নববর্ষের দর্শন:
পতনশীল পাতা ও আগামীর কিশলয়
কালস্রোতের অমোঘ নিয়মে মহাকালের খাতায় যুক্ত হলো
আরও একটা পালক– 2026.
ক্যালেন্ডারের পাতা ওল্টানো মানে কেবল সংখ্যা বদল নয়, এ যেন এক চ্যুতি আর প্রাপ্তির সন্ধিক্ষণ।
শিশিরভেজা ঘাসের ডগায় যখন নতুন বছরের প্রথম সূর্যরশ্মি এসে পড়ে,
তখন মনে হয় পৃথিবীটা এক বিশাল বৃক্ষ, সমাজ সেই বৃক্ষের ডালপালা।
আজ সময় এসেছে সেই জীর্ণ, পচা-গলা, পাপীরূপী পুরনো পাতাগুলোকে ঝরিয়ে ফেলার।
ঝরে পড়ুক অশুভ চিন্তা, ঝরে পড়ুক অনৈতিকতার গ্লানি।
বদলে আসুক কচি কিশলয়ের স্নিগ্ধতা, জন্ম নিক এক নতুন সবুজ সমাজ।
অপরাধহীন সমাজ নয়,
প্রয়োজন ন্যায়ের শাসন
আমরা এক কাল্পনিক স্বর্গরাজ্যের স্বপ্ন দেখি, যেখানে কোনো অন্যায় বা অপরাধের অস্তিত্ব থাকবে না।
কিন্তু বাস্তবতা হলো, ঘর্ষণ ছাড়া যেমন আগুন জ্বলে না, তেমন বৈচিত্রময় সমাজে দ্বন্দ্ব থাকা স্বাভাবিক।
আমাদের কাম্য এমন এক সমাজ, যেখানে অপরাধ এত কম হবে যে, পুলিশ-আদালত অপ্রয়োজনীয় হবে না, আবার অতিরিক্ত ব্যস্তও থাকবে না।
আইনের প্রয়োজন ফুরিয়ে যাওয়া মানে সমাজের স্থবিরতা।
আমরা চাই অপরাধ থাকুক, কিন্তু তা যেন হয় নগণ্য।
এর অর্থ অপরাধকে প্রশ্রয় দেওয়া নয়, বরং এমন এক সমাজ গড়া–
যেখানে ন্যায়বিচারের উপস্থিতিতেই অপরাধ মাথা তুলতে সাহস না পায়।

অপরাধ শূন্য সমাজ নয়, বরং নিয়ন্ত্রিত ও ন্যায়নিষ্ঠ সমাজই আমাদের লক্ষ্য।
আইনের শাসন এতটাই সজাগ থাকুক যে, অপরাধী অপরাধ করার আগেই যেন বিচারব্যবস্থার খড়্গের কথা ভেবে শিউরে ওঠে।
আদালত হবে ন্যায়ের মন্দির, আর পুলিশ হবে সাধারণ মানুষের পরম বন্ধু,
কোনো বিশেষ অশুভ শক্তির হাতের পুতুল নয়।
নারী স্বাধীনতা ও কঠোর আইনের আবশ্যকতা
একটা সমাজের সভ্যতার মাপকাঠি হলো সেই সমাজের নারীরা কতটা সুরক্ষিত।
2026 সালে আমাদের অঙ্গীকার হোক– ভারতের মাটিতে আর কোনো
(পড়ুন) নির্যাতিতার আর্তনাদ আকাশ-বাতাস ভারি করবে না।
ধর্ষকদের জন্য কোনো রকম ছাড় বা দয়া নয়, কোনো রাজনৈতিক আশ্রয় নয়।
তাদের জন্য প্রণীত হোক ভারতের ইতিহাসের কঠোরতম আইন।
মেয়েরা যেন কেবল চার দেওয়ালের মাঝে সুরক্ষিত না থাকে, বরং মাঝরাতেও যেন তারা নির্ভয়ে রাজপথে হাঁটতে পারে।
তাদের সম্মান ও স্বাধীনতা যেন কোনো করুণার দান না হয়, বরং তা যেন তাদের জন্মগত অধিকার হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হয়।
সমাজটা হবে উন্মুক্ত বাতাসের মতো, যেখানে প্রতিটা নারী তার স্বপ্ন আর মেধা নিয়ে ডানা মেলতে পারবে।
শিক্ষিত নেতৃত্ব:
পরীক্ষা দিয়েই হোক নেতার অভিষেক
আমরা প্রায়ই বলি, একটা পিয়ন হতে গেলেও শিক্ষাগত যোগ্যতার প্রয়োজন হয়।
তবে রাজ্য, দেশ চালানোর এত গুরুদায়িত্ব, ভার যাদের হাতে, তাদের জন্য কোনো
নির্দিষ্ট জ্ঞান বা শিক্ষার মাপকাঠি থাকবে না?
2026 সাল থেকে শুরু হোক না হয় এক নতুন বিপ্লব।
নেতা-মন্ত্রীদের শুধু সনাতনী শিক্ষায় কম-বেশি শিক্ষিত হলে চলবে না;
2026 থেকে নেতৃত্বকে হতে হবে বিজ্ঞানমনস্ক ও দূরদর্শী।
টিকিট পাওয়ার আগে প্রতিটা ভবিষ্যৎ নেতা-মন্ত্রীকে বাধ্যতামূলকভাবে কয়েকটা বিষয়ের উপরে পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হতে হবে, দপ্তর বিশেষে হতে হবে বিশেষজ্ঞ।
এই পরীক্ষা জনগণের ভোটাধিকার কেড়ে নেবে না, বরং ভোটের আগে নেতৃত্বের যোগ্যতার ন্যূনতম মান নিশ্চিত করবে– যাতে মানুষ অযোগ্যতার মধ্যে থেকে কম ক্ষতিকারটাকে বেছে নিতে বাধ্য না হয়।
- রাষ্ট্রবিজ্ঞান ও সংবিধান:
দেশের শাসনতন্ত্র ও সাধারন মানুষের অধিকার বোঝার জন্য। - সমাজবিজ্ঞান ও দর্শন:
মানুষের মনস্তত্ব, মূল্যবোধ ও সামাজিক কাঠামো অনুধাবনের জন্য। - ইতিহাস ও ভূগোল:
নিজের মাটি, ঐতিহ্য ও ভৌগলিক গুরুত্বকে চেনার জন্য। - অর্থনীতি:
দেশের সম্পদ সঠিক বন্টনের কৌশল ও উন্নয়নের সঠিক দিশা পাওয়ার জন্য। - পরিবেশ বিজ্ঞান ও তার বিশেষ অংশ হিসেবে জলবায়ু পরিবর্তন:
শিল্পায়ন আর পরিবেশের মধ্যে ভারসাম্য রক্ষা এবং ‘কার্বন ফুটপ্রিন্ট’
কমিয়ে টেকসই উন্নয়ন নিশ্চিত করতে। - তথ্যপ্রযুক্তি ও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা:
সাইবার নিরাপত্তা, ডেটা প্রাইভেসি এবং AI-এর প্রভাব বুঝে ডিজিটাল যুগের সঠিক আইন প্রণয়নের জন্য। - আন্তর্জাতিক সম্পর্ক ও কূটনীতি:
বৈশ্বিক ভূ-রাজনীতি বুঝে বিদেশের সঙ্গে সম্মানজনক চুক্তির মাধ্যমে দেশের স্বার্থ রক্ষার জন্য। - দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা:
বন্যা, ঘূর্ণিঝড় বা মহামারীর মতো সময়ে দ্রুত সিদ্ধান্ত ও ত্রাণ পরিচালনার সঠিক পরিকল্পনার জন্য। - আইন ও বিচারবিভাগীয় প্রাথমিক জ্ঞান:
অধিকার ও মানবাধিকার রক্ষা করে জনস্বার্থমুখী আইন প্রণয়ন করার জন্য।
তবেই তাঁরা স্মার্ট রাষ্ট্র গঠনের প্রকৃত কারিগর হতে পারবেন।
(লোভ প্রতিটা মানুষের ভিতরেই কম-বেশি থাকে,
কিন্তু যখন সেই লোভ, এর সীমা ভেঙে অমানবিক হয়ে ওঠে।
যখন ক্ষমতার নেশা সম্পদের উপর ঝাঁপিয়ে পড়ে।
যখন অন্যের ঘর, জমি, শিল্প, সভ্যতা– সবই কেবল দখলের লক্ষ্য হয়ে যায়,
ঠিক তখনই ইতিহাস জন্ম দেয় পোশাকে উন্নত,
অথচ ভিতরে ভয়াবহ এক বিদেশি জাতিকে– ব্রিটিশ।
পড়ুন– Click: ইংরেজ ভারতে না আসলে, আজ বিশ্বের সুপার পাওয়ার হতো ভারত!)
দুর্নীতির দম্ভ ও গণতন্ত্রের শিরদাঁড়া
গণতন্ত্র মানে কেবল ভোটদান নয়, (পড়ুন) গনতন্ত্র মানে জবাবদিহিতা।
গত কয়েক দশকে আমরা দেখেছি, বুঝেছি, জেনেছি, কিভাবে দুর্নীতির করাল গ্রাস
সাধারণ মানুষের ঘাম-রক্তে অর্জিত অর্থ রাহুরূপে গ্রাস করেছে।
2026 সালে আসুক সেই প্রত্যাশিত ‘নিদারুণ ও অপ্রত্যাশিত আঘাত।’
দুর্নীতির ওপর দাঁড়িয়ে যারা দম্ভ করেন, তাঁদের সেই দম্ভ যেন গণতন্ত্রের আঘাতে চূর্ণ-বিচূর্ণ হয়ে যায়।
স্বচ্ছতা আসুক প্রশাসনে, পবিত্রতা আসুক রাজনীতিতে।
বিশ্বউষ্ণায়ন:
অস্তিত্ব রক্ষার লড়াইয়ে শামিল হোক বিশ্ব
আমরা যখন সমাজ আর রাজনীতি নিয়ে ব্যস্ত, প্রকৃতি তখন নিঃশব্দে ফুঁসছে।
(পড়ুন) বিশ্বউষ্ণায়ন-এর ভয়ঙ্কর ভবিষ্যৎ আর কোনো তাত্ত্বিক কথা নয়, এ এক জ্বলন্ত বাস্তব।
2026 সালে প্রত্যেক দেশের কর্মকর্তা ও জনগণকে যুদ্ধের তৎপরতায় ঝাঁপিয়ে পড়তে হবে পরিবেশ রক্ষায়।
কেবল সেমিনার, ভাষণে সীমাবদ্ধ না থেকে, বৃক্ষরোপণ এবং কার্বন নিঃসরণ কমানোর লড়াইটা হতে হবে আক্ষরিক।
জনগণকেও বুঝতে হবে, পৃথিবী সুস্থ না থাকলে আমাদের সমাজ বা রাজনীতি–
কোনো কিছুই অবশিষ্ট থাকবে না।
সমুদ্রের জলস্তর বৃদ্ধি আর হিমবাহের গলন আমাদের অস্তিত্বের মূলে আঘাত করছে।
এই লড়াইয়ে পরাজয় মানে মানবজাতির বিনাশ, নিশ্চিহ্ণ হওয়া।
শুদ্ধির পথে অগ্রযাত্রা
পুরনো পাতা ঝরে গিয়ে যেমন বসন্তের নতুন প্রাণস্পন্দন অনুভূত হয়,
2026 সাল আমাদের জীবনে তেমনি এক শুদ্ধি নিয়ে আসুক।
দুর্নীতি, নারী নির্যাতন, বিশ্ব উষ্ণায়ন আর অশিক্ষার অন্ধকার কাটিয়ে সমাজটা হয়ে উঠুক সবুজে ঘেরা এক নিরাপদ উদ্যান।
আমরা যেন কেবল স্বপ্ন না দেখি, বরং সেই স্বপ্ন পূরণের প্রতিটা ধাপে নিজেদের নিয়োজিত করি।
- নতুন বছর হোক সাহসের।
- নতুন বছর হোক সত্যের।
- জয় হোক সাধারণ মানুষের।
- জয় হোক গণতন্ত্রের।
- টিকে থাকুক নেতাজীসম নেতৃত্ব।
- শুদ্ধ হোক সমাজ, ঝরে পড়ুক সব পচা-ধসা পাতা।
- নিশ্চিন্ত হোক মা-বোনেদের রাতের রাজপথ।
- দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি হোক নারী-শিকারি পিশাচদের।
- শিক্ষা আর যোগ্যতায় ভূষিত হোক আগামীর নেতৃত্ব।
- সোজা থাকুক গণতন্ত্রের শিরদাঁড়া।
- সবুজ পাতায় ভরে উঠুক পৃথিবী।
- বেঁচে থাকুক মানবতা, জয়ী হোক 2026.
শুদ্ধতার শপথ:
মানুষের দিকেই ইতিহাসের মুখ
- নতুন বছর মানে কেবল সময়ের পরিবর্তন নয়, মানে নিজের দায় স্বীকার।
- আমরা যদি ন্যায়কে ভয়ের ঊর্ধ্বে, মানবতাকে ক্ষমতার ঊর্ধ্বে রাখি– তবেই সমাজ বাঁচবে।
- রাষ্ট্র শক্তিশালী হয় আইন দিয়ে নয়, চরিত্র, মানসিকতা দিয়ে।
- পাতা ঝরবে, কিশলয় আসবেই– যদি আমরা নিজেরা গাছ হয়ে দাঁড়াই।
- 2026 হোক সেই বছরের নাম, যখন ইতিহাস আবার মানুষের দিকেই মুখ ফেরাবে।
- মানুষ বদলালে রাষ্ট্র বদলায়, রাষ্ট্র বদলালে ভবিষ্যৎ বদলায়।
- নৈতিকতা যদি পথ দেখায়, ক্ষমতা আপনাতেই সংযত হয়।
- এই বিশ্বাসেই শুরু হোক নতুন বছর– মানুষের পক্ষে, মানবতার পথে।
(যেখানে আমরা আজীবন টাকার পিছনে দৌড়ানোকে বেশি গুরুত্ব দিই,
সেখানে থিমাক্কা গুরুত্ব দিয়েছেন গাছের পিছনে দৌড়ানোর মধ্যে,
ভালোবেসেছেন গাছকে, মিশে গেছিলেন গাছের আত্মার সাথে;
যে কোনো দিন বিশ্বাসঘাতকতা করে না, প্রতারণা জানে না।
পড়ুন– Click: গাছের মা– সালুমারাদা থিম্মাক্কা ও সেই সবুজ সন্তানদের গল্প!)
(আজকাল অনেক মন্দিরে দর্শন মানে প্রার্থনা নয়, বরং লাইনে দাঁড়িয়ে পকেটের ক্যালকুলেটর চালানো।
ভক্তরা আসে প্রণাম করতে, শান্তি পেতে, কিন্তু বেরিয়ে যায় বিল ও রসিদ নিয়ে মাথা ঘামিয়ে।
পুরোহিত বা মন্দির কর্তৃপক্ষের দৃষ্টি বেশিরভাগ সময়ে ভক্তদের চেহারা নয়,
বরং পকেটের দিকে থাকে।
“বিশেষ ভোগ?– QR স্ক্যান করেছেন কি?”
পড়ুন– Click: মায়ের দর্শন নাকি ব্যবসার শো রুম?)
(Articlesবাংলা – আমাদের, আপনাদের পরিবার।
ইমেল আইডি দিয়ে আমাদের সাথে যুক্ত হন।
ফলে যখনই এই ব্লগে কোনো নতুন লেখা পোস্ট করা হবে,
সবার আগে আপনিই পাবেন নোটিফিকেশন।
লেখাটা ভালো লাগলে,
শেয়ার করে বন্ধুদের পড়ার সুযোগ করে দিন।
মূল্যবান মন্তব্যে জানান কেমন লাগলো।)
Articlesবাংলা Bangla Articles, Quotes & Prose-Poetry / বাংলা প্রবন্ধ, উক্তি ও গদ্য-কবিতা।





