা সেদিন জিতেছিল স্রেফ একটা পাহাড়ে,
আর বিরসা জিতে নিয়েছিলেন ইতিহাসকে।
বিশ্বাসঘাতকতার সেই কালো রাত:
ডম্বারি পাহাড়ের গণহত্যার পর বিরসা ব্রিটিশদের চোখে ধুলো দিয়ে
গভীর জঙ্গলে আত্মগোপন করেছিলেন।
কিন্তু ব্রিটিশরা তাকে সম্মুখ সমরে হারাতে না পেরে ৫০০ টাকার পুরস্কার ঘোষণা করে,
যা সেই সময়ে ছিল এক মোটা অঙ্কের টাকা, তাও গরীব গ্রামবাসীদের কাছে।
শেষ পর্যন্ত ১৯০০ সালের ৩রা ফেব্রুয়ারি, চক্রধরপুরের জামকোপাই বনের গভীরে
যখন তিনি ক্লান্ত শরীরে গভীর ঘুমে আচ্ছন্ন ছিলেন,
তখন একদল অর্থলোভী নিজের জাতিরই বিশ্বাসঘাতক ব্রিটিশদের খবর দিয়ে দেয়।

ব্রিটিশ নথিতে বিরসা মুন্ডাকে ‘খুবই বিপজ্জনক ব্যক্তি’ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছিল।
কারণ তিনি শুধু যুদ্ধ করেছিলেন তা নয়,
তিনি মানুষের বিশ্বাসের মধ্যে রাজত্ব করেছিলেন।
আর এই ধরনের নেতাই ব্রিটিশদের কাছে সবচেয়ে ভয়ের কারণ ছিল।
কারণ বন্দুক দিয়ে বিপ্লবী বা সৈন্যকে মারা যায়, কিন্তু বিশ্বাসকে নয়।
জেলের ভেতর রহস্যময় মৃত্যু:
বিষ নাকি ষড়যন্ত্র?
১৯০০ সালের ৩রা ফেব্রুয়ারি বিরসাকে গ্রেফতার করে রাঁচি জেলে বন্দি রাখা হয়।
তাঁর বিরুদ্ধে সে সময় রাষ্ট্রদ্রোহের মামলা চলছিল।
কিন্তু বিচার শেষ হওয়ার আগেই,
৯ জুন ১৯০০ সালে জেলের মধ্যেই তাঁর রহস্য মৃত্যু হয়।
সরকারি নথিতে লেখা হয়—
মৃত্যুর কারণ: কলেরা।
কিন্তু অনেকেই এই রিপোর্ট নিয়ে সন্দেহ প্রকাশ করেন।
ইতিহাসবিদদের মতে, বিরসার শরীরে কোনও রোগের চিহ্ন ছিল না।
আরও কারণ হিসেবে উঠে আসে—
- হঠাৎ অসুস্থতার খবর ছড়ায়।
- পরিবারকে শেষ দেখা করারও সুযোগ দেওয়া হয়নি।
- দ্রুত দাহ করার ব্যবস্থা করা হয়।
ব্রিটিশরা ভয় পেয়েছিল যে, বিরসার বিচার শুরু হলে পুরো ভারতবর্ষের জ্বলে উঠবে।
তাই লোকচক্ষুর আড়ালে তাকে খাদ্যে বিষ প্রয়োগ করে
মেরে ফেলার ষড়যন্ত্র করা হয়েছিল বলে আজও অনেক বিশ্বাস করেন।
কেন তাঁর মৃতদেহ
পাহারা দিয়েছিল ব্রিটিশরা?
১. মিথ বা অলৌকিক বিশ্বাসের আতঙ্ক:
বিরসা মুন্ডার অনুসারীরা বিশ্বাস করত, তাঁদের ‘ভগবান’ অমর।
ব্রিটিশরা জানত আদিবাসী সমাজে এই বিশ্বাস কতটা গভীর ও শক্তিশালী।
ব্রিটিশদের ভয় ছিল যদি মানুষ তাঁর মৃতদেহ দাহ করার প্রমাণ না পায় বা ছাইটুকুও দেখতে না পায়,
তবে তাঁরা ভাববে তিনি অলৌকিকভাবে অন্তর্হিত হয়েছেন এবং আরও বড় শক্তি নিয়ে ফিরে আসবেন।
এই ‘ফিরে আসার’ ভয়ই ব্রিটিশদের রাতের ঘুম কেড়ে নিয়েছিল।
তাঁরা ভেবেছিল এমন হলে বিদ্রোহের আগুন কোনোদিন নিভবে না।
২. প্রতীকী শক্তির বিনাশ:
ব্রিটিশরা চেয়েছিল বিরসাকে একজন সাধারণ ‘মরণশীল’ মানুষ হিসেবে প্রমাণ করতে।
তাঁরা চেয়েছিল আদিবাসী মানুষ জানুক যে বিরসা মারা গেছে,
আর তাঁর দেহ পঞ্চভূতে মিশে গেছে।
কিন্তু তাঁরা এতটাই সন্দিগ্ধ ছিল যে,
যদি কোনও অনুসারী চিতাভস্ম বা দেহাবশেষ চুরি করে রটিয়ে দেয় যে,
“ভগবান মরেননি, বেঁচে আছেন,” তবে তাঁদের সব চাল বিফলে যাবে।
তাই তাঁরা সশরীরে পাহারাদার বসিয়েছিল যাতে লাশের অবশিষ্টাংশের ওপর
তাঁদের পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ থাকে।
সহজ কথায় ব্রিটিশরা বিরসার শরীরকে নয়,
বরং তাঁর ‘অমরত্বের ভাবমূর্তি’-কে পাহারা দিচ্ছিল।
৩. গোপন শেষকৃত্য:
একজন বীরের বিদায় সম্মানের সাথে হওয়ার কথা থাকলেও
ব্রিটিশরা এতটাই ভয় পেয়েছিল যে, চোরের মত গভীর রাতে, চুপিসারে,
ডিস্টিলারি ব্রিজের পাশে কোকার নদীর তীরে তাঁর শেষকৃত্য সম্পন্ন করে,
যাতে সাধারণ মানুষ বা তাঁর অনুসারীরা সেখানে পৌঁছাতে না পারে।
যেন কোনও অপরাধী নয়, বরং একটা সাম্রাজ্য তার নিজের পতনকে লুকিয়ে রাখছে।
তাঁরা পরিবারের হাতেও লাশ তুলে দেওয়ার সাহস পায়নি।
স্মৃতিস্থলে পুলিশি পাহারা:
বিরসার শেষকৃত্যের জায়গায় সশস্ত্র পুলিশ বসানোর কারণ ছিল বড় অদ্ভুত।
ব্রিটিশরা ভয় পেয়েছিল কেউ যদি সেখান থেকে তাঁর দেহাবশেষ সরিয়ে ফেলে
এবং রটিয়ে দেয় যে ভগবান বেঁচে আছেন, তবে সেই আগুন আর নেভানো যাবে না।
অনেক স্থানীয় স্মৃতি ও বর্ণনায় বলা হয়, ব্রিটিশরা তাঁর দেহাবশেষের ওপর কড়া
নজরদারি রেখেছিল, যাতে তা বিদ্রোহের প্রতীকে পরিণত না হয়।
শরীর মরে, বিশ্বাস মরে না:
(পড়ুন) বিরসা মুন্ডা মাত্র ২৫ বছরের জীবনে যা করে দেখিয়েছেন, তা শত বছরেও অনেকে পারে না।
তাঁর বিদ্রোহের পর আদিবাসী জমির প্রশ্নে ব্রিটিশ সরকার চাপের মুখে পড়ে,
যার ফল হিসেবে ১৯০৮ সালে ‘ছোটনাগপুর প্রজাস্বত্ব আইন’ (CNTA) পাস করা হয়,
যা আজও আদিবাসীদের জমি রক্ষার প্রধান হাতিয়ার।
আজ বিরসা মুন্ডা কোনও বিশেষ সম্প্রদায়ের নয়, তিনি গোটা ভারতবর্ষের গর্ব।
তাঁর জীবন আমাদের শেখায়—

বিজয় মানে কেবল যুদ্ধে জয় নয়,
বিজয় মানে নিজের অস্তিত্ব আর সম্মানের জন্য শেষ রক্তবিন্দু পর্যন্ত লড়ে যাওয়া।
তিনি মাটির নিচে চাপা পড়েন নি,
বরং তিনি বীজের মত অঙ্কুরিত হয়ে কোটি মানুষের হৃদয়ে আজ
একটা ‘উলগুলান’ হয়ে বেঁচে আছেন।
ব্রিটিশরা ভেবেছিল একজন মানুষকে মাটির নিচে চাপা দিলেই সব শেষ হয়ে যাবে।
কিন্তু তাঁরা বুঝতে পারেনি—
- তিনি ছিলেন এক বিশ্বাস।
- এক আত্মসম্মানের প্রতীক।
- এক আদিবাসী জাতির জেগে ওঠার গল্প।
আর ইতিহাস বারবার প্রমাণ করেছে—
বিশ্বাসকে কখনও কোনোভাবেই কবর দেওয়া যায় না।
——————–
( ব্রিটিশ বাহিনীর এক উচ্চপদস্থ অফিসারের নেতৃত্বে গভীর রাতে এক বিশাল পুলিশ
ও গোর্খা বাহিনী ঘিরে ফেলল সেই মাটির বাড়ি।
ব্রিটিশরা প্রস্তুত ছিল ইতিহাসের সেই মোস্ট ওয়ান্টেড বিপ্লবীকে খাঁচাবন্দী করতে।
পুলিশ যখন ঘটনাস্থলে এসে পৌঁছাল, তাঁরা দেখল… কাটা-ছেঁড়া,
ক্ষতবিক্ষত রক্তাক্ত দেহটা মাটিতে পড়ে আছে।
পাশে দাঁড়িয়ে তাঁর স্ত্রী—
যার চোখে না ছিল কোনও অশ্রু, না কণ্ঠে ছিল কোনও হাহাকার!
ব্রিটিশ পুলিশ অফিসার তাকে জেরা করলেন—
“আপনার চোখের সামনে আপনার স্বামীকে খুন করা হল,
খুনিকে চিনতে পারেন নি?”
সেই নারী স্থির দৃষ্টিতে,
অত্যন্ত শান্ত গলায় স্পষ্ট উত্তর দিয়েছিলেন—
পড়ুন সেই রুদ্ধশ্বাস কাহিনী।
Click: …স্বামীর মৃত্যুতেও কেন শোক পালন করেননি সেই বীরাঙ্গনা? )
[ লেখাটা প্রয়োজনীয় মনে হলে অবশ্যই শেয়ার করে
সমাজের অন্যদেরও পড়তে, জানতে সুযোগ করে দেবেন।
ইমেইল আইডি দিয়ে আমাদের বাঙালির পরিবারের একজন
প্রিয় মানুষ হয়ে উঠুন।
চলুন বাঙালিকে বিশ্বের দরবারে বারবার তুলে ধরি—
চিন্তা, চেতনা আর শব্দের শক্তিতে— একসাথে, সবাই মিলে।
বিশ্ব জানুক—
আমাদের ভারত কি?
বাঙালি কি?
বাংলা শব্দের ক্ষমতাই বা কি? ]
Articlesবাংলা Bangla Articles, Quotes & Prose-Poetry / বাংলা প্রবন্ধ, উক্তি ও গদ্য-কবিতা।





