অ্যাগনডিস (Agnodice)– এক দুঃসাহসিক নারীর নিষেধ-ভাঙা গল্প!

নারীর পথ চলা কখনও সহজ ছিল না

মেয়েদের জীবনের লড়াই বিশ্বের ইতিহাস জুড়ে কখনই সহজ ছিল না।
পুরুষতান্ত্রিক সমাজের গোঁড়ামি, নিয়মের বেড়াজাল,
আর ক্ষমতার অহঙ্কার সেই পথকে সর্বদা কঠিন ও জটিল করে রাখত;
ফলে তাদের পথচলা ছিল চ্যালেঞ্জে ভরা।

শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে তাঁরা বিভিন্ন নিষেধ, বৈষম্য, আইনি বাধা,
সামাজিক গোঁড়ামি, শিক্ষার নিষেধাজ্ঞা, কর্মক্ষেত্রে সীমাবদ্ধতা,
ইত্যাদির মুখোমুখি হয়েছে।

তবুও সময় বারবার দেখেছে–

  • ক্যালকুলেটর ও রোবোটবিহীন যুগে জটিল গাণিতিক কাজ সম্পন্ন করা হাইপেশিয়া।
  • যন্ত্র এবং গবেষণার মাধ্যমে আধুনিক বিজ্ঞানকে বদলে দেওয়া মেরি ক্যুরি।
  • ভারতের আকাশে উড়ানের পথ দেখানো কল্পনা চাওলা।
  • কিংবা সীমাহীন প্রতিকূলতা ছাপিয়ে মাঠে বিশ্বকাপ জিতে,
    ইতিহাস সৃষ্টি করা ভারতের মহিলা ক্রিকেট দলের অসামান্য সাফল্য।

সবাই প্রমান করেছে একটাই সত্যঃ
নারী কোনো দিক থেকেই পুরুষের চেয়ে কম নয়,
বরং বহু ক্ষেত্রে এগিয়ে, অনুপ্রেরণার উৎস।

এই দীর্ঘ সংগ্রামের ইতিহাসেই এক রহস্যময়, দুঃসাহসী নাম–
অ্যাগনডিস (Click: Agnodice)
প্রাচীন গ্রীসে চিকিৎসাশিক্ষা নিষিদ্ধ ছিল নারীদের জন্য; অথচ তিনিই হলেন সেই নারী,
যিনি পুরুষ সেজে চিকিৎাবিদ্যার পথ খুলে দিয়েছিলেন হাজার বছরের জন্য।

প্রাচীন গ্রীসঃ যেখানে নারী হওয়াটাই ছিল অপরাধ

খ্রিস্টপূর্ব চতুর্থ শতকে এথেন্স–
একদিকে গণতন্ত্রের জন্মভূমি, অন্যদিকে নারীদের জন্য নিষিদ্ধের দেশ।

  • নারীরা ভোট দিতে পারত না।
  • আদালতে নিজের পক্ষে কথা বলতে পারত না।
  • কোনো পেশা শেখার অধিকার ছিল না।
  • আর চিকিৎসা শিক্ষা তো ছিল সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ।

কারণ?

সোজা– পুরুষেরা বিশ্বাস করতো, চিকিৎসাশাস্ত্র হল ‘উচ্চ জ্ঞান,’
এবং নারীরা নাকি তা উপলব্ধি করার মত যোগ্য নয়।
আর এই দম বন্ধ সমাজেই জন্ম নিয়েছিলেন অ্যাগনডিস।

(একটা বই–
যার ভাষা আজও অজানা; যার ছবি স্বপ্নিল,
আর যার উদ্দেশ্য এখনও অনাবিষ্কৃত।
কি সেই বইয়ের রহস্য?
পড়ুন– Click: ভয়নিচ ম্যানুস্ক্রিপ্ট রহস্যঃ
এক অস্বাভাবিক ও অমীমাংসিত প্রাচীন দস্তাবেজ !)

অ্যাগনডিসঃ

ছেলের ছদ্মবেশে নিষেধ ভাঙা নারী

ইতিহাস বলে– অ্যাগনডিস ছোটবেলায় দেখতেন,
অসংখ্য নারী প্রসব যন্ত্রণায় মর্মান্তিকভাবে মৃত্যুকে অনিচ্ছাকৃত বরণ করছে,
কারণ তারা পুরুষ চিকিৎকের কাছে যেতে ভয় পেত।
গ্রীসে তখন নারীদের শরীর কেউ স্পর্শ করুক– এই ধারণাই সমাজে লজ্জা, পাপ, অপমান।

অ্যাগনডিস ঠিক করলেন–
নারীদের এই চিরন্তন যন্ত্রণা থেকে মুক্তি দেওয়ার পথ খোলা একটাই;
শত নারীকে বাঁচাতে তিনি নিজেই জীবনের ঝুঁকি নেবেন।
তিনি নিজেই চিকিৎসক হবেন।

কিন্তু পথ বন্ধ।
সমাজ-আইন জানিয়ে দিয়েছে আগেই, নারী হলে চিকিৎসা শেখা নিষিদ্ধ।
তাই অ্যাগনডিস করলেন এমন এক কাজ, যা আজও সাহসের প্রতীক–
মেয়েদের কাছে তার চুল, একটা অলঙ্কারের মতন।
তিনি সেই চুলই ছেলেদের মতন কেটে ফেললেন ছোট করে,
এরপর ছেলের পোশাক পরে, নিজেকে পুরুষের মত অনুশীলন করে;
‘পুরুষ’ পরিচয়ে মিশর বা আলেক্সান্দ্রিয়ায় চিকিৎসা শিক্ষা নিতে গেলেন।

ইতিহাসবিদরা বলেন– তিনি হিপোক্রেটিসের ধারার চিকিৎসাবিদ্যা শিখেছিলেন।
যেখানে তাঁর প্রতিভা এতটাই উজ্জ্বল ছিল যে,
শিক্ষকরা তাকে ভবিষ্যতের অন্যতম শ্রেষ্ঠ ‘পুরুষ ছাত্র’ হিসেবেই দেখতো। 
তারা কোনোদিনও ধরতেও পারেনি যে, অ্যাগনডিস ছিলেন একজন নারী।

এথেন্সে প্রত্যাবর্তনঃ নারীদের প্রথম ভরসা

শিক্ষা শেষ করে অ্যাগনডিস এথেন্সে ফিরে চিকিৎসা শুরু করলেন।
তিনি পুরুষ সেজে যেতেন নারীদের চিকিৎসা করতে।
কিন্তু নারীরা প্রথমে ভয় পেত– ‘একজন পুরুষ কি আমাদের পরীক্ষা করবেন?’

ঠিক তখনই অ্যাগনডিস নিজের নারীর হওয়ার পরিচয় দেখিয়ে দিতেন,
আর বলতেন– “আমি একজন নারী, তোমাদের মতই।”
আর জানাতেন– নিজেদের ভালোর জন্যে বিষয়টাকে গোপন রাখতে।

হয়তো তখন ফিসফিস করে কোনো গর্ভবতী নারী বলেছিলেন–
‘তাহলে তুমি-ই আমাদের চিকিৎসক।’

একসময় এভাবেই ধীরে ধীরে বাড়তে লাগলো অ্যগনডিসের জনপ্রিয়তা।
প্রসব, নারীর স্বাস্থ্য– যেখানে পুরুষ চিকিৎসকরা অবহেলা করতেন,
অ্যাগনডিস সেখানে হয়ে উঠলেন আশা, আস্থা।
নারীরা লাইন দিয়ে আসতে লাগলো তাঁর কাছেই।

সমস্যা শুরুঃ পুরুষ চিকিৎসকদের ঈর্ষা

পুরুষ চিকিৎসকরা লক্ষ্য করলো– অ্যাগনডিসের কাছেই নারী রোগী বেশি যাচ্ছে।

  • কি কারণ?
  • কেন এমন ঘটছে?
  • কি এমন চিকিৎসা করেন?
  • না কি অন্য কিছু?

বিষয়টা ধীরে ধীরে তাদের চক্ষুশূল হয়ে উঠতে লাগলো।
অবশেষে–
ঈর্ষা, হিংসায় রূপান্তরিত হয়ে আগুন জ্বলতে লাগলো তাদের অহঙ্কারে।
তারা অভিযোগ করে বসলো–
“এই পুরুষ চিকিৎসক নারীদের ভুলভাবে প্রলুব্ধ করছে,
তাই এরা তাঁর কাছে যাচ্ছে।”

অভিযোগ সত্যি না হলেও,
মিথ্যেটা খুব সহজেই সত্যি হয়েই ঝুলে রইল এথেন্সের বাতাসে।
অবশেষে আদালত অ্যাগনডিসকে তলব করলো।
শাস্তি?
মৃতদণ্ড।

কারণ একটাই–
পুরুষতান্ত্রিক সমাজে সামাজিক প্রথাকে অপমান করে, নস্যাৎ করে;
সে নারী হয়ে চিকিৎসা শিখেছে, তাও আবার পুরুষের ছদ্মবেশ নিয়ে।

আদালতের নাটকঃ সত্য প্রকাশের মুহূর্ত

আদালতে অ্যাগনডিস প্রথমে নিজের পরিচয় গোপনই রেখেছিলেন।
কিন্তু যখন দেখলেন,
তাঁর মহৎ উদ্দেশ্য নিয়ে অপমানজনক মন্তব্য করা হচ্ছে–
তিনি সবার সামনে বাধ্য হয়ে নিজের পোশাক খুলে সত্য প্রকাশ করলেন।

পুরুষ বিচারকরা হতবাক!
সমাজ স্তব্ধ।
অভিযোগের ভিত্তি যেন,
নিজে থেকেই ভেঙে গুঁড়িয়ে গেল আদালতের মাটিতে।

এর পরেও বিচারকরা বললেন–
“নারী হয়ে আপনি চিকিৎসা শিখেছেন– এটাই বড় অপরাধ।”

এ সমাজ নারীর সাফল্য মেনে নিতে প্রস্তুত ছিল না।
তাই তারা তাঁকে মৃত্যুদণ্ড দিতে যাচ্ছিল।

সেই মুহূর্তের অলৌকিক দৃশ্য

এথেন্সবাসী আগে কখনও এমন বিষ্ময়কর ঘটনা দেখেনি।
শত শত নারীর চাপে রাস্তারও যেন দম বন্ধ হয়ে আসছিল।
তারা আদালতের সামনে এসে ভিড় জমালো, যেন নারীদের এক বিশাল ঢেউ,
এক সমবেত প্রতিবাদ ও বিদ্রোহ।

তারা চিৎকার করে উঠলো–
যেন এথেন্সের আকাশ-বাতাস প্রতিধ্বনিত হতে লাগলো সে শব্দে।
“যদি অ্যাগনডিসকে মারো, তবে আমাদেরও মেরে ফেলতে হবে!”
তিনি আমাদের মেয়েদের একমাত্র আশা, ভরসা।
তিনি আমাদের জীবন বাঁচিয়েছেন।

ইতিহাসে এটাই ছিল গ্রীসের প্রথম সংগঠিত নারী প্রতিবাদ।
যে প্রতিবাদের সামনে পুরুষরাও দাঁড়াতে পারেনি, পারেনি তাদের সামাজিক আইন আদালত টিকতে।

রায় বদলে গেল।

ইতিহাস বদলে দেওয়া রায়

এথেন্সের আইন পরিবর্তন করা হল–
জারি হল নতুন আইন, ভেঙে টুকরো হল কুসংস্কারের প্রাচীর।
নারীদের চিকিৎসা শেখা এবং নারীদের চিকিৎসা করা, এখন দুই-ই বৈধ।

অ্যাগনডিস শুধু একজন চিকিৎসক নন,
তিনি নারী শিক্ষার পথে প্রথম আলোর শিখা।
তাঁর সাহস ও মহৎ ভাবনা বহু নারীকে অনুপ্রাণিত করেছে।

যেমন মধ্য যুগে ট্রটুলা অব স্যালের্নো,
অথবা আধুনিক কালে এলিজাবেথ ব্ল্যাকওয়েল,
যারা মেয়েদের চিকিৎসাশিক্ষার পথকে আরও প্রশস্ত করেছেন।

অ্যাগনডিস-এর উত্তরাধিকারঃ

কেন তিনি আজও গুরুত্বপূর্ণ?

আজকের পৃথিবীতে–
মহিলা ডাক্তার, সার্জন, গাইনোকোলজিস্ট, বিজ্ঞানী…
এসব দেখা খুব স্বাভাবিক মনে হয়।

কিন্তু এর শুরু কোথায়?
একজন নারীর ছদ্মবেশে, বিদ্রোহে আর সাহসে।
অ্যাগনডিস প্রমাণ করেছিলেন–
শিক্ষা লিঙ্গ দেখে বেছে নেয় না;
সমাজের গোঁড়ামিই শুধু শত্রু হয়ে
পথ আটকায়।

আজও তাঁর গল্প আমাদের শেখায়–

  • নারীর জন্য দরজা বন্ধ থাকলে, তাকে নতুন দরজা তৈরি করতে হয়।
  • সাহস কখনও কখনও সমাজকে বদলে দিতে পারে,
    পারে ইতিহাস পাল্টে দিতে।
  • সবচেয়ে বড় সত্য– লেখা নিয়ম সবসময় ঠিক হয় না।
    সঠিক হয় ন্যায়ের পক্ষে দাঁড়ানো মানুষগুলো;
    যা বর্তমানে এক বোকামি ছাড়া কিছুই নয়।
    যার ভয়ঙ্কর পরিণাম পেতে হল R G Kar কাণ্ডে অভয়াকে। 

সেই অনন্ত সংগ্রামের অনুপ্রেরণা

আজ লক্ষ লক্ষ মেয়েরা চিকিৎক হচ্ছে, গবেষণা করছে, শিখছে–
এ সবই সম্ভব হয়েছে এমন কিছু নারীর কারণে, যারা ভয় না পেয়ে নিজের পথেই ভয়ের বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে।

অ্যাগনডিস সেই তালিকায় প্রথম নামগুলোর একটা।
যিনি নিজের পরিচয় লুকিয়ে, জীবন বিপন্নপ্রায় করে হাজার নারীর জীবন বাঁচাতে গিয়েছিলেন।
তাঁর গল্প শুধু এক ইতিহাস নয়;
এ এক চিরন্তন আহ্বান–
“ভয় তুমি ভয়কে দেখাও– এ পথ তোমারই।”

(ঘন জঙ্গলের বুক চিরে দাঁড়িয়ে আছে প্রাচীন পাথরের দেয়াল;
লতা-গুল্ম যেন সময়ের ধুলো মুছে দিতে চায় তার বুকে।
পড়ুন– Click: মায়ান রহস্য– হারিয়ে যাওয়া সভ্যতার সন্ধানে !)

(Articlesবাংলা – আমাদের, আপনাদের পরিবার।
ইমেল আইডি দিয়ে আমাদের সাথে যুক্ত হন।

লেখাটা ভালো লাগলে,
শেয়ার করে বন্ধুদের পড়ার সুযোগ করে দিন।
মন্তব্যে জানান কেমন লাগলো।)

Join Our Newsletter

We don’t spam! Read our privacy policy for more info.

About Articlesবাংলা

Welcome to Articlesবাংলা – a vibrant hub of words, ideas, and creativity. This website is the personal archive and creative expression of Tanmoy Sinha Roy, a passionate writer who has been exploring the art of writing for more than seven years. Every article, prose-poem, and quotation you find here reflects his journey, experiences, and dedication to the written word. Articlesবাংলা aims to inspire readers by offering thought-provoking insights, celebrating the richness of Bengali language and literature, and creating a space where ideas, imagination, and culture connect. Whether you are seeking literary reflections, prose-poems, diverse articles, or meaningful quotations, you are invited to explore, reflect, and be inspired.

Check Also

একটি লম্বা শটের চিত্র যেখানে বলিউড অভিনেতা ধর্মেন্দ্রকে একটি বিলাসবহুল স্যুট পরিহিত অবস্থায় দেখা যাচ্ছে, তিনি একটি ছড়ি হাতে নিয়ে আত্মবিশ্বাসের সাথে দাঁড়িয়ে আছেন। তার পটভূমিতে দুটি বড় জানালা এবং ক্লাসিক্যাল ইন্টেরিয়র ডিজাইন দেখা যাচ্ছে।

ধর্মেন্দ্রঃ এক জীবনের পর্দা নামলে যে নীরবতা রয়ে যায়!

ধর্মেন্দ্রঃ এক জীবনের পর্দা নামলে যে নীরবতা রয়ে যায় এই পৃথিবী শেষ পর্যন্ত আমাদের সবার …

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *