শরীর– রোগের গোডাউন
মানবদেহ মানেই রোগের গোডাউন।
এই শরীরের ভিতর হাজার রকম ব্যাধি ঢোকার দরজা খোলা থাকে–
কিছু আসে, কিছু যায়,
আবার কোনো কোনোটা আমাদের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতার কাছে
হার মেনে সেরেও ওঠে।
তাই পড়ুন– আপনার শরীর কি কোনো সংকেত দিচ্ছে?
চিনে নিন সেই গোপন শত্রুকে!

আমরা তাই অভ্যস্ত।
জ্বর হলে ওষুধ খাই, ব্যথা হলে সহ্য করি,
রোগ এলে ভাবি– “কেটে যাবে।”
কিন্তু এর ভিতর একটা রোগ আছে,
যে হঠাৎ আসে না, চেঁচিয়ে জানায় না।
ঢাকঢোল পিটিয়ে হাজির হয় না।
সে ব্যথা দিয়ে সতর্ক করে না,
হঠাৎ কোনো অ্যালার্ম বাজায় না,
বরং স্বাভাবিক ছদ্মবেশে নীরবে জায়গা করে নেয়।
সে আসে ধীরে।
অদৃশ্য পায়ে হাঁটে।
একটা কোষের সামান্য ভুল দিয়ে শুরু হয়–
একটা ভুল, যাকে আমরা গুরুত্ব দিই না।
সেই ভুলই
আজ নয় তো কাল
গড়ে তোলে এক বিদ্রোহী বাহিনী।
নিজের শরীরের ভিতরেই
নিজের শরীরের বিরুদ্ধে।

আর শেষটা আসে
একটা জীবনের সমস্ত হিসেব
নিঃশব্দে চুকিয়ে দিয়ে।
এর নাম– ক্যান্সার।
যা রোগ কম, আতঙ্ক বেশি।
(সাধারণ মানুষ হিসেবে আমরা ভাবি– “এগুলো হয়তো আমাদের জন্য নয়,”
বা “এত ঝামেলায় না যাওয়াই ভালো।”
আর ঠিক এই মানসিকতাকেই কাজে লাগিয়ে অনেক সময়
আমরা প্রতারিত হই, ঠকে যাই।
পড়ুন– Link: হাসপাতাল, আইন আর রোগী:
যে সত্যগুলো না জানলে আপনি সর্বশান্ত হতে পারেন!)
ক্যান্সার আসলে কি?
মানবদেহের প্রতিটা অঙ্গ তৈরি হয় কোটি কোটি কোষ দিয়ে।
একটা কোষের স্বাভাবিক চক্র হলো জন্মানো
এবং নির্দিষ্ট কাজ শেষে নিয়ম মেনে মৃত্যু বরণ করা।
অর্থাৎ–
- কোষ জন্মায়।
- কাজ করে।
- সময় হলে মারা যায়।
এই নিয়মেই শরীর টিকে থাকে।
ক্যান্সার হয় যখন কিছু কোষ এই নিয়ম ভেঙে ফেলে।
- তারা অকারণে বাড়তে থাকে।
- মৃত্যু মানতে চায় না।
- আশেপাশের সুস্থ কোষ দখল করে নেয়।
- রক্ত বা লিম্ফ সিস্টেম দিয়ে শরীরের অন্য জায়গায় ছড়িয়ে পড়ে।
এই অনিয়ন্ত্রিত কোষের বিদ্রোহই ক্যান্সার।
কেন ক্যান্সার হয়? (ভাগ্যের খেলা নয়)
ক্যান্সার কোনো অভিশাপ নয়।
বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই এর কারণ আছে।
প্রধান কারণগুলো–
তামাক ও ধূমপান
- মুখ, ফুসফুস, গলা, খাদ্যনালীর ক্যান্সারের সবচেয়ে বড় শত্রু।
অ্যালকোহল
- দীর্ঘদিনের মদ্যপানে লিভার, মুখ, স্তন ক্যান্সারের ঝুঁকি বাড়ে।
অস্বাস্থ্যকর খাদ্যাভ্যাস
- অতিরিক্ত ভাজা, প্রসেসড খাবার, কম ফল-সবজি।
ভাইরাস সংক্রমণ
- HPV– সার্ভাইক্যাল ক্যান্সার
- Hepatitis B ও C– লিভার ক্যান্সার
বংশগত জিনগত ত্রুটি
- সব ক্যান্সার নয়, তবে কিছু ক্ষেত্রে ভূমিকা রাখে।
মাত্র ৫-১০% ক্যান্সার বংশগত হয়, বাকিটা জীবনযাত্রার উপর নির্ভর করে।
পরিবেশ ও দূষণ
- বাতাস, রাসয়নিক, রেডিয়েশন।
ক্যান্সার মানে হঠাৎ দুর্ঘটনা নয়–
বেশিরভাগ সময় এটা দীর্ঘ অবহেলার ফল।
কারা সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে?
- যারা তামাক/ গুটখা খায়।
- যাদের পরিবারে ক্যান্সারের ইতিহাস আছে।
- ৪০ বছরের বেশি বয়সীরা।
- দীর্ঘদিনের ডায়াবেটিস বা স্থূলতা আছে যাদের।
- দূষিত পরিবেশে কাজ করেন।
- দীর্ঘদিন চিকিৎসা না করা সংক্রমণ আছে যাদের।
ক্যান্সার সবাইকে সমানভাবে আঘাত করে না।
কিছু মানুষ অজান্তেই প্রতিদিন বেশি ঝুঁকিতে হাটছেন।
কত ধরণের ক্যান্সার আছে?
বিশ্বজুড়ে ১০০ টারও বেশি ধরণের ক্যান্সার শনাক্ত হয়েছে।
এর মধ্যে সবচেয়ে পরিচিত কিছু–
- ব্রেস্ট ক্যান্সার।
- লাং ক্যান্সার।
- ওরাল ক্যান্সার।
- সার্ভাইক্যাল ক্যান্সার।
- লিভার ক্যান্সার।
- ব্লাড ক্যান্সার (লিউকোমিয়া)।
- ব্রেইন টিউমার
- কোলন ক্যান্সার।
- (দেখুন) স্কিন ক্যান্সার।
এই প্রতিটা ক্যান্সারে যে অঙ্গ আক্রান্ত হয়,
সাধারণত ক্যান্সারের নাম সেখান থেকেই আসে।
কোন বয়সে কোন ক্যান্সারের
ঝুঁকি বেশি?
ক্যান্সার যে কোনো বয়সে হতে পারে।
কিন্তু সব বয়সে সব ক্যান্সারের ঝুঁকি সমান নয়।
৩০ বছরের নিচে তুলনামূলকভাবে কম দেখা যায়,
তবে ব্লাড ক্যান্সার বা কিছু বিরল টিউমার হতে পারে।
৪০-এর পর থেকে ঝুঁকি বাড়তে শুরু করে।
বিশেষ করে ব্রেস্ট, সার্ভাইক্যাল, কোলন ও ওরাল ক্যান্সার।

৫০-এর পর লাং, প্রোস্টেট, লিভার ও কোলন ক্যান্সারের ঝুঁকি সবচেয়ে বেশি।
এই বয়সে নিয়মিত স্ক্রিনিং না করলে বিপদ অনেক গুণ বেড়ে যায়।
বয়স বাড়া মানেই ক্যান্সার নয়–
কিন্তু বয়স বাড়লে সতর্কতা বাড়ানো জরুরি।
ক্যান্সারের লক্ষণ:
যেগুলো শরীর ফিসফিস করে জানায়
ক্যান্সার শুরুতে চিৎকার করে না।
সে ফিসফিস করে।
সেই ফিসফিসানিগুলো–
- হঠাৎ করে ওজন কমে যাওয়া।
- শরীরের অবসাদ বা ক্লান্তি দানা বাঁধে।
- দেহের কোথাও শক্ত গিঁট বা ফোলা।
- না সারতে চাওয়া ক্ষত।
- অস্বাভাবিক রক্তপাত।
- দীর্ঘদিনের কাশি বা স্বর পরিবর্তন।
- খাবার গিলতে সমস্যা।
- দীর্ঘদিনের ব্যথা, যার স্পষ্ট কারণ নেই।
- মল বা প্রস্রাবের অভ্যাসে হঠাৎ পরিবর্তন।
(ঘন ঘন ডায়রিয়া, কোষ্ঠ্যকাঠিন্য, প্রস্রাবে জ্বালা বা রক্ত) - খাবারে অরুচি বা দ্রুত পেট ভরে যাওয়া।
- চামড়ার অস্বাভাবিক পরিবর্তন।
(রঙ বদলানো, কালো দাগ বড় হওয়া, তিলের আকার/রঙ বদল) - রাতের বেলা অতিরিক্ত ঘাম।
- জ্বর, যা দীর্ঘদিন থাকে কিন্তু কারণ ধরা পড়ে না।
- স্তন বা অণ্ডকোষে অস্বাভাবিক পরিবর্তন।
(স্তন বা অণ্ডকোষের আকার ও গঠনে কোনো কোনো পরিবর্তন আসা।)
স্তনের নিপল থেকে রক্ত বা কোনো অস্বাভাবিক স্রাব নির্গত হওয়া। - হাড়ে বা পিঠে দীর্ঘস্থায়ী ব্যথা, যা বিশ্রাম নিলেও কমে না।
- মাথাব্যথা বা খিঁচুনি, বিশেষ করে নতুনভাবে শুরু হলে।

এই লক্ষণগুলোর বেশিরভাগকেই আমরা বলি–
“গ্যাস,” “বয়সের সমস্যা,” স্ট্রেস।”
প্রশ্ন একটাই–
যদি আপনি ভুল হন,
দামটা কে দেবে?
২-৩ সপ্তাহের বেশি থাকলে,
এটাকে স্বাভাবিক বলে অবহেলা করা মানে
নিজের হাতে নিজের বিপদ ডেকে আনা।
প্রাথমিক স্টেজে ক্যান্সার ধরা পড়লে কি হয়?
এই জায়গাটাই সবচেয়ে আশার।
শুরুর দিকে ধরা পড়লে অনেক ক্যান্সার পুরোপুরি সেরে যায়।
কিভাবে সম্ভব?
- নিয়মিত স্ক্রিনিং।
- উপসর্গ দেখেই ডাক্তার দেখানো।
- ঝুঁকিপূর্ণ অভ্যাস ত্যাগ।
প্রয়োজনীয় কিছু পরীক্ষা–
- স্তন পরীক্ষা (ম্যামোগ্রাফি)
- সার্ভাইক্যাল প্যাপ স্মিয়ার।
- মুখ পরীক্ষা (তামাক ব্যবহারকারীদের জন্য)
- কোলনস্কোপি (নির্দিষ্ট বয়সের পর)
সময়মতো ধরা পড়া মানে–
জীবন বাঁচানো ও খরচ কমানো।
ক্যান্সারের ওষুধ কি বেরিয়েছে?
সোজা কথা–
একটা ওষুধে সব ক্যান্সার সারে, এমন কিছু নেই।
কিন্তু চিকিৎসা আছে।
বর্তমানে ব্যবহৃত পদ্ধতি–
- সার্জারি।
- কেমোথেরাপি।
- রেডিওথেরাপি।
- টার্গেটেড থেরাপি।
- ইমিউনোথেরাপি।

বিশেষ করে ইমিউনোথেরাপি কিছু ক্যান্সারে নতুন আশার আলো।
অনেক জায়গায় শোনা যায়–
“ক্যান্সারের ওষুধ বেরিয়ে গেছে।”
বাস্তবটা হলো–
সব ক্যান্সারের জন্য একটাই ওষুধ এখনও নেই।
তবে কিছু নির্দিষ্ট ক্যান্সারে ইমিউনোথেরাপি ও টার্গেটেড ওষুধ রোগ নিয়ন্ত্রণে রাখতে বা দীর্ঘদিন সুস্থ জীবন দিতে পারছে।
এই চিকিৎসা কি মানুষকে বাঁচাতে পারে?
হ্যাঁ।
আজ অসংখ্য মানুষ ক্যান্সার জয় করে স্বাভাবিক জীবন কাটাচ্ছেন।
কিন্তু তিনটে শর্ত–
- সময়মতো ধরা পড়তে হবে।
- সঠিক চিকিৎসা নিতে হবে।
- নিয়মিত ফলোআপ করতে হবে।
ক্যান্সার ভয়ঙ্কর– কিন্তু অজেয় নয়।
ক্যান্সার ধরা পড়ার পর সবচেয়ে ভুল
ক্যান্সার ধরা পড়লে মানুষ প্রথম যে ভুলটা করে,
তা হলো– দেরি করা।
ভয়ের কারণে অনেকে পরীক্ষা করাতে চান না,
আবার কেউ কেউ ভুল চিকিৎসায় মূল্যবান সময় নষ্ট করেন,
বা ভুয়ো ওষুধের চক্করে সময় খরচ করেন।
অনেকের ক্ষেত্রে আবার– “আরও ক’দিন দেখি”–
এই মানসিকতাই কাল হয়ে দাঁড়ায়।
কিন্তু ক্যান্সারে সময় মানেই জীবন।
এক মাস দেরি মানে স্টেজ বদলে যাওয়া।
স্টেজ বদল মানে চিকিৎসা কঠিন হয়ে যাওয়া।
ক্যান্সার মানুষকে একদিনে মারে না।
দেরি করার সিদ্ধান্তই তাকে মারাত্মক করে তোলে।
ক্যান্সার নিয়ে সবচেয়ে
বিপজ্জনক ভুল ধারণা
- “ক্যান্সার মানেই মৃত্যু– একদম ঠিক নয়।”
- “আমার পরিবারে হয়নি, আমার হবে না”– ভুল।
- “ব্যথা না হলে সমস্যা নেই”– ভয়ঙ্কর ভুল।
কোথায় চিকিৎসা পাওয়া যায়?
ভারতে–
- সরকারি মেডিক্যাল কলেজ।
- ক্যান্সার বিশেষ হাসপাতাল।
- AIIMS, Tata Memorial, RCC ইত্যাদি।
সরকারি হাসপাতালে অনেক চিকিৎসা কম খরচে বা বিনামূল্যে পাওয়া যায়।
চিকিৎসার খরচ: নির্মম বাস্তবতা
খরচ নির্ভর করে–
- ক্যান্সারের ধরন।
- স্টেজ।
- চিকিৎসার ধরন।
আনুমানিক–
- সাধারণ কেমোথেরাপি: কয়েক হাজার থেকে কয়েক লক্ষ।
- উন্নত ইমিউনোথেরাপি: কয়েক লক্ষ থেকে কয়েক কোটি।
তাই আগেভাগে ধরা পড়া মানে শুধু জীবন নয়– অর্থও বাঁচানো।
এই লেখাটা যদি আপনি শেষ পর্যন্ত পড়ে থাকেন,
তাহলে আজই একটাই কাজ করুন–
নিজের বা পরিবারের একজনের শরীরের দিকে
একটু মন দিয়ে তাকান।
ভয়ই শেষ নয়
এই লেখা যদি ভয় দেয়–
ভালো।
কিন্তু যদি চোখ খোলে–
তাহলে সেটাই জয়।
ক্যান্সার শরীরের ভিতরের যুদ্ধ।
এই ক্যান্সার বিরোধী যুদ্ধে আসল অস্ত্র হলো–
জ্ঞান, সচেতনতা আর সময়।
আজ নয় তো কাল–
কিন্তু অবহেলা করলে, সে এসে পড়বেই।
চিনে নিন, আগে থেকেই।
(ভারতে এসে বহু বিদেশি যে কাজটা সবচেয়ে নির্দ্বিধায় করে,
তা হলো গরীব, দুঃস্থ, অসহায় মানুষের ছবি তোলা।
বস্তি, ফুটপাত, আধখানা জামা, নোংরা পা, খালি চোখ।
অনুমতি? নেই।
কথা বলা? নেই।
মানুষ হিসেবে স্বীকৃতি? সেটাও নেই।
শুধু দামী ক্যামেরা তুলে ক্লিক।
পড়ুন– Click: খাঁচার ভিতর ভারত, বাইরে সভ্যতার সার্টিফিকেট!)
(Articlesবাংলা – আমাদের, আপনাদের পরিবার।
ইমেল আইডি দিয়ে আমাদের সাথে যুক্ত হন।
ফলে যখনই এই ব্লগে কোনো নতুন লেখা পোস্ট করা হবে,
সবার আগে আপনিই পাবেন নোটিফিকেশন।
লেখাটা ভালো লাগলে,
শেয়ার করে বন্ধুদের পড়ার সুযোগ করে দিন।
মূল্যবান মন্তব্যে জানান কেমন লাগলো।)
Articlesবাংলা Bangla Articles, Quotes & Prose-Poetry / বাংলা প্রবন্ধ, উক্তি ও গদ্য-কবিতা।







