ক্ষুধার ঘড়ি
ধনীর সকাল শুরু হয়
যন্ত্রের নির্দেশে,
একটা রুটিন মাফিক জাঁকজমক।

দরিদ্রের সকাল শুরু হয়
পাকস্থলীর আর্তনাদে–
যা সময়ের চেয়েও বেশি সত্য।
সূর্য এখানে আলো দেয় না,
কেবল একজনের জন্য
আরামদায়ক উষ্ণতা হয়ে আসে।
আর অন্যজনের জন্য তা–
শ্রমের ঘাম ঝরানোর সংকেতবাহী
এক জ্বলন্ত ঘণ্টা।
দৃষ্টিভঙ্গি: পুঁজি বনাম অস্তিত্ব
ধনী জানে,
আজকের মেনুতে কি খাকবে–
সেটা তার রুচির বিলাস।
দরিদ্র জানে,
আজ যদি খেতে পারে,
সেটাই সাফল্য।
বিভাজনটা টাকার অঙ্কে নয়,
বিভাজনটা
সম্ভাবনা আর সংকোচনের মাঝে।
ধনী সময়কে দেখে ‘সম্পদ’ হিসাবে–
সে সময় কেনে।
দরিদ্র সময়কে দেখে ‘ক্ষয়’ হিসাবে–
সে সময় বিক্রি করে,
নিজের রক্ত জল করা দামে।
এই সমাজে
সময় ধনীর হাতে ঘড়ি,
দরিদ্রের পেটে ক্ষুধা।
তাই একজন ভবিষ্যৎ প্ল্যান করে।
আর একজন
আগামী সকাল পার করার হিসাব কষে।
সামাজিকতা: মুখোশ আর দরজার ফাঁক
ধনীর সামাজিকতা হলো–
পরস্পরের স্বার্থকে
সুগন্ধি মাখিয়ে আলিঙ্গন করা,
এক মার্জিত লেনদেন,
ভদ্রতার সংস্করণ।

দরিদ্রের সামাজিকতা হলো–
অপমানিত হওয়ার প্রস্তুতি নিয়ে,
কারো দুয়ারে দাঁড়ানো।
একজনের নেটওয়ার্ক সিঁড়ি,
অন্যজনের আত্মীয়তা শেষ সম্বল–
যা অনেক সময়
লজ্জার কাছে পরাজিত হয়।
লজ্জা: অসম বণ্টনের উত্তরাধিকার
ধনী লজ্জিত হয়
যখন তার আভিজাত্যের মোড়ক ছিঁড়ে যায়।
দরিদ্র লজ্জা পায়
যখন তার বেঁচে থাকার নূন্যতম প্রয়োজনটুকুও
অন্যের দয়ার মুখাপেক্ষী হয়।

(মৃত্যুরও কি কোনো পোস্টাল কোড থাকে?
কোনো গলি,
কোনো দরজা,
কোনো নামফলক–
যেখানে লেখা থাকে,
“এখানে একজন মা থাকেন?”
পড়ুন– Click: যে ঠিকানাটা আর জানা হলো না!)
লজ্জা এখানে
পোশাকের ব্র্যান্ডে নয়,
লজ্জা এখানে
এক জন্মগত উত্তরাধিকার।
নৈতিকতা: ভরা পেটের দর্শন
ধনীর নীতিকথা
শৌখিন টেবিলে ফুলদানির মতো সাজানো থাকে–
যাদের অভাব নেই,
তারাই নীতির কারিগর।
কিন্তু যে খালি পেটে
ডাস্টবিনের পাশে দাঁড়ায়,
তার কাছে নৈতিকতা,
কোনো আদর্শ নয়–
পেট ভরার পরের প্রশ্ন।
পেট যখন শূন্য থাকে,
তখন ঈশ্বরও
রুটির আকার ধারণ করে।
শিক্ষা: আয়না বনাম দেয়াল
ধনীর সন্তান শেখে–
জগতকে শাসন করার ব্যাকরণ।
আর দরিদ্রের সন্তান–
জগতের শাসন মেনে নেওয়ার
নিঃশব্দ শিল্প।
শিক্ষা এখানে আলো নয়।
একজনের জন্য
তা আকাশ ছোঁয়ার সিঁড়ি,
অন্যজনের জন্য
নিজের অক্ষমতাকে চিনিয়ে দেওয়া
এক নিষ্ঠুর আয়না।

মৃত্যু: নীরবতা বনাম ইতিহাস
মৃত্যু সাম্যবাদী নয়–
তার শ্রেণিচেতনা আছে।
ধনী মরলে
তার শূন্যতা পূরণ করতে
শোকের মহড়া বসে,
ইতিহাসের পাতায়
কালির আঁচড় পড়ে।
দরিদ্র মরলে
শুধু একটা পরিসংখ্যান বাড়ে;
তার অস্তিত্বের দাগটুকু
পরের দিনের বৃষ্টিতেই ধুয়ে যায়।

একজন রেখে যায় উত্তরাধিকার,
অন্যজন
কেবল ঋণের বোঝা
আর কিছু দীর্ঘশ্বাস।
দর্শনের নিষ্ঠুর সত্য
এই সমাজে
ধনী মানুষ নয়–
ধনই মানুষ।
আর দরিদ্র মানুষ নয়–
দারিদ্র্যই তার পরিচয়।
এখানে কেউ জন্মায় না সমান হয়ে–
কেউ শুধু ধীরে ধীরে বুঝে ফেলে
সে কোন দলে পড়ে গেছে।
শেষ কথা
যদি তুমি ধনী হও–
এই লেখা তোমাকে অস্বস্তি দেবে,
কারণ এতে তোমার আয়না আছে।
যদি তুমি দরিদ্র হও–
এই লেখা তোমাকে চুপ করিয়ে দেবে,
কারণ তোমার বলার ভাষা
আগেই কেড়ে নেওয়া হয়েছে।

আর যদি তুমি মাঝখানে থাকো–
এই লেখা তোমাকে ভয় দেখাবে,
কারণ তুমি জানো
নিচে নামার কোনো বীমা নেই।
এই সমাজে
সবচেয়ে ভয়ংকর জায়গাটা পতন নয়।
ভয়ংকর হলো সেই জায়গা–
যেখানে মানুষ পড়ে গিয়ে
আর মানুষ থাকে না।
শুধু একটা বোঝা হয়ে যায়,
যাকে নাম ধরে ডাকার
আর কোনো প্রয়োজন পড়ে না।
বি: দ্র:
এই লেখা কোনো শ্রেণিকে দোষারোপ করার জন্য নয়।
লেখাটা একটা সমাজকে আয়নায় দাঁড় করানোর চেষ্টা।
যেখানে সময় সবার জন্য এক রকম নয়,
আর ক্ষুধা কোনো রূপক নয়– একটা বাস্তব ঘড়ি।
(কি অদ্ভুত মহাজাগতিক পরিহাস!
একই মানুষ, একই নাম, একই স্পর্শ,
অথচ হৃদয়ের গভীরে এদের সমস্ত অর্থ আজ বিপর্যস্ত, শূন্য।
কিভাবে একই চোখে চোখ রেখেও,
একদিন মানুষ অপরিচিত হয়ে যায়।
পড়ুন– Click: প্রেমের দ্বৈত নীতি– এক মহাজাগতিক পরিহাস!)
(Articlesবাংলা – আমাদের, আপনাদের পরিবার।
ইমেল আইডি দিয়ে আমাদের সাথে যুক্ত হন।
ফলে যখনই এই ব্লগে কোনো নতুন লেখা পোস্ট করা হবে,
সবার আগে আপনিই পাবেন নোটিফিকেশন।
লেখাটা ভালো লাগলে,
শেয়ার করে বন্ধুদের পড়ার সুযোগ করে দিন।
মূল্যবান মন্তব্যে জানান কেমন লাগলো।)
Articlesবাংলা Bangla Articles, Quotes & Prose-Poetry / বাংলা প্রবন্ধ, উক্তি ও গদ্য-কবিতা।


