যে শিখিয়ে দিল দেশ প্রেম
বয়স দেখে না
ভারতের ইতিহাসের যুদ্ধ, সীমান্ত আর সাহসিকতার গল্প নতুন নয়।
কিন্তু কখনো কখনো সেই ইতিহাসের পাতায় এমন একটা নাম উঠে আসে,
যা আমাদের চেনা সংজ্ঞাগুলোকে নাড়িয়ে দেয়।
পাঞ্জাবের ফিরোজপুর জেলার এক দশ বছরের বালক—
শ্রাবণ সিং আজ সেই নাম।
ভাবুন– অপারেশন সিঁদুর: যখন বড়রা ভয়ে থমকে যায়, তখন ১০ বছরের এক সাহস ইতিহাসে নাম লেখায়!
সাহসিকতার জন্য (দেখুন) “প্রধানমন্ত্রী রাষ্ট্রীয় বাল পুরস্কার” প্রাপ্ত
এই শিশুটা প্রমাণ করে দিয়েছে, দেশপ্রেম কোন বয়সের অপেক্ষা করে না,
কোন পাঠ্য বইয়ের অধ্যায় নয়, কোন বক্তৃতার বিষয়ও নয়—
এটা এক গভীর উপলব্ধি, এক অদম্য ইচ্ছা শক্তি।

প্রধানমন্ত্রী বাল পুরস্কার:
শিশুদের সর্বোচ্চ সম্মান
প্রধানমন্ত্রী বাল পুরস্কার ভারতের শিশুদের জন্য সর্বোচ্চ রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি।
ক্রীড়া, শিল্প, সমাজসেবা, বিজ্ঞান, সাহসিকতা—
এইসব ক্ষেত্রেই অসাধারণ অবদান রাখলে তবেই মেলে এই সম্মান।
(দেখুন) শ্রাবণ সিং এই পুরস্কার পেয়েছে সাহসিকতার জন্য।
আর এখানেই তার গল্প আলাদা হয়ে যায়।
কারণ সে কোন সিনেমার নায়ক নয়, কোন প্রশিক্ষিত ক্যাডেট নয়,
এমনকি কোন সংগঠনের প্রতিনিধি নয়।
সে একেবারেই সাধারণ এক গ্রাম্য পরিবারের সন্তান—
যার হাতে বই থাকার কথা, খেলনা থাকার কথা স্কুল ব্যাগ থাকার কথা
কিন্তু বাস্তব তাকে দাঁড় করিয়েছিল এক ভিন্ন পরীক্ষার সামনে।
অপারেশন সিঁদুর: যেখানে
আতঙ্কই ছিল নিত্যসঙ্গী
অপারেশন সিঁদুর চলাকালীন ফিরোজপুর সীমান্ত এলাকা
ছিল চরম উত্তেজনায় ভরা।
গোলাগুলির আশঙ্কা, বিস্ফোরণের ভয়, অজানা বিপদের ছায়া—
সব মিলিয়ে বড় বড় মানুষও যখন আতঙ্কে ঘরবন্দী,
তখন মাত্র দশ বছরের এক ছেলেকে বাইরে বেরোতে বারণ করাটাই ছিল স্বাভাবিক।
সীমান্ত এলাকায় বসবাস মানেই ঝুঁকি।
সেখানে সেনাদের উপস্থিতি যেমন নিরাপত্তার প্রতীক,
তেমনই যুদ্ধের সম্ভাবনারও ইঙ্গিত।

এই পরিস্থিতিতে বাবা-মা হয়তো চেয়েছিলেন,
তাঁদের স্নেহ-ভালোবাসার সন্তান যেন ঘরের ভিতরেই থাকে।
এক মুহূর্তের ভুল কেড়ে নিতে পারতো একটা ছোট্ট, নিস্পাপ, নিরীহ প্রাণ।
কিন্তু শ্রাবণ সিং এর মনে চলছিল তখন অন্য যুদ্ধ।
ভয়ের উল্টো দিকেই
সাহসের জন্ম:
যখন আশেপাশের মানুষ আতঙ্কে দিশেহারা,
তখন শ্রাবণের চোখে ছিল শুধুমাত্র ভারতীয় সেনারা।
রোদে পুড়ে, ধুলোয় ভিজে, সীমান্ত পাহারা দিচ্ছে যাঁরা,
তাঁদের জন্য কে ভাববে?
সে দেখেছিল সেনারা ঘন্টার পর ঘন্টা দাঁড়িয়ে থাকে।
সে বুঝেছিল তাঁদের ক্লান্তি আছে, তৃষ্ণা আছে, ক্ষুধা আছে—
কিন্তু অভিযোগ নেই।
আর ঠিক তখনই জন্ম নেয় এক মহৎ সিদ্ধান্ত।
প্রায় নিয়মিতভাবে শ্রাবণ জল, লস্যি, দুধ, কখনো খাবার নিয়ে পৌঁছে দিত
সেনাদের কাছে।

- কেউ বলেনি তাকে।
- কেউ আদেশ দেয়নি।
- টাকার কথাও কেউ বলেনি।
- কোন পুরস্কারের কথাও সে জানতো না।
সে শুধু ভেবেছিল—
“ওরা যদি আমাদের জন্য দাঁড়িয়ে থাকে,
আমি কি ওদের জন্য একটুও করতে পারিনা?”
(পৃথিবীর সবচেয়ে পরিষ্কার, সবচেয়ে নিঃশব্দ,
সবচেয়ে সুন্দর জায়গায়গুলোর একটা– সুইজারল্যান্ডের (দেখুন) ডাভোস।
কিন্তু কোনো এক কারণে আজ World Economic Forum Davos hypocrisy
বলতে মানুষ বাধ্য হচ্ছে, কেন?
বরফে মোড়া পাহাড়, নিঃশ্বাস নিলে মনে হয় অক্সিজেনও VIP.
এই জায়গাতেই বসে প্রতিবছর পৃথিবীর সবচেয়ে ক্ষমতাশালী
মানুষেরা বলেন–
পড়ুন– Click: পৃথিবী বাঁচাবে বলে যারা এসেছিল, তারাই পৃথিবী পুড়িয়ে গেল!)
বাবা মায়ের ভয় বনাম
সন্তানের দেশপ্রেম:
শ্রাবণের বাবা-মা জানতেন এ কাজ কতটা বিপদজনক, কতটা ভয়ংকর।
এরপরেও হয়তো বাধা দেওয়ার কোন চেষ্টাও করেননি।
আর এই বাবা-মায়ের, এই সন্তান হওয়াটাই তো স্বাভাবিক।
শ্রাবণ জানত,
- সে সৈনিক নয়।
- তার হাতে বন্দুক নেই।
- আছে শুধু জল, দুধ, খাবার।
- আর নি:স্বার্থ ভালবাসা ও অগাধ দেশপ্রেম।
এই দৃঢ়তা, এই অদম্য মানসিকতা— এই বয়সে— সাধারণ নয়।
এখানেই শ্রাবণ সিং হয়ে ওঠে “ভারতের সবচেয়ে ছোট যোদ্ধা।”
সাহসিকতা মানে শুধু অস্ত্র নয়:
আমরা প্রায়ই সাহসিক কথা বলতে—
- অস্ত্র ধারণ।
- যুদ্ধ।
- আক্রমণ।
- আগুন।
- বিস্ফোরণ।
- গোলাগুলি।
এই দৃশ্যগুলো কল্পনা করি।
কিন্তু সাহসিকতার আরেক নাম যে মানবিকতা,
এ দৃষ্টান্ত, এই ছোট বালকের কাছ থেকেই লক্ষ কোটি ভারতবাসী
আরো একবার শিখল।

অপারেশন সিঁদুরের সময় শ্রাবণের কাজ ছিল নিঃশব্দ।
- কোন ক্যামেরা ছিল না।
- কোন সংবাদ মাধ্যম ছিল না।
- ছিল শুধু কর্তব্যবোধ।
সে বুঝেছিল—
- দেশের সেবা মানে শুধু যুদ্ধ করা নয়।
- দেশের সেবা মানে পাশে দাঁড়ানো।
শ্রাবণের স্বপ্ন: ফৌজি হওয়া
কিছু কিছু বাচ্চাদের স্বপ্ন হৃদয়ের গভীরে এতটাই শিকড় গাড়ে,
যে সেই স্বপ্ন একদিন শুধু তাঁদের নয়–
চারপাশের বড়দেরও এক গুরুদায়িত্ব হয়ে দাঁড়ায়।
যেমন ধরা যায় (দেখুন) আলিশা কার্সন-এর কথা।
ছোটবেলা থেকেই মঙ্গল গ্রহের মাটিতে প্রথম মানুষ হিসেবে পা রাখার
স্বপ্ন বুকে ধরে রেখেছে সে–
সময় বদলেছে, বয়স বেড়েছে, পরিস্থিতি বদলেছে,
কিন্তু স্বপ্নটা আজও বিন্দুমাত্র ভাঙেনি, অটুট।

ঠিক তেমনই—
এই বয়স থেকেই শ্রাবণের একটাই স্বপ্ন—
সে বড় হয়ে একজন ফৌজি হতে চায়।
কারণ সবাই যদি ডাক্তার উকিল ইঞ্জিনিয়ারই হয়–
তাহলে সীমান্তে দাঁড়িয়ে আমাদের পাহারা দেবে কে?
শ্রাবণের এই স্বপ্ন কোন সিনেমা দেখে তৈরি হয়নি,
এটা তৈরি হয়েছে—
- সীমান্তের ধুলোয়।
- সেনাদের ঘামে।
- আর নিজের অভিজ্ঞতায়।
সে খুব কাছ থেকে দেখেছে,
কিভাবে সৈনিকরা নিজেদের জীবন বাজি রেখে অন্যের
নিরাপত্তা নিশ্চিত করে।

- এই উপলব্ধি বই থেকে আসে না।
- এই শিক্ষা ক্লাসরুমে পাওয়া যায় না।
- এটা আসে বাস্তব থেকে।
রাষ্ট্রের স্বীকৃতি,
সমাজের দায়িত্ব:
প্রধানমন্ত্রী বাল পুরস্কার দিয়ে রাষ্ট্র শ্রাবণ সিংকে সম্মানিত করেছে।
এটা শুধু একটা শিশুর পুরস্কার নয়—
এটা একটা বার্তা।
বার্তা এই যে—
- সাহসিকতা পদবী দেখে আসে না।
- ঘর, জাত, ধর্ম দেখে আসে না।
- ধনী-দরিদ্র দেখে আসে না।
- মানবিকতা কোন সার্টিফিকেট চায় না।
কিন্তু প্রশ্ন থেকে যায়—
- আমরা সমাজ হিসেবে কি এই বার্তাটা বুঝছি?
- তা কতদিন ধারণ করতে পারবো?
শেষ কথা:
আমরা কি আমাদের সন্তানদের শুধু ‘সফল’ হতে শেখাচ্ছি?
নাকি ‘মানুষ’ হতে?
আমরা কি আমাদের সন্তানদের দেশপ্রেম শেখাতে পারছি?
আমরা প্রায়ই শিশুদের বলি—
- ভালো চাকরি করতে হবে।
- বড় মানুষ হতে হবে।
- সফল হতে হবে।
কিন্তু আমরা কি কখনো তাদের সেই অর্থে শেখাই—
- দেশপ্রেম আসলে কি?
- কেন তা জানা প্রয়োজন?
- কি তার মাহাত্ম্য?
- কি তার ইতিহাস?
কত কষ্টে, বলিদানে এ দেশ আমরা আবার স্বাধীন করেছি?
আমাদের ভবিষ্যৎ প্রজন্ম কি জানে,
কিভাবে মাইনাস তাপমাত্রায়,
ঘন জঙ্গলে নিস্তব্ধ রাতের অন্ধকারে অতন্দ্র প্রহরী হয়ে,
দিনের পর দিন দাঁড়িয়ে থাকে আমাদের সৈনিকেরা,
আর তা আমাদের নিরাপত্তার জন্যই?

গড়ে দেশের কতজন জানে?
- শ্রাবণ সিং কোন ভাষণ দেয় নি।
- কোন স্লোগান দেয়নি।
- সে শুধু কাজ করেছে।
আর সেই কাজই আমাদের আয়নার সামনে দাঁড় করিয়ে দেয়।
আজ প্রশ্নটা শ্রাভণের নয়।
প্রশ্নটা আমাদের—
আমরা কি এমন মানুষ তৈরি করছি,
নাকি শুধু সফল নাগরিক?
শ্রাবণ সিং বুঝিয়ে দিয়েছে—
দেশপ্রেম কোনো বয়সের বিষয় নয়,
এটা সিদ্ধান্তের বিষয়।
যে মুহূর্তে কেউ পাশে দাঁড়ায়,
সেই মুহূর্তেই সে একজন প্রকৃত যোদ্ধা।
শ্রাবণের গল্প আমাদের শেখায় যে,
ইউনিফর্ম না পরেও দেশের সেবা করা যায়।
তাই আসুন, শুধু সফল হওয়ার দৌড়ে শামিল না হয়ে,
আমাদের সন্তানদের হৃদয়ে রোপন করি নিঃস্বার্থ সেবার বীজ।
দেশপ্রেম কোনো গন্তব্য নয়,
বরং আর্তের পাশে দাঁড়ানোর এক পবিত্র অঙ্গীকার।
সত্যিকারের বীরত্ব থাকে মানুষের প্রতি ভালোবাসায়।
(লোভ প্রতিটা মানুষের ভিতরেই কম-বেশি থাকে,
কিন্তু যখন সেই লোভ, এর সীমা ভেঙে অমানবিক হয়ে ওঠে।
যখন ক্ষমতার নেশা সম্পদের উপর ঝাঁপিয়ে পড়ে।
যখন অন্যের ঘর, জমি, শিল্প, সভ্যতা– সবই কেবল দখলের লক্ষ্য হয়ে যায়,
ঠিক তখনই ইতিহাস জন্ম দেয় পোশাকে উন্নত,
অথচ ভিতরে ভয়াবহ এক বিদেশি জাতিকে–(Click:) ব্রিটিশ।
পড়ুন– Click: ইংরেজ ভারতে না আসলে,
আজ বিশ্বের সুপার পাওয়ার হতো ভারত!)
Articlesবাংলা Bangla Articles, Quotes & Prose-Poetry / বাংলা প্রবন্ধ, উক্তি ও গদ্য-কবিতা।
