খাঁচার ভিতর ভারত, বাইরে সভ্যতার সার্টিফিকেট!

খাঁচার সামনে দাঁড়িয়ে মানুষ দেখা:

ক্যামেরা, ক্ষমতা আর দৃষ্টির রাজনীতি

সিভিক সেন্স, ক্যামেরা, Slumdog Millionaire আর ঔপনিবেশিক চোখের নির্লজ্জ উত্তরাধিকার

বিদেশিরা ভারতে এসে খুব স্বচ্ছন্দে একটা বাক্য ব্যবহার করে–
“Indians have no civic sense.”
এই বাক্যটা তারা বলে এমন ভঙ্গিতে, যেন সভ্যতা কোনো আন্তর্জাতিক এয়ারপোর্টে ইমিগ্রেশনের সময় সিল মারা হয়।
যেন ইউরোপ বা আমেরিকার মাটিতে জন্মালেই মানুষ স্বয়ংক্রিয়ভাবে ভদ্র, সংবেদনশীল ও নৈতিক হয়ে যায়।
আর এদিকে খাঁচার ভিতর ভারত– বাইরে সভ্যতার সার্টিফিকেট।

কিন্তু প্রশ্নটা খুব সাধারণ–
ভারতে এসে তারা নিজেরা যা করে, তাতে কি আদৌ সিভিক সেন্স থাকে? 

ক্যামেরার সামনে মানুষ নয়, “এক্সপেরিয়েন্স”

ভারতে এসে বহু বিদেশি যে কাজটা সবচেয়ে নির্দ্বিধায় করে, তা হলো গরীব, দুঃস্থ, অসহায় মানুষের ছবি তোলা।
বস্তি, ফুটপাত, আধখানা জামা, নোংরা পা, খালি চোখ।

  • অনুমতি? নেই।
  • কথা বলা? নেই।
  • মানুষ হিসেবে স্বীকৃতি? সেটাও নেই।

শুধু দামী ক্যামেরা তুলে ক্লিক।

এই ছবি তোলার ভঙ্গি দেখলে মনে হয়–
যেন খাঁচার ভিতরে রাখা কোনো জন্তু-জানোয়ার বা অদ্ভুত কিছুর ছবি তোলা হচ্ছে।
মানুষ এখানে মানুষ নয়– প্রদর্শনীর বস্তু।

এই দৃষ্টিতে গরীব মানুষ কষ্ট পায় না, লড়াই করে না, স্বপ্ন দেখে না।
সে শুধু “ভারতের অবস্থা।”

সিভিক সেন্স: রাস্তা নয়, চোখ থেকে শুরু

বিদেশিরা সিভিক সেন্স বলতে বোঝে–

  • লাইন ধরে দাঁড়ানো।
  • ট্রাফিক সিগন্যাল মানা।
  • পাবলিক স্পেস পরিষ্কার রাখা।

এসব গুরুত্বপূর্ণ, সন্দেহ নেই।
কিন্তু সিভিক সেন্সের সবচেয়ে মৌলিক স্তরটা তারা সুবিধামতো ভুলে যায়–

অপর মানুষের মর্যাদা বোঝা। 

  • কাউকে তার সম্মতি ছাড়া ক্যামেরায় বন্দি করা।
  • তার দারিদ্রকে ভ্রমণ স্মৃতিতে পরিণত করা।
  • তার অসহায়তাকে “অথেনটিক ইন্ডিয়া” হিসেবে বাজারে তোলা।

এই আচরণ কি সভ্যতা, না কি ঔদ্ধত্য?

Slumdog Millionaire:

দারিদ্রের অস্কার-জয়ী প্যাকেজ

এই দৃষ্টিভঙ্গির সবচেয়ে জনপ্রিয়, সবচেয়ে গ্রহণযোগ্য উদাহরণ হলো–
Slumdog Millionaire.

এই সিনেমা পশ্চিমে দেখানো হলো “ভারতের বাস্তবতা” হিসেবে।
বস্তি, স্বহিংসতা, নোংরা, নিষ্ঠুরতা– সব মিলিয়ে এক নিখুঁত প্যাকেজ।

অস্কার এল, প্রশংসা এল।
পশ্চিম বললো– “Such a powerful portrayal of India.”

কিন্তু প্রশ্ন হলো–
ভারতের বাস্তবতা কি শুধু বস্তির মধ্যেই সীমাবদ্ধ?

এই সিনেমায় ভারতকে দেখানো হলো এমনভাবে–

  • যেন দারিদ্রই তার বিশেষ পরিচয়।
  • মনে হয় আশা শুধুই দুর্ঘটনা।
  • যেন মানবিকতা কেবল ব্যতিক্রম।

এটা ভারতীয় পরিচালকের ছবি হলেও,
তার দৃষ্টি ছিল পশ্চিমা স্বীকৃতির জন্য নির্মিত দৃষ্টি। 

কেন এই ছবি এত পছন্দ?

কারণ এই ছবি পশ্চিমের চেনা গল্পকে শক্ত করে।

  • ওরা গরিব।
  • ওরা বিশৃঙ্খল।
  • আমরা সভ্য।

(দেখুন) Slumdog Millionaire ভারতকে খাঁচার ভিতর দাঁড় করিয়ে,
পশ্চিমকে খাঁচার বাইরে রেখে দিয়েছে।

এটা সিনেমা নয় শুধু–
এটা দৃষ্টির রাজনীতি। 

Poverty Tourism: দুঃখ যেখানে বিনোদন

এই মানসিকতার নাম আছে– Poverty Tourism.

এখানে দারিদ্র কোনো সমস্যা নয়,
দারিদ্রই আকর্ষণ।

মানুষ এখানে মানুষ নয়,
সে কনটেন্ট।
সে ইউটিউব ভিডিও, ইনস্টাগ্রাম রিল বা ট্রাভেল ব্লগের মূল উপাদান।

আগে উপনিবেশবাদীরা এসে সম্পদ লুটত।
আজ তারা আসে গল্প লুটতে।

ইতিহাস না জানার আরামদায়ক বিলাস

এই বিদেশিদের অনেকেই জানে না–
বা জানলেও উপেক্ষা করে–

ইংরেজ শাসনের আগে বিশ্ব মোট উৎপাদনের প্রায় ২৪-২৫ শতাংশ ছিল ভারতের দখলে।
ভারত ছিল শিল্প, বাণিজ্য ও দক্ষতার কেন্দ্র।

অর্থনৈতিক ইতিহাসবিদ (দেখুন) উৎসা পটনাইক ও প্রভাত পটনাইক দেখিয়েছেন,
ব্রিটিশ শাসনের দুই শতাব্দীতে ভারত থেকে লুণ্ঠিত সম্পদের বর্তমান
মূল্য হতে পারে আনুমানিক ৪৫ ট্রিলিয়ন ডলার।

এই দারিদ্র কোনো দুর্ঘটনা নয়।
এটা পরিকল্পিত নিঃস্বকরণ।

কিন্তু এই ইতিহাস জানলে তো Superiority Complex কাজ করে না।


(যখন ক্ষমতার নেশা সম্পদের উপর ঝাঁপিয়ে পড়ে।

যখন অন্যের ঘর, জমি, শিল্প, সভ্যতা– সবই কেবল দখলের লক্ষ্য হয়ে যায়,
ঠিক তখনই ইতিহাস জন্ম দেয় পোশাকে উন্নত,
অথচ ভিতরে ভয়াবহ এক বিদেশি জাতিকে…

পড়ুন– Click: ইংরেজ ভারতে না আসলে, আজ বিশ্বের সুপার পাওয়ার হতো ভারত!)

নির্বাচিত ফ্রেম, নির্বাচিত সত্য

ভারতে দারিদ্র আছে– নিশ্চয়ই আছে।
কিন্তু সেটা পুরো ভারত জুড়ে নয়।

একই দেশে–

  • সাশ্রয়ী মহাকাশ প্রযুক্তি ও সফল মঙ্গল অভিযান।
  • জেনেরিক ওষুধ উৎপাদনে বৈশ্বিক নেতৃত্ব।
  • ডিজিটাল পেমেন্ট ও ফিনটেক বিল্পব।
  • তথ্যপ্রযুক্তি ও সফটওয়্যার পরিষেবায় বৈশ্বিক উপস্থিতি।
  • ভ্যাকসিন উৎপাদন ও রপ্তানিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা।
  • বৃহৎ গণতান্ত্রিক নির্বাচন ব্যবস্থাপনা।
  • স্টার্টআপ ইকোসিস্টেম ও প্রযুক্তি উদ্যোক্তা সংস্কৃতি।
  • শূন্যের ধারণা ও দশমিক সংখ্যা পদ্ধতি।
  • আয়ুর্বেদ ও শল্যচিকিৎসার প্রাচীন জ্ঞান।
  • নালন্দা ও তক্ষশিলা– বিশ্বের প্রাচীন ও শ্রেষ্ঠতম বিশ্ববিদ্যালয়।
  • ধাতুবিদ্যা ও স্থাপত্য (লৌহস্তম্ভ, মন্দির নির্মাণ)
  • জ্যোতির্বিদ্যা ও ক্যালেন্ডার বিজ্ঞান।
  • সংস্কৃত, পালি, প্রাকৃতের দার্শনিক সাহিত্য।
  • যুক্তিবিদ্যা ও ন্যায় দর্শনের ধারা।
  • সমুদ্র বাণিজ্য ও নৌযান প্রযুক্তি।
  • হাজার বছরের দর্শন ও নৈতিক চিন্তা।
  • ভাষাগত বৈচিত্র ও লোকজ সাহিত্য।
  • সংগীত, নৃত্য ও নাট্যের ধারাবাহিক ঐতিহ্য।
  • সহাবস্থান ও বহুত্ববাদের সামাজিক চর্চা।
  • খাদ্যসংস্কৃতির আঞ্চলিক বৈচিত্র।
  • বস্ত্র, হস্তশিল্প ও কারুশিল্পের ঐতিহ্য।

কিন্তু এসব ছবি তুললে তো “সভ্য বনাম অসভ্য” গল্প ভেঙে যাবে।

তাই ক্যামেরা ঘোরে বস্তির দিকেই।

আসল প্রশ্ন: কার সিভিক সেন্স নেই?

শেষ পর্যন্ত প্রশ্নটা ভারতের নয়।

প্রশ্ন হলো–
যে মানুষ অনুমতি ছাড়া অন্য মানুষের দারিদ্রকে ক্যামেরাবন্দি করে,
যে ব্যক্তি ইতিহাস না জেনে সভ্যতার সার্টিফিকেট বিলি করে,
যে চোখ মানুষকে মানুষ না দেখে দৃশ্য হিসেবে দেখে–

তার সিভিক সেন্স কোথায়?

ভারত নিখুঁত নয়।
ভারত সমস্যাহীন নয়।
সমস্যা সব দেশেই কম-বেশি থাকে।

কিন্তু ভারত কোনো খাঁচা নয়।
এখানকার মানুষ কোনো প্রদর্শনীর বস্তু নয়।

সভ্যতা শুরু হয় রাস্তা থেকে নয়–
চোখ থেকে। 

আর সেই চোখে যদি সম্মান না থাকে,
তবে হাতে যত দামি ক্যামেরাই থাকুক, দেহে যতই দামি পোশাক থাকুক,
সে চোখ আদতে অন্ধই থেকে যায়।

সভ্যতার শেষ পরীক্ষা:

দৃষ্টি, দায় আর নৈতিক অবস্থান

এই লেখার শেষে এসে সবচেয়ে অস্বস্তিকর সত্যটা ধরা পড়ে–
সমস্যা কোনো একটা দেশ নয়, সমস্যা দেখার অভ্যাস। 

  • যে চোখ অন্য সমাজকে দেখে কেবল নিজের শ্রেষ্ঠত্ব প্রমাণ করার জন্য।
  • যে দৃষ্টি দারিদ্রকে ব্যাখ্যা করে না, ব্যবহার করে।
  • যে মন ইতিহাসকে বোঝে না, কিন্তু রায় দিতে ভালোবাসে।

সে চোখ আদতে পর্যবেক্ষক নয়, সে একজন ভোক্তা।

এই ভোগের রাজনীতিতে দুঃখ পণ্য হয়ে যায়,
মানুষ হয়ে ওঠে প্রপস, আর বাস্তবতা রূপ নেয় গল্পে– যেটা শুনে দর্শক নিশ্চিন্ত থাকে,
কারণ গল্পের শেষে সমস্যাটা ওদের নয়, “ওদের।”

কিন্তু সভ্যতার সত্যিকারের পরীক্ষা সেখানে নয়।
পরীক্ষা হয় তখন–

  • যখন তুমি শক্তিশালী হয়েও সংযত থাকো।
  • যে সময় তুমি দেখতে পারো কিন্তু প্রদর্শন করো না।
  • যখন তুমি জানো– সবকিছু দেখানো যায় না, সবকিছু দেখার অধিকারও নেই।

ভারতকে বোঝা মানে তাকে মহিমামণ্ডিত করা নয়,
আবার তাকে খাঁচায় পুরে রাখা তো আরও নয়।
বোঝা মানে তার জটিলতা স্বীকার করা–
তার ক্ষত, তার লড়াই, তার সম্ভাবনা একসাথে দেখা।

সভ্যতা আসলে কোনো জায়গার নাম নয়।
এটা একটা নৈতিক অবস্থান।

আর যে মানুষ সেই অবস্থানে দাঁড়াতে শেখেনি,
তার চোখে ধরা পড়া কোনো ছবিই শেষ পর্যন্ত সত্য হয়ে ওঠে না।


(পৃথিবীর সবচেয়ে ভয়ঙ্কর বিপর্যয়গুলো অনেক সময় নীরবে আসে।

কোনো বিস্ফোরণ নেই, কোনো যুদ্ধঘোষণা নেই–
শুধু ধীরে ধীরে একটা…
পড়ুন– Click: মরুভূমি গ্রাস করছে সভ্যতাকে:
চীনের সেই গোপন সবুজ দেওয়াল ও খরগোশের রহস্য!)

(Articlesবাংলা – আমাদের, আপনাদের পরিবার।
ইমেল আইডি দিয়ে আমাদের সাথে যুক্ত হন।
ফলে যখনই এই ব্লগে কোনো নতুন লেখা পোস্ট করা হবে,

সবার আগে আপনিই পাবেন নোটিফিকেশন। 

লেখাটা ভালো লাগলে,
শেয়ার করে বন্ধুদের পড়ার সুযোগ করে দিন।
মূল্যবান মন্তব্যে জানান কেমন লাগলো।)

ইমেইল আইডি দিয়ে যুক্ত হন

We don’t spam! Read our privacy policy for more info.

About Articlesবাংলা

Welcome to Articlesবাংলা – a vibrant hub of words, ideas, and creativity. This website is the personal archive and creative expression of Tanmoy Sinha Roy, a passionate writer who has been exploring the art of writing for more than seven years. Every article, prose-poem, and quotation you find here reflects his journey, experiences, and dedication to the written word. Articlesবাংলা aims to inspire readers by offering thought-provoking insights, celebrating the richness of Bengali language and literature, and creating a space where ideas, imagination, and culture connect. Whether you are seeking literary reflections, prose-poems, diverse articles, or meaningful quotations, you are invited to explore, reflect, and be inspired.

Check Also

জলবায়ু পরিবর্তন ও প্রযুক্তির বিভ্রম এবং প্রাকৃতিক বিপর্যয়ের কাল্পনিক দৃশ্য।

জলবায়ু সংকট চরমে: গাছ লাগালেও কি শেষ রক্ষা পাবো আমরা?

গত এক দশকে— “জলবায়ু পরিবর্তন ও বৃক্ষরোপণ” বা “গাছ লাগান পৃথিবী বাঁচান”— এই বাক্যটা প্রায় …

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *