সরকারি হাসপাতাল ও স্কুলের দূরবস্থা
যেখানে সার্ভিস দেয় ভাগ্য,
আর বাকিটা সিস্টেমের মুডে নির্ভর
বলা হয়, কোনো দেশের প্রকৃত চেহারা দেখা যায় দু’জায়গায়–
সে দেশের স্কুলে আর হাসপাতালে।
যেখানে শিশু প্রথম অক্ষর শেখে, আর মানুষ যেখানে শেষ শ্বাস নেয়–
সেই দুটো জায়গাই যদি দীর্ঘশ্বাসে ভরা থাকে,
তাহলে বুঝতে হবে পুরো ব্যবস্থার মেরুদণ্ড বোধহয় কিছুটা বেঁকে গেছে।
কিন্তু বাস্তবতার মজাই আলাদা।
আমরা যে সমাজে বাস করি, সেখানে সরকারি হাসপাতাল আর সরকারি স্কুল–
দুটোই এমন প্রতিষ্ঠান, যেখানে ঢুকলে মনে হয়,
জীবন এক বিশাল নাট্যশালা, আর এই নাটক পরিচালনা করছেন এমন কিছু মানুষ,
যাদের ঘুম-খাওয়া-কথা-মনোযোগ কোনো কিছুরই সময় মিলতে চায় না।

এটা একদিনের সমস্যা নয়– এ এক যুগের ব্যথা।
সময় এসেছে একটু হাসতে হাসতে সত্যিটা দেখা।
১. সরকারি হাসপাতাল
নোংরার মধ্যেও জীবনের গভীর দর্শন
সরকারি হাসপাতালে ঢুকলেই বোঝা যাবে–
মানুষ আসলে ধুলো, গন্ধ আর বিশৃঙ্খলার মধ্যেই জন্মায়,
আর সেখানেই ফিরে যায়।
মেঝেটা এমন–
যেন জীবনের পথচলা নিজেই ভিজে, পিচ্ছিল, অনিশ্চিত।
আপনি হাঁটছেন, আর মনে মনে ভাবছেন–
আমি কি মেঝেতে পা দিচ্ছি, না কি ভাগ্যের উপর?

গন্ধটা আবার এক আলাদা শিক্ষা দেয়–
ডেটল, নর্দমা, ঘাম আর হতাশা,
এক সাথে মিশে বলে–
এই হল বাস্তবতা, বাছা। পৃথিবী কোনো পারফিউম শোরুম না।
সুশৃঙ্খলতা আসলে মানুষের বিলাসিতা,
কিন্তু বিশৃঙ্খলা প্রকৃতির অরিজিনাল প্ল্যান।
যেখানে লাইন ছোট হতে চায় না,
আর ডাক্তার আসে চাঁদের ক্যালেন্ডার দেখে
সকালে হাসপাতালের গেটে দাঁড়ালেই মনে হয়–
মানুষ নয়;
উদ্বেগ আর অসহায়তার লম্বা সারি।
এখানে ঢুকলেই কিছু বৈশিষ্ট্য চোখে না পড়লেই আশ্চর্য–
সবচেয়ে বড় হল অপেক্ষা।
অপেক্ষা এখানে শুধু শব্দ নয়– প্রতিষ্ঠানের মূল নীতি।
চেয়ার কম, রোগ বেশি:
দাঁড়িয়ে থেকেই চিকিৎসা
পাওয়ার আল্টিমেট যোগা ট্রেনিং
একটা চেয়ার আছে কি নেই– সেটা নিয়ে যুদ্ধ।
কিন্তু ব্যথা আছে, জ্বর আছে, কাশি আছে– তাতে কি?
ব্যবস্থা বলছে,
অপেক্ষা করুন।
যেন দাঁড়িয়ে থাকা নিজেই চিকিৎসার অংশ।
ডাক্তারের টাইমিং–
নেটফ্লিক্স সিরিজও এত আনপ্রেডিক্টেবল নয়
ডাক্তার কখন আসবেন–
এই রহস্যের সমাধান মিশরীয় পিরামিডের চেয়েও কঠিন।
কেউ আসে, কেউ আসে না,
আসলেও কখনও এমন ব্যস্ত থাকেন যে
রোগীর চোখে চোখ ফেলার সময় নেই।
মাঝে মাঝে মনে হয়–
তাদের একদিনে ৩৬ ঘন্টা দরকার!
(সেদিনও তিনি বনে ঢুকে পড়েছিলেন
“অস্বাভাবিক আলো” দেখার গল্প শুনে–
এরপর?
আর ফেরা হয়নি বন্ধুদের মাঝে, পরিবারের কাছে।
পড়ুন–
Click: ১৯৮৩-এর অন্ধকারে হারিয়ে যাওয়া লেন্স কাকে দেখেছিল শেষবার?)
যন্ত্রপাতি আছে–
কিন্তু কাজ করবে কি না,
সেটা ঈশ্বরও গ্যারান্টি দেন না
নতুন যন্ত্র, নতুন ফিতে কাটা, নতুন ছবি– সব হয়।
কিন্তু রোগী গেলে শোনা যায় ক্লাসিক ডায়লগ
এটা আজ কাজ করছে না।
এই বাক্যটাই হাসপাতালের জাতীয় স্লোগান।
হাসপাতালের টয়লেট:
দেশের সবচেয়ে বিপদজনক অ্যাডভেঞ্চার রাইড
টয়লেটের অবস্থা দেখে
অনেক রোগী চিকিৎসার আগে মানসিক ধাক্কায় সেরে ওঠে।
অধিকাংশই বলে–
“এখানকার টয়লেট ব্যবহার করলে সুস্থ মানুষও অসুস্থ হয়ে যাবে!”
এটা আসলে হাসপাতালের গোপন মানসিক শক্তি বৃদ্ধি প্রোগ্রাম।
২. সরকারি স্কুল
যেখানে মার্কারের গন্ধেই ছাত্রদের
‘ফ্রি মেডিটেশন’ হয়ে যায়
স্কুলে ঢুকলেই কিছু ব্যাপার চোখে পড়ে–
পলেস্তারা ঝরছে, ফ্যান দুলে দুলে জীবন নিয়ে বাজি ধরছে,
আর হোয়াইটবোর্ডে লিখতে গেলেই মার্কারের গন্ধ এমনভাবে ভেসে ওঠে
যেন স্কুলই নিজে বলছে–
এসো বাচ্চারা… গভীর শ্বাস নাও… কিন্তু পড়ে যেও না।
শিক্ষক কম– কিন্তু আশা বেশি:
কেউ নেই তো আমিই সব পড়াই
অনেক স্কুলে ক্লাস দশটা,
শিক্ষক তিনজন।
একজনই একদিনে গণিত, বিজ্ঞান, বাংলা, ভূগোল– সব পড়িয়ে দেন।
এমন মাল্টিটাস্কিং গুগুলও করতে পারে না।

মার্কার আসছে– একটা চিরন্তন প্রতিশ্রুতি:
কাল, পরশু, মহাবিশ্বের কোনো একদিন…
হোয়াইট বোর্ডের সামনে দাঁড়ানো শিক্ষক প্রতিদিনই আশা করেন,
আজ হয়তো আলমারিতে একটা সুস্থ-স্বাভাবিক মার্কার পাবেন।
কিন্তু স্কুলের বাস্তবতা বলে–
মার্কার হয়তো রক্তশূন্যতায় ভুগছে,
নয়তো এর খুলি উড়ে চলে গেছে,
নয়তো কালি আছে– কিন্তু লেখে বাছাই করে।
যখন পুরোপুরি কাজ করা কোনো মার্কার পাওয়া যায় না,
শিক্ষক গভীর দুঃখে বলেন–
আজ সবাই বোর্ডটা মনে মনে কল্পনা করবে… লাইনগুলো নিজেরাই মাথায় পূরণ করে নেবে।
এই হল স্কুলের নতুন যুগের ইমাজিনেশন থেরাপি ক্লাস–
বিনা ফি-তে চিন্তাশক্তি উন্নয়ন,
বিনা যন্ত্রে মস্তিষ্ক-মেদ বাড়ানো।
বেঞ্চ-ডেস্ক:
এগুলোর বয়স দেখে মিউজিয়ামও মাথা নত করে
বেঞ্চগুলো এমনভাবে কাঁকিয়ে ওঠে
যেন এরা ছাত্রদের অনুপ্রেরণা দিতে চাইছে–
বোঝো, জীবন সবসময়ই আরামে কাটে না।
স্কুলের ফ্যান: আছে,
কিন্তু ঘোরে কি না সেটা বৈজ্ঞানিক রহস্য
স্কুলের ফ্যান মূলত ঘোরে না–
এটা বাতাস নয়,
বিশ্বাসে চলে।
ছাত্ররা উপরে তাকিয়ে অপেক্ষা করে–
আজ নড়বে কি?
মানে, এটা স্কুলের নিজস্ব সাসপেন্স থ্রিলার।
৩. দু’পক্ষের মিল:
যেখানে ‘আজ একটু সমস্যা আছে’-ই জাতীয় স্লোগান
হাসপাতাল বা স্কুল–
দুটো জায়গারই একই ডায়লগ–
- আজ জল নেই।
- আজ ডাক্তার নেই/ স্যার আসেন নি।
- আজ মার্কার নেই।
- আজ ফ্যান চলবে না।
- আজ টয়লেট বন্ধ।
যেন প্রতিটা দিনই সমস্যা দিবস।
ফাইল হারানো– এক শিল্প,
যা হাসপাতাল ও স্কুল দু’জায়গায়
সমান দক্ষতায় চর্চিত
রোগীর ফাইল,
ছাত্রের রেজিস্টার–
সবই রহস্যময়ভাবে গায়েব হয়ে যায়।
এটা যেন সরকারি প্রতিষ্ঠানের ঐতিহ্যগত জাদু বিদ্যা।
অপেক্ষা অপেক্ষা আর অপেক্ষা–
রোগী আর ছাত্র, দু’জনেরই যোগ্যতা পরীক্ষা
রোগী অপেক্ষা করে ডাক্তার আসার।
ছাত্র অপেক্ষা করে শিক্ষক আসার।
দুজনেই অপেক্ষা করে সার্ভিসের জন্য–
যা কখনও আসে, কখনও আসে না।
৪. সমাধান?
হাসতে হাসতে বাঁচি– আর সমাধান চাইতে থাকি।
হাসি যখন বেঁচে থাকার শক্তি দেয়,
তখন সমাধানও স্পষ্ট হয়–
- স্পষ্ট বাজেট।
- পর্যাপ্ত বিশ্বস্ত লোকবল।
- অবকাঠামো ঠিকঠাক।
- কমিউনিটি নজরদারি।
এছাড়া সিস্টেম বদলানো সম্ভব নয়।

সিস্টেম না বদলালেও মানুষের হাসি এখনও অটুট–
এটাই সবচেয়ে বড় আশীর্বাদ।
হাসপাতালের লাইনে দাঁড়িয়ে থাকা মানুষ হোক,
স্কুলের ভাঙা বেঞ্চে বসা ছাত্র হোক–
হাসি কখনও হারায় না।
আর এই হাসিই একদিন পরিবর্তনের শক্তি হয়ে ফিরবে।
শিক্ষাব্যবস্থা আর হাসপাতাল পরিষেবা–
কবে উন্নতি হবে?
মহাবিশ্বও জানে না
এই দু’জায়গার উন্নতি কবে হবে?
এ নিয়ে ইসরোতে গবেষণা রীতিমতন চলছে।
বিজ্ঞানীরা ব্ল্যাক হোলের ছবি বের করে ফেলল,
মঙ্গলে জমি কিভাবে কিনতে হয়, এও বের হলো।
কিন্তু এই দুটো ব্যবস্থার উন্নতির দিন?
এটা হয়তো ভবিষ্যতের সময়যন্ত্রও বলতে পারবে না।

হয়তো কোনো একদিন,
অন্য গ্রহে সভ্যতা তৈরি হবে।
রোবটরা মানুষকে স্কুলে পড়াবে,
চাঁদে আলট্রাসনিক হাসপাতাল হবে…
কিন্তু আমাদের চিরন্তন প্রশ্নটা তখনও মাটিতে পড়ে থাকবে–
হাসপাতাল-স্কুলের ওভারঅল উন্নতি কবে হবে?
উত্তর একটাই–
আশা আছে বলেই বেঁচে আছি…
না হলে উন্নতির অপেক্ষা করতে করতে ফসিল হয়ে যেতাম।
(বি: দ্র: এই লেখার কোনো অংশই কোনো রাজনৈতিক দল, ডাক্তার,
শিক্ষক বা কোনো ব্যক্তি-বিশেষকে উদ্দেশ্য করে রচিত নয়।
দীর্ঘদিন ধরে চলে আসা অতি সাধারণ বা নিম্নবিত্ত মানুষের কথা ভেবে,
এক অনুন্নত ব্যবস্থার উন্নতির উদ্দেশ্যে লেখা।
এবং আর্টিকেলটা সম্পূর্ণভাবে প্রিয় পাঠকদের মনোরঞ্জনের জন্য,
সাহিত্যের একটা অংশ মাত্র।)
(এমন কিছু স্থান আছে, যেখানে মানুষের পদচিহ্নই অপরাধ,
আর সেই অপরাধের শাস্তি নিশ্চিত।
যেখানে প্রকৃতি কিংবা ক্ষমতা দুটোই বলে দেয়–
“এখানে তোমার স্থান নয়।”
পড়ুন– Click:
বিশ্বের ১০ নিষিদ্ধ জায়গা– যেখানে আজও প্রবেশ নিষেধ!)
(Articlesবাংলা – আমাদের, আপনাদের পরিবার।
ইমেল আইডি দিয়ে আমাদের সাথে যুক্ত হন।
ফলে যখনই এই ব্লগে কোনো নতুন লেখা পোস্ট করা হবে,
সবার আগে আপনিই পাবেন নোটিফিকেশন।
লেখাটা ভালো লাগলে,
শেয়ার করে বন্ধুদের পড়ার সুযোগ করে দিন।
মূল্যবান মন্তব্যে জানান কেমন লাগলো।)
Articlesবাংলা Bangla Articles, Quotes & Prose-Poetry / বাংলা প্রবন্ধ, উক্তি ও গদ্য-কবিতা।





