ধর্মেন্দ্র: এক জীবনের পর্দা নামলে
যে নীরবতা রয়ে যায়
এই পৃথিবী শেষ পর্যন্ত আমাদের সবার কাছেই অস্থায়ী একটা ভাড়া ঘর।
সে ঘরে আমরা কেউ চিরদিনের মালিক নই– শুধু অতিথি।
সময়ই যেন একমাত্র প্রকৃত স্বত্বাধিকারী;
সে আমাদের হাসায়, স্বপ্ন, পথ দেখায়, দৌড় করায়,
আর একদিন খুবই নরম অথচ নির্মম ভঙ্গিতে অবধারিত পর্দা টেনে দেয়।
(Click:) ধর্মেন্দ্রর মৃত্যুর পরে,
আজ ঠিক এই কথাটাই আরও ভয়াবহভাবে সত্য হয়ে ওঠে–
কিছু মানুষ চলে যান,
কিন্তু তাদের অনুপস্থিতিই আমাদের উপস্থিতির সংজ্ঞা নতুন করে লিখে দেয়।
আমাদের ভেতরে এক বিশাল শূন্যতা উন্মোচন করে।

যেন পৃথিবী কিছুক্ষণের জন্য হঠাৎ একটু ঠান্ডা হয়ে যায়,
একটু কম আলোয় ভরে ওঠে।
তিনি শুধু একজন অভিনেতাই ছিলেন না;
ছিলেন এক যুগের অভ্যন্তরীণ স্পন্দন, একটা প্রজন্মের আশ্রয়।
আর পর্দার ওপারে, আমাদের নিজেদের অচেনা যন্ত্রণা ও আনন্দের আয়না।
বলিউডের রূপ-ছায়া-যুগবদলের শব্দহীন স্থপতি,
যিনি তাঁর নিজস্ব মাংশপেশি-ভরা ভাষা,
নিজস্ব নরম পুরুষত্ব এবং সরলতায় একগুঁয়েভাবে বেঁচে ছিলেন।
প্রথম আলো: গ্রাম থেকে পর্দার রাজপথ
পাঞ্জাবের এক গ্রাম থেকে উঠে আসা এক তরুণ–
যার স্বপ্ন ছিল না দুর্দান্ত কথা বলা, না ছিল কোনো বিশেষ সম্পর্ক;
না ছিল টাকা বা পরিচয়।
ছিল কেবল এক ধরণের নীরব আগুন।
এই আগুনই পরে হয়ে গেল বলিউডের সবচেয়ে উজ্জ্বল শিখা।

(হাসিনাকে মৃত্যুদণ্ডের রায় দেওয়া হয়েছে যখন তিনি দেশে নেই।
রায় এসেছে এমন এক সময়,
যখন দেশ উত্তেজনাপূর্ণ রাজনৈতিক পরিবর্তনের মধ্যে দিয়ে যাচ্ছে।
পড়ুন– Click: শেখ হাসিনার মৃত্যুদণ্ডঃ বিচার নাকি প্রতিশোধ?)
ধর্মেন্দ্র যখন প্রথম স্ক্রিনে এলেন, দর্শক তখনও জানত না–
এই মানুষটা কেবল অভিনয়ের জন্য আসেননি,
তিনি এসেছেন–
- পুরো পুরুষত্বের সংজ্ঞা বদলাতে।
- এসেছেন দেখাতে, শক্তি মানে শুধু মাংশপেশি নয়,
শক্তি হলো কোমলতা, মানবিকতা, ভরসার ছায়া।
অ্যাকশন নয়, আবেগের রাজনীতি
ধর্মেন্দ্রকে অনেকে ‘হি-ম্যান’ বলে মনে রাখে,
কিন্তু তাকে সত্যিকারের অনন্য করে তোলে তার আবেগের গভীরতা।
তার চোখে ছিল এমন এক নীরব ব্যথা,
যা কথা না বললেও দর্শককে বুঝিয়ে দিত–
এই মানুষটা কোনও চরিত্রে অভিনয় করছেন না, বরং চরিত্র হয়ে বেঁচে আছেন।
- তিনি প্রেমিক হয়েও ছিলেন অসহায়;
- অ্যাকশন হিরো হয়েও কোমল;
- কমেডিয়ান হয়েও ছিলেন গুরুগম্ভীর;
- দুঃখের চরিত্রেও থাকত তাঁর এক অদ্ভুত সম্মান।
মানুষ তাকে বিশ্বাস করত–
কারণ তিনি কখনো চরিত্রে ‘নাটক’ করেননি,
তিনি চরিত্রটাকে হাড়-মাংস বানিয়ে উপস্থাপন করতেন।
তারকা নয়, মানুষের নায়ক
ধর্মেন্দ্র ছিলেন সেই সময়ের নায়ক–
যখন সিনেমা মানে ছিল একটা চিঠির মতো অনুভব করা,
যখন একটা দর্শক পুরো পরিবার নিয়ে হলে যেত শুধু তার এক ঝলক দেখার জন্য।
তিনি কখনও অতিরিক্ত আলো চাইতেন না,
নিজেকে দেবতা বানিয়ে রাখতেনও না।
বলতেন–
“আমি মানুষ, তাই ভুল করি। কিন্তু চেষ্টা করি ভালো থাকতে।”
এই সাধারণ হওয়াটাই তাকে অসাধারণ বানিয়েছিল।
তার নীরবতা, সংযম, সরলতা–
সবই তাকে তারুণ্যের, বয়স্কের, গ্রাম-শহরের সবার কাছে আপন করে তুলেছিল।
পর্দার ওপারে:
যে মানুষটাকে কেউ জানত না
তিনি ছিলেন চরম ইন্ট্রোভার্ট–
বাইরের জৌলুস তাঁর কাছে ছিল কাচের মতো স্বচ্ছ;
যেটা ভেঙে গেলে তেমন কিছুই আর থাকে না।
সেটের বাইরে তিনি চুপচাপ থাকতেন,
লোকের ভিড় পছন্দ করতেন না, প্রচারবাজি– একদম না।
বন্ধুরা বলতো–
ধর্মেন্দ্রর হাসি ছিল এমন, যা দিয়ে সূর্যকেও লজ্জায় ফেলা যায়।
কিন্তু সেই পাওয়া ছিল ভাগ্যের ব্যাপার–
কারণ তিনি নিজের ভেতরটা খুব সহজে খুলে দেখাতেন না।
হয়তো এই কারণেই তাঁর অভিনয়ে সবসময় একটা ব্যক্তিগত ব্যথা লুকানো থাকতো,
যা অভিনেতা নয়, মানুষ হিসেবে তাঁর ভেতরের গভীর থেকে বেরিয়ে আসত।
ব্যর্থতা, সাফল্য এবং জীবনের
এক পরীক্ষাগার
যারা মনে করেন তিনি কেবল বড় সুপারস্টার–
তারা ভুল।
ধর্মেন্দ্র অগণিত ব্যর্থতার মধ্যে দিয়ে জীবনের পথ বানিয়েছেন।
প্রথম দিকে তাকে কেউ গুরুত্ব দিত না,
স্ক্রিন-টেস্টে বারবার প্রত্যাখ্যাত হতেন,
শিল্পীরা বলত–
“তোমার চেহারা সুন্দর, কিন্তু গভীরতা কম।”
ধর্মেন্দ্র হাসতেন না, প্রতিবাদও করতেন না।
নিঃশব্দে নিজেকে গড়তেন।
অভিনয় শিখতেন, মানবিকতা বাড়াতেন,
আর নিজের কণ্ঠস্বর খুঁজে বের করতেন।
সেই কণ্ঠস্বর পরে বলিউডের স্রোত বদলে দেয়।
অসংখ্য স্মৃতি, অসংখ্য ছাপ
তাঁর প্রতিটা সিনেমায় শুধু গল্পের অংশ নয়,
একটা সময়কালের আলাপ থাকে।
তিনি বীরু হয়ে যেমন হাসাতেন,
তেমনই সত্যকামের মুখ হয়ে সমাজের বিবেক নাড়িয়ে দিতেন।
- তাঁর হাসির মধ্যে ছিল বাচ্চাদের মতো সরলতা।
- তাঁর রাগের মধ্যে ছিল প্রকৃত পুরুষত্ব।
- তাঁর চোখের জলে ছিল এমন সত্য–
যা দর্শকরা আজও ভুলতে পারে না।
যে মানুষের ভেতরে ছিল
হাজার মানুষের গল্প
ধর্মেন্দ্রর সবচেয়ে বড় শক্তি ছিল–
তিনি অসংখ্য শ্রেণির প্রতিনিধিত্ব করতেন।
- গ্রামের মানুষের সরলতা।
- শহরের মানুষের সংগ্রাম।
- প্রেমিকের হৃদয়।
- পিতার নরম অথচ দৃঢ়তা।
- যোদ্ধার অবিচলতা।
- আর্টিস্টের নীরব বেদনা।
তিনি একটা দেশের মানসিক প্রতিচ্ছবি ছিলেন।
ঠিক এই কারণেই তিনি “তারকা” ছিলেন না–
ছিলেন এক গভীর অভিজ্ঞতা।
উত্তরাধিকার:
রক্তের নয়, রূহের ধারাবাহিকতা
তাঁর পরিবার বলিউডে আছে–
হ্যাঁ, সেটাই মানুষের চোখে প্রথম পড়ে।
কিন্তু তাঁর আসল উত্তরাধিকার সেখানেই থামে না।
তাঁর অভিনয়, মুখের ভাষা, চোখের কথন–
এগুলো এতটাই আলাদা, যে পরবর্তী প্রজন্মেরা তাকে নকল করতে গিয়ে শিখেছে–
“নকল করা যায় কৌশল, কিন্তু আত্মা নয়।”
ধর্মেন্দ্রর উত্তরাধিকার আসলে একটাই–
মানুষ হিসেবে মহান হওয়া।
শেষ সন্ধ্যা:
নীরব ঘরে সময়ের শেষ স্পর্শ
শেষ কয়েকমাস ধরে তাঁর শ্বাসনালী-সংক্রান্ত সমস্যা বাড়তে থাকে।
প্রথমে হাসপাতালে চিকিৎসা– পরীক্ষা, যন্ত্রপাতির শব্দ,
কলরবের মাঝেও ছিল এক নিঃসঙ্গ নীরবতা।
চিকিৎসকরা বলেছিলেন– বয়সের ভার, দুর্বল ফুসফুস,
এবং দীর্ঘদিনের জটিলতা তাঁর শরীরকে আর লড়াইয়ের শক্তি দিচ্ছিল না।
পরবর্তী সময়ে কিছুটা স্থিতিশীল হলে তাকে বাড়িতে নেওয়া হয়।
শেষ মুহূর্তে ধর্মেন্দ্রর পাশে ছিলেন তাঁর পরিবার।
প্রথম স্ত্রী প্রকাশ কৌর, যার সাথেই তিনি দীর্ঘ দশক ধরে একই বাড়িতে বসবাস করছিলেন,
সাথে ছিলেন সন্তান সানি দেওল, ববি দেওল, বিজেতা দেওল ও অজিতা দেওল।
এছাড়া দ্বিতীয় সংসারে, স্ত্রী হেমা মালিনী,
কন্যা এশা দেওল ও আহানা দেওলও ছিলেন গভীর শোকাহত।
শেষ নিঃশ্বাসটা তিনি নিজের ঘরে, আপনজনের উপস্থিতিতেই ত্যাগ করেন।
পরদিন মুম্বাইয়ের পাওয়ান হ্যান্স ক্রিমেটোরিয়ামে তাঁর শেষকৃত্য সম্পন্ন হয়,
যেখানে সুশান্ত সিং রাজপুত-এর বিদেহী আত্মা চির শান্তিতে শায়িত হয়েছে।
পরিবারের পাশাপাশি উপস্থিত ছিলেন বলিউডের বহু মুখ।

(Click:) শাহরুখ, সলমন, আমির, করণ জহর।
অমিতাভ বচ্চন বিশেষ করে “শোলে”-র স্মৃতি মনে করে দুঃখ ভরা ভাষায় শ্রদ্ধা জানালেন।
শহরের আকাশে ধোঁয়া, বাতাসে ভারী শান্তি–
সব মিলিয়ে এক যুগের সমাপ্তি মনে করিয়ে দেয়।
দেশজুড়ে সাধারণ মানুষ ও সেলিব্রিটিরা শোক প্রকাশ করেন।
স্মৃতি ও প্রভাব অব্যাহত
একজন মানুষ মারা গেলে তার জীবন শেষ হয়,
কিন্তু তার গল্প কখনও শেষ হয় না।
ধর্মেন্দ্রর মৃত্যু তাই সমাপ্তি নয়;
এটা একটা সেতু বন্ধন–
যেখানে স্মৃতি, নস্টালজিয়া, শিল্প এবং মানবতার সব রঙ এসে মিশে যায়।
তিনি আমাদের শিখিয়ে গেছেন–
- জীবন যতই কঠিন হোক, হাসি হারানো যাবে না।
- মানুষের প্রতি বিশ্বাস হারানো যাবে না।
- নিজের ভেতরের সরলতাটাকে কখনও লুকিয়ে রাখা যাবে না।
বিদায়, কিন্তু হারিয়ে যাওয়া নয়
একটা যুগ শেষ হলো–
কিন্তু আমাদের হৃদয়ে তার আলো নিভলো না।
আজ আমরা শুধু একজন অভিনেতাকে নয়,
এক ধরণের জীবনের দর্শনকেই শ্রদ্ধা জানাচ্ছি।
ধর্মেন্দ্র চলে গেছেন–
কিন্তু তাঁর চোখের ভাষা, হাসির ওজন, নীরব শক্তি;
এসব চিরকাল টিকে থাকবে।

এ পৃথিবী সত্যিই আমাদের ভাড়া ঘর;
কিন্তু কিছু মানুষ ভাড়া না দিয়ে চিরকাল দাগ রেখে যায়।
ধর্মেন্দ্র সেই মানুষ।
তাঁর যাত্রা যেন আলো হয়ে থাকে– যেখানে যেখানেই তিনি এখন আছেন।
শান্তিতে থাকুন, কিংবদন্তি।
(আমরা যেন ধীরে ধীরে একটা বিশাল গ্যাস চেম্বার জাতি হয়ে উঠছি।
আর এটাই সেই গল্প, একটা দেশের নয়, বরং সমগ্র পৃথিবীর।
পড়ুন– Click: AQI গাঢ় লালঃ ভারতের ভবিষ্যত কি তবে ভয়ঙ্কর?)
Articlesবাংলা Bangla Articles, Quotes & Prose-Poetry / বাংলা প্রবন্ধ, উক্তি ও গদ্য-কবিতা।



