ভারতে ব্রিটিশ শাসন:
ইতিহাসের ভিন্ন বয়ান,
দুই দেশের দুই দৃষ্টিভঙ্গি
ভারতে ব্রিটিশ শাসন:
ইতিহাস কেবল অতীতের ঘটনাপ্রবাহ নয়,
এটা একটা জাতির বর্তমান মানসিকতা গড়ার কারিগর।
কিন্তু সমস্যা তখন বাঁধে,
যখন কোন রাষ্ট্র তার নাগরিকদের কাছে সত্যের বদলে কেবল সুবিধাজনক অংশ উপস্থাপন করে।
ব্রিটিশদের ভারত শাসন থেকে শুরু করে বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধ পর্যন্ত—
সবক্ষেত্রেই আমরা দেখি কিভাবে সত্যকে আড়াল করে একটা নির্দিষ্ট ন্যারেটিভ বা বয়ান তৈরি করা হয়।
বিশ্ব ইতিহাসে ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের ভূমিকা নিয়ে বিতর্ক আজও শেষ হয়নি।
বিশেষ করে ভারতকে ঘিরে বিতর্ক আরও তীব্র।
ভারতের অনেক মানুষ মনে করেন ব্রিটিশ শাসন ছিল এক ভয়াবহ অর্থনৈতিক ও সামাজিক শোষণের সময়।
অন্যদিকে বৃটেনের বহু সাধারণ মানুষের কাছে ইতিহাসটা সম্পূর্ণ ভিন্নভাবে উপস্থাপন করা হয়েছে।
ফলে সেখানে মানুষজন বিশ্বাস করেন ব্রিটিশরা ভারতের লুটপাট করতে আসেনি;
বরং একটা পিছিয়ে থাকা সমাজকে আধুনিকতার পথে নিয়ে যাওয়ার দায়িত্ব নিয়েছিল।

এই পার্থক্যের মূল কারণ হল ইতিহাসের বর্ণনা।
একেক দেশে ইতিহাসে এক একেকভাবে শেখানো হয়, ফলে একই ঘটনার দুটো সম্পূর্ণ ভিন্ন ব্যাখ্যা তৈরি হয়।
ভারতের ব্রিটিশ শাসন নিয়ে যে তীব্র সমালোচনা শোনা যায়,
বৃটেনের অনেক মানুষই সেই বর্ণনা শুনে সত্যিই অবাক হয়ে যান।
কারণ তাঁদের শিক্ষাব্যবস্থায় ঔপনিবেশিক ইতিহাস নিয়মিত এমনভাবে উপস্থাপিত হয়েছে,
যেখানে সাম্রাজ্যের সমালোচনার অনেক অংশই অনুপস্থিত বা তুলনামূলকভাবে কম গুরুত্ব পেয়েছে।
ব্রিটিশদের ‘সভ্য করার মিশন’
আড়ালে থাকা শোষণ:
অর্থাৎ, বৃটেনের স্কুলগুলোতে আজও যখন ঔপনিবেশিক ইতিহাস পড়ানো হয়,
সেখানে অত্যন্ত সুকৌশলে “White Man’s Burden” তত্ত্বটা গেঁথে দেওয়া হয়।
ব্রিটিশরা দাবি করে—
“ভারত ছিল এক বর্বর ও অসভ্য দেশ।”
আর তাঁরা সেখানে গিয়েছিল ত্রাণকর্তা হিসেবে।
তাঁদের প্রধান যুক্তিগুলো হল—
অবকাঠামো উন্নয়ন:
তাঁরা বলে যে তাঁরাই ভারতকে রেলওয়ে, ডাক ব্যবস্থা এবং আধুনিক সড়ক ইত্যাদি দিয়েছে।
হ্যাঁ দিয়েছে।
তবে রেলওয়ে, ডাক ব্যবস্থা, আধুনিক সড়ক এসবই ভারতের গহীন থেকে কাঁচামাল দ্রুত বন্দরে নিয়ে যাওয়ার জন্য এবং ব্রিটিশ সৈন্য চলাচলের সুবিধার্থে।
আর এর চড়া মূল্য দিতে হয়েছিল ভারতীয় করদাতাদেরই।
আইন ও শিক্ষা:
আধুনিক আইন ও বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার কৃতিত্ব তাঁরা নেয়।
অথচ ব্রিটিশ শাসনের আগে ভারতে গ্রামভিত্তিক যে শিক্ষা ও বিচার ব্যবস্থা ছিল,
তা ধ্বংস করে তাঁরা এমন এক কেরানি-নির্ভর ব্যবস্থা চালু করেছিল যা কেবল তাঁদের শাসনকে দীর্ঘস্থায়ী করতে সহায়তা করে।
সুপরিকল্পিত দুর্ভিক্ষ
ও অবহেলা:
ব্রিটিশ শাসনের আরেকটা অন্ধকার দিক যা তাদের ইতিহাসে অনুপস্থিত,
তা হল বারবার ঘটে যাওয়া ভয়াবহ দুর্ভিক্ষ।
১৭৭০-এর (দেখুন) ছিয়াত্তরের মন্বন্তর থেকে শুরু করে ১৯৪৩ এর পঞ্চাশের মন্বন্তর পর্যন্ত—
ব্রিটিশদের কর আদায়ের জেদ এবং যুদ্ধকালীন ভূল নীতি লক্ষ লক্ষ ভারতীয়র প্রাণ কেড়ে নিয়েছিল।
১৯৪৩ সালে বাংলায় যখন মানুষ না খেয়ে মরছিল,
তখন ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী উইনস্টন চার্চিল ভারত থেকে খাদ্য রপ্তানি বন্ধ করেনি।
এই তথ্যগুলো বৃটেনের পাঠ্য বইয়ে আধুনিকতার গল্পের আড়ালে ঢাকা পড়ে থাকে।
ভারতে ব্রিটিশ শাসন:
সামাজিক সংস্কার
নারী শিক্ষা বা দলিত অধিকারের কথা বলা হলেও,
ব্রিটিশদের মূল লক্ষ্য ছিল বিভাজন (Divide and Rule) তৈরি করা।
অর্থাৎ বলা যেতে পারে—
বৃটেনে স্কুলে পড়ানো ইতিহাসে দীর্ঘদিন ধরে একটা ধারণা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে—
“সভ্যতা দানের দায়িত্ব।”
এই ধারণাকে সাহিত্যিক রূপ দিয়েছিলেন ব্রিটিশ লেখক Rudyard Kipling,
যার ১৮৯৯ সালের বিখ্যাত কবিতা (পড়ুন)‘The White Man’s Burden’ ঔপনিবেশিক যুগে ব্যাপক প্রচার পায়।
সেখানে বলা হয়েছিল,
শ্বেতাঙ্গ জাতির এক ধরনের দায়িত্ব আছে পৃথিবীর ‘অশিক্ষিত ও পিছিয়ে থাকা’ জনগণকে সভ্য করে তোলার।
আর ঠিক এই ধারণার ভিত্তিতেই উপনিবেশ স্থাপনকে অনেক সময় একটা ‘সভ্যতা প্রদানের প্রকল্প’ হিসেবে তুলে ধরা হয়েছিল।
ফলে বৃটেনে অনেক মানুষ সত্যিই বিশ্বাস করতেন বা আজও করেন—
তাঁরা ভারতকে শোষণ করতে নয়, বরং উন্নত করতে গিয়েছিল।
ভারতে ব্রিটিশ শাসন:
অর্থনৈতিক লুণ্ঠন,
ব্রিটিশ সিলেবাসে অনুপস্থিত
যে বিষয়টা বৃটেনে সচেতনভাবে গোপন করা হয়, তা হল ভারত থেকে পাচার হওয়া সম্পদের পরিমাণ।
বিখ্যাত অর্থনীতিবিদ উৎসা পট্টনায়কের এক গবেষণা অনুযায়ী—
১৭৬৫ থেকে ১৯৩৮ সালের মধ্যে বৃটেন ভারত থেকে প্রায় ৪৫ ট্রিলিয়ন ডলার (বর্তমান বাজার মূল্য অনুযায়ী) সমপরিমাণ সম্পদ লুটে নিয়েছে।
অর্থনৈতিক ইতিহাসবিদ অ্যাঙ্গাস ম্যাডিসনের গবেষণা অনুযায়ী—
ব্রিটিশরা যখন ভারতে আসে,
তখন বিশ্ব অর্থনীতিতে ভারতের অংশীদারিত্ব (GDP) ছিল প্রায় ২৪%.
আর যখন তাঁরা ১৯৪৭ সালে ভারত ছেড়ে যায়, তখন তা নেমে দাঁড়িয়েছিল মাত্র ৪%-এর নিচে।
( আরও পড়ুন সেই গোপন সত্যি, যা আজ আপনার চোখ খুলে দেবে।
ব্রিটিশ সম্পর্কে গোটা ধারণাটাই আজ বদলে যাবে।
Click: ইংরেজ ভারতে না আসলে, আজ বিশ্বের সুপার পাওয়ার হতো ভারত! )
এই যে বিশাল অর্থনৈতিক পঙ্গুত্ব, তা কোনো ব্রিটিশ পাঠ্যবইয়ে পড়ানো হয় না।
সেখানে ভারতকে দেখানো হয় এক দরিদ্র দেশ হিসেবে, যাকে তাঁরা উদ্ধার করতে গিয়েছিল।
ঔপনিবেশিক অর্থনীতির সমালোচকরা বলেন—
ভারত ছিল ব্রিটিশ শিল্পের কাঁচামালের প্রধান উৎস।
ঔপনিবেশিক নীতির মাধ্যমে এমন এক পরিস্থিতি তৈরি করা হয়েছিল,
যাতে ভারত কার্যত ব্রিটিশ প্রস্তুত পণ্যের বাজারে পরিণত হয়।
ফলে স্থানীয় শিল্প অনেক ক্ষেত্রে ধ্বংস হয়ে যায়।
কৃষকদের ওপর করের চাপ বাড়ানো হয়।
বর্তমানের অনেক ঐতিহাসিক, বিশেষ করে শশী থারুর বা উইলিয়াম ডালরিম্পল মনে করেন,
ব্রিটেনের উচিত তাদের এই ঐতিহাসিক অন্যায়ের জন্য অন্তত আনুষ্ঠানিকভাবে ক্ষমা প্রার্থনা করা।
এটা কেবল অর্থের বিষয় নয়, বরং সত্যকে স্বীকার করার বিষয়।
এই দৃষ্টিভঙ্গি অনুযায়ী ব্রিটিশ শাসনকে ‘উন্নয়ন’ নয়, বরং এক ধরনের ঔপনিবেশিক অর্থনৈতিক শোষণ হিসেবে দেখা হয়।
ভারতে ব্রিটিশ শাসন:
সামাজিক সংস্কারের প্রশ্ন
ব্রিটিশ শাসনের সমর্থকরা আরেকটা যুক্তি দেয়—
ভারতে কিছু সামাজিক সংস্কার ব্রিটিশ আমলেই শুরু হয়।
যেমন:
- নারীদের শিক্ষার প্রসার।
- কিছু সামাজিক প্রথার বিরুদ্ধে আইন।
- প্রশাসনিক কাঠামোর মাধ্যমে আইনি অধিকার।
তবে এক্ষেত্রেও ব্রিটিশদের শোষণ কৌশলের কিছু যুক্তি তুলে ধরা হল—
সতীদাহ প্রথা বিলোপের মত সংস্কার মূলত ভারতীয় মহান সমাজ সংস্কারক রাজা রামমোহন রায়ের দীর্ঘদিনের আন্দোলন ও প্রচারের ফল।
পরে গভর্নর জেনারেল লর্ড উইলিয়াম বেন্টিঙ্ক ১৮২৯ সালে সেই প্রথা নিষিদ্ধ করার আইন জারি করেন মাত্র।
আর যদি রাজা রামমোহন রায়ের তীব্র আন্দোলন সে সময়ে না থাকত,
এমন তো নিশ্চিতভাবে বলা যায় না যে, রামমোহন রায় না করলেও বেন্টিঙ্ক নিজ উদ্যোগে সেই প্রথা বন্ধ করে দিতেন।
ব্রিটিশ প্রশাসনের প্রধান লক্ষ্য ছিল শাসন বজায় রাখা, সমাজ সংস্কার নয়—
তাই তাঁরা প্রায়ই স্থানীয় রক্ষণশীল শক্তির সঙ্গে আপোষ করত।
আধুনিক শিক্ষাব্যবস্থা চালুর লক্ষ্য ছিল মূলত প্রশাসনের জন্য এক মধ্যস্থ শ্রেণী তৈরি করা;
এই ধারণা স্পষ্টভাবে দেখা যায়—
Thomas Babington Macaulay-এর শিক্ষানীতিতে।
রেলওয়ে ও অবকাঠামো নির্মাণের বড় উদ্দেশ্য ছিল সৈন্য পরিবহন, কাঁচামাল দ্রুত বন্দরে পৌঁছে দেওয়া,
ঔপনিবেশিক অর্থনীতিকে শক্তিশালী করা।

উপনিবেশিক বাণিজ্যনীতির ফলে ভারত ধীরে ধীরে ব্রিটিশ শিল্পের বাজার ও কাঁচামালের উৎসে পরিণত হয়,
যার ফলে স্থানীয় শিল্প ক্ষতিগ্রস্ত হয়।
বহু ঐতিহাসিকের মতে ব্রিটিশ শাসনের সময় ভারতের বিপুল সম্পদ ধীরে ধীরে ব্রিটেনে সরে যায়—
যাকে ইতিহাসে “Drain of Wealth” তত্ত্ব হিসেবে ব্যাখ্যা করেছিলেন ভারতীয় অর্থনীতিবিদ ও নেতা দাদাভাই নওরোজি।
ইতিহাসের বর্ণনা কেন আলাদা হয়?
এখানে একটা গুরুত্বপূর্ণ বিষয় সামনে আসে—
ইতিহাস সব দেশে একভাবে শেখানো হয় না।
প্রায় সব দেশই নিজেদের ইতিহাস এমনভাবে উপস্থাপন করে, যাতে জাতীয় পরিচয় বা গর্ব বজায় থাকে।
আবার পাশাপাশি এটাও উল্লেখ করা জরুরি যে—
কোনো জাতির প্রকৃত ইতিহাস কী ছিল এবং সেটাকে বর্তমানে কীভাবে ব্যাখ্যা করা হচ্ছে?
বাংলাদেশ ও ভারতের ভূমিকা:
ইতিহাসের আরেক পিঠ
ইতিহাস আড়াল করা, অস্বীকার করা, এসব প্রবণতা কেবল প্রাক্তন ও উপনিবেশবাদীদের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়।
বাংলাদেশের পাঠ্যপুস্তকের বিবর্তন লক্ষ্য করলে দেখা যায়,
রাজনৈতিক পট পরিবর্তনের সাথে সাথে ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধে ভারতের ভূমিকার গুরুত্বও কমে এসেছে।
মুক্তিযোদ্ধাদের ত্যাগ
ও ভারতের সহায়তা:
এটা সত্য যে বাংলাদেশের সাধারণ মানুষ ও মুক্তিযোদ্ধারা অসীম সাহসিকতায় লড়াই করেছেন।
কিন্তু যুদ্ধের কৌশলগত মোড় ঘোরানো,
এক কোটি শরণার্থীকে আশ্রয় দেওয়া এবং শেষ পর্যায়ে সরাসরি মিত্রবাহিনী হিসেবে যুদ্ধে অংশ নেওয়া ভারতের অবদানকে যদি আজ বাংলাদেশ সেই অবদানকে প্রান্তিক করে দেখায়, তবে তা পূর্ণাঙ্গ ইতিহাস কখনই হয় না।
( “যে ব্যক্তি বলে সে মৃত্যুভয়ে ভীত নয় , সে হয় মিথ্যেবাদী, নয় এক গোর্খা!”
৩ ডিসেম্বর, সাল ১৯৭১.
তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী, নেহেরু কন্যা শ্রীমতী ইন্দিরা গান্ধী,
পাকিস্তানি সেনার বিরুদ্ধে, পূর্ববাংলার মুক্তিবাহিনীর দিকে বাড়িয়ে দেন সাহায্যের হাত।
মেজর জেনারেল ইয়ান কার্ডোজোর গোর্খা রাইফেলস্ সে সময়ে বিরামহীন যুদ্ধ করে যাচ্ছিল পূর্ব পাকিস্তানের সিলেটে।
এরপর পড়ুন কার্তুজ সাহাবের সেই হাড়হিম করা কাহিনী ও স্বাধীন বাংলাদেশ জন্মতে ভারতের সেই অপরিশোধ্য অবদান!
Click: ৭১-এর মুক্তিযুদ্ধ: ভারতীয় আর্মির অবদান মনে আছে বাংলাদেশের? )
কেন এমনটা করা হয়?
অনেক সময় জাতীয়তাবাদকে আরও শক্তিশালী করতে গিয়ে বিদেশের সাহায্যকে খুব ছোট করে দেখানোর চেষ্টা করা হয়,
যাতে নতুন প্রজন্মের মনে এই ধারণা জন্মে যে তারা সম্পূর্ণ স্বনির্ভরভাবেই স্বাধীনতা অর্জন করেছে।
এটা একটা মনস্তাত্ত্বিক কৌশল, যা বৃটেনে ব্রিটিশ জনগণের ওপর প্রয়োগ করা কৌশলের সঙ্গেও সমান্তরাল।
এছাড়া ইতিহাসের এই কাটছাঁট প্রক্রিয়ায় অনেক সময় বৈশ্বিক ভূ-রাজনীতিও বড় ভূমিকা রাখে।
১৯৭১ সালে ভারতের সহায়তার পেছনে যেমন মানবিক দায়বদ্ধতা ছিল,
তেমনই ছিল তৎকালীন সোভিয়েত ইউনিয়ন ও আমেরিকার মধ্যকার স্নায়ুযুদ্ধের প্রভাব।
এই জটিল সমীকরণগুলো এড়িয়ে যখন শুধু সংকীর্ণ জাতীয়তাবাদের চশমায় ইতিহাস দেখা হয়,
তখন ভবিষ্যৎ প্রজন্ম অসম্পূর্ণ সত্য নিয়ে বড় হয়।
শেষ কথা, যা শেষ নয়:
ইতিহাসের সত্যতা কোনো একটা নির্দিষ্ট দেশের পাঠ্যবইয়ের সীমাবদ্ধতায় আটকে থাকতে পারে না।
বৃটেন যেমন তাদের শোষণের ইতিহাস আড়াল করে ‘সভ্য করার’ গৌরব প্রচার করে,
তেমনই অনেক দেশ নিজেদের রাজনৈতিক প্রয়োজনে তাদের বন্ধুদের ভূমিকাকে তুচ্ছ করে।
কিন্তু প্রকৃত ইতিহাস হচ্ছে সেই আয়না, যেখানে আলো এবং অন্ধকার উভয়কেই সমানভাবে দেখা প্রয়োজন।
অতীতের ভুল বা শোষণের কথা স্বীকার করলেই কেবল একটি জাতি মানসিকভাবে প্রকৃত স্বাধীন ও আধুনিক হতে পারে।
অন্যথায় আমরা কেবল আমাদের পরবর্তী প্রজন্মের হাতে সত্যের এক বিকৃত সংস্করণই তুলে দেব।
এরপর কোনো একদিন সেই প্রজন্ম যখন প্রকৃত সত্যটা আবার জানতে পারবে,
তখন বিষয়টা হয়ে দাঁড়াতে পারে আরও খারাপ কিছু।
শেষ পর্যন্ত একটা বিষয় পরিষ্কার—
ইতিহাস কেবল অতীতের বিবরণ নয়, বরং সমাজ কিভাবে নিজের অতীতকে বুঝতে চায় তার প্রতিফলনও বটে।
ভারতের পাঠ্যপুস্তকে
অনুপস্থিত ইতিহাস:
একটা প্রশ্ন
ব্রিটিশ শাসনের শোষণের অনেক গভীর তথ্য ভারতের জাতীয় পাঠ্যপুস্তকে (বিশেষ করে NCERT) আজও খুব বিস্তারিত পড়ানো হয় না।
এর পেছনে সম্ভাব্য কিছু কারণ এবং তার পাল্টা যুক্তি নিচে দেওয়া হল:
কেন অন্তর্ভুক্ত করা হয়নি?
(সম্ভাব্য কারণ)
১. জাতীয় সংহতি রক্ষা:
স্বাধীনতার পর ভারতের মূল লক্ষ্য ছিল বৈচিত্রের মধ্যে ঐক্য বজায় রাখা।
তাই উগ্র জাতীয়তাবাদ বা চরম ক্ষোভ জন্ম দিতে পারে এমন ‘আঘাতমূলক ইতিহাস’ এড়িয়ে গিয়ে গঠনমূলক ইতিহাসের ওপর জোর দেওয়া হয়েছিল।
২. কূটনৈতিক সম্পর্ক:
বৃটেনের সাথে দীর্ঘদিনের কমনওয়েলথ সম্পর্ক ও কূটনৈতিক সুসম্পর্ক বজায় রাখার তাগিদে ইতিহাসের তিক্ততা অনেক কমিয়ে উপস্থাপন করা হয়েছে।
৩. নেতিবাচক মানসিকতা এড়ানো:
তরুণ প্রজন্মের মনে কেবল ‘শোষণের শিকার’ হীনম্মন্যতা না জাগিয়ে, আধুনিক ভারত গড়ার সংগ্রামের দিকে বেশি নজর দেওয়া হয়েছে।
কেন এটা ভুল এবং
কী হওয়া উচিত ছিল?
১. সত্যের মুখোমুখি হওয়া:
কোনো জাতি ততক্ষণ মানসিকভাবে শক্তিশালী হয় না, যতক্ষণ না সে তার অতীত যন্ত্রণার সঠিক ইতিহাস জানে।
অন্ধকারকে আড়াল করে আলো খুঁজে পাওয়া সম্ভব নয়।
২. ভুল থেকে শিক্ষা:
দুর্ভিক্ষ বা অর্থনৈতিক লুণ্ঠনের প্রক্রিয়াগুলো বিস্তারিত না জানলে, আধুনিক প্রজন্মের কাছে ‘উন্নয়ন’ আর ‘শোষণ’-এর পার্থক্য অস্পষ্ট থেকে যায়।
ফলে আজও অনেকে অনিচ্ছাকৃতভাবে ঔপনিবেশিক মানসিকতা বহন করে চলে।
৩. বৌদ্ধিক সততা:
শিক্ষা কেবল জাতীয়তাবাদের হাতিয়ার নয়, বরং তা সত্যের দর্পণ হওয়া উচিত।
বৃটেন তাদের সিলেবাসের সত্য গোপন করেছে বলে, আমাদেরও তা করতে হবে—
এই ধারণাটা একটা জাতির বৌদ্ধিক বিকাশের পরিপন্থী।
সারকথা, ইতিহাসের সত্যকে কেবল কূটনৈতিক বা রাজনৈতিক চশমায় না দেখে তার নগ্নরূপেই পরবর্তী প্রজন্মের সামনে তুলে ধরা উচিত।
কারণ সঠিক ইতিহাসই পারে একটা জাতিকে নিজের শেকড় এবং মেরুদণ্ড সম্পর্কে সচেতন করতে।
( আপনি নিশ্চয়ই শাহরুখ খান বা রণবীর কাপুরকে চেনেন।
আবার এদিকের রুপোলি পর্দার মহাতারকা দেব, জিৎ কিংবা অনির্বাণ ভট্টাচার্যের
প্রত্যেকটা সিনেমার আপডেট আপনার নখদর্পনে।
তাঁদের স্টাইল, সংলাপ আমাদের ড্রয়িংরুমের আলোচনার অবিচ্ছেদ্য অংশ।
কিন্তু কিঙ্করি দেবীকে চেনেন কি?
না ঠিক চেনেন না।
আসলে চেনার কথাও নয়।
কারণ ইনি তথাকথিত কোনো ‘সেলিব্রিটি’ নন।
আর ভাগ্যিস সেলিব্রিটি নন,
তাহলে বোধহয় এ কাজ তিনি আর মাটিতে নেমে করতে পারতেন না।
তাই পড়ুন কী সেই কাহিনী, যা কাঁপিয়ে দিয়েছিল হাইকোর্ট থেকে বিশ্বমঞ্চ।
কী করেছিলেন এক দলিত, দরিদ্র, অক্ষরজ্ঞানহীন সেই প্রান্তিক মহিলা?
Click: পরিবেশ রক্ষায় মাফিয়াদের বিরুদ্ধে এক দলিত নারীর রুদ্ধশ্বাস লড়াই! )
[ আরও এমনই বিভিন্ন দুর্দান্ত টপিকের ওপরে এরকমই সব
বিশ্লেষণধর্মী লেখা পেতে নিয়মিত আমাদের পেজে চোখ রাখুন।
এবং তা আপনার, আপনার প্রতিবেশি, বন্ধুবান্ধব, আত্মীয় তথা সমাজের জন্য।
এ বিষয়ে আপনার গুরুত্বপূর্ণ মতামত জানার অপেক্ষায় রইলাম।
লেখাটা প্রয়োজনীয় মনে হলে অবশ্যই শেয়ার করে
সমাজের অন্যদেরও পড়তে, জানতে সুযোগ করে দেবেন।
ইমেইল আইডি দিয়ে আমাদের বাঙালির পরিবারের একজন
প্রিয় মানুষ হয়ে উঠুন।
চলুন বাঙালিকে বিশ্বের দরবারে সবাই মিলে একসাথে বারবার তুলে ধরি
চিন্তা, চেতনা আর শব্দের শক্তিতে—
একসাথে, সবাই মিলে।
বিশ্ব জানুক—
আমাদের ভারত কি?
বাঙালি কি?
বাংলা শব্দের ক্ষমতাই বা কি? ]
Articlesবাংলা Bangla Articles, Quotes & Prose-Poetry / বাংলা প্রবন্ধ, উক্তি ও গদ্য-কবিতা।





