“শীতের আমেজ মাখা কোন এক ভোরে অথবা হঠাৎ ছড়ে যাওয়া হাঁটুতে যে সুগন্ধি প্রলেপটা
আমাদের তিন প্রজন্ম ধরে আগলে রেখেছে, তার কথা ভাবুন তো একবার।
নামটা নিশ্চই জানতে আগ্রহ জন্মাচ্ছে– বোরোলিন:
সেটার রং গাঢ় সবুজ, আর তার ভিতরে লুকিয়ে আছে বাঙালির
এমন এক অদম্য সংকল্প, যা ব্রিটিশ আধিপত্যের ভিত নাড়িয়ে দিয়েছিল।
সেই স্পর্ধা, সেই মমতা আর নিরাময়ের এক অনন্য আখ্যান আজ শোনাবো।

উপনিবেশিক সময় ও
আত্মসম্মানের সংকট:
বিংশ শতাব্দীর শুরুর দিকের ভারত ছিল এক অদ্ভুত দ্বন্দ্বের ভূমি।
একদিকে বিদেশি শাসনের দাপট, অন্যদিকে নিজের পরিচয় খোঁজার ব্যাকুলতা।
তখন বাজার দাপিয়ে বেড়াত বিলিতি সাবান, মলম, ওষুধ, প্রসাধনী।
সেগুলো দামি, চকচকে আর তথাকথিত ‘বিশ্বাসযোগ্য ও আভিজাত্যের’ প্রতীক।
দেশি জিনিস মানেই ছিল কম মানের— এই ধারণা আমাদের মজ্জায় এমনভাবে ঢুকে গিয়েছিল যে,
নিজের তৈরি কিছু ব্যবহার করাও যেন একরকম ঝুঁকি নেওয়া,
এই মানসিক দাসত্বই ছিল আসল শাসন।
ঠিক এই সময়েই কিছু মানুষ বুঝতে পেরেছিলেন— স্বাধীনতা শুধু রাজনৈতিক নয়, মানসিকও।
আর মানসিক স্বাধীনতার শুরু হয় দৈনন্দিন জীবনের ছোট ছোট সিদ্ধান্ত থেকে।
তাঁরা বিশ্বাস করতেন, যতক্ষণ না আমরা নিজেদের প্রয়োজনীয় দ্রব্য নিজেরা উৎপাদন
করতে পারছি, ততক্ষণ এই শৃঙ্খল মুক্তি অসম্ভব।
বিস্তৃতির অন্তরালে
এক স্বপ্নদ্রষ্টা:
গল্পটা শুরু হয় কলকাতার এক প্রাচীন পাড়ায়।
গলিগুলো তখন সংকীর্ণ, দুপাশে লাল ইটের সারিবদ্ধ বাড়ি।
সেই ভিড়ের মাঝে বাস করতেন এক তেজস্বী মানুষ— নাম তার গৌরমোহন দত্ত।
সময়টা তখন ব্রিটিশ শাসনের মধ্যগগন, আমাদের বাজার তখন বিলিতি পণ্যে ঠাসা।
সামান্য কাটা-ছেঁড়া কিংবা শীতের রুক্ষতার হাত থেকে বাঁচতেও আমাদের
তাকিয়ে থাকতে হতো সাহেবদের তৈরি ওষুধের দিকে।

গৌর মোহন বাবুর মনে তখন এক অস্থির প্রশ্ন জেগেছিল— “আমাদের দেশের মাটি,
আমাদের নিজস্ব জ্ঞান কি পারবে না সাধারণ মানুষের ক্ষততে প্রলেপ দিতে?
আমরা কি সবকিছুর জন্যই অন্যের মুখাপেক্ষী হয়ে থাকবো?”
এই এক বগগা জেদ থেকেই শুরু হলো এক নীরব বিপ্লব।
১৯২৯ সালে কলকাতার এক কোণে ছোট একটা ঘরে তিনি বসালেন তাঁর স্বপ্নের কারখানা।
নাম দিলেন (দেখুন) ‘জি. ডি ফার্মাসিউটিক্যালস।’
গৌর মোহন দত্ত কোন রাজনীতিবিদ ছিলেন না, কোন বিপ্লবী সংগঠনের মুখ ও ছিলেন না।
তিনি ছিলেন এক সাধারন মানুষ— যিনি অসাধারণভাবে ভাবতে শিখেছিলেন।
ক্ষত, ফাটা হাত, শীতের জ্বালা—
এই সমস্যাগুলো খুব বড় কিছু নয়, কিন্তু এগুলোই মানুষের শরীরকে মনে করিয়ে দেয়,
সে যত্ন চায়।
গৌরমোহন দত্ত বুঝেছিলেন, দেশের মানুষ যদি নিজের শরীরের যত্নই বিদেশী পণ্যের উপর
ছেড়ে দেয়, তাহলে আত্মসম্মান, দেশের মর্যাদা কোথায় গিয়ে দাঁড়াবে?
আর এই ভাবনাই তাঁকে ঠেলে দিয়েছিল পরীক্ষাগারের পথে।
এক অলৌকিক
নিরাময়ের সন্ধানে–
১৯২৯-এর সেই
নিভৃত সাধনা:
১৯২৯ সাল।
কলকাতার এক প্রাচীন পাড়ায় ছোট্ট একটা কারখানা।
সেখানে কোনো আধুনিক প্রযুক্তির বিলাসিতা ছিল না, ছিল না বিদেশি যন্ত্রপাতির বাহার।
গৌরমোহন দত্তের একমাত্র সম্বল ছিল, তাঁর নিজের মেধা আর বুকের
গভীরে থাকা প্রবল দেশপ্রেম।
কারখানার ভিতরে দিনের পর দিন চলল অন্তহীন পরীক্ষা-নিরীক্ষা।
- কখনও মলমটা খুব বেশি শক্ত হয়ে যেত, কখনও বা এতটাই পাতলা যে ত্বকে বসত না।
- কখনও দেখা যেত মিশ্রণটা ত্বকে জ্বালা ধরাচ্ছে, নয়তো তা প্রত্যাশা মত কাজ করছে না।
- শীতের দিনে যে মলম কাজ করতো, দেখা যত গরম আসতেই তা গলে জল হয়ে গেছে।

অনেকেই হয়তো এই ব্যর্থতার পাহাড় দেখে এই জায়গায় এসে হাল ছেড়ে দিতেন,
কিন্তু গৌরমোহন দত্ত মনোবল হারাননি, থেমে থাকেননি।
কারণ তাঁর লক্ষ্য কেবল একটা পণ্য বানানো ছিল না— তিনি বানাতে চাইছিলেন বাঙালির
দীর্ঘস্থায়ী এক ‘ভরসা।’
তিনি চেয়েছিলেন এমন এক ঘরোয়া ওষুধ, যা গরিব-ধনী নির্বিশেষে সবার কাজে আসবে।
যে মলম ত্বককেও নরম রাখবে, প্রাথমিক ক্ষত সারাবে আবার সংক্রমণ থেকেো রক্ষা করবে।
অবশেষে বহু তিতিক্ষার পর, ল্যাবরেটরির আধারে ধরা দিল কাঙ্ক্ষিত সেই
সাদা রঙের ঘন নির্যাস।
জন্ম নিল এমন এক ক্রিম, যা সাধারণ মানুষের প্রতিদিনের সাধারণ সমস্যার
এক অসাধারণ সমাধান।
নাম রাখা হলো— বোরোলিন।

বোরিক অ্যাসিড এবং ল্যানোলিন-এর সংমিশ্রণে রাখা এই নামটা হয়তো খুব সাধারণ ছিল,
কিন্তু সেই ছোট টিউবের ভিতরে লুকিয়ে ছিল পরাধীন ভারতের এক অপারেজেয় মানুষের
অসাধারণ এক সংকল্প।
[ মানুষ যখন সাফল্যের শিখরে পৌঁছতে শুরু করে, তখন সে ‘সাফল্য’
একটা ছাঁকনির মতন হয়ে যায়।
- কে সেই সাফল্যে প্রকৃত আনন্দ পেল।
- কে শুভাকাঙ্ক্ষী।
- আর কেউ বা ভিতরে ভিতরে ঈর্ষাকাতর হয়ে পড়ল।
সবগুলোই ছেঁকে বেরিয়ে আসে।
এর এক জলজ্যান্ত উদাহরণ আমদের (পড়ুন) নেতাজী সুভাষচন্দ্র বসু।
ভারতের স্বাধীনতার এই সিংহপুরুষকে ব্রিটিশদের কামানের গোলার চেয়েও
বেশি লড়তে হয়েছে ঘরের ভিতরের ঈর্ষার বিরুদ্ধে।
আরও একজন মহাপুরুষ, যাকে একই ঈর্ষার আগুনে পুড়তে হয়েছিল।
পড়ুন সেই মর্মান্তিক কাহিনী–
Link: স্বামী বিবেকানন্দের বিশ্বজয়ের আড়ালে এক অজানা যন্ত্রণার ইতিহাস! ]
বোরোলিন–
নাম যখন দর্শন হয়ে ওঠে:
বোরোলিন— নামটা শুনলে আজও মনে হয়,
- এর মধ্যে কোন আড়ম্বড় নেই।
- কোন বড় প্রতিশ্রুতি নেই, ঠিক যেমন এর কাজ।
- বোরোলিন কখনো দাবি করে না যে, সে সব সমস্যার সমাধান।
- সে শুধু বলে— ‘আমি আমার কাজটা ঠিকঠাক করি।’
এই সততাই তাকে আলাদা করেছে অন্যান্য থেকে।
সন্দেহের মেঘ
বনাম স্বদেশী তেজ:
আজকের দিনে আমরা যা খুব সহজে মেনে নিই, ১৯৩০ এর দশকে তা ততটা সহজ ছিল না।
মানুষ শুরুতে সন্দিহান ছিল— বিলিতি ‘অ্যান্টিসেপটিক’ ছাড়া কি কাজ হবে?
কিন্তু কাজই তো সব তর্কের অবসান ঘটায়।
ধীরে ধীরে কলকাতার অলিগলি থেকে বাংলার গ্রামগঞ্জে ছড়িয়ে পড়ল এক অদ্ভুত কাহিনী।
- শোনা গেল পাড়ার এক বৃদ্ধার জঘন্য হয়ে থাকা গোড়ালি ফাটা, জাদুর মতো সেরে গেছে।
- কোন শিশুর খেলাধুলার ফাঁকে ছড়ে যাওয়া হাঁটুতে এই প্রলেপ দিতেই, সে ব্যথা ভুলে ঘুমিয়ে পড়েছে।
- শীতের রাতে ফাটা ঠোঁটের অসহ্য যন্ত্রণা মিটিয়ে দিল সেই এক চিমটি মলম।

মানুষ তখন ওষুধের নাম ভুলে গিয়ে শুধু একটা রঙের কথা বলতে শুরু করলো—
“ওই সবুজ টিউটটা কোথায়, দাও তো!”
কোনো চটকদার বিজ্ঞাপন ছাড়াই বোরোলিন হয়ে উঠলো বাঙালির ঘরের অংশ।
আজকের যুগে কোটি কোটি টাকা খরচ করে রঙিন বিজ্ঞাপন দেওয়া হয়।
বড় বড় সিনেমা তারকারা এসে অন্যের গুণগান করেন।
কিন্তু কোন চটকদার বিজ্ঞাপন ছাড়াই
বোরোলিন ধীরে ধীরে মানুষের মনের ভিতরে নিজের জায়গা করে নিয়েছিল।
আজও শীতের রাতে যখন হাত ফাটে, বা হঠাৎ কেটে যায় আঙুল— তখন মানুষ কোনো
বিজ্ঞাপনের কথা ভাবে না, তারা কেবল বলে ওঠে, ‘বোরোলিন আছে তো?’
এই বিশ্বাস বিজ্ঞাপনের মাধ্যমে কেনা নয়, মানুষের দ্বারা অর্জিত।
বোরোলিন–
স্বাধীনতার লড়াইয়ের
‘অঘোষিত সৈনিক’
ভারতের স্বাধীনতার লড়াই তখন চরম সীমায়।
একদিকে দেশবন্ধু চিত্তরঞ্জন দাস, অন্যদিকে নেতাজি সুভাষ চন্দ্রের ডাক—
সবকিছু মিলে এক উত্তাল সময়।
সেই সময় স্বদেশী পণ্য ব্যবহার করা ছিল এক রকমের দেশ ভক্তি।
বোরোলিন হয়ে উঠল সেই দেশভক্তির এক নীরব ধারক।
যখন পরাধীন ভারতের মানুষ বিলিতি প্রসাধনী বর্জন করে হাতে ঐ সবুজ টিউবটা তুলে নিতেন,
তখন তাঁরা কেবল কোনো মলম ব্যবহার করতেন না,
তাঁরা আসলে ব্রিটিশ আধিপত্যের মুখে এক টুকরো অবজ্ঞা প্রাণ খুলে ছুঁড়ে দিতেন।

১৯২৯ থেকে ১৯৪৭— বোরোলিন কেবল ব্যবসায়িক উন্নতি করেনি, এটা বাঙালির
আত্মমর্যাদাকেও রক্ষা করেছিল।
বোরোলিন সেই সময় কোন মিছিল করেনি, কোন স্লোগান, ভাষণ দেয় নি।
সে চুপচাপ মানুষের হৃদয় জয়ের মাধ্যমে ড্রেসিং টেবিলে জায়গা করে নিয়েছিল।
এই নীরব উপস্থিতিই ছিল তার সবচেয়ে বড় সত্যি।
বোরোলিন, প্রজন্মের সেতু–
দাদু থেকে নাতনির সফর:
সময় গড়িয়েছে, ব্রিটিশরা চলে গেছে, আকাশচুম্বি বহুতল ডানা মেলেছে কলকাতার বুকে।
কিন্তু বোরোলিনের সেই ছোট্ট সবুজ টিউবটা বাঙালির জীবন থেকে হারিয়ে যায়নি,
বরং তা হয়ে উঠেছে এক অবিচ্ছেদ্য উত্তরাধিকার।
- বাবার অফিস ফেরত ব্যাগের সেই পুরনো টিউবটা একসময় নিঃশব্দে
ঠাঁই পেল ছেলের স্কুল ব্যাগে। - মায়ের ড্রেসিং টেবিলের আয়নার কোণ থেকে সেই সুগন্ধি কৌটটা, এক সময় পৌঁছে গেল
বিদেশের বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়তে যাওয়া নাতনি সুটকেসে।
পৃথিবীর গতি বদলেছে, হাজারো আধুনিক মহেশচারাইজার বাজারে এসেছে চকচকে
বিজ্ঞাপন আর বড় বড় প্রতিশ্রুতি নিয়ে, আবার কত গেছে হারিয়েও।
কিন্তু বোরোলিন আজও সেই পরিচিত সবুজ রংয়ের টিউবে, এক কালজয়ী চিহ্ন
হয়ে রয়ে গেছে।

বোরোলিন আজ আর শুধু একটা অ্যান্টিসেপটিক ক্রিম নয়—
এক জ্যান্ত স্মৃতি, এক অটুট বিশ্বাস।
এক প্রজন্ম থেকে আরেক প্রজন্মের বয়ে চলা এক গভীর ভালোবাসার গল্প।
একটা ছোট্ট সবুজ টিউবের মহাকাব্য, যার ভিতর লুকিয়ে আছে যত্ন, ভরসা আর
এক শতাব্দী প্রাচীন, দেশীয় গর্ব।
আজ যখন আমরা সেই সুগন্ধি প্রলেপটা গায়ে মাখি,
তখন আসলে আমরা স্পর্শ করি— পরাধীন ভারতের এক স্বপ্নদ্রষ্টার সেই অদম্য জেদকে,
যা আজও আমাদের আগলে রেখেছে।
- [ আজ আপনি হাতে যে স্মার্টফোনটা ধরেছেন।
- যে Wi-Fi সিগন্যাল বাতাসে ভেসে এসে আপনার স্ক্রিনে তথ্য পৌঁছে দিচ্ছে।
- যে মোবাইল নেটওয়ার্ক মুহূর্তে মুহূর্তে আপনার কণ্ঠস্বরকে মাইলের
পর মাইল দূরে পাঠিয়ে দিচ্ছে।
এই সবকিছুর পেছনে যে মৌলিক পদার্থবিদ্যা কাজ করে,
তার পরীক্ষামূলক ভিত্তি তৈরি হয়েছিল এক শতাব্দীরও বেশি আগে
কলকাতার এক নিভৃত পরীক্ষাগারে।
কি, বিশ্বাস করলেন না তো?
পড়ুন প্রায় অনেকেরই অজানা এই কাহিনীটা:
পড়ুন– Link: ১৯ শতকের সেই ল্যাবরেটরি,
যেখানে জন্ম হয়েছিল আজকের Wi-Fi আর 5G-র ফিজিক্স!]
(Articlesবাংলা – আমাদের, আপনাদের পরিবার।
ইমেল আইডি দিয়ে আমাদের সাথে যুক্ত হন।
ফলে যখনই এই ব্লগে কোনো নতুন লেখা পোস্ট করা হবে,
সবার আগে আপনিই পাবেন নোটিফিকেশন।
লেখাটা ভালো লাগলে,
শেয়ার করে বন্ধুদের পড়ার সুযোগ করে দিন।
মূল্যবান মন্তব্যে জানান কেমন লাগলো।)
Articlesবাংলা Bangla Articles, Quotes & Prose-Poetry / বাংলা প্রবন্ধ, উক্তি ও গদ্য-কবিতা।
