খাদ্যদ্রব্যে সংকট
ও উদাসীনতা:
ভারতের খাদ্যদ্রব্যের সবচেয়ে বড় সংকট আজ ভেজাল ও প্রতারণা নয়—
নজরদারিতে ভেজাল।
যার মাশুল প্রতিদিন গুনতে হচ্ছে আমাকে, আপনাকে আর আমাদের সন্তানদের।
কিন্তু বিভিন্ন ব্যস্ততার কারণে,
অজান্তে কিংবা উদাসীনতার কারণে অনেকেই হয়ত তা আমরা
দিনের পর দিন বুঝতেই পারছিনা, গুরুত্ব দিচ্ছিনা।
যা ভবিষ্যতে হয়ত ভয়ঙ্কর বিপদ ডেকে আনতে পারে।
উদাহরণ:
ভেজাল ও প্রতারণা:
দুধে ভেজাল:
- ইউরিয়া—প্রোটিনের মাত্রা কৃত্রিমভাবে বেশি দেখানোর জন্য।
- ডিটারজেন্ট—দুধকে ঘন ও ফেনা যুক্ত দেখাতে।
- স্টার্চ— দুধ ঘন করার জন্য।
- সিন্থেটিক দুধ—তেল, ডিটারজেন্ট ইউরিয়া মিশিয়ে তৈরি নকল দুধ।
- জল— পরিমাণ বাড়াতে সবচেয়ে সাধারণ ভেজাল।
- ফরমালিন (সংরক্ষণে)— যা খাদ্যে ব্যবহার সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ,
কারণ এটা শিল্প ও চিকিৎসা কাজে ব্যবহৃত রাসয়নিক।
ক্ষতিকারক প্রভাব:
ইউরিয়া: খাবারে ইউরিয়ার মেশানো হলে তা শরীরের জন্য বিষাক্ত হতে পারে।
অতিরিক্ত ইউরিয়া শরীরে গেলে কিডনির ওপর চাপ পড়ে;
কিডনি বিকল হলে ইউরেমিয়া হতে পারে।
এর লক্ষণ হতে পারে—
- ত্বকে চুলকানি।
- শ্বাসে দুর্গন্ধ।
- বমি বমি ভাব।
- গুরুতর ক্ষেত্রে বিভ্রান্তি বা অচেতনতা।
ডিটারজেন্ট: পাকস্থলী ও অন্ত্রে ক্ষত সৃষ্টি করতে পারে।
স্টার্চ: দুধ বা পনিরে স্টার্চ মেশানো এক ধরনের বড়সড় প্রতারণা।
অতিরিক্ত স্টার্চ বিশেষ করে ডায়াবেটিক রোগীদের জন্য বিপজ্জনক হতে পারে,
কারণ এটা রক্তের শর্করার মাত্রাকে বাড়ায়।
ফরমালিন: উচ্চমাত্রায় ও দীর্ঘমেয়াদী সংস্পর্শে ক্যান্সারের ঝুঁকি বাড়িয়ে দেয়।
পনিরে ভেজাল:
অ্যানালগ পনির: দুধের বদলে উদ্ভিজ্জ তেল,
স্টার্চ ও কৃত্রিম উপাদান দিয়ে তৈরি নকল পণ্য, যা দেখতে আসল পনিরের মত।
(দেখুন) স্টার্চ মেশানো পনির: ওজন বাড়াতে।
অতিরিক্ত জল ধরে রাখা: অনেক সময় ফসফেট ব্যবহার করা হয়
জল ধরে রেখে ওজন বাড়ানোর জন্য, যা কিডনির জন্য ক্ষতিকর।
নকল দুধ থেকে তৈরি পনির:
ফলে ইউরিয়া বা ডিটারজেন্টের অবশিষ্ট অংশ থাকার ঝুঁকি থাকে।
সবজিতে ভেজাল:
সবজি টাটকা ও উজ্জ্বল দেখাতে অনেক সময় শিল্পে ব্যবহৃত রং লাগানো হয়,
বিশেষ করে—
- কাঁচা মটর বা শাকসবজিতে উজ্জ্বল সবুজ রং আনতে,
ম্যালাকাইট গ্রিন বা টেক্সটাইল গ্রেড রং ব্যবহার করার অভিযোগ পাওয়া গেছে। - লাল লঙ্কা বা টমেটোতে অতিরিক্ত লালচে ভাব আনতে সুদান ডাই—
এর মত শিল্প রং ব্যবহারের ঘটনাও ধরা পড়েছে বিভিন্ন পরীক্ষায়।

এসব রং খাদ্যগ্রেড নয়।
শরীরে গেলে এগুলো—
- লিভারের ক্ষতি করতে পারে।
- অন্ত্রে জ্বালা ও সংক্রমণ ঘটাতে পারে।
- দীর্ঘ মেয়াদে ক্যান্সারের ঝুঁকি বাড়াতে পারে বলে আশঙ্কা রয়েছে।
বিশেষ করে সুদান ডাইয়ের ক্ষেত্রে প্রাণী পরিক্ষায় কার্সিনোজেনিক প্রভাব
দেখা গেছে।
রাসায়নিক পালিশ ও
অবশিষ্ট কীটনাশক:
সবজি (পড়ুন) চকচকে দেখাতে বা দ্রুত বাজারজাত করতে
অনেক সময় মোমজাতীয় আবরণ বা রাসায়নিক স্প্রে ব্যবহার করা হয়।
এছাড়া কীটনাশকের অতিরিক্ত ব্যবহারও বড় সমস্যা।
ফসল তোলার আগে পর্যাপ্ত সময় না দিলে সেই কীটনাশকের অবশিষ্টাংশ
সবজির গায়েই থেকে যায়।
এর ফলে—
- পাকস্থলীতে জ্বালা।
- বমি।
- মাথাব্যথা।
- লিভার ও স্নায়ুতন্ত্রের ক্ষতি।
- দীর্ঘ মেয়াদে হরমোনের ভারসাম্যহীনতা।
হতে পারে।
ফলে ভেজাল
ক্যালসিয়াম কার্বাইড:
ফল দ্রুত পাকাতে বেআইনিভাবে ব্যবহার করা হয়।
এটা আর্দ্রতার সংস্পর্শে এসে অ্যাসিটিলিন গ্যাস তৈরি করে,
যা ফলকে দ্রুত পাকায়।
সমস্যা হল এই প্রক্রিয়ায় ফল বাইরে থেকে পাকা দেখালেও
ভেতরে পুরোপুরি স্বাভাবিকভাবে পাকে না।
নিম্নমানের ক্যালসিয়াম কার্বাইডে আর্সেনিক ও ফসফরাসের মত বিষাক্ত
অশুদ্ধি থাকার অভিযোগ ও পরীক্ষালব্ধ তথ্য পাওয়া গেছে।
এর প্রভাবে—
- মাথাব্যথা।
- মাথা ঘোরা।
- বমি।
- পেট ব্যথা।
- স্নায়বিক সমস্যা।
- দীর্ঘ মেয়াদে বিষক্রিয়ার ঝুঁকি।
থেকেই যায়।
আইন অনুযায়ী ফল পাকাতে ক্যালসিয়াম কার্বাইড নিষিদ্ধ;
নির্দিষ্ট মান মেনে ইথিলিন গ্যাস ব্যবহারই বৈধ পদ্ধতি।
প্রাকৃতিক ইথিলিন
বনাম কৃত্রিম কার্বাইড:
মনে রাখবেন, ফলের নিজস্ব পাক ধরার প্রক্রিয়ায় প্রাকৃতিকভাবেই ইথিলিন
গ্যাস তৈরি হয়।
আধুনিক ও নিরাপদ পদ্ধতিতে ইথিলিন রাইপেনার (Ethylene Ripener) প্যাকেট
ব্যবহার করা বৈধ, কারণ এটা ফলকে ভেতর ও বাইরে থেকে সমানভাবে পাকতে
সাহায্য করে।
কিন্তু অসাধু ব্যবসায়ীরা স্রেফ লাভের আশায় ক্যালসিয়াম কার্বাইড ব্যবহার করে।
এটা আসলে এক ধরণের রাসায়নিক পুড়িয়ে ফলকে জোর করে পাকানো,
যা আমাদের স্নায়ুতন্ত্রের জন্য অত্যন্ত বিপজ্জনক।
এর দায়িত্বে রয়েছে কারা?
- 1. FSSAI (Food Safety and Standards Authority of India)
- 2. ASCI (Advertising Standards Council of India)
ভারতের বাজারে খাদ্যদ্রব্যের মান এবং এতে ভেজালের বাড়াবাড়ি
বর্তমানে ধীরে ধীরে এমন এক জায়গায় পৌঁছেছে,
যা সহ্যের সীমা অনায়াসেই অতিক্রম করে গেছে।
সাধারণ মানুষের প্রাত্যহিক খাদ্য তালিকায় থাকা পণ্যগুলো কতটা নিরাপদ,
তা নিয়ে বড়সড় প্রশ্ন চিহ্ন দেখা দিয়েছে।
আর খাবারে এই ভেজাল ও প্রতারণা নতুন কিছু নয়।
বহু বছর ধরেই চলে আসছে নিঃশব্দে, চুপিসারে।
FSSAI এমন একটা সংস্থা,
যারা খাবারে সিল মেরে নিরাপদ বলে ঘোষণা করে,
অথচ তাদের নাকের ডগায় চলছে অসাধু ব্যবসায়ীদের অবাধ জালিয়াতি।
আইন আছে,
কিন্তু প্রয়োগ কোথায়?
ভারতে খাদ্য সুরক্ষা নিয়ে শক্তিশালী আইন রয়েছে—
Food Safety and Standards Act, 2006.
যার অধীনে কাজ করে—
1. FSSAI (Food Safety and Standards Authority of India)

অন্যদিকে—
2. ASCI (Advertising Standards Council of India)
একটা স্ব-নিয়ন্ত্রক বিজ্ঞাপন সংস্থা, যা বিভ্রান্তিকর বিজ্ঞাপনের বিরুদ্ধে
নির্দেশিকা জারি করে।
তাহলে প্রশ্ন উঠছে—
- আইন থাকা সত্ত্বেও বাজারে ভেজাল থামছে না কেন?
- তাহলে কি নজরদারি ব্যবস্থায় এক বিশাল ফাঁক থেকে যাচ্ছে?
কারণগুলো স্পষ্ট:
১. পর্যাপ্ত পরিদর্শনের অভাব:
ভারতের মত বিশাল দেশে খাদ্য ব্যবসায়ীর সংখ্যা কোটি ছাড়িয়েছে।
কিন্তু নিয়মিত স্যাম্পেল টেস্টিং ও পরিদর্শনের হার সে তুলনায় অনেক কম।
২. শাস্তি আছে, কিন্তু ভয় নেই:
জরিমানা অনেক সময় কম।
বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হয় না,
আর দ্রুত নেওয়ার কথা তো অনেক পরে।
ফলে অসাধু ব্যবসায়ীরা আইনকে তোয়াক্কা না করেই,
নির্ভয়ে এবং নির্দ্বিধায় একই কাজ দিনের পর দিন চালিয়ে যায়।
৩. ল্যাব সুবিধার ঘাটতি:
- সব রাজ্যে উন্নত মানের পরীক্ষাগার নেই।
- স্যাম্পেল পরীক্ষার রিপোর্ট আসতে দেরি হয়।
- এতে আইনি ব্যবস্থা অনেক দেরি হয়।
৪. বিজ্ঞাপনে বিভ্রান্তি:
- ১০০% খাঁটি।
- প্রাকৃতিক।
- ভেষজ গুণসম্পন্ন।
- কোনও কেমিক্যাল নেই।
এসব দাবি অনেক ক্ষেত্রে বৈজ্ঞানিকভাবে যাচাইয়ের মাধ্যমে প্রমাণিত হয় না।
ASCI নির্দেশিকা দিলেও প্রয়োগ অনেক সময় দুর্বল।
৫. প্রোপাইটারি ফুড
(Proprietary Food)-এর
আড়ালে ছাড়পত্র:
অনেক বড় কোম্পানি তাদের পণ্য বা প্রোডাক্টকে এই ক্যাটেগরিতে নথিভুক্ত করে,
এর ফলে FSSAI-এর নির্দিষ্ট মানদণ্ডের বাইরে গিয়ে তারা উপাদানের হেরফের
করার দারুণ সুযোগ পায়।
অর্থাৎ, লাইসেন্স থাকার মানেই যে প্রোডাক্টটা ১০০% নিরাপদ বা পুষ্টিকর,
তা কিন্তু সবসময় আদৌ নয়।
চলুন একটু বড় অর্থে জিনিসটাকে বোঝা যাক—
নিয়ন্ত্রক সংস্থার কার্যকারিতা
ও বিভ্রান্তিকর লেবেলিং:
ভারতের খাদ্য সুরক্ষা ব্যবস্থা যে ঠিক কতটা নড়বড়ে,
তার প্রমাণ মেলে বড় বড় ব্র্যান্ডগুলোর লেভেলিং এর মার্কেটিং কৌশলে।
যার গুন আছে ষোল আনা,
তাকে কি চিৎকার করতে হয়?
অতিরঞ্জিত বানাতে হয়?
না, হয় না।
ফাঁকা ড্রামের আওয়াজ সবসময়েই বেশি হয়।

এখন আমার বড় প্রশ্ন FSSAI-এর কাছে—
তারা কিভাবে এই ধরনের বিভ্রান্তিকর লেবেল ছাপানোর অনুমতি দেয়?
কেলগস (Kellogg’s)-এর মত বিশ্বখ্যাত ব্র্যান্ডগুলো যখন বাজারে তাদের পণ্য ছাড়ে,
তখন তারা তথ্যের এমন এক সূক্ষ্ম মার-প্যাঁচ ব্যবহার করে,
যা সাধারণ মানুষের পক্ষে ধরা কঠিন।
এখানেই আসে বিজ্ঞাপনের গ্ল্যামার।
এই কেলগসের বিজ্ঞাপন যখন কাজলের মত জনপ্রিয় তারকারা
মোটা টাকার বিনিময়ে গুছিয়ে পরিবেশন করে,
সাধারণ মানুষের আস্থা তখন ২-৩ গুণ বেড়ে যায়।
আমরা ভেবে বসি—
এ তো সাধারণ কোনো প্রোডাক্ট নয়, তাও আবার কেলগস ব্র্যান্ড—
নিশ্চই অসাধারণ!
অপরদিকে বড় বড় সংস্থাগুলো তাদের মুনাফা বাড়িয়ে চলেছে।
কিন্তু মুদ্রার উল্টোপিঠ হল—
এই চটকদার বিজ্ঞাপন প্রচারের আড়ালে আপনার সন্তানের
প্রকৃত স্বাস্থ্য পড়ে যায় চরম ঝুঁকির মুখে।
লেবেলের কারচুপি
ও গাণিতিক ধোঁকা:
কেলগস কর্নফ্লেক্স নামক পণ্যটার প্যাকেটের গায়ে তথ্যের যে শেডিং
বা বিন্যাস করা হয়েছে, তা অত্যন্ত চতুর ও বিভ্রান্তিকর।
একটু লক্ষ্য করলে দেখা যায়:
———————
[ শুধুমাত্র ভারতের জিডিপি বৃদ্ধিই উন্নয়নের একমাত্র মানদণ্ড হয় কি?
কর্মসংস্থান, মানবসম্পদ, পরিবেশ ও ন্যায়বিচারের মানই শেষ পর্যন্ত
একটা দেশের ভবিষ্যৎ ঠিক করে।
ডিগ্রি হাতে কয়েক কোটি যুবক আজ রাজপথে ঘুরছে,
কিন্তু বাজারের কাছে তাঁদের জন্য কোনও সম্মানজনক কাজ নেই।
গ্রামীণ স্বাস্থ্যপরিষেবার অবস্থা দেখলে তো মেরুদন্ড দিয়ে যেন
হিমস্রোত বয়ে যায়।
(দেখুন) দিল্লির বাতাস তো আজ এক বিষাক্ত গ্যাস-চেম্বারে পরিণত হয়েছে,
যেখানে নিশ্বাস নেওয়া মানে দিনে কয়েক প্যাকেট সিগারেট খাওয়ার সমান।
এদিকে আমাদের পবিত্র নদীগুলো শিল্পবর্জ্যের নালায় পরিণত হয়েছে।
বিচার বিভাগীয় পরিসংখ্যান অনুযায়ী (দেখুন) ৫ কোটি+ বিচারাধীন মামলার পাহাড়প্রমাণ
ভার প্রমাণ করে যে— এদেশে আইন আছে, কিন্তু অধিকার প্রাপ্তির পথটা অবরুদ্ধ।
জেনে রাখুন সাধারণ মানুষের এখনও না শেষ হওয়া সেই যন্ত্রনার বাস্তব সত্যিগুলো।
Click: ভারতের জিডিপি: অর্থনীতি তো ছুটছে, কিন্তু বাস্তবে ক্ষতি হচ্ছে কাদের? ]
সার্ভিং সাইজের মারপ্যাঁচ:
আপনি যখন প্যাকেটের ওপরে কোনো অংশে বড় করে লেখা দেখেন
“৯ গ্রাম প্রোটিন” বা “৭ গ্রাম ফাইবার,”
খুব সাধারণভাবেই আপনার মনে হতে পারে,
এক বোল বা বাটি (৩০ গ্রাম) খেলেই বুঝি আপনি বা আপনার বাচ্চা
অতটা পরিমাণ পুষ্টি পাবে।
কিন্তু ছবির নিউট্রিশন টেবিলটা একটু ভালো করে লক্ষ্য করুন,
ওই পুষ্টির হিসাব দেওয়া আছে ১০০ গ্রামের ভিত্তিতে।
ফলে একজন সাধারণ ক্রেতা ঝটপট পড়তে গিয়ে ১০০ গ্রামের ওই বড়
সংখ্যাটাকেই এক বাটির (৩০ গ্রাম) পুষ্টিগুণ ভেবে ভুল করেন।
এদিকে কোম্পানি নিজেই বলছে একবারে আপনার খাওয়া উচিৎ ৩০ গ্রাম (সার্ভ সাইজ)।
অর্থাৎ, আপনি যা খাচ্ছেন,
তাতে প্রোটিন বা ফাইবার ওই বড় সংখ্যার মাত্র ৩ ভাগের ১ ভাগ থাকছে।
আর ঠিক এটাই হল ক্রেতাকে বিভ্রান্ত করার প্রথম ধাপ।
প্রোটিন নিয়ে মিথ্যে আস্ফালন,
(High in Protein Claim):
কোম্পানি দাবি করছে ১০০ গ্রামে প্রোটিন আছে ৭.২ গ্রাম।
সেই হিসেবে এক বাটিতে (৩০গ্রাম) আপনি পাচ্ছেন মাত্র ২.১৬ গ্রাম প্রোটিন।
এখন তুলনা করে দেখুন, একটা সাধারণ সেদ্ধ ডিমে প্রোটিন থাকে প্রায় ৬-৭ গ্রাম।
অর্থাৎ, যে পরিমাণ প্রোটিন একটা ডিমে আছে, তা পেতে আপনাকে ৩ বাটি
কর্নফ্লেক্স খেতে হবে!
যে খাবারে মাত্র ২.১৬ গ্রাম প্রোটিন আছে, তাকে কোন যুক্তিতে
“High in Protein”বা প্রোটিন সমৃদ্ধ খাবার বলে ফাঁকা আওয়াজ তোলা হচ্ছে?
ডিম বনাম কর্নফ্লেক্স:
একটা ডিমের গড় মূল্য— ৬-১০ টাকা।
আর একটা ১০০-১২০ গ্রাম কর্নফ্লেক্সের দাম ৫৫ টাকা।
কোম্পানি বড় গলায় ‘Power of 5’ (এনার্জি, প্রোটিন, ক্যালসিয়াম, আয়রণ, ভিটামিনস)
দাবি করলেও, বাস্তবে এই পুষ্টিগুলো প্রাকৃতিক খাবারে অনেক সস্তায় এবং উন্নত মানে পাওয়া যায়।
কি এনার্জি আদৌ পাওয়া যায়, না আইওয়াশ, তা আপনারাই বুঝে দেখুন।
পাশাপাশি প্যাকেটজাত খাবারে যে পুষ্টির গুণগান লেখা থাকে,
সেগুলো অনেক ক্ষেত্রেই “Fortified” বা কৃত্রিমভাবে মেশানো হয়,
যা ভুলেও কোনোদিন প্রাকৃতিক পুষ্টির বিকল্প হতে পারে না।
আমরা ধীরে ধীরে প্যাকেটজাত খাবারে যে পরিমাণ আকৃষ্ট হচ্ছি,
আমাদের পরবর্তী প্রজন্ম সেটাই কপি করবে, আর এর ফল?
চিনি ও কার্বহাইড্রেটের
তথ্য গোপন:
কোম্পানি প্রোটিন নিয়ে চিৎকার করলেও কার্বহাইড্রেট আর চিনি নিয়ে একদম চুপ।
লেবেলের তথ্য অনুযায়ী:
১০০ গ্রামে কার্বহাইড্রেট আছে ৮৪.৮ গ্রাম, অর্থাৎ এই খাবারের প্রায় ৮৫% স্রেফ শর্করা!
এতে ১৩.৪ গ্রাম Added Sugar (বাড়তি চিনি) আছে।
এখন চলুন একটু গাণিতিক হিসেবটা বুঝে নিই—
আপনি যদি এক বাটি বা ৩০ গ্রামের একটা সার্ভিং খান,
তবে তাতে চিনির পরিমাণ দাঁড়ায় প্রায় ৪ গ্রাম (প্রায় ১ চা চামচ)।
এটা শুনতে খুব সামান্য মনে হতেই পারে, কিন্তু ব্রেকফাস্টে নিয়মিতভাবে
এই পরিমাণ বাড়তি চিনি শরীরের ভেতরে ঢোকানো চরম ক্ষতিকর।
অথচ প্যাকেটের সামনে, পিছনে বা কোথাও কি লেখা আছে—
“High in Carbs বা High in Sugar”
না, নেই।
কোম্পানি শুধু সেটুকুই বলছে, যা শুনলে মনে হবে খাবারটা বেশ স্বাস্থ্যকর।
তথ্যের বিন্যাস বা
ভিজ্যুয়াল ট্রিক:
ছবির লেবেলটা লক্ষ্য করুন—
১০০ গ্রামের কলামটা সবার আগে এবং গাঢ় রঙে এমনভাবে দেওয়া হয়েছে,
যাতে মানুষের নজর ওই বড় সংখ্যাগুলোর ওপর আগে পড়ে।
আর ৩০ গ্রামের আসল তথ্যগুলো তার পাশে ছোট করে এবং হালকা রঙে দেওয়া।
আর একেই বলে ক্রেতাকে বিভ্রান্ত করার চতুর ডিজাইন।

সহজ কথায় ভুলটা কোথায়?
ভুলটা হল অসম্পূর্ণ সত্য বলা।
কোম্পানি আপনাকে জানাচ্ছে না যে,
আপনি এক বাটি খাবারে প্রোটিনের চেয়ে ১১-১২ গুণ বেশি শর্করা আর বিষতুল্য
চিনি নিঃশব্দে আপনার বা সন্তানের দেহে প্রবেশ করাচ্ছেন।
খাবারটা শুধু মিষ্টি (চিনি) নয়, এটা আসলে একটা “শর্করার বোমা।”
আমরা সাধারণভাবেই ভাবছি পুষ্টি পাচ্ছি,
কিন্তু বাস্তবে আমরা আসলে শরীরের ভেতরে শর্করার পাহাড় জমা করছি,
যার একটা বড় অংশই হল ক্ষতিকর বাড়তি চিনি,
যা রক্তে শর্করার মাত্রা বাড়িয়ে স্থূলতা (Obesity) ও ডায়াবেটিসের মত
রোগের ঝুঁকি বাড়ায়।
ফাইবারের শুভঙ্করের ফাঁকি:
ফাইবারের ক্ষেত্রেও একই গল্প।
প্যাকেটে ৭ গ্রাম ফাইবারের কথা ফলাও করে বলা হলেও,
এক সার্ভিংয়ে (৩০ গ্রাম) আপনি পাচ্ছেন মাত্র ২.১ গ্রাম ফাইবার।
যে উপাদানগুলো (প্রোটিন ও ফাইবার) সবচেয়ে নগণ্য পরিমাণে আছে,
সেগুলোকেই বিজ্ঞাপনে প্রধান আকর্ষণ হিসেবে দেখানো হচ্ছে।
এবারে আপনারা নিজেরাই চিন্তা করে দেখুন—
- নিয়ন্ত্রক সংস্থা FSSAI এই ধরনের ভুল লেবেল ছাপানোর অনুমতি দেয় কি করে?
- কিভাবে অনুমোদন দেয় এই ধরনের প্রোডাক্টকে?
- FSSAI কেন এ ধরণের বিজ্ঞাপন সাধারণ মানুষের জীবনের ক্ষতির স্বার্থে
বন্ধ বা ব্যান করছে না? - এটা কি আমাদের বা শিশুদের স্বাস্থ্য নিয়ে এক চরম ছেলেখেলা নয়?
বিজ্ঞাপনী প্রতারণা ও
ASCI-এর ভূমিকা:
এখানে দ্বিতীয় আরেক বড় সমস্যা— ASCI- এর সঙ্গে।
একটা বিজ্ঞাপন যখন কোনো তারকাকে দিয়ে প্রচার করানো হয়,
তখন সেই প্রোডাক্টের আসল গুণগত মান বা উপাদানগুলোর চেয়ে,
যে উপাদানগুলো সবচেয়ে কম পরিমাণে থাকে, চতুর বিজ্ঞাপনের মাধ্যমে সেগুলোকে
এমনভাবে তুলে ধরা হয়, যেন সেগুলোই সেই প্রোডাক্টের প্রধান গুণ।
সেলিব্রেটিদের বিশ্বাসযোগ্যতাকে ঢাল হিসাবে ব্যবহার করে
সাধারণ মানুষের কাছে প্রোডাক্টের একটা উজ্জ্বল কিন্তু অসম্পূর্ণ ছবি পরিবেশন করা হয়।
ASCI-ও বা কিভাবে এই বিভ্রান্তিকর বিজ্ঞাপনের অনুমোদন দিল?

প্রশ্ন এখানেও থেকে যায়।
পরিশেষে—
ভেজালের প্রকৃত মূল্য দিচ্ছে কে?
মাশুল গুনছে কারা?
- আমরা।
- প্রতিদিন।
- অজান্তে।
স্বাস্থ্যের উপর চাপ পড়ছে,
বাড়ছে বিপদ:
- কিডনি রোগ।
- লিভারের সমস্যা।
- ক্যান্সারের ঝুঁকি।
- হরমোনের গোলমাল।
- শিশুদের বিকাশজনিত সমস্যা।
এসবের চিকিৎসা ব্যয় বহন করতে হচ্ছে সাধারণ পরিবারগুলোকে।
শিশুদের ক্ষেত্রে ঝুঁকি তো আরও বেশি।
- শরীর ছোটো।
- প্রতিরোধ ক্ষমতা কম।
- রাসয়নিকের প্রভাব দ্রুত ছড়িয়েপড়ে।

ভেজাল ও প্রতারণা:
আমাদের করণীয় কি?
অভিযোগের পর অভিযোগ জমা পড়ে আছে ধুলোর মত।
তবুও শুধু অভিযোগ করে থেমে গেলে চলবে না।
১. লেবেল পড়ুন:
FSSAI লাইসেন্স নম্বর আছে কিনা দেখুন।
উৎপাদনের তারিখ, মেয়াদ, উপাদান তালিকা পড়ুন।
২. অস্বাভাবিক রং ও গন্ধ খেয়াল করুন:
অতিরিক্ত উজ্জ্বল সবজি।
অস্বাভাবিকভাবে ফেনাযুক্ত দুধ।
অস্বাভাবিক শক্ত বা রাবারের মত পনির।
সন্দেহ হলে ব্যবহার করবেন না।
৩. ঘরে ছোট পরীক্ষা:
দুধে আয়োডিন দিলে নীল হলে স্টার্চ থাকতে পারে।
জলে লঙ্কার গুঁড়ো দিলে রং আলাদা হয়ে গেলে রং মেশানো সন্দেহ।
এগুলো প্রাথমিক ধারণা দেয়, চূড়ান্ত প্রমাণ নয়।
অভিযোগ করুন:
- FSSAI-এর “Food Safety Connect” অ্যাপের মাধ্যমে অভিযোগ জানানো যায়।
- অভিযোগ না করলে ব্যবস্থা নেওয়ার সুযোগও থাকে না।
ভেজাল ও প্রতারণা:
শেষ কথা
(পড়ুন) ভেজাল শুধু স্বাস্থ্য ও জীবনের ঝুঁকিই নয়—
- এটা নৈতিকতার সংকট।
- প্রশাসনিক ব্যর্থতা।
- বাজার ব্যবস্থার দুর্বলতা।
ভেজাল ও প্রতারণা দেখে, শুনে, জেনে, বুঝে আজ প্রশ্ন একটাই—
আমরা কি এভাবেই চুপ করে হাত গুটিয়ে বসে থাকব?
নাকি সচেতন হব, প্রশ্ন করব, দাবি তুলব?
কারণ খাবার শুধু পণ্য বা প্রোডাক্ট নয়।
খাবার আমাদের জীবনের ভিত্তি।

আর সেই ভিত্তি যদি দূষিত বা বিষ হয়—
তার প্রভাব প্রজন্ম ধরে বহন করতে হয়।
ভয়াবহ (দেখুন)মাশুল গুনতে হয় আমাদেরই।
—————–
( প্রকৃত শিল্পী কাদের বলা যায়?
নিজেদের স্বার্থে শুধুমাত্র বিনোদনের সামান্য টুকরো ছুঁড়ে দিলেই কি প্রকৃত
শিল্পী হওয়া যায়?
শুধু আলোয় দাঁড়িয়ে হাততালি আর প্রশংসা কুড়লেই কি দায়িত্ব শেষ হয়ে যায়?
শুধু ব্যাঙ্ক ব্যালেন্স, আরও যশ-খ্যাতির হিসেব দিবারাত্রি মনে মনে কষে গেলেই
কি তাঁকে শিল্পী বলা যায়?
নিজের নিরাপত্তার জন্য অন্যায় দেখেও চুপ থাকলেই কি শিল্পীর কাজ সেরে ফেলা হয়?
ক্ষমতার প্রশংসা গাইতে গাইতে সাধারণ মানুষের দীর্ঘশ্বাস ভুলে গেলে,
সে কি আর সত্যিই মানুষের কণ্ঠস্বর থাকে?
পড়ুন সেই আসল শিল্পীর বাস্তব গল্প, যা আপনাকে ভাবাবেই।
Click: জুবিন গর্গ: সেলিব্রিটি হওয়া সোজা, বিবেক হওয়া কঠিন– কেন? )
Articlesবাংলা Bangla Articles, Quotes & Prose-Poetry / বাংলা প্রবন্ধ, উক্তি ও গদ্য-কবিতা।



