বাতাসের ভিতরে লুকানো ভবিষ্যৎ
কখনও কখনও কোনো দেশকে বোঝার জন্য তার ইতিহাস পড়তে হয় না,
শুধু সে দেশের বাতাস শুঁকলেই যথেষ্ট।
বাতাসের গন্ধে থাকে মানুষের ভবিষ্যৎ, শহর ভাগ্য, সরকারের দায়বদ্ধতা,
আর সভ্যতার সৎ-অসৎ সমস্ত হিসেব।
যখন বাতাস নিজেই বিষে ভরে ওঠে, তখন নীরবতাই সবচেয়ে ভয়ঙ্কর উপসর্গ।
চিনে যখন AQI (Air Quality Index) ৭০০ ছাড়ালো
(সাধারণত ৪০০-৫০০-এর মধ্যেই চিনে জরুরি অবস্থা ঘোষণা করা হয়;
৭০০+ বিরল ঘটনা), তারা জরুরি অবস্থা জারি করেছিল।
কারণ তারা জানে সেটা বিপর্যয়ের সীমা।

কিন্তু ভারত?
AQI গাঢ় লালঃ ভারতের ভবিষ্যত কি তবে ভয়ঙ্কর?
আজ ভারতের অনেক শহরেই AQI, Hazardous লেভেল ছুঁই ছুঁই,
পশ্চিমবঙ্গও এর বাইরে নয়– বিশেষত শীতকালে কোলকাতা, হাওড়া,
বালিগঞ্জ, সল্টলেকসহ বহু এলাকায় AQI প্রায়শই অস্বাস্থ্যকর থেকে,
অত্যন্ত অস্বাস্থ্যকর (২০০-৩৫০+) স্তরে ওঠে।
এ পরিস্থিতিতে এক সামগ্রিক নীরবতা যেন দেশটাকে ঘিরে রেখেছে।
এমন নীরাবতা, যা আসলে পরাজয়ের স্বীকারোক্তি।
এবারে চোখ ফেরানো যাক বিশ্বের দিকে।
পৃথিবীর (Click:) ‘Real-time Most Polluted Cities‘ তালিকায় যে চিত্র ফুটে ওঠে,
তা দেখলে মনে হয়–
আমরা যেন ধীরে ধীরে একটা বিশাল গ্যাস চেম্বার জাতি হয়ে উঠছি।
আর এটাই সেই গল্প, একটা দেশের নয়, বরং সমগ্র পৃথিবীর।
ভারতের শহরগুলো কেন শীর্ষে?
কারণগুলো অস্বীকারের বাইরে
ভারতের শহরগুলো কোনো কালেই দূষণমুক্ত ছিল না,
কিন্তু গত কয়েক বছরে পরিস্থিতি এমন জায়গায় দাঁড়িয়েছে,
যেখানে স্বাভাবিকতা আর বিপদের পার্থক্যই মুছে গেছে।
দিল্লি, গাজিয়াবাদ, গুরুগ্রাম (গুরগাঁও), মুজাফফরনগর, রোহতক–
এই সমস্ত শহর নিয়মিতভাবে AQI তালিকায় সর্বোচ্চ স্থানে।
কারণগুলো জটিল নয়–
দীর্ঘদিন ধরে উপেক্ষিত পরিবেশনীতি, যানবাহনের ভয়াবহ বৃদ্ধি, অবাধ নির্মাণ,
কৃষিক্ষেত্রে অবশিষ্ট পোড়ানো ও প্রায়শই দুর্বল প্রশাসনিক সদিচ্ছা।
এ সব মিলে বাতাসের উপর এক অদৃশ্য শ্মশানঘাট তৈরি করেছে।
কিন্তু মূল সমস্যা হলোঃ
ভারত; দূষণে এতটাই মানিয়ে নিয়েছে যে, এখন আর ভারতের মানুষ ভয় পায় না।
এটাই সবচেয়ে ভয়ঙ্কর ও দুশ্চিন্তার কারণ।
চিন কেন জরুরি ঘোষণা দিয়েছিল,
আর ভারত কেন দেয় না?
চিন AQI ৭০০ ছাড়ানোর মুহূর্তেই–
- স্কুল বন্ধ।
- কারখানা আংশিক বন্ধ।
- ট্রাফিক হাফ-লোড।
- জনস্বাস্থ্য সতর্কতা।
- সরকারি বিবৃতি।

এসব ঘোষণা করেছিল, কারণ তারা জানেঃ
শ্বাস নেওয়া কোনো দেশের রাজনৈতিক বিতর্ক নয়।
ভারতে কিন্তু দূষণ রাজনৈতিক হয়ে যায়–
কেউ বলে কৃষকের দোষ, কেউ বলে গাড়ির দোষ, কেউ বলে প্রতিবেশী রাজ্যের দোষ।
দোষ চাপানোর রাজনীতি চলতেই থাকে।
আর এদিকে প্রতিদিন কোটি কোটি মানুষ বিষ শ্বাস নিয়ে, লাইন দিয়ে;
সাত তাড়াতাড়ি গুছিয়ে ভোট দিতে যায় গণতন্ত্র রক্ষায়।
তবে কি এটা অজ্ঞতা?
মোটেই নয়, বরং সুবিধাজনক চুপ থাকা।
পৃথিবীর বর্তমান চিত্রঃ
দূষণের তালিকায় ভারতের শহরের আধিক্য
বিশ্বের সবচেয়ে দূষিত শহরগুলোর যে (Click:) Real-Time AQI Global Ranking;
নিয়মিত প্রকাশিত হয়, তা পড়লেই বোঝা যায়–
দক্ষিণ এশিয়া আজ ভৌগলিকভাবে পৃথিবীর দূষণের এক অভূতপূর্ব কেন্দ্রবিন্দু।
বিশেষ করে ভারত এখানে কেন্দ্রীয় ভূমিকা রাখে।
IQAir ও অন্যান্য আন্তর্জাতিক মনিটরিং প্ল্যাটফর্মের তথ্য অনুযায়ী,
বিশ্বের সবচেয়ে দূষিত শহরগুলোর মধ্যে উল্লেখযোগ্য সংখ্যকই ভারতের।
বিশেষ করে শীর্ষ ২০-৫০ তালিকায় ভারতের উপস্থিতি অত্যন্ত প্রকট।

(মেয়েদের জীবনের লড়াই বিশ্বের ইতিহাস জুড়ে কখনই সহজ ছিল না।
পুরুষতান্ত্রিক সমাজের গোঁড়ামি, নিয়মের বেড়াজাল,
আর ক্ষমতার অহঙ্কার সেই পথকে সর্বদা কঠিন ও জটিল করে রাখত…
এই দীর্ঘ সংগ্রামের ইতিহাসেই এক রহস্যময়, দুঃসাহসী নাম–
পড়ুন– Click: অ্যাগনডিস (Agnodice)– এক দুঃসাহসিক নারীর নিষেধ-ভাঙা গল্প!)
তালিকার বাকি অংশে অবশ্য রয়েছে কিছু শহর বাংলাদেশ,
পাকিস্তান, ইরান, ইরাক ও চ্যাড থেকে।
এরা ওঠা-নামা করে।
কখনও উপরে, কখনও নিচে।
কিন্তু এত বড় মাত্রায় এবং ধারাবাহিকভাবে কোনো দেশই;
এই তালিকাকে দখল করে রাখে না– ভারত ছাড়া।
যখন (Click:) বিশ্ব দূষণের মানচিত্রটা লক্ষ্য করা হয়,
তখন দক্ষিণ এশিয়ার অংশটা কেবল লাল নেই, এটা প্রায় কালো হয়ে উঠেছে।
(গাঢ় লাল বা অত্যন্ত গাঢ় রঙ বোঝায় উচ্চ-দূষণ,
“কালো” ভিজ্যুয়াল সংজ্ঞা সবসময় বৈজ্ঞানিক নয়।)
এক ধরণের অন্ধকার সতর্কবার্তা– যেন ভবিষ্যতে গিলে খাবে গোটা সভ্যতাকেই।
আর তা প্রতিদিনই আরও ঘন হয়ে চলেছে।
দূষণের “নীরব ঘাতক” প্রভাব–
যা পরিমাপ করা যায় না
PM2.5 বা PM10 সংখ্যা দিয়ে দূষণ গণনা করা যায় ঠিকই,
কিন্তু ফুসফুস, হৃদযন্ত্র, মস্তিষ্ক– এগুলোর ক্ষতি সংখ্যায় ধরা যায় না।
দূষণ মানুষের শরীরের ৩ টে জায়গায় আঘাত করেঃ
- ১. শ্বাসতন্ত্র।
- ২. রক্ত সঞ্চালন।
- ৩. মস্তিষ্ক।

সবচেয়ে ভয়ঙ্কর হলো–
বাচ্চারা যেই বয়সে দৌড়ানো শেখে,
সেদিন থেকেই তারা দূষণের টক্সিক কণা ফুসফুসে জমাতে শুরু করে।
বয়স্কদের ক্ষেত্রে এটা হয় ধীরে ধীরে মৃত্যু-ঘড়ির মতো।
একটা দেশ তখনই বিপদে পড়ে, যখন এর নাগরিকরা অসুস্থ হয়;
কিন্তু অসুস্থতাকে আর অসুস্থতা মনে করে না।
ভারত ঠিক সেই জায়গায়।
বাতাসের ভিতর জমে থাকা ভবিষ্যৎঃ
অর্থনীতি থেকে মনস্তত্ত্ব পর্যন্ত ক্ষতি
দূষণ শুধু স্বাস্থ্য সমস্যা নয়–
এটা অর্থনৈতিক ক্ষতি, সামাজিক অসমতা এবং রাষ্ট্রীয় দুর্বলতার সমান্তরাল গল্প।
- সবথেকে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত নিম্ন আয়ের মানুষগোষ্ঠী।
যাদের ঘর ছোট, যাদের রাস্তায় হাঁটতেই হয়, যাদের মাস্ক বা পিউরিফায়ার নেই। - কর্মদক্ষতা কমে যায়।
শ্রমিক, অফিসার, শিক্ষক, ছাত্র– সবাই ক্লান্তি, মাথাব্যথা, শ্বাসকষ্ট নিয়ে দিন কাটায়। - হাসপাতালে চাপ বাড়ে, কিন্তু দূষণ কমানোর ব্যবস্থা আর বাড়ে না।
এগুলো মিলিয়ে দেশের মানবসম্পদই দুর্বল হয়ে যায়, যার ফল দীর্ঘমেয়াদে ভয়ঙ্কর।
বিশ্বের মোকাবিলা বনাম ভারতের উদাসীনতা
ভারতকে শুধু সামরিকভাবে বিশ্বের চতুর্থ শক্তিধর দেশ থাকলেই হবে না।
পাশাপাশি মানবিক ও পরিবেশগত দায়িত্ব পালন করাও জরুরি।
শুধুমাত্র অস্ত্রশক্তি বা অর্থনৈতিক প্রভাব দিয়ে কোনো দেশ সত্যিকারের শক্তিশালী হয় না।
স্বাস্থ্য ও নাগরিকদের জীবনমানও সমানভাবে গুরুত্বপূর্ণ।
দক্ষিণ কোরিয়া, জাপান, চিন, ইউরোপ;
যেখানে দূষণ বাড়ে, সেখানেই–
- জরুরি অবস্থার অধীন নীতি।
- পাবলিক ট্রান্সপোর্ট ফ্রি।
- গাড়ি সীমাবদ্ধতা।
- স্কুল-কলেজ বন্ধ।
- রিয়েল-টাইম গণবিজ্ঞপ্তি।
মানুষ কেন চুপ?
সমাজবিজ্ঞানের কিছু কারণ
চুপ থাকা সবসময় ভয় না,
চুপ থাকা অনেক সময় হাল ছেড়ে দেওয়া।
মানুষ চুপ কারণ–
- দূষণ কখনো হঠাৎ মারছে না– ধীরে ধীরে মারছে।
- সবাই মনে করে, “এটা তো রোজকার ব্যাপার”– তাই স্বাভাবিকতা তৈরি হয়েছে।
- মিডিয়া ও প্রশাসন বড় বিপর্যয় ছাড়া বিষয়টাকে আলোচনা কেন্দ্রে রাখে না।
- ব্যক্তিগতভাবে সমাধান কঠিন, তাই মানুষ ভাবতে চায় না।
মানুষের মনে একটাই ধারণা প্রতিষ্ঠিত হয়েছেঃ
“আমি একা করলে কি হবে?”
আর ঠিক এখানেই সমাজ ভেঙে পড়ে।
বিশ্বব্যাপী পরিস্থিতি যে দিক দেখায়
যখন Real Time দূষণের বিশ্বমানচিত্র দেখা হয়, বোঝা যায়–
এটা কোনো দেশের সমস্যা নয়, এটা সভ্যতার রোগ।
উত্তর আফ্রিকা, মধ্যপ্রাচ্য, দক্ষিণ এশিয়া;
বায়ু দূষণের সবচেয়ে ঘন অঞ্চলগুলো সমগ্র পৃথিবীর ভবিষ্যৎকে ঝুঁকির মুখে দাঁড় করিয়েছে।
যে সব দেশ মনিটরিং বাড়াচ্ছে, তারা ভয় পাচ্ছে।
আর যে সব দেশ মনিটরিং কমাচ্ছে, তারা সচেতন-দুর্বল;
দুটোই সমান বিপজ্জনক!
সমাধানের পথঃ দীর্ঘ কিন্তু জরুরি
- শক্তিশালী আইন।
- সবুজ পরিবহণ।
- নির্মাণ নিয়ন্ত্রণ।
- কৃষিক্ষেত্র আধুনিকীকরণ।
- জরুরি সতর্কতা ঘোষণা।
- শহরভিত্তিক ক্লিন এয়ার অ্যাকশন প্ল্যান।
- নাগরিক সচেতনতা।
এসব একদিনে হবে না, কিন্তু শুরু করতে হবে আজই।
কারণ দূষণ শুধুই সমস্যা নয়–
এটা মানুষের অস্তিত্বের পরীক্ষা।
পরিশেষঃ
আমাদের নীরবতা কি আমাদের মৃত্যু-ঘন্টা?
বাতাস কাউকে ছাড় দেয় না।
যে দেশে দিনের আলোয় বিষ ঢুকে পড়ছে মানুষের শ্বাসে,
সেখানে উন্নয়ন, রাজনীতি, দোষারোপ– এসব সবই একসময় অর্থহীন হয়ে যায়।
ভারত আজ সেই পর্যায়ে দাঁড়িয়ে।
যেখানে দূষণ সংখ্যামাত্র নয়,
একটা সভ্যতার আয়না।
যেখানে আমরা নিজেরাই নিজেদের প্রতিচ্ছবি দেখে ভয় পাই।
পৃথিবীর দূষণের তালিকা শুধু ডেটা নয়;
এটা মানবজাতির ভবিষ্যতের কালো রেজিস্টার।
আজ যদি আমরা কথা না বলি,
আগামীকাল হয়তো শ্বাস নেওয়ার ভাষাও থাকবে না।
(রাস্তা ভাঙবে– মেরামত হবে– আবার ভাঙবে– আবার টেন্ডার–
এভাবেই বহু মানুষের পকেট ধীরে ধীরে, বৈধভাবে;
বর্ষার জল ঢোকার মতো পরিপূর্ণতা অর্জন করে।
পড়ুন– Click: গর্তের দর্শনঃ প্রেমে ব্যর্থ বিটুমেন!)
Articlesবাংলা Bangla Articles, Quotes & Prose-Poetry / বাংলা প্রবন্ধ, উক্তি ও গদ্য-কবিতা।



