মেসি আসেনি, এসেছিল এক ‘মহাযজ্ঞ’–
মেসি আসেনি–
এসেছিল এক ‘মহাযজ্ঞ,’
যেখানে দেবতা ছিল VIP আর সাধারণের প্রসাদ, হতাশা।
VIP-হ্যাংলামো আর ইগোর মহাযজ্ঞে, সেদিন মেসিও ছিল ক্ষমতার প্রসাদ!
স্বপ্নের হাটে বিক্রি হচ্ছিল বিশ্বাস
সল্টলেক স্টেডিয়াম সেদিন শুধু একটা মাঠ ছিল না,
ওটা ছিল স্বপ্নের হাট।
যেখানে চার হাজার টাকায় কেউ কিনেছিল
ছেলের চোখের প্রথম ফুটবল আনন্দ,
আর বারো হাজারে কেউ কিনেছিল
নিজের শৈশবের দেয়ালে পিনে আটকানো মেসি-পোস্টার।
স্কুল পালিয়ে রেডিওতে শোনা গোলের স্মৃতি,
আর বিশ্বাস–
সে ফুটবল এখনও সব শ্রেণীর জন্য এক।
স্বপ্ন নয়, স্ট্যাটাসের প্রদর্শনী
কিন্তু হাটে ঢোকার পর বোঝা গেল–
এটা স্বপ্নের বাজার নয়,
এটা স্ট্যাটাসের প্রদর্শনী।
যেখানে নেতা-মন্ত্রী, তাঁদের ঘনিষ্ঠ আর তথাকথিত তারকারা
নিজেদের গুরুত্ব জাহির করতে গিয়ে বাঙালির সম্মানকে নির্দ্বিধায়
নামিয়ে আনতে পারে একেবারে ধুলোয়।
সমাজসংস্কারের নতুন শত্রু
এই বিকৃত মানসিকতা, চিন্তাধারা–
যেখানে ক্ষমতা নিজেকে সমাজের ঊর্ধ্বে ভাবতে শেখে–
যদি আজ রাজা রামমোহন রায় দেখতেন,
তিনি হয়তো সতীদাহ নয়–
এই হ্যাংলামোকেই
আধুনিক সমাজের প্রথম এবং সবচেয়ে বিপজ্জনক ব্যাধি
বলতেন।
উন্মাদনার শেষ সীমা
সীমা, লজ্জা আর দায়িত্ব–
সবকিছুর উর্ধ্বে উঠে উন্মাদ হওয়ার এই ক্ষমতা,
এতটাই নির্লজ্জ, এমনই আত্মমগ্ন, আত্মকেন্দ্রিক–
যে উলঙ্গতাও এখানে অপ্রাসঙ্গিক হয়ে পড়ে।

ইতিহাসের অংশ হতে এসে, প্রপস হয়ে ফেরা
গ্যালারিতে বসে মানুষ ভাবছিল–
“আজ আমি ইতিহাসের অংশ।”
কিন্তু ইতিহাস সেদিন অন্য ঘরে বসে,
অন্য স্ক্রিপ্টে লেখা হচ্ছিল।
একদিকে ঘাম ঝরানো সাধারণ মানুষ–
রোদ, ধাক্কা, অপেক্ষা, তাচ্ছিল্য আর ধমক গিলে।
আরেকদিকে ঘামহীন VIP ছায়া–
যাদের শরীরে নয়, শুধু উপস্থিতিতেই বিশেষ অধিকার।
মাঠে নেমে মেসি নয়,
নেমেছিল ব্যবস্থার ব্যর্থতা।
গোল হয়নি,
কিন্তু নিঃশব্দে ভেঙে গেছে বহু মানুষের বুক।
টিকিট নয়, এটা ছিল বিশ্বাসের দাম
স্টেডিয়ামে সবচেয়ে কম ছিল চার হাজার টাকার টিকিট,
যা এই রাজ্যে কম কিছু নয়।
এটা কারো এক মাসের বাজার,
কারো মেয়ের কোচিং ফি,
আবার কারো বাবার রক্তচাপের ওষুধ।

তবুও মানুষ কিনেছিল।
কারণ তারা বিশ্বাস করেছিল–
ফুটবল এখনও রাজনীতির ঊর্ধ্বে,
মাঠ এখনও অন্তত সমান।
কিন্তু বিশ্বাসেরও একটা এক্সপায়ারি ডেট থাকে–
আর সেটাই সেদিন
স্টেডিয়ামে এসে চুপচাপ শেষ হয়ে গেল।
মানুষ ঠিক বুঝে উঠতে পারেনি–
রাজনীতির আঁকা-বাঁকা শিকড় আজ কোথায়, কোথায় গিয়ে পৌঁছেছে?
তা কি কি করতে পারে?
VIP কালচার:
যেখানে ফুটবলও দাঁড়িয়ে স্যালুট করে
স্টেডিয়ামের একপাশে ছিল সাধারণ দর্শক–
রোদে পুড়ে, লাইনে দাঁড়িয়ে,
নিরাপত্তার ধাক্কা হজম করে, চিৎকার আর ধমকের মধ্যে দিয়ে
নিজের জায়গা খুঁজে নিচ্ছে।
আরেকপাশে?
- মন্ত্রী,
- তাঁর ঘনিষ্ঠ,
- তারকা,
- তারকার ঘনিষ্ঠ,
- ঘনিষ্ঠের পরিচিত–
- ক্ষমতার ছায়ায় গড়ে ওঠা এক চেনা নেটওয়ার্ক।

(আপনি ভাবছেন আপনি স্বাধীন
কিন্তু… আপনি কবে কোথায় মাথা ঘোরালেন,
আপনার মগজের আগেই তারাই সিদ্ধান্ত নেয়।
পড়ুন– Click:ভারতের মাথার উপর ঘুরছে অদৃশ্য এক হাত–
যার ছায়াও ধরা যায় না!)
যাদের টিকিটের দাম নয়,
দাম ছিল ফোনবুকের পাতায়।
এখানে ফুটবলও যেন বলছিল–
“আমার খেলাটা তোমাদের জন্য নয়,
আমার স্টেজটা ওদের জন্য।”
VIP কালচারে খেলোয়াড় আসল তারকা নয়–
অ্যাক্সেসই আসল সেলিব্রিটি।
মেসি না এলে কি আসে যায়?
কিন্তু স্বপ্ন না এলে আসে যায়
অনেকে বলবে– মেসি না এলে পৃথিবী থেমে যায় না।
কিন্তু হতাশাটা মেসিকে ঘিরে নয়।
বরং সেই যন্ত্রণার অনুভূতিকে ঘিরে– যেখানে মানুষ বুঝতে পারে,
তারা ঠকেছে, তাদের বোকা বানানো হয়েছে।
বারে বারেই সাধারণ মানুষ পকেট থেকে হিসেবের বিল মেটায়,
আর লাভের টেবিলে বসে থাকে VIP-রা।

মানুষ জানত ঝুঁকি আছে,
কিন্তু ভাবেনি–
ঝুঁকির নাম হবে ‘ব্যবস্থা।’
ফুটবলপ্রেমিক বাঙালি মেসিকে দেখতে যায়নি শুধু–
তাঁরা গিয়েছিল নিজেকে আবার বিশ্বাস করতে।
মন্ত্রী, তারকা আর হ্যাংলামো:
এক ত্রিভুজ প্রেম
এটা ক্রীড়া অনুষ্ঠান ছিল না–
- এটা ছিল স্ট্যাটাসের উৎসব।
- সামাজিক ফটোশুট।
- মাঠে ফুটবল কম।
- গ্যালারিতে সেলফি বেশি।
বল গড়ানোর আগেই, যেটুকু গড়ানোর কথাই ছিল–
হ্যাংলামোর ফুলটাইম শুরু হয়ে গিয়েছিল।

মন্ত্রী হাসছেন,
তারকা হাত নাড়ছেন,
তারকার পাশে দাঁড়িয়ে মন্ত্রী আরও জোরে হাসছেন–
কারণ ক্যামেরা রানিং।
আন্তরিক চেষ্টা চলছে নিজেকে গুরুত্বপূর্ণ প্রমাণ করার।
ফুটবল তখন ব্যাকগ্রাউন্ড মিউজিক।
মূল খেলা–
কে কার পাশে দেখা গেল।
মুখ্য চরিত্র–
নিজেকে দেখানোর তাড়না।
ফুটবল নয়,
এটা ছিল ‘অ্যক্সেসের খেলা’
সেইদিন সল্টলেক স্টেডিয়ামে দুটো দল নেমেছিল:
এক দল: আর্জেন্টিনার কয়েকজন খেলোয়াড়,
যাঁদের কাজ ছিল বলের সাথে একটু হাত মেলানো।
অন্য দল (মূল খেলোয়াড়): VIP, মন্ত্রী, তারকা এবং
তাঁদের ঘনিষ্ঠরা, যাঁদের কাজ ছিল– মেসিকে ঘিরে
ক্যামেরার সামনে দাঁড়িয়ে প্রমাণ করা–
“দেখো, আমরা তোমাদের চেয়ে কতটা গুরুত্বপূর্ণ।”
(সময় অনির্দিষ্ট, যতক্ষণ ক্যামেরা চলছিল)।

VIP-দের এই খেলাটা ছিল স্রেফ ‘অ্যাক্সেসের খেলা।’
হাজার টাকার টিকিট কেটে যারা গ্যালারিতে বসেছেন,
তাঁরা স্রেফ স্কোরবোর্ডের মতো ব্যাকগ্রাউন্ডে থাকার কথা ছিল।
কিন্তু যখন VIP-দের দৌরাত্ম্যের ভিড়ে মেসিকে আর দেখাই গেল না,
তখন গ্যালারি থেকে হতাশা, রাগ-দুঃখ, যন্ত্রণা, কষ্ট আর বোতলের
‘ফুলটাইম হুইসেল’ বাজতে শুরু করল।
হাস্যকরতম সেলফি:
বাংলার রাজনীতির ‘শ্যাডো বক্সিং’
সার্চ রেজাল্ট বলছে–
মেসিকে ‘দখলে’ রাখা নিয়ে দুই মন্ত্রীর নাকি আবার ইগোর লড়াই শুরু হয়েছিল!
এ ঘটনাটা সম্ভবত বাংলার রাজনীতিতে সেরা হাস্যকর অধ্যায় হয়ে থাকবে।
ইগোর মূল্য যে ঠিক কত বড়, তাও শিখলো বাঙালি।
যেন মেসি কোনো বিশ্বসেরা খেলোয়াড় নন,
তিনি হলেন ক্ষমতার ‘শো-পিস ট্রফি।’
এক মন্ত্রী চাইছেন ট্রফি তাঁর বাড়িতে থাকুক,
অন্যজন চাইছেন স্টেডিয়ামে তাঁর পাশে থাকুক।

এই সব কিছুর মাঝে, হাজার হাজার টাকা দিয়ে টিকিট কাটা সাধারণ মানুষ
হতাশায় চেয়ার ভাঙছে, আর মেসি মাত্র ১০ মিনিটেই বিদায় নিচ্ছেন।
তিনি হয়তো মনে মনে হাসছিলেন–
“বাহ! এই লোকগুলো আমাকে নিয়ে নিজেদের মধ্যে মারামারি করছে,
আর এদের নিজেদের দেশের সাধারণ মানুষরা আমার একটা ঝলক দেখার জন্য আত্মসম্মানের আগুনে পুড়ছে।
ভাবছিলেন–
আমি যদি এদের দেশের বিদ্যুৎ উৎপাদন কেন্দ্র হতাম,
তাহলে হয়তো এর ১% আগ্রহও দেশের সাধারণ মানুষ পেত না!”
দার্শনিক আফসোস:
বিশ্বাসের এক্সপায়ারি ডেট
আসলে, সেদিন (দেখুন) মেসি আসেননি,
এসেছিল সাধারণ বাঙালির ‘ফুটবলের প্রতি আবেগ, বিশ্বাস।’
সেই বিশ্বাস ছিল– খেলার মাঠকে অন্তত রাজনীতি ছোঁবে না,
কিন্তু সেই বিশ্বাসকে VIP-হ্যাংলামো লাথি মেরে মাঠের বাইরে ফেলে দিল,
সাথে দিল সাধারণ মানুষের আশা-ভরসা, স্বপ্ন ও সম্মান।
যেখানে সাধারণ মানুষের ভালো লাগা, শান্তি, সুখেই মন্ত্রী-তারকার সুখ খুঁজে
পাওয়ার কথা ছিল।
সেখানে সেই সুখকেই লাঞ্ছিত করে তাঁরা নিজেদের “ক্ষমতার স্ট্যাটাস”
জাহির করে গেলেন।
মেসি হয়তো এটাই ভেবে গেলেন–
“সত্যিই সেলুকাস, কি বিচিত্র এই দেশ!”
কি অদ্ভুত এ দেশের নেতা-মন্ত্রী আর সেলিব্রিটির সংস্কৃতি!”
যেখানে জনগণই আসল দেবতা,
সেখানে তাঁরাই হয়ে গেলেন VIP-দের প্রসাদ।
সবশেষে কি এটা বলা যায়?
It’s A Game…
It’s A Game…
…A Game.
(কিন্তু…
আপনি সেখান থেকে হঠাৎই যা অনুভব করলেন,
তাতে যেন সাময়িক স্তব্ধ হয়ে গেল আপনার হৃদপিণ্ড।
আপনি এতক্ষণ যাদের দেখলেন, তারা কেউ একটুও নড়ছে না।
পড়ুন– Click: জাপানের সেই গ্রাম–
যেখানে সবাই আপনার দিকে তাকিয়ে আছে, কিন্তু কেউ বেঁচে নেই!)
বি: দ্র: এই লেখা কাউকে ছোট বা অপমানের উদ্দেশ্যে নয়।
বাংলার সম্মান ও গভীর খারাপ লাগা থেকে শুধুমাত্র একটা সৃষ্টি।
নিরপেক্ষতাই এই ব্লগের মূল নীতি।
(Articlesবাংলা – আমাদের, আপনাদের পরিবার।
ইমেল আইডি দিয়ে আমাদের সাথে যুক্ত হন।
ফলে যখনই এই ব্লগে কোনো নতুন লেখা পোস্ট করা হবে,
সবার আগে আপনিই পাবেন নোটিফিকেশন।
লেখাটা ভালো লাগলে,
শেয়ার করে বন্ধুদের পড়ার সুযোগ করে দিন।
মূল্যবান মন্তব্যে জানান কেমন লাগলো।)
Articlesবাংলা Bangla Articles, Quotes & Prose-Poetry / বাংলা প্রবন্ধ, উক্তি ও গদ্য-কবিতা।



