এমবিএ নয়,
বাবাগিরিতেই পরম সুখ:
ভণ্ড বাবা ও মা।
আধ্যাত্মিকতার আবরণে সাধারণ মানুষের অসহায়ত্বকে পুঁজি করে গড়ে ওঠা এক গভীর সামাজিক ব্যাধি।
অন্ধবিশ্বাসের সুযোগ নিয়ে এই স্বঘোষিত ধর্মগুরুরা বিশ্বাসের মূলে আঘাত করে
সমাজকে ধীরে ধীরে অন্ধকারের দিকে ঠেলে দিচ্ছে।
আপনি যদি ভাবেন পড়াশোনা করে, হাড়ভাঙা খাটুনি খেটে জীবনে বড় হবেন,
তবে আপনি এখনও সেই আদ্দিকালের মান্ধাতা আমলের চিন্তায় পড়ে আছেন।
সময়ের তালে তাল মিলিয়ে চিন্তাধারার পরিবর্তন অত্যন্ত জরুরি।
আজকের স্টার্টআপ কালচারে সবচেয়ে লাভজনক বিজনেস মডেল হল—
‘আধ্যাত্মিক ফ্র্যাঞ্চাইজি।’
এখানে ইনভেস্টমেন্ট বলতে কেবল (দেখুন) একজোড়া গেরুয়া বা সাদা থান, গলায় কাঠের বা তুলসীর মালা,
কপালে একটু চন্দন আর চোখে মুখে এমন এক ভাব,
যেন আপনি কাল রাতেও স্বয়ং বিশ্বব্রহ্মাণ্ডের সাথে ডিনার করেছেন।

ব্যাস!
ডিগ্রিধারীরা আপনার পায়ের কাছে সিভি নয়, নারকেল নিয়ে লাইন দেবে।
আপনার রিহার্সাল যত ভালো হবে, পারফরমেন্সও হবে দুর্দান্ত।
ভণ্ড বাবা:
আশীর্বাদের ব্যবসা
বাইরে থেকে সব স্বাভাবিক—
কাজ, পড়াশোনা, উন্নতি।
কিন্তু ভেতরে ভেতরে জমে উঠেছে এক অন্যরকম বাজার—
বিশ্বাসের রমরমা বাজার।
এখানে দোকান নেই, কিন্তু ভিড় আছে।
পণ্য নেই, কিন্তু দাম আছে।
আর সবচেয়ে বড় কথা—
এখানে মানুষ ঠকলেও বারবার ফিরে আসে।
কারণ এখানে যা বিক্রি হয় সেটা জিনিস না— ভরসা।
আসলে এই ভরসার বাজার তখনই তুঙ্গে ওঠে,
যখন রাষ্ট্র এবং সমাজ সাধারণ মানুষকে ন্যূনতম নিরাপত্তা বা সামাজিক বিচার দিতে ব্যর্থ হয়।

যখন একজন মানুষ দেখে তাঁর চারপাশে আইনি ব্যবস্থা মন্থর,
চিকিৎসা ব্যয় আকাশচুম্বী এবং ন্যায় বিচার পাওয়া কেবল বিত্তশালীদের একচেটিয়া অধিকার—
তখন সে দিশেহারা হয়ে অলৌকিকতার অন্ধকার গলিতে আশ্রয় খোঁজে।
রাষ্ট্র যেখানে তার নাগরিকের মৌলিক অধিকার আর সুরক্ষা নিশ্চিত করতে পারেনা,
সেই শূন্যস্থান পূরণ করতেই উদয় হয় এইসব ‘ত্রাতা’ বা ‘বাবা’রা।
সিস্টেমের ব্যর্থতাই এঁদের ব্যবসার সবচেয়ে বড় মূলধন।
দুর্বলতার দরজা:
মানুষ যখন ক্লান্ত হয়, ব্যর্থ হয় বা একা হয়ে পড়ে—
তখন সে যুক্তি খোঁজে না, খোঁজে আশ্বাস।
ঠিক তখনই যদি কেউ বলে, “সব ঠিক করে দেব”—
সেটা যুক্তির চেয়েও অনেক বেশি শক্তিশালী শোনায়।
আর ঠিক এই জায়গাটাতেই তৈরি হয় ফাঁদ।
ভণ্ড বাবা:
ফাঁদের নীল নকশা
এই ডিজিটাল যুগের ফ্রড বাবাদের , এমনকি (দেখুন)অপ্রাপ্তবয়স্ক বাবাদের মার্কেটিং স্ট্র্যাটেজি
বড় বড় কর্পোরেট কোম্পানিকেও লজ্জায় ফেলে দেবে।
এই ভণ্ড বাবা ও মা-এঁদের সাফল্যের তিনটে প্রধান স্তম্ভ আছে:
১. ভয় দেখানো:
“আপনার গ্রহ-নক্ষত্র বিগড়ে গেছে।”
(আসলে বিগড়েছে আমাদের সাধারণ জ্ঞান)
২. অসম্ভব প্রতিশ্রুতি:
“এই কবজটা পড়লে ইন্টারভিউ না দিয়েই চাকরি হবে।”
(অথচ কবচ বিক্রেতার নিজেরই কোনও বৈধ চাকরি নেই।)
৩. সোশ্যাল মিডিয়া সার্কাস:
রিলস আর শর্টস-এ এমনভাবে অলৌকিক এডিটিং করা হয়,
যেন মনে হয় তিনি তুরি মারলেই বৃষ্টি নামাতে পারেন।
প্রশ্নের ভয়:
যেখানে সত্যি থাকে, সেখানে প্রশ্নের জায়গা থাকে।
কিন্তু যেখানে ব্যবসা থাকে, সেখানে প্রশ্ন বিপজ্জনক।
তাই অনেক সময় শোনা যায়— “প্রশ্ন করোনা, বিশ্বাস রাখো।”
আর এই এক লাইনই অনেক কিছু বলে দেয়।
যুক্তি কি বলে?
যেখানে একজন শিক্ষিত যুবক a² + b²-এর সূত্র মিলিয়ে জীবনের অংক মেলাতে পারছে না,
সেখানে এই ফ্রড বাবারা কোনও যুক্তি ছাড়াই জীবন বদলে দেওয়ার গ্যারান্টি দিচ্ছে।
মজার বিষয় হল, মানুষ কঠোর যুক্তির চেয়ে সস্তা সান্ত্বনা বেশি পছন্দ করে,
আর তাই তো মহাকাশ বিজ্ঞানের যুগেও মানুষ পাথরের টুকরোয় ভাগ্য খোঁজে।
বিষয়ের গভীরতা:
অনেকেই হয়ত পিকে (PK) সিনেমাটা দেখে হিন্দু ধর্মের অবমাননা বা একজন মুসলিম অভিনেতার দ্বারা হিন্দু ধর্মের অপমান নিয়ে সমালোচনা করেছেন, এটা স্বাভাবিক।
কিন্তু ব্যক্তিগত আক্রমণ ও ঠুনকো সেন্টিমেন্ট বাদ দিয়ে যদি বিষয়টার আরও গভীরে পৌঁছানো যায়,
তবে কয়েকটা তিক্ত, কিন্তু সত্য বিষয় পরিষ্কার হয়ে যায়:
১. শিল্প ও শিল্পীর
কোনও সীমানা হয় না
আমির খান যেমন পিকে-এর মাধ্যমে হিন্দু সমাজের একশ্রেণীর মানুষের তৈরি অন্ধবিশ্বাস,
ধর্মীয় গোঁড়ামি এবং কুসংস্কার নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন,
তেমনি আমাদের বিদ্রোহী কবি কাজী নজরুল ইসলামও মুসলিম সমাজের জড়তা কাটানোর আপ্রাণ চেষ্টা করেছেন।
নজরুল ইসলাম নিজে একজন মুসলিম হয়েও শ্যামাসঙ্গীত বা হিন্দুদের নিয়ে কালজয়ী সব গান রচনা করেছেন।
কারণ প্রকৃত শিল্পীর চোখে সত্যের একটাই রূপ— আর তা হল মানবতা।
২. ধর্মীয় উগ্রতা
সভ্যতাকে পিছিয়ে দেয়:
যে কোনও সভ্য ধর্মের জন্য উগ্রতা কখনই শোভনীয় নয়।
যখন জ্ঞান-বিজ্ঞান, বিচারবুদ্ধি আর মানবতাকে ছাপিয়ে অন্ধভক্তি আর উগ্রতা বড় হয়ে ওঠে,
তখন বুঝতে হবে সেটা উন্নতি নয়, বরং এক ভয়াবহ ধ্বংসের পূর্বাভাস।
৩. পেশাদার ধর্মব্যবসায়ী
বনাম প্রকৃত আধ্যাত্মিকতা:
সব আধ্যাত্মিক পথপ্রদর্শক এক নয়।
প্রকৃত আধ্যাত্মিকতা মানুষকে মুক্ত করতে শেখায়,
কিন্তু এই (দেখুন) আধুনিক বাবা-মা-এঁরা মানুষকে ভয়ের অদৃশ্য শিকলে বন্দি করে।
ধর্মকে যখন লক্ষ লক্ষ টাকার গাড়ি কেনার হাতিয়ার বানানো হয়, তখন তা আর বিশ্বাস থাকে না,
হয়ে দাঁড়ায় একটা করমুক্ত লাভজনক (দেখুন) ‘কর্পোরেট স্টার্টআপ।’
৪. শিক্ষা যখন উপেক্ষিত,
কুসংস্কার তখন শাসক:
যে সমাজে একজন বেকার ছাত্রকে লাঠিপেটা করা হয়,
আর একজন (দেখুন) ভণ্ড ধর্মব্যবসায়ীকে লাল গালিচা দেওয়া হয়, সেই সমাজের ভবিষ্যৎ অন্ধকার।
প্রশ্ন করার ক্ষমতা হারিয়ে ফেললে আমরা ২১ শতকের নাগরিক হয়েও আদতে মধ্যযুগীয় মানসিকতায় ফিরে যাচ্ছি।
মনে রাখবেন, আমরাই কিন্তু সমাজ।
আর আমাদের ভবিষ্যত প্রজন্ম ঠিক সেটাই পাবে, যা আমরা রেখে যাব।
ভণ্ড বাবা:
ব্যর্থতার দায় কার?
এই ব্যবস্থার সবচেয়ে চতুর দিক হল— এটা কখনও ব্যর্থ হয় না।
কারণ কাজ না করলে বলা হয়— “আপনার বিশ্বাস যথেষ্ট ছিল না।”
অর্থাৎ, সমস্যা সিস্টেমে না, সমস্যা আপনার মধ্যেই।
একটা অদ্ভুত খেলা, যেখানে হারলেও আপনি দায়ী।
সহজ পথের টান:
- বাস্তব জীবন কঠিন।
- পরিশ্রম চায়, ধৈর্য চায়।
কিন্তু এর বিপরীতে যদি কেউ বলে—
“সহজে সব পেয়ে যাবে, কোনও চিন্তা নেই— আমি তো আছি!”
তাহলে সাধারণত মানুষ কোনটা বেছে নেবে?
এই প্রশ্নের উত্তরই এই পুরো ব্যবস্থাকে দিনের পর দিন ধরে অবলীলাক্রমে চালায়।
যখন রাষ্ট্র এবং সমাজ
‘ভিআইপি’ তকমা দেয়
সবচেয়ে বড় কৌতুকটা শুরু হয় তখন, যখন শিক্ষিত সমাজ আর প্রশাসন এদের মাথায় ছাতা ধরে।
একজন বিজ্ঞানী সারা জীবন ল্যাবে কাটিয়ে হয়ত একটা সম্মানীয় পদক পান না,
কিন্তু একজন স্ব-ঘোষিত ‘বাবা’ বা ‘মা’, যার কথার কোনও বৈজ্ঞানিক ভিত্তি নেই,
উনি অনায়াসেই সরকারের শীর্ষস্তরের আতিথেয়তা পেয়ে যান।
বাস্তবতা:
রাষ্ট্র যখন শিক্ষার চেয়ে অলৌকিকতাকে বেশি গুরুত্ব দেয়, তখন যুবসমাজ বিভ্রান্ত হবেই।
তাঁরা যখন দেখে যে—
লাইব্রেরীতে বসে পড়াশোনা করলে ভবিষ্যতে পুলিশের লাঠি জোটে,
কিন্তু কোনও মঠে বসে গুছিয়ে ব্রহ্মাণ্ড কাঁপানো গল্প শোনালে ৪ কোটি টাকার গাড়ি
আর সরকারি নিরাপত্তা জোটে, তখন তাঁদের মনের প্রতিক্রিয়া ঠিক কী হয়?
এটা কেবল তাঁদের দুর্ভাগ্য নয়, এটা জাতীয় বুদ্ধিমত্তার অপমান।
ভণ্ড বাবা:
দায় শুধু কার?
এখানে শুধু যারা এই ব্যবসা করছে তাঁদের দোষ দিয়ে লাভ নেই।
কারণ বাজার তখনই টিকে থাকে, যখন ক্রেতা থাকে।
- আমরা শুনতে চাই সহজ কথা।
- বিশ্বাস করতে চাই সুন্দর গল্প।
আর এই চাহিদাই পুরো ব্যবস্থাকে অক্সিজেন দিয়ে রাখে।
বিশ্বাসের পরজীবী:
এই (দেখুন) ফ্রড বাবা-মা-এঁরা আসলে সমাজের পরজীবী।
তাঁরা মানুষের অসহায়ত্বকে পুঁজি করে নিজেদের ব্যাংক ব্যালেন্স বাড়ায়।
বিদ্বানের সম্পদ:
জ্ঞান, যা অন্যকে দিলে বাড়ে।
ফ্রড বাবা-মা-এঁদের সম্পদ:
ভীতি, যা প্রচার করলে ব্যবসা বাড়ে।
হাস্যকর বিষয় হল—
এইসব বাবা-মা-এঁরা মঞ্চে দাঁড়িয়ে গলায় গীটারের তার বের করে বলবেন—
“মোহ-মায়া ত্যাগ করো বৎস!
তুমি কি নিয়ে এসেছো?
জগতের সব কিছু জগতেই রেখে যেতে হবে।”
অথচ তাঁরা নিজেরাই স্টেজ থেকে নেমে দামী এসি গাড়িতে ওঠেন।
তাঁদের ঘড়িটা হয়ত রোলেক্সের, কিন্তু উপদেশটা মহৎ ত্যাগের।

অলৌকিকতার অপচয়:
বৈশ্বিক সংকটে
কেন এই নীরবতা?
সবচেয়ে বড় কৌতুকটা এখানেই!
আমাদের এই সুপার পাওয়ার বাবারা যখন মঞ্চে বসেন, তখন তাঁদের ভাবখানা এমন যেন,
তাঁরা চাইলেই পকেট থেকে একটা নতুন পৃথিবী বের করে দিতে পারেন।
অথচ দেখুন দীর্ঘকাল ধরে হিন্দু-মুসলিম রেষারেষি,
সেটা মেটানোর কোনও অলৌকিক চাবিকাঠি কোনও বাবার ঝোলায় নেই।
আসলে আমাদের যেমন অফিসের বসের ওপর বস থাকেন,
এনাদেরও তেমনি কোনও এক ‘সুপ্রিম বস’ আছেন কোনও এক গোপন ল্যাবে।
এখন তাঁদের কাছে আমার প্রশ্ন হল—
সেই সুপ্রিম বস কি গ্রহ নক্ষত্রের একটু কারিগরি করে কিংবা রাশিফলের একটা তুড়ি মেরে
গ্লোবাল ওয়ার্মিং বা সাম্প্রদায়িক দাঙ্গাটা চিরতরে থামাতে পারেন না?
এনারা মঞ্চে বসে, মাইক্রোফোনে এমন সব মহাজাগতিক জ্ঞানের আলো ছড়ান—
যেন মনে হয় এনারা চোখ বন্ধ করলেই ওজোনস্তরের ফুটোটা পৃথিবীতে বসেই সেলাই করে দিতে পারতেন,
কিন্তু কোনও এক অজ্ঞাত কারণে তা করছেন না।
সত্যি না সান্ত্বনা?
শেষ পর্যন্ত প্রশ্নটা খুব সাধারণ, কিন্তু অস্বস্তিকর—
আমরা কি সত্যি খুঁজছি?
নাকি শুধু সান্তনা?
কারণ এই দুটো এক না।
এবার একটু সবাই মিলে ভাবি চলুন:
শিক্ষা কি তবে সত্যিই অর্থহীন?
- শিক্ষা আমাদের প্রশ্ন করতে শেখায়।
- সত্যের মুখোমুখি দাঁড়াতে শেখায়।
আর এই ভণ্ড বাবা, এঁদের সবচেয়ে বড় ভয় হল সেই ‘প্রশ্ন।’
তাঁরা চায় এমন একটা সমাজ, যেখানে সবাই মাথা নত করবে, কিন্তু খাটাবে না।
চিড়িয়াখানা ভ্রমণ:
আমাদের দেশটা যেন আজ এক আজব চিড়িয়াখানা হয়ে দাঁড়িয়েছে—
যেখানে খাঁচার ভেতরে জানোয়ার নয়,
বরং সেইসব মানুষের বিবেক আর ভবিষ্যৎগুলো বন্দী হয়ে আছে।

এই চিড়িয়াখানার সবচেয়ে বড় তামাশাগুলো হল—
একদিকে একজন যুবক নিজের জীবনের শ্রেষ্ঠ সময়, হাড়ভাঙা খাটুনি,
অর্থ আর স্বপ্ন মিশিয়ে পিএইচডি করে ল্যাম্পপোস্টের নিচে চাকরির জন্য ধর্না দিচ্ছে,
উল্টোদিকে স্বঘোষিত ‘ভগবান’রা লাক্সারি রিসোর্টে বসে মোক্ষলাভের ডিল দিচ্ছে।
পিকে (PK) সিনেমার মত শক্তিশালী সামাজিক বার্তা দেখে,
শুনে এবং তথাকথিত ‘রং নাম্বার’-এর তত্ত্ব বুঝেও এক বিরাট সংখ্যক মানুষ আজও
সেইসব বাবা-মা-এঁদের কাছে ভিড় জমাচ্ছে— এক অন্ধ বিশ্বাসে।
আবার কাজী নজরুল ইসলামের বিদ্রোহ কবিতা পড়ে, আবৃত্তি করে, জেনে, বুঝেও মানুষ দিনের পর দিন অমানবিক হয়ে পড়ছে আরও বেশি।
মানুষ থেকে ভিড়
সাম্প্রদায়িক চেতনার মৃত স্তুপের ওপর দাঁড়িয়ে সেই মানুষগুলো আজ জয়গান গাইছে বিভেদের;
যেখানে নজরুলের ‘মানুষ’ কবিতার সেই সাম্য আজ কেবল কাগুজে দলিলে বন্দি।
যে সুফি আন্দোলন একদিন বাংলার রাজপথে প্রেম, সম্প্রীতি আর পরমাত্মার সঙ্গে মিলনের গান শুনিয়েছিল, আজ তা সাম্প্রদায়িক উগ্রতা আর রাজনীতির যাঁতাকলে পিষ্ট হয়ে মুখ থুবড়ে পড়ে আছে।
মানবিকতার সেই উদার পথ আজ প্রায় জনশূন্য।
যে লালন সাঁই গেয়েছিলেন— “সব লোকে কয় লালন কি জাত সংসারে!”
আজ আমরা স্মার্ট সিটিতে বাস করি, হাতে লেটেস্ট আইফোন,
কিন্তু মনের ভেতরে সেই আদিম অন্ধকার।
আজও বাড়ি ভাড়া দেওয়ার আগে মানুষের পদবী দেখা হয়, জাত দেখা হয়।
লালনের আরশিনগর আজ কেবল ইউটিউবের প্লে-লিস্টে বন্দি, রাজপথ দখল করে আছে সংকীর্ণ সম্প্রদায়িকতা।
শিক্ষা আছে, সচেতনতা নেই:
ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর বর্ণপরিচয় লিখেছিলেন আমজনতাকে অক্ষরজ্ঞান দিতে।
অথচ আজ সেই বর্ণপরিচয় পড়া শিক্ষিত সমাজই সবচেয়ে বেশি ফেসবুক,
হোয়াটস্ অ্যাপ ইউনিভার্সিটির জাল খবরে বিশ্বাস করে।
ডিগ্রি যত বাড়ছে, বিচারবুদ্ধি যেন ততই কমছে;
নয়ত একজন শিক্ষিত মানুষ কিভাবে বিশ্বাস করে যে কোনও বাবার একটা ফুঁয়ে
তাঁর জীবনের সব সমস্যা মিটে যাবে?
নৈতিকতার পতন:
বেগম রোকেয়া নারী স্বাধীনতার যে স্বপ্ন দেখেছিলেন, আজ তা কেবল সভার বক্তৃতায় সীমাবদ্ধ।
২১ শতকেও নারীদের নিরাপত্তা প্রশ্নচিহ্নের মুখে।
অথচ আশ্চর্যের বিষয় হল—
এই সমাজেরই এক বড় অংশ কোনও এক মা বা বাবার চরণে মাথা ঠুকছে অলৌকিক কিছু পাওয়ার আশায়,
কিন্তু পাশের বাড়ির মেয়েটার ওপর হওয়া অনাচার দেখে মুখ ঘুরিয়ে চলে যাচ্ছে।
রবীন্দ্রনাথ লিখেছিলেন—
“এসো আর্য, এসো অনার্য, হিন্দু-মুসলমান।”
আজ সেই মহামানবের সাগরতীরে আমরা একে অপরের রক্ত পিপাসু।
যে মহামিলনের কথা তিনি বলে গেছেন, তা আজ রাজনীতির ড্রইংরুমে কাটাছেঁড়া হচ্ছে।
মানুষে মানুষের যে সেতু হওয়ার কথা ছিল, সেখানে আজ তৈরি হয়েছে সন্দেহের পাঁচিল।

পরেরবার যখন কোনও ‘বাবা’ বা ‘মা’কে কোটি টাকার গাড়িতে ঘুরতে দেখবেন,
আর নিজের পকেটে রাখার ডিগ্রীর সার্টিফিকেটের দিকে তাকাবেন, তখন বুঝবেন—
ভুলটা আপনার নয়, ভুলটা সেই সিস্টেমের, যা মেধার চেয়ে মশকরাকে বেশি পুরস্কৃত করে।
মনে রাখবেন, অলৌকিকতা কখনও অভাব মেটাতে পারে না, পারে কেবল বিভ্রান্তি বাড়াতে।
আজ মহাকাশ বিজয়ের যুগে দাঁড়িয়েও যদি আমরা যুক্তির বদলে জাদুটোনায় আস্থা রাখি,
তবে আমাদের অর্জিত সব ডিগ্রিই মূল্যহীন।
জীবনের অংক মেলাতে কঠোর পরিশ্রমের পাশাপাশি প্রয়োজন বৈজ্ঞানিক দৃষ্টিভঙ্গি আর নির্মোহ যুক্তিবাদ।
কারণ অন্ধভক্তি মানুষকে দাসে পরিণত করে, আর প্রশ্ন করার সাহস বা যুক্তি মানুষকে দেয় প্রকৃত মুক্তি।
বিবেক জাগ্রত করুন, কারণ অলৌকিক কিছু দিয়ে পেট ভরে না, পেট ভরে অন্ন দিয়ে।
আর সেই অন্ন আসে মেধা, শ্রম এবং বিজ্ঞানের সঠিক প্রয়োগ থেকে।
অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ:
(গহীন রাতে ভারত-বাংলাদেশ সীমান্তের নিঃশব্দ আর্তনাদ কি কেউ আজও শুনতে পান?
এক সময়ে এই উপমহাদেশের মানুষ একসাথে ছিল—
একই নদীর জল, একই আকাশ, একই গান আর অনুভূতিও এক।
তারপর একদিন সময়, ধর্ম আর রাজনীতি মিলে একটা শ্রেষ্ঠ ভূখণ্ডের বুক চিরে ভাগ করে দিল।
নাম দিল— “র্যাডক্লিফ লাইন।”
তারপর?
জেনে রাখুন ভেতরের সেই মর্মস্পর্শী ও বাস্তব কাহিনি,
যা আপনাকে নিয়ে যাবে এক অন্য চিন্তার জগতে।
যাদের জীবনের সাথে এই অভিজ্ঞতা বাস্তব, তাঁদের মন আরও বেশি ভারী হতে পারে।
পড়ুন: ভারত-বাংলাদেশ: আলাদা দেশ, না কি একই কষ্টের দুই নাম?)
( ভারতের মানচিত্রে নারী নিরাপত্তা আজ এক বিরাট প্রশ্নচিহ্নের মুখে দাঁড়িয়ে।
নির্ভয়া থেকে শুরু করে উনাও, কাঠুয়া কিংবা অতি সাম্প্রতিক আরজিকর—
প্রতিটা ঘটনা কেবল একটা অপরাধ নয়,
বরং আমাদের রাষ্ট্রীয় এবং সামাজিক কাঠামোর ব্যর্থতার এক একটা জীবন্ত দলিল।
প্রশ্ন উঠছে,
যে দেশে ধর্ষণের সর্বোচ্চ শাস্তি মৃত্যুদণ্ড হতে পারে, সেখানে অপরাধীরা কেন অবলীলায় ঘুরে বেড়ায়?
কেন আইন শক্তিশালী হওয়া সত্বেও তার প্রয়োগ অপরাধীর মনে ত্রাস সৃষ্টি করতে পারছে না?
আজ জেনে রাখুন ভেতরের সেই লুকোনো সত্যি, যা আপনার জেনে নেওয়াটা অত্যন্ত জরুরি।
পড়ুন: ভারতে মেয়েদের নিরাপত্তা– এটা কি শুধুই এক বিশ্বাস? )
একটা বিশেষ নিবেদন:
[ Articlesবাংলা, আমার-আপনার পরিবার
আপনাদের জন্যেই এই ওয়েবসাইটের জন্ম।
তাই আরও বিভিন্ন দুর্দান্ত টপিকের ওপরে এরকমই সব
বিশ্লেষণধর্মী লেখা পেতে নিয়মিত আমাদের পেজে চোখ রাখুন।
আপনার প্রতিবেশি, বন্ধুবান্ধব, আত্মীয়-স্বজন তথা সমাজের স্বার্থে
আপনার যে লেখাটা গুরুত্বপূর্ণ মনে হবে, আপনি সেই লেখাকে শেয়ার করে পৌঁছে দিন তাঁদের কাছে,
যাতে তাঁরাও জানার, বোঝার সুযোগটুকু পান আপনাদের মাধ্যমে।
ইমেইল আইডি দিয়ে আমাদের বাঙালির পরিবারের একজন
প্রিয় মানুষ হয়ে উঠুন।
এরপর এই ওয়েবসাইটে যখনই কোনও লেখা প্রকাশিত হবে,
সবার আগে আপনি পেয়ে যাবেন নোটিফিকেশন— সরাসরি আপনার ইনবক্সে।
পড়তে ইচ্ছে না করলে অডিও প্লে করে শুনে নিতে পারবেন।
এ বিষয়ে আপনার গুরুত্বপূর্ণ মতামত জানার অপেক্ষায় রইলাম।
চলুন বাঙালিকে বিশ্বের দরবারে সবাই মিলে একসাথে বারবার তুলে ধরি
চিন্তা, চেতনা আর শব্দের শক্তিতে—
একসাথে, সবাই মিলে।
বিশ্ব জানুক—
আমাদের ভারত কি?
বাঙালি কি?
বাংলা শব্দের ক্ষমতাই বা কি? ]
Articlesবাংলা Bangla Articles, Quotes & Prose-Poetry / বাংলা প্রবন্ধ, উক্তি ও গদ্য-কবিতা।






