গর্তের দর্শন
ভারতে রাস্তা দেখতে বের হওয়া মানে,
এক ধরণের অ্যাডভেঞ্চার ট্যুরিজম–
যেখানে প্রতিটা গর্ত আপনাকে জীবনের গভীর দর্শন শেখায়।
একটা গর্ত বলে–
“জীবনে হঠাৎ নেমে যাওয়ার জন্য প্রস্তুত থাকুন।”
আরেকটা গর্ত বলে–
“যা উপরে ওঠে, তা নিচে নেমেই যাবে–
বিশেষত যদি সেটা আপনার সাসপেনশন হয়।”
রাস্তার উপর দিয়ে হাঁটলে মনে হয়, রাস্তা আসলে তৈরি হয়নি–
বরং প্রেমে ব্যর্থ বিটুমেন-এর টুকরো জোড়া লাগিয়ে,
কিছু একটা বানানো হয়েছে।

বর্ষা এলে রাস্তা আরও দার্শনিক হয়ে ওঠে।
তখন রাস্তা বলে–
“আমি আসলে তরল… আপনি আমাকে কঠিন ভেবেছিলেন, ভুল আপনার।”
এই দেশে রাস্তা ভাঙে, কিন্তু যার কাজ রাস্তা বানানো, তার বিবেক ভাঙে না।
আমরা নম্রভাবে জিজ্ঞেস করলে তারা বলে–
“স্যার! প্রাকৃতিক দুর্যোগ!”
যেন হালকা বৃষ্টি-টিপটিপকেও ২০০৪ সালের সুনামি বানিয়ে দিতে পারলে,
তারা মনে মনে ভীষণ স্বস্তি অনুভব করে।
তবুও আমরা মেনে নিই।
কারণ আমরা ভারতীয়।
আমরা আরাম খুঁজি না– বিশ্বাস খুঁজি।
তাই গর্তে পড়ে গেলেও বিশ্বাস রাখি– আসছে বছর আবার হবে।
কিন্তু ভাগ্যের পরিহাস হলো–
এই ভারতেই এমন এক রাস্তা আছে, যা গত ৫০ বছরেও ভাঙেনি।
হ্যাঁ– আপনি ঠিকই পড়েছেন।
আমাদের মাঝে এক তপস্বী রাস্তা আছে,
যে গর্তের মোহে পড়েনি, ঠিকাদারের প্রতারণায় ভাঙেনি;
আর বর্ষাকেও বলেছে–
“দূর হ, আমি স্থির।”
এর নাম– “জঙ্গলি মহারাজ রোড (Click: JM Road), পুনে।
(এই দীর্ঘ সংগ্রামের ইতিহাসেই এক রহস্যময়, দুঃসাহসী নাম–
অ্যাগনডিস (Click: Agnodice)।
কি ছিল তাঁর, ইতিহাস বদলে দেওয়া সেই দুঃসাহসিক পদক্ষেপ?
পড়ুন– Click: অ্যাগনডিস (Agnodice)– এক দুঃসাহসিক নারীর নিষেধ-ভাঙা গল্প!)
ভারতের রাস্তা কেন ভেঙে পড়েঃ
হাসির সাথে দুঃখের বিজ্ঞান
A. “লোয়েস্ট টেন্ডার” নামক ভারতীয় ট্র্যাজিকমেডি
যে দেশ বিয়ে ঠিক করার সময় “সবচেয়ে ভালো পাত্র” খোঁজে,
সেই দেশ রাস্তা তৈরি করায় “সবচেয়ে কম দামে বানাবে কে”– সেটাই খোঁজে!
ফল–
যার কাজ করার চেয়ে অজুহাত বানানোর দক্ষতা বেশি,
সে-ই রাস্তাও বানায়।
B. কাঁটাছেড়ার ভারতীয় সংস্কৃতি
রাস্তা তৈরি হলো?
বাহ!
এবার সব বিভাগ এসে একে একে বলবে–
“আমরাও একটু কেটে নেব।”
বিদ্যুৎ বিভাগ, জল বিভাগ, গ্যাস বিভাগ, টেলিকম কোম্পানি;
সবাই মিলে নতুন রাস্তা দেখে ভাববে–
“এটার ছাতির উপরই কেবল বসালে ভালো লাগবে।”
রাস্তা কেটে কেটে এমন অবস্থা,
যেন মেডিকেল কলেজের ফার্স্ট ইয়ারের ছাত্ররা,
একটা মানবদেহ নিয়ে প্র্যাকটিক্যাল করছে।
C. রাস্তার ড্রেনেজ সিস্টেমঃ
ভাঙনের ওপেন সিক্রেট
ভারতের অনেক রাস্তাই ড্রেনেজবিহীন প্রেমের মতো;
বৃষ্টি নামলেই ভেসে যায়।
ফলে রাস্তা নরম হয়, আর নরম জিনিস নিয়ে গাড়ি চললে কি হয়,
তা তো আমরা জানিই।
D. গুণগত মান? ওটা আবার কি?
রাস্তায় বিটুমেন কম দিলে নাকি বাজেট বাঁচে।
- ঠিকাদার খুশি।
- ইঞ্জিনিয়ার খুশি।
- রাজনীতি খুশি।
- চারিদিকে খুশির জোয়ার;
শুধু রাস্তা দুঃখে ভেঙে পড়ে। - এবং শেষে পড়ি আমরা।
আর একটা তিক্ত সত্য আছে–
JM Road ইঞ্জিনিয়ার বা কনট্রাক্টররা হয়তো বোকা ছিল,
তাই বিগত ৫০ বছর ধরে তাদের বা তাদের উত্তরসূরীদের জন্য,
এই রাস্তা থেকে আয়ের সুযোগ বন্ধ আছে।
কিন্তু ভারত, বিশেষত পশ্চিমবঙ্গের রাস্তা তৈরিতে যুক্ত;
অনেক মানুষই তুলনামূলকভাবে দূরদর্শী, তাই তাদের আয়ও বেশি।
এখানে প্রকৃতির দোষ ভাবলে ভুল হবে,
এ এক অর্থনৈতিক মডেল।
রাস্তা ভাঙবে– মেরামত হবে– আবার ভাঙবে– আবার টেন্ডার–
এভাবেই বহু মানুষের পকেট ধীরে ধীরে, বৈধভাবে;
বর্ষার জল ঢোকার মতো পরিপূর্ণতা অর্জন করে।
কিন্তু পুনের রাস্তা গর্তের প্রতি বিশ্বস্ত নয়
জঙ্গলি-মহারাজের মতো নাম, শাস্ত্রীয় শক্তির মতো স্থায়িত্ব–
এটাই জঙ্গলি মহারাজ রোড।
এই রাস্তা যেন রাস্তা নয়–
আজকের দিনে একটা বিরল প্রজাতির তপস্বী;
যে ভারতের সব রাস্তার সামনে ধ্যান করে বলে–
“শান্ত হও, আমার সন্তানরা; স্থায়িত্ব অর্জন করো।”
A. নির্মাণের পিছনে ছিল সততা–
যা আজ ডাইনোসরের ক্লোজ
রাস্তাটা যখন তৈরি হয়–
ইঞ্জিনিয়াররা বলেছিল,
“কম বাজেটে নয়, ভালো মানে কাজ করবো।”
এটা আজ যদি কোনো মিটিং-এ কেউ বলে,
কফি মুখ থেকে বেরিয়ে এসে প্রোজেক্টর-এ লেগে যাবে।
B. তখন টেকনিক সহজ, মানুষ মনোযোগী–
এখন টেকনিক জটিল, মানুষ অসচেতন
তখনকার নির্মাণ ছিল সোজা–
উচ্চমানের অ্যাগ্রিগেট, যথেষ্ট বিটুমেন, কঠোর কম্প্যাকশন।
এখন টেকনিক আরও প্রো-লেভেল–
কিন্তু যারা কাজ করছে, তারা মনে মনে ভাবছে;
“হুঁ! এমনিই চলবে।”
C. ড্রেনেজ এত ভালো যে বৃষ্টিও হিংসে করে
JM Road এর ড্রেনেজ সিস্টেম এমন,
বৃষ্টি নেমে ভাবতে থাকে–
“এখানে জমে থাকা যায় না ভাই, চলে যাই।”
E. ভবিষ্যৎ ভেবে রাস্তা তৈরি হয়েছিল,
এটাই তার গোপন রহস্য
কেবল, পাইপ, ড্রেন;
সবকিছুর জায়গা আগে থেকেই রাখা ছিল।
ফলে রাস্তা কেটে অপ্রয়োজনীয় কাজ করা যায় নি।
এটাই তার অর্ধশতাব্দীর অমরত্বের মূল মন্ত্র।
রাস্তা শুধু রাস্তা নয়–
সে আমাদের জীবনের শিক্ষক
JM Road আমাদের শেখায়ঃ
- গুণগত মানে বিনিয়োগ করো– সস্তা জিনিস দ্রুত ভেঙে পড়ে;
আর তা জিনিস, সম্পর্ক, চরিত্র– সব জায়গাতেই সত্যি। - কাজ ভালো করতে চাইলে ভবিষ্যৎ ভাবতে হয়।
হুটহাট সিদ্ধান্ত, দুমদাম কাঁটাছেড়া, জীবন ও রাস্তাকে সমানভাবে নষ্ট করে। - রক্ষণাবেক্ষণ সবকিছুর আয়ু বাড়ায়।
সে দাম্পত্য জীবন হোক বা রাস্তার বিটুমেন– মেইনটেনেন্স খুব জরুরি। - সৎ মানুষ থাকলে ভালো কাজ হয়; কম থাকলেও হয়–
জঙ্গলি মহারাজ রোডের গল্পে তা প্রমাণিত।
রাস্তার হাস্যরস, জীবনের দার্শনিকতা
ভারতের রাস্তা একেকটা গর্ত দিয়ে আমাদের শেখায়–
“জীবনে স্থিরতা চাইলে গভীর ভিত্তি তৈরি করো।”
আর সেই ভারতেরই JM Road শেখায়–
“সঠিক সিদ্ধান্ত, সঠিক কাজ, আর দায়িত্ববোধ থাকলে,
একটা রাস্তা ৫০ বছর বা এরও বেশি টিকে যেতে পারে, আর মানুষ তার চেয়েও বেশি।”
রাস্তা ভাঙলে মানুষ রাগ করে; ভালো রাস্তা মানুষকে গর্ব দেয়।
ঠিক যেমন–
ভালো সম্পর্ক ভরসা দেয়, খারাপটায় প্রতিদিন গর্ত পড়ে।
রাস্তার গল্পে দেশের চরিত্র
ভারতের ভাঙা রাস্তা আমাদের দেশের অব্যবস্থার প্রতিচ্ছবি।
আর সেই ভারতেই– JM Road আমাদের সম্ভাবনার প্রতিচ্ছবি।
একদিকে আছে ভাঙ্গন, গর্ত, অজুহাত।
অন্যদিকে আছে জেদ, নীতি, টেকসইতার দর্শন।
দেশের চরিত্র পাল্টাতে গেলে রাস্তা থেকেই শুরু করতে হবে।
এমন রাস্তা চাই, যা গর্তকে ভয় পায় না।
দায়িত্বহীনতাকে জায়গা দেয় না, আর সময়কে মুখে চপেটাঘাত করে বলে–
“ভাঙব না, দাঁড়িয়ে থাকবো।”
এটাই ভবিষ্যৎ ভারতের রাস্তা এবং আমাদের জীবনদর্শনের সবচেয়ে বড় শিক্ষা।

সতর্কবার্তাঃ ভারতের সড়ক দুর্ঘটনা
ভারতের রাস্তাগুলো শুধু স্থায়িত্ব এবং গুণগত মানের শিক্ষাই দেয় না;
দেখায় বাস্তব তিক্ত সত্যও।
২০২৩ সালে ভারতে প্রায় ৪,৮০,৫৮৩ টা সড়ক দুর্ঘটনা ঘটেছে,
যার ফলে অনিচ্ছাকৃত প্রাণ গেছে– ১,৭২,৮৯০ জনের।
(সূত্রঃ Click: MoRTH বার্ষিক রিপোর্ট ২০২৩)

এর মানে দাঁড়ায়–
প্রতিদিন গড়ে প্রায় ৪৭৪ জন প্রাণ হারিয়েছে,
আর প্রতি ৩ মিনিটে এক জনের মৃত্যু হয়েছে রাস্তায়।
দুর্ঘটনার প্রধান কারণ?
অতিরিক্ত গতি।
মোট মৃত্যুর প্রায় ৭১-৭২% অতিরিক্ত গতির ফলেই ঘটে।
এর পাশাপাশি ২০২২ সালের তথ্য অনুযায়ী–
সেই বছরে আহতের সংখ্যা ছিল ৪,৪৩,৩৩৬ জন।
(সূত্রঃ MoRTH বার্ষিক রিপোর্ট ২০২২)
বিশেষত যুব সমাজ–
১৫-২৯ বছর বয়সী তরুণরা সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ,
কারণ এই বয়স-গোষ্ঠীর মৃত্যুর অন্যতম প্রধান কারণই হল সড়ক দুর্ঘটনা ।
এ তথ্য আমাদের মনে করিয়ে দেয়– রাস্তা ভালো হলে জীবনও সুরক্ষিত থাকে।
(“যার টাকা আছে, তার কাছে আইন খোলা আকাশের মত,
আর যার কাছে টাকা নেই, তার কাছে আইন মাকড়সার জালের মত।”
সেই হিসেবে আমরা সাধারণ মানুষ,
তাই আইন আমাদের জীবনের প্রতিটা ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ একটা বিষয়।
পড়ুন– Click:
আইনের খুঁটিনাটিঃ সাধারণ মানুষের জন্য আইনের জ্ঞান–
না জানলে পড়তে পারেন বিপদে!)
(Articlesবাংলা – আমাদের, আপনাদের পরিবার, সাথে যুক্ত থাকুন।
লেখাটা ভালো লাগলে,
শেয়ার করে বন্ধুদের পড়ার সুযোগ করে দিন।
মন্তব্য করে জানান আপনাদের মূল্যবান মতামত।)
Articlesবাংলা Bangla Articles, Quotes & Prose-Poetry / বাংলা প্রবন্ধ, উক্তি ও গদ্য-কবিতা।




