বিরহের কবিতা:
কখনও কখনও প্রিয় মানুষের চলে যাওয়া ঝড়ের মত হঠাৎ সবকিছু ভেঙে দেয় না।
বরং তা ঘটে এক অদ্ভুত নীরবতায়—
যেন ভেতরে ভেতরে ধ্বসে পড়ে একটা অদৃশ্য শহর।
বাইরে থেকে জীবন তখনও স্বাভাবিক দেখায়;
দিন যায়, সময় এগিয়ে চলে, মানুষ নিজের মত করে মানিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করে।
মনে হয় এটাই তো নিয়ম—
কেউ চিরকাল থাকে না।
তবু সত্যিটা অন্য কোথাও লুকিয়ে থাকে।
কারণ মানুষ চলে গেলেও তাঁর উপস্থিতি পুরোপুরি মুছে যায় না।
হঠাৎ কোনও অচেনা মুখের ভিড়ে,
কোনও পুরনো বইয়ের পাতায়, কিংবা এক টুকরো নীরব দুপুরে
অদ্ভুতভাবে ফিরে আসে সেই অনুভূতি—
যেন সে এখনও কাছেই আছে।
চোখে দেখা যায় না।
স্পর্শ করা যায় না কিন্তু স্মৃতি আর অভ্যাসের গভীরে তাঁর ছায়া থেকে যায়।
এই অভিজ্ঞতা এক ধরনের অদ্ভুত দ্বৈততা—
অনুপস্থিতি আর উপস্থিতি একই সাথে বেঁচে থাকে মানুষের ভেতরে।
আমরা জানি সে আর ফিরবে না,
তবু মনের অজান্তেই তাঁকে খুঁজে ফিরি চারপাশের বাতাসে, শব্দে, গন্ধে।
কারণ প্রিয় মানুষ কখনও কেবল একটা শরীর নয়,
সে হয়ে ওঠে আমাদের ভেতরের এক অদৃশ্য ভূগোল।
আর তাই শেষ পর্যন্ত অপেক্ষাটা থেকে যায়—
কোন বাস্তব প্রত্যাবর্তনের জন্য নয়, বরং সেই একটামাত্র হারিয়ে যাওয়া ছোঁয়ার
অনুভূতিকে আবার একবার স্পষ্টভাবে অনুভব করার জন্য।
বিরহের কবিতা:
তুই চলে গেছিস–
এক নীরব ধ্বস
তুই চলে গেছিস–
সে যাওয়া কোনও ঝড়ের মতন বিশৃঙ্খল ছিল না,
বরং ছিল এক নীরব ধ্বস।
যার শব্দ বাইরে নয়–
ভেতরে গুঁড়িয়ে দিয়েছিল একটা গোটা শহর।

আমি চেষ্টা করেছি মানিয়ে নিতে।
তোর না-থাকাকে মেনে নিতে চেয়েছি
সময়ের মত স্বাভাবিক করে।
বুঝেছি–
কেউ চিরকাল থাকে না।
থেকে যায় শুধু কিছু স্মৃতি, কিছু অভ্যাস,
আর কিছু অদ্ভুত প্রতিক্রিয়া,
যার ব্যাখ্যা আমি পারি না
নিজেকেও দিতে।
এক অদ্ভুত
রোগ ধরেছে আমায়
আজকাল
এক অদ্ভুত রোগ ধরেছে আমায়–
যার নেই কোনো ক্লিনিক্যাল সংজ্ঞা,
নেই কোনো ঔষধি প্রতিকার।
অচেনা কোনো মেয়ের পাশ দিয়ে যাওয়া,
অথবা কোনো পুরনো বই খুলে বসার মুহূর্তে,
বুকের মাঝখানে দাঁড়িয়ে যায়
এক নীরব সময়।
বাতাস ভারী হয়ে ওঠে,
অক্সিজেন যেন চেনে না আমায়–
মনে হয়–
তুই ঠিক এখানেই আছিস,
হাত বাড়ালেই ছুঁয়ে ফেলা যাবে তোকে।
ভয়ে চোখ বুজে ফেলি সে সময়ে-
যদি দেখি, সবটাই বিভ্রম।
কেমন নিখুঁতভাবে
চিনতাম তোকে
শব্দ নেই, মুখ নেই, কণ্ঠ নেই–
তবু একটা চেনা সত্তা
নীরবে ঢুকে পড়ে ভেতরে,
আর মনে করিয়ে দেয়–
কেমন নিখুঁতভাবে চিনতাম তোকে,
কত সহজে খুঁজে নিতাম
হাজার মানুষের ভিড়েও,
শুধু একটুখানি ইশারায়।

তোর সেই চেনা ইশারা এখন অদৃশ্য।
তবু কোথাও ছড়িয়ে আছে–
কোনও হাওয়ার দোলায়,
কোনও ছায়ার ক্ষণিক রেখায়,
অথবা কোনো পুরনো দুপুরের নিঃশ্বাসে।
এক হারিয়ে যাওয়া
ছোঁয়ার অপেক্ষা
আর আমি–
প্রতিবার সেই চেনা অচেনাকে খুঁজে ফিরি
নিজের ভেতরের সীমা পেরিয়ে,
পৃথিবীর সব গন্ধে,
সব নীরবতায়–
কখনও যদি ফিরে পাই
হারিয়ে যাওয়া
একটা মাত্র ছোঁয়া।
(একদিন পৃথিবী চুপ করে যাবে,
যেমন হঠাৎ থেমে যায় ঘড়ির কাঁটা।
অথচ সময় থেকে যায় এর পরেও।
মানুষ, যে একসময় আকাশ মেপেছিল চোখে,
সে একদিন তাকাবে নিজেরই ধ্বংসের দিকে।
অবাক হয়ে, যেন প্রথমবার কিছু দেখছে।
পড়ুন– Click: শেষ প্রজাতির প্রতিচ্ছবি!)
Articlesবাংলা Bangla Articles, Quotes & Prose-Poetry / বাংলা প্রবন্ধ, উক্তি ও গদ্য-কবিতা।