ভারতের বন আইন আমাদের সামনে আজ যে বৈপরীত্য তুলে ধরে,
তার দার্শনিক ব্যাখ্যা প্রায় আড়াই হাজার বছর আগেই পাওয়া যায়।
প্লুটার্কের বর্ণনা অনুযায়ী–
খ্রিস্টপূর্ব ষষ্ঠ শতাব্দীতে যখন সিথিয়ান দার্শনিক অ্যানাচারসিস (Anacharsis) এথেন্সে এসে
রাজনীতিবিদ, আইনপ্রণেতা ও কবি সোলোন (Solon)- এর সাথে দেখা করেন,
তখন সোলোন তাঁর দেশের জন্য নতুন কিছু আইন লেখার কাজে ব্যস্ত ছিলেন।
অ্যানাচারসিস তখন সোলোনের আইনি খসড়া দেখে তাঁকে উপহাস করে বলেছিলেন:
“Laws are like spider webs:
if some poor weak creature comes up against them, it is caught;
but a bigger one can break through and get away.”
(আইন হলো মাকড়সার জালের মত:
যদি কোন দরিদ্র দুর্বল প্রাণী এতে পড়ে, তবে সে আটকে যায়;
কিন্তু কোন বড় প্রাণী একে ছিঁড়ে অনায়াসেই বেরিয়ে যায়।)

আর এই উক্তিটাই বিবর্তিত হয়ে চলে আসছে সক্রেটিস-এর নামে।
যাইহোক পৃথিবী কাঁপানো এই উক্তির দূরদর্শীতা, বাস্তবতা যেন এমন–
যতদিন পৃথিবীর অস্তিত্ব থাকবে, প্রয়োগও থাকবে
এই উদ্ধৃতির গোটা বিশ্ব জুড়ে।
আধুনিক ভারতের বন–
মানুষের বৈপরীত্য:
ভারতবর্ষে অরণ্য আর মানুষের সম্পর্কটা বেশ প্রাচীন।
কিন্তু আধুনিক সময়ে এর সম্পর্কের রসায়নটা বেশ বদলে গেছে।
একদিকে যেমন পরিবেশ রক্ষার কড়া আইন আছে, অন্যদিকে আছে উন্নয়নের তাগিদ।
এই দুইয়ের সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে এক অদ্ভুত বৈপরীত্যের ছবি ধরা পড়ে আমাদের চোখে।
চলুন একটু গভীরে গিয়ে দেখি— কেন একজন সাধারণ মানুষ যদি রান্নার তাগিদেও
জঙ্গল থেকে দু’চারটে শুকনো ডাল কেটে আনে,
তাহলে বন আইন সঙ্গে সঙ্গে দাঁত মুখ খিঁচিয়ে তেড়ে আসে।
কিন্তু একই দেশে যখন বড় শিল্প আসে বা শিল্পের প্রয়োজনে যাদের উৎপাদনের
সঙ্গে জড়িয়ে থাকে লক্ষ লক্ষ গাছ, হাজার হাজার টন কাঠ, তখন সেই আইন
হঠাৎ করেই কিভাবে হয়ে যায় নমনীয়, আলোচনা সাপেক্ষ আর “শর্তসাপেক্ষ অনুমোদনযোগ্য।”

পরিবেশ রক্ষা করা রাষ্ট্রের পরম ধর্ম।
কিন্তু মজার বিষয় হল— সেই একই বনভূমি যখন বড় কোন প্রকল্পের জন্য বরাদ্দ হয়,
তখন আইনি প্রক্রিয়াগুলো অনেক বেশি সহজ বা মসৃণ মনে হয়।
এটা কোন ব্যক্তি বিশেষের দোষ নয়,
বরং সিস্টেমের এমন এক পরিকাঠামো, যেখানে উন্নয়ন বনাম সংরক্ষণ-এর লড়াইয়ে
সব সময় বড় বিনিয়োগই অগ্রাধিকার পায়।
প্রশ্নটা তাই সহজ:
আইন কি বন বাঁচানোর জন্য, না কি শক্তিশালীদের সুবিধা মসৃণ করার জন্য?
বন আইন আসলে
কি বলেছিলো?
Forest Conservation Act, 1980-এর মূল উদ্দেশ্য ছিল একটাই—
নির্বিচারে বনভূমি ধ্বংস আটকানো।
বন ব্যবহার করতে হলে কঠোর অনুমোদন ও পরিবেশগত মূল্যায়ন বাধ্যতামূলক করা।
কিন্তু চার দশক পরে বাস্তব চিত্র বদলেছে।
(পড়ুন) Indian Forest Act (1927) অনুযায়ী, সংরক্ষিত বনাঞ্চল থেকে কাঠ বা ডাল
সংগ্রহ করা দণ্ডনীয় অপরাধ।
যদিও Forest Rights Act (2006) আদিবাসী ও বনবাসীদের কিছু অধিকার দিয়েছে,
কিন্তু সাধারণ গ্রামীণ মানুষের জন্য আইনি জটিলতা পাহাড়প্রমাণ।
অর্থাৎ বড় শিল্পের আইন কাগজের কারাগারে বন্দী আছে,
কিন্তু প্রয়োগে এসেছে ব্যতিক্রম— শিথিলতা আর ‘বিশেষ ছাড়।’

ফলে যা দাঁড়িয়েছে—
- সাধারণ মানুষের জন্য আইন = শাস্তি।
- বড় প্রকল্পের জন্য আইন = প্রক্রিয়া।
এটাই আসল ফারাক।
ডাল কাটলে অপরাধ,
শিল্প কাটলে–
“Sustainable Transition?”
ভারতের বন আইন-এর একটা বাস্তব দৃশ্য কল্পনা করুন— একজন গ্রামবাসী শুকনো ডাল
কুড়িয়ে আনলেন উনুন জ্বালাতে।
বনরক্ষী ধরলে জরিমানা, মামলা, কখনও জেল।
আরেকদিকে বড় শিল্প—
উৎপাদন প্রক্রিয়ায় বিপুল পরিমাণ প্রাকৃতিক সম্পদ লাগে, তারা হাজির হয়
চকচকে শব্দ নিয়ে—
- Net Zero (নেট-জিরো)।
- Carbon Offset (কার্বন অফসেট)।
- Responsible Sourcing (রেসপনসিবল সোর্সিং)।
দুই ক্ষেত্রেই বন যাচ্ছে।
কিন্তু একটায় অপরাধ, আরেকটায় আধুনিক ‘গ্রিনওয়াশিং’ (Greenwashing)–
অর্থাৎ পরিবেশ ধ্বংসের দাগ মেটাতে সুন্দর প্রেজেন্টেশন (Presentation).
(বিংশ শতাব্দীর শুরুর দিকের ভারত ছিল এক অদ্ভুত দ্বন্দ্বের ভূমি।
একদিকে বিদেশি শাসনের দাপট, অন্যদিকে নিজের পরিচয় খোঁজার ব্যাকুলতা।
তখন বাজার দাপিয়ে বেড়াত বিলিতি সাবান, মলম, ওষুধ, প্রসাধনী।
সেগুলো দামি, চকচকে আর তথাকথিত ‘বিশ্বাসযোগ্য ও আভিজাত্যের’ প্রতীক।
দেশি জিনিস মানেই ছিল কম মানের— এই ধারণা আমাদের মজ্জায় এমনভাবে
ঢুকে গিয়েছিল যে, নিজের তৈরি কিছু ব্যবহার করাও যেন একরকম ঝুঁকি নেওয়া,
এই মানসিক দাসত্বই ছিল আসল শাসন।
ঠিক এই সময়েই…
কি ঘটেছিল?
পড়ুন– Click: সবুজ টিউবে বন্দি এক শতাব্দীর ইতিহাস:
একটা পকেট ভর্তি নস্টালজিয়ার গল্প!)
ভারতের বন আইন–
টোবাকো শিল্প ও
কাঠের নিরব সম্পর্ক:
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (WHO) এবং FAO (Food and Agriculture Organization)-এর মতো
সংস্থাগুলো বহুদিন ধরেই বলে আসছে—
টোবাকো উৎপাদন শুধু স্বাস্থ্যের জন্য ক্ষতিকর নয়।
এটা বননিধন, মাটির উর্বরতা হ্রাস ও জলসম্পদের উপর চাপ সৃষ্টি করে।
বিশেষ করে তামাক শুকানো (Curing) প্রক্রিয়ায়—
জ্বালানির জন্য বিপুল কাঠ লাগে।
এই কাঠ আসে মূলত গ্রামীণ ও বন-প্রান্তিক অঞ্চল থেকে।
বিভিন্ন গবেষণায় দেখা গেছে,
এক কেজি তামাক প্রক্রিয়াকরণে কাঠের ব্যবহার খাদ্যশস্যের তুলনায় অনেক বেশি।
এই কাঠ সবসময় “সরকারি বন” হিসেবে নথিভুক্ত না হলেও,
বাস্তবে তা আসে এমন এলাকা থেকে—
যেখানে বন, কৃষি জমি আর গ্রামবাসীর জীবিকা একে অপরের সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িয়ে।
আইনের চোখে সেটা হয়তো ধূসর এলাকা।
প্রকৃতির চোখে— সেটাও বন।

“Zero Deforestation”
বনাম কাঠের বাস্তবতা:
বড় টোবাকো কোম্পানিগুলো, ITC সহ, দাবি করে—
- তারা সামাজিক বনায়ন করছে।
- বিকল্প জ্বালানির দিকে যাচ্ছে।
- “জিরো ডিফরেস্টেশন” লক্ষ্য নিয়েছে।
কাগজে এগুলো অস্বীকার করার কোন জায়গা নেই।
কিন্তু প্রশ্ন হলো—
- এই দাবির স্বাধীন, স্বচ্ছ, গ্রাউন্ড লেভেল হিসাব কতটা জনসমক্ষে আসে?
- কতটা কাঠ কমলো?
- কোথা থেকে এল?
- কোন অঞ্চলে বনচাপ বাড়লো?
এই প্রশ্নগুলোর উত্তর সাধারন নাগরিক খুব কমই পায়, বা একেবারে পায় না
বলাটাই যুক্তিসঙ্গত।
ফলে তৈরি হয় এক অদ্ভুত পরিস্থিতি —
- বন কমে।
- রিপোর্ট বাড়ে।
- দায় ঝাপসা হয়ে যায় আধুনিক গ্রিনওয়াশিং- এর আড়ালে।
এখানে একটা গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন থেকে যায়— একটা প্রাকৃতিকভাবে বেড়ে ওঠা জঙ্গলের
জীববৈচিত্র কি মানুষের লাগানো সাজানো বাগানের সমতুল্য হতে পারে?
সিএসআর (CSR) বনাম
প্রকৃত সবুজায়ন–
একটা দার্শনিক দ্বন্দ্ব:
বড় কোম্পানিগুলোর হাতে একটা ‘জাদুদণ্ড’ থাকে, যার নাম— “Corporate Social Responsibility”
(কর্পোরেট সোশ্যাল রেস্পন্সিবিলিটি)।
এদের কিছু সংস্থা দাবি করে, তারা কয়েক লক্ষ একর জমি সবুজায়ন করেছে।
তারা কৃষকদের নিয়ে এমন গাছ লাগায়, যা থেকে ভবিষ্যতে বাণিজ্যিক পণ্য তৈরি হবে।
বিজ্ঞানের ভাষায় যাকে বলে, (দেখুন) ‘মনোকালচার’ (Monoculture)– যেখানে গাছের সংখ্যা থাকলেও
বনের প্রাণ বা জীববৈচিত্র থাকে না।
অর্থাৎ, গাছ কাটা হচ্ছে লাভজনক পণ্য তৈরির জন্য, আর গাছ লাগানো হচ্ছে কাঁচামালের
জোগান বজায় রাখার জন্য।
এটা এক ধরণের ‘চক্রাকার ব্যবসা।’
এখানেই জন্ম নেয় এক গভীর দার্শনিক প্রশ্ন:
ভারতের বন আইন অনুযায়ী একজন দরিদ্র মানুষ যখন উনুন জ্বালাতে ডাল কাটেন,
তার পিছনে থাকে বেঁচে থাকার লড়াই।
আর যখন একটা শিল্পগোষ্ঠী বন পরিষ্কার করে, তার পিছনে থাকে মুনাফার অঙ্ক।
আইন কি তবে কেবল বেঁচে থাকার লড়াইকে শাসন করে আর মুনাফার লড়াইকে ‘লাইসেন্স’ দেয়?
উন্নয়নের ভারসাম্য,
না কি আইনি বিলাসিতা?
সরকারের যুক্তি থাকে—
বড় শিল্প হাজার হাজার মানুষের কর্মসংস্থান করে এবং রাষ্ট্রকে
কোটি কোটি টাকা রাজস্ব দেয়,
তাই তাদের জন্য নিয়ম কিছুটা নমনীয় হওয়া দরকার।
কিন্তু এই যুক্তির আড়ালে কি সাধারণ মানুষের অধিকার চাপা পড়ে যাচ্ছে না?
যে আইন গ্রামের মানুষকে বনের সম্পদ থেকে বঞ্চিত করছে, সেই একই আইন
বড় সংস্থাকে ‘বন ব্যবহারের অনুমতি’ দিচ্ছে অতি সহজেই।
এটা ঠিক যেন এমন— আপনার উঠোনের আম গাছ থেকে ফল পাড়া বারণ,
কিন্তু পাশের বাড়ির মালিক যদি বড় কন্ট্রাক্টর হন, তবে তিনি চাইলে
পুরো গাছটাই সরাতে পারেন রাস্তা বানানোর নাম করে!
ভারতের বন আইন–
এখানে সমস্যা শুধু
পরিবেশের নয়:
এটা ক্ষমতার প্রশ্ন।
- যার হাতে রিপোর্ট লেখার ক্ষমতা আছে,
তার বন ব্যবহারের ব্যাখ্যাও গ্রহণযোগ্য। - আর যার হাতে শুধু উনুন জ্বালানোর প্রয়োজন,
তার কাছে আইন কেবল দণ্ডবিধি।
এই দ্বৈত নীতিই আসল সমস্যা।
এই লেখা কোন একক কোম্পানির বিরুদ্ধে অভিযোগ নয়।
এটা একটা ব্যবস্থার প্রশ্ন।
যে ব্যবস্থায়—
- বন আইন গরিবের ক্ষেত্রে কঠোর।
- আর শক্তিশালীর ক্ষেত্রে নমনীয়।

টোবাকো শিল্প তার একটা উদাহরণ মাত্র।
যদি সত্যিই বন বাঁচাতে হয়, তাহলে আইনকে সবার জন্য সমান হতে হবে—
শুধু খাতা কলমে থাকা উচিত নয়।
ডাল কুড়ানোও মানুষের জন্য, আর কোটি টাকার উৎপাদন চালানো শিল্পের জন্যেও।
নইলে বন বাঁচবে না, শুধু রিপোর্ট মোটা হবে।
অন্ধ আইন, না কি
সতর্ক প্রশাসন?
ভারতবর্ষে আজ প্রয়োজন এক সুষম বননীতির।
এমন এক ব্যবস্থা যেখানে সাধারন মানুষের মৌলিক প্রয়োজনকে অপরাধ হিসেবে
দেখা হবে না, আবার বড় কোম্পানিগুলোকেও কেবল ‘চারা লাগানোর’ বিজ্ঞাপনের
আড়ালে ছাড় দেওয়া হবে না।
পরিবেশ রক্ষা এবং শিল্পায়ন দুটোই প্রয়োজনীয়, কিন্তু তার মূল্য যেন কেবল
প্রান্তিক মানুষগুলোকেই চোকাতে না হয়।
যদি বড় কোম্পানির আধিকারিকদের জরিমানা না হয়,
কারণ তারা ‘আইন মেনে’ কাজ করছেন, তবে সাধারণ মানুষকেও আইনের আওতায় এনে
বিকল্প জ্বালানির সহজ পথ করে দেওয়া উচিত।
নয়তো এই ধোঁয়াটে বৈষম্য, ভবিষ্যতে একদিন সমাজকে কেবল আরও বিভাজিতই করবে।
আর বিশৃঙ্খলা, সে উত্তর হয়তো সময়ই বলে দেবে।
(স্কুলের অনুষ্ঠান থেকে কর্পোরেট CSR, সোশ্যাল মিডিয়া ক্যাম্পেইন থেকে
রাজনৈতিক বক্তৃতা— সব জায়গাতেই গাছ লাগানোই যেন
জলবায়ু সংকটের চূড়ান্ত সমাধান।
কিন্তু এখানেই সবচেয়ে বিপজ্জনক ভুলটা হচ্ছে।
ভুলটা এই নয় যে গাছ লাগানো খারাপ।
ভুলটা এই যে, আমরা ধরে নিচ্ছি গাছ লাগালেই জলবায়ু পরিবর্তন থেমে যাবে।
জলবায়ু পরিবর্তন কোন আবেগের সমস্যা নয়, এটা একটা কার্বন ব্যালেন্স–এর অঙ্ক।
আর সেই অঙ্কটাই বোঝা না গেলে, ভালো কাজও শেষ পর্যন্ত অকার্যকর হয়ে যায়।
তবে এর ভিতরের আসল অঙ্কটা কি?
পড়ুন– Click: জলবায়ু সংকট চরমে: গাছ লাগালেও কি শেষ রক্ষা পাবো আমরা?)
[ আপনি কি মনে করেন এ বিষয়ে?
অবশ্যই জানাবেন আপনার মূল্যবান মন্তব্য। ]
(Articlesবাংলা – আমাদের, আপনাদের পরিবার।
ইমেল আইডি দিয়ে আমাদের সাথে যুক্ত হন।
ফলে যখনই এই ব্লগে কোনো নতুন লেখা পোস্ট করা হবে,
সবার আগে আপনিই পাবেন নোটিফিকেশন।
লেখাটা ভালো লাগলে,
শেয়ার করে বন্ধুদের পড়ার সুযোগ করে দিন।
মূল্যবান মন্তব্যে জানান কেমন লাগলো।)
Articlesবাংলা Bangla Articles, Quotes & Prose-Poetry / বাংলা প্রবন্ধ, উক্তি ও গদ্য-কবিতা।


