ইংরেজ ভারতে না আসলে, আজ বিশ্বের সুপার পাওয়ার হতো ভারত!

বারবার লুণ্ঠিত ধারার সবচেয়ে নির্মম অধ্যায়–

ব্রিটিশ শাসন

লোভ প্রতিটা মানুষের ভিতরেই কম-বেশি থাকে,
কিন্তু যখন সেই লোভ, এর সীমা ভেঙে অমানবিক হয়ে ওঠে।
যখন ক্ষমতার নেশা সম্পদের উপর ঝাঁপিয়ে পড়ে।
যখন অন্যের ঘর, জমি, শিল্প, সভ্যতা– সবই কেবল দখলের লক্ষ্য হয়ে যায়,
ঠিক তখনই ইতিহাস জন্ম দেয় পোশাকে উন্নত,
অথচ ভিতরে ভয়াবহ এক বিদেশি জাতিকে–(Click:) ব্রিটিশ।  

ইংরেজ ভারতে না আসলে, আজ বিশ্বের সুপার পাওয়ার হতো ভারত!

ভারতের ইতিহাস এক অদ্ভুত পুনরাবৃত্তি।
এই ভূখণ্ডের সম্পদ, শিল্পকলা, সোনা-রূপোর প্রাচুর্য এবং ভৌগলিক সুবিধা,
বারবার বিদেশি শক্তিকে আকর্ষণ করেছে।
শক, হুন, গ্রিক, কুষাণ, পারস্য (নাদির শাহ),
তুর্কি ও আফগান (সুলতান মাহমুদ, ঘুরি, লোদি, সূর ইত্যাদি)। 

এই দীর্ঘ লুণ্ঠনের ইতিহাসে–
সবচেয়ে সুপরিকল্পিত, বৈজ্ঞানিকভাবে সংগঠিত ও দীর্ঘস্থায়ী শোষণ ঘটিয়েছে ব্রিটিশরা।
তারা শুধু রাজ্য দখল করেনি, দখল করেছে বাজার, কৃষি, কররাজস্ব,
এবং পুরো অর্থনৈতিক রক্তস্রোত।
দুই শতাব্দী ধরে শোষণের এমন এক নিখুঁত কাঠামো তৈরি করা হয়েছিল,
যার উদ্দেশ্য ছিল স্পষ্টঃ ভারতকে দারিদ্রের অতল খাদে ধাক্কা মেরে ফেলে দিয়ে,
ব্রিটেনকে বিশ্বের শক্তিশালী সাম্রাজ্যে রূপান্তর করা।

উপনিবেশ-পূর্ব ভারতের অর্থনৈতিক শক্তি

ইংরেজ শাসনের আগে ভারত ছিল বিশ্বের অন্যতম সমৃদ্ধ অর্থনীতির দেশ।
(Click:) অ্যাঙ্গাস ম্যাডিসন (পরিমাণগত সামষ্টিক অর্থনৈতিক-ইতিহাস বিশেষজ্ঞ ব্রিটিশ অর্থনীতিবিদ)-এর নিরূপণ অনুযায়ীঃ
সেই সময় বিশ্বের মোট GDP- এর প্রায় ২৪-২৫% ছিল একা ভারত।

  • বিশ্ববিখ্যাত সূক্ষ্ম তুলো ও রেশমের বস্ত্র।
  • মশলা, ধাতু, নীল, চা, মূল্যবান পাথর।
  • উন্নত ধাতুশিল্প ও জাহাজ নির্মাণ।
  • বৈচিত্র্যময় কৃষি।

এসবই ভারতকে বৈশ্বিক বাণিজ্যের একটা কেন্দ্রবিন্দুতে স্থাপন করেছিল।
অর্থনীতি ছিল প্রাণবন্ত, বাজার সক্রিয় এবং কৃষি কাঠামো ছিল তুলনামূলকভাবে ভারসাম্যপূর্ণ।

ব্রিটিশদের আগমনঃ বাণিজ্যের আড়ালে সাম্রাজ্য

ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি প্রথমদিকে কেবল বাণিজ্য করতে এসেছিল।
কিন্তু ধীরে ধীরে বাণিজ্য, সীমাহীন লোভে পরিণত হয় সামরিক শক্তিতে,
আর সামরিক শক্তি, পরবর্তীতে রূপ নেয় রাজনৈতিক দখলে।
১৭৫৭ সালের পলাশির যুদ্ধ ছিল সেই মোড়–
যখন ভারতীয় সম্পদের উপর ব্রিটিশদের পূর্ণ নিয়ন্ত্রণের পথ খুলে যায়।

এরপর যা ঘটল, তা ছিল পরিকল্পিত অর্থনৈতিক পুনর্গঠন–
ভারতের ক্ষতি ও ব্রিটেনের লাভকে কেন্দ্র করে।

কিভাবে লুণ্ঠন চালানো হয়েছিলঃ

ব্রিটিশ শোষণের বহুমাত্রিক কৌশল

কৃষিকে নগদ ফসলের বন্দিতে পরিণত করা

সুস্থ কৃষি ব্যবস্থাকে একরৈখিক করে তুলেছিল ব্রিটিশ শাসন।
তুলো, নীল, আফিম, এমন সব নগদ ফসল চাষে বাধ্য করা হয়,
যার ফলে খাদ্যশস্যের উৎপাদন ধীরে ধীরে কমে যায়।
ফলে দুর্ভিক্ষ আরও মারণরূপ ধারণ করে।

(খাদ্যে ভেজালের কিছু সহজ উদাহরণ…
পেট্রোল-ডিজেলের মধ্যেও কিভাবে ভেজাল ঢুকে পড়ছে।
কি দিয়ে ভেজাল করা হয়, এর ফল কি,
এবং খুব সহজেই তা চিহ্নিত করতে পারি।

পড়ুন– Click: ভেজাল– এক নিঃশব্দ ঘাতক!)

দেশীয় শিল্প ধ্বংস

ভারতের সুপ্রাচীন সূতিকাগার শিল্পকে ধ্বংস করতে ব্রিটিশরা উচ্চ কর,
আমদানি নিষেধাজ্ঞা ও সস্তা ব্রিটিশ পণ্য বাজারে ঢোকায়।
শোষিত হাজারো কারিগর, তাঁতি, শিল্পী জীবিকা হারায়।

কর ও রাজস্বের সরাসরি লুণ্ঠন

ভারতীয় কৃষকের কাছ থেকে সংগৃহিত করের একটা বিশাল অংশ,
সোজা ব্রিটেনে পাঠানো হতো।
আর এই অর্থ দিয়েই ব্রিটেন গড়ে তোলে শিল্পবিপ্লব, রেলপথ, জাহাজ নির্মাণ ও সামরিক শক্তি।

বাণিজ্যের ভারসাম্যকে উল্টো করে দেওয়া

ভারত থেকে কাঁচামাল নেওয়া হতো, আর ব্রিটেন থেকে প্রস্তুত পণ্য চাপিয়ে দেওয়া হতো।
ফলে ভারতীয় অর্থনীতিতে বিনিয়োগ বন্ধ হয়ে যায়,
পাশাপাশি ব্রিটিশ কলকারখানা সমৃদ্ধ হতে থাকে।

দুর্ভিক্ষে মৃত্যুর দায়

ইতিহাসের ভয়াবহ ও মর্মান্তিক দুর্ভিক্ষগুলো (১৭৭০, ১৮৩৭-৩৮, ১৮৭৬-৭৮, ১৯৪৩)-
এর পিছনে ছিল ব্রিটিশ নীতি।
যেখানে খাদ্যশস্য রপ্তানি করা হচ্ছিল তাদের সাম্রাজ্যে।
এদিকে ভারতীয় মানুষ অনাহারে, অসহায়ভাবে রাস্তায় ধুঁকে মারা যাচ্ছিল।

৪৫ ট্রিলিয়ন ডলারের ক্ষতিঃ

(Click:)’ড্রেইন অব ওয়েলথ’-এর পরিমাণ

বিখ্যাত অর্থনৈতিক-ইতিহাসবিদ ও প্রফেসর–
(Click:) উৎসা পটনাইক ও প্রভাত পটনাইক (স্বামী-স্ত্রী)-এর গবেষণা বিশ্লেষণ অনুযায়ী,
ব্রিটিশ শাসনের দুই শতাব্দীতে ভারত থেকে লুণ্ঠিত সম্পদের বর্তমান মূল্য–
আনুমানিক প্রায় ৪৫ ট্রিলিয়ন ডলার হতে পারে।

আর এই পরিমাণ অর্থ ভারতকে নিঃসন্দেহে সুপারপাওয়ার-এ পরিণত করতে পারে।

এটা শুধুঃ

  • সোনা বা রূপো নয়,
  • শুধু কর নয়,
  • শুধু পণ্য নয়।

এতে অন্তর্ভুক্ত আছে–
শিল্প ধ্বংসের ক্ষতি, মানবসম্পদের ক্ষতি, কৃষির ভারসাম্যহীনতা,
দুর্ভিক্ষের মৃত্যুহার, মূল্যমানের পরিবর্তন এবং শতবর্ষ ব্যাপী বিনিয়োগ-বঞ্চনার যৌথ প্রভাব।
এটা অর্থনৈতিক ইতিহাসের সর্ববৃহৎ লুটের অন্যতম উদাহরণ।

স্বাধীনতার সময় ভারতের পরিস্থিতি

১৯৪৭ সালে স্বাধীনতার সময়–

  • ভারত বিশ্বের GDP- এর মাত্র ৪% ধরে রাখতে পেরেছিল। 
  • দারিদ্র সর্বাধিক।
  • শিল্প প্রায় শূন্য।
  • কাঁচামাল রপ্তানি নির্ভর অর্থনীতি।
  • শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও বিজ্ঞান চরম অনুন্নত।

একসময়ের সমৃদ্ধ উপমহাদেশ যেন কঙ্কালসার হয়ে পড়ে।

(পাঞ্জাবের এক গ্রাম থেকে উঠে আসা এক তরুণ–
যার স্বপ্ন ছিল না দুর্দান্ত কথা বলা, না ছিল কোনো বিশেষ সম্পর্ক;
না ছিল টাকা বা পরিচয়।
ছিল কেবল এক ধরণের নীরব আগুন।

পড়ুন– Click:
এই আগুনই পরে হয়ে গেল বলিউডের সবচেয়ে উজ্জ্বল শিখা)

যদি ব্রিটিশরা না আসত–

সম্ভাব্য বিকল্প ইতিহাস

ইতিহাসে ‘যদি’ বলে কিছু নেই– তবু যুক্তিযুক্ত বিশ্লেষণ ইঙ্গিত করেঃ

  • ভারত তার বস্ত্রশিল্পের বৈশ্বিক আধিপত্য ধরে রাখতে পারত।
  • জাহাজ নির্মাণ, ধাতু শিল্প ও কৃষি আরও উন্নত হতো।
  • বাজার ও শিল্পে বিনিয়োগ বহুগুণ বাড়ত।
  • আঞ্চলিক শক্তিগুলোর উন্নয়ন এক বৈচিত্র্যময় ফেডারেল অর্থনীতি তৈরি করত।
  • ভারত ২০শ শতকের মাঝামাঝিই সুপারপাওয়ারে পরিণত হওয়ার সম্ভাবনা রাখত।

ভারতের প্রযুক্তিগত ও শিল্প উৎপাদন ক্ষমতা বৃহৎ শক্তিগুলোর সমতুল্য স্থান অর্জন করতে পারত।

যদি ভারতও একদিন হিসেব নিতে যায়ঃ

ইতিহাসের শোধ, ন্যায়বোধের শিক্ষা

যদি একদিন ভারতও ব্যবসার অজুহাতে ব্রিটিশ উপনিবেশে গিয়ে বলে,
“এবার হিসেবটা চুকিয়ে নেওয়া যাক।
ভারত থেকে শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে ডাকাতি করে নিয়ে যাওয়া যে সম্পদ,
সেগুলো এবারে ফিরিয়ে নেওয়ার সময় হয়েছে– দাও।”

তাহলে দৃশ্যটা ঠিক কেমন লাগবে?

ইতিহাসের বেদনাকে এতদিন ধরে ভারত তো বুকে বয়েই এসেছে।
কারণ এই ভূখণ্ডের সংস্কৃতি লুণ্ঠনের নয়, নির্মাণের।

কিন্তু ধরা যাক, ভারত এই কাজটা করল শুধু অনুভব করানোর জন্য–
শিক্ষা দেওয়ার উদ্দেশ্যে দেখাতে যে, অন্যকে শোষণ করে অস্থিচর্মসার করলে,
ঠিক কেমন লাগে।
তা কতটা অন্যায়, ভুল, আর নিজের ভুলের দায় স্বীকার করাই প্রকৃত সভ্যতার পরিচয়।

এমনকি এক প্রতীকী প্রতিশোধের দিনে পৃথিবী হয়তো বুঝে যাবে–
ক্ষমতা নয়– নৈতিকতাই আসল শক্তি।

অথচ আমরা তখন শুধুই বোঝাবো–
“Every action has an equal and opposite reaction”,
যে সূত্রের জন্মদাতা তারাই।

ভবিষ্যৎ ভারতের দায়িত্বঃ

ইতিহাসের ক্ষত ভুলে নয়, বুঝে সামনে এগোনো

ভারতের পুনর্জাগরণ আজও চলছে।
বিজ্ঞান, আইটি, অবকাঠামো, প্রতিরক্ষা, মহাকাশ গবেষণা, বৈশ্বিক বাণিজ্য–
সব ক্ষেত্রে অগ্রগতি দৃশ্যমান।
তবে অতীতের ক্ষত বুঝে আঘাতের গভীরতা উপলব্ধি করাও জরুরি।

আমাদের করণীয়

  • ইতিহাসকে সত্যভিত্তিক করা ও শিক্ষার অংশ করা।
  • দেশীয় শিল্পকে পুনর্জাগরণের নীতি গ্রহণ।
  • কৃষির বৈচিত্র্য ও আত্মনির্ভরতা বৃদ্ধি। 
  • প্রযুক্তি ও মানবসম্পদে বৃহৎ বিনিয়োগ।
  • সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য পুনরুদ্ধার। 

ব্রিটিশ উপনিবেশবাদ শুধু সম্পদ লুণ্ঠন করেনি,
এটা একটা সভ্যতার আত্মাকে ক্ষতবিক্ষত করেছে।
দুটো শতকের পরিকল্পিত শোষণ ভারতকে তার স্বাভাবিক উন্নয়নের পথ থেকে সরিয়ে দেয়।
কিন্তু ইতিহাসের এই নির্মম অধ্যায় আজ ভারতকে আরও শক্তিশালী করেছে।
যেখানে পুনর্গঠনের জেদ, আত্মসম্মান ও অগ্রগতির আকাঙ্ক্ষাই নতুন শক্তি।
ভারত আবার দাঁড়াচ্ছে–
আর এবার নিজের শক্তিতে, নিজের অধিকারে, নিজের ভবিষ্যৎ গড়ে।

(পৃথিবীর ‘Real-time Most Polluted Cities‘ তালিকায় যে চিত্র ফুটে ওঠে,
তা দেখলে মনে হয়–
আমরা যেন ধীরে ধীরে একটা বিশাল গ্যাস চেম্বার জাতি হয়ে উঠছি।
পড়ুন– Click: AQI গাঢ় লালঃ ভারতের ভবিষ্যত কি তবে ভয়ঙ্কর?)

 

Join Our Newsletter

We don’t spam! Read our privacy policy for more info.

About Articlesবাংলা

Welcome to Articlesবাংলা – a vibrant hub of words, ideas, and creativity. This website is the personal archive and creative expression of Tanmoy Sinha Roy, a passionate writer who has been exploring the art of writing for more than seven years. Every article, prose-poem, and quotation you find here reflects his journey, experiences, and dedication to the written word. Articlesবাংলা aims to inspire readers by offering thought-provoking insights, celebrating the richness of Bengali language and literature, and creating a space where ideas, imagination, and culture connect. Whether you are seeking literary reflections, prose-poems, diverse articles, or meaningful quotations, you are invited to explore, reflect, and be inspired.

Check Also

শেখ হাসিনার মৃত্যুদণ্ড: বিচারের পাল্লায় ফাঁসির দড়ি ও ন্যায়বিচার, বাংলাদেশের রাজনৈতিক বিতর্কের প্রতীকী চিত্র।

শেখ হাসিনার মৃত্যুদণ্ডঃ বিচার নাকি প্রতিশোধ?

শেখ হাসিনার মৃত্যুদণ্ডঃ বিচার নাকি প্রতিশোধ? বাংলাদেশে সম্প্রতি (Click:) সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার বিরুদ্ধে ঘোষিত …

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *