ইংরাজি কেন প্রভাবশালী ভাষা
আজকের এই আধুনিক ও বিশ্বায়নের যুগে আমাদের মনে এই প্রশ্ন আসা স্বাভাবিক যে,
ইংরাজি কেন সবচেয়ে প্রভাবশালী ভাষা হয়ে উঠল?
(পড়ুন) ইংরাজি হলো বিশ্বের সবচেয়ে প্রভাবশালী ও সর্বাধিক ব্যবহৃত আন্তর্জাতিক ভাষা।
আজকের পৃথিবীতে যোগাযোগ মানেই ইংরাজি।
ভিন্ন দেশের মানুষ পরস্পরের সঙ্গে কথা বলতে, ব্যবসা করতে,
গবেষণা ভাগ করে নিতে কিংবা কূটনৈতিক আলোচনায় বসতে সবচেয়ে বেশি
ইংরাজিই ব্যবহার করে।
বর্তমানে বিশ্বের বহু দেশে ইংরাজি অফিসিয়াল বা
আধা-অফিসিয়াল ভাষা হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে।
শিক্ষা, বিজ্ঞান, প্রযুক্তি, ব্যবসা, কূটনীতি– সব ক্ষেত্রেই ইংরাজি কার্যত প্রধান ভাষা।
বিশ্বের শীর্ষ বিশ্ববিদ্যালয়, গবেষণাগার, কর্পোরেট সংস্থা ও আন্তর্জাতিক সংগঠনগুলো
ইংরাজিকেই যোগাযোগের মাধ্যম হিসেবে নিয়েছে।

ইন্টারনেট ও ডিজিটাল দুনিয়ায় এর আধিপত্য আরও স্পষ্ট।
সবচেয়ে বেশি ওয়েবসাইট, গবেষণাপত্র, সফটওয়্যার ডকুমেন্টেশন ও প্রযুক্তিগত
কনটেন্ট লেখা হয় ইংরাজিতে।
ফলে ইংরাজি আজ আর শুধু একটা ভাষা নয়–
এটা ক্ষমতা, সুযোগ ও আধুনিকতার প্রতীক।
ইংরাজি জানলেই স্মার্ট–
এই সামাজিক ধারণা
কিভাবে তৈরি হলো
এই বাস্তবতার মধ্যেই আমাদের সমাজে এক ভয়ঙ্কর ধারণা জন্ম নিয়েছে।
ইংরাজি কেন প্রভাবশালী ভাষা হয়ে উঠল, তার প্রভাব এখন আমাদের মনস্তত্ত্বে
গভীরভাবে গেঁথে গেছে।
ধীরে ধীরে ইংরাজি ভাষা সম্পর্কে আমাদের ব্যবহার ও দৃষ্টিভঙ্গি
এমন জায়গায় পৌঁছেছে যে–
আমরা ভাবতে শুরু করে দিয়েছি, যে ভালো ইংরাজি বলতে পারে,
সে বেশি স্মার্ট, বেশি শিক্ষিত ও আধুনিক।

একজন মানুষ গভীর চিন্তাশীল, বুদ্ধিমান, দূরদর্শী হলেও,
ইংরাজিতে সাবলীল না হলে তাকে বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয় না।
আর উল্টো দিকে–
ফাঁপা জ্ঞান, কিন্তু ঝরঝরে ইংরাজি–
সমাজ তাকে “ইন্টেলেকচুয়াল” বলে মেনে নেয়।
শুধু তাই নয়, আজ ইংরাজি বলা আমাদের কাছে গর্বের বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে।
বাচ্চা ইংরাজিতে গড়গড় করে কথা বললে আমরা খুশি হই,
আর মাতৃভাষায় কথা বললে বলি– “ও তো ঘরোয়া!”
মূলত ভাষার এই আধিপত্যই আমাদের মনে প্রশ্ন জাগায় যে,
শেষ পর্যন্ত ইংরাজি কেন প্রভাবশালী ভাষা হিসেবে আমাদের ব্যক্তিত্বের
মাপকাঠি হয়ে দাঁড়াল?
মাতৃভাষা: ঘরের লোক,
তাই কদর কম
মাতৃভাষা আমাদের কাছে যেন ঘরের লোক।
সবসময় সুখে-দুঃখে পাশে থাকে– তাই তার মূল্য সবচেয়ে কম।
যাকে হারানোর ভয় নেই, তাকেই আমরা সবচেয়ে সহজে অবহেলায় নিই।
বাংলা ভাষায় আমরা কথা বলতে স্বচ্ছন্দ।
বিশেষত প্রয়োজনে ভালোবাসি, উপভোগও করি–
কিন্তু দায়িত্ববোধ?
তা ক্রমশঃ সীমিত ও সঙ্কুচিত হয়ে আসছে।
আজ বাংলা ভাষার সঙ্গে আমাদের সম্পর্ক প্রায় এইটুকুতেই এসে আটকেছে:
- দৈনন্দিন কথাবার্তা।
- আবেগঘন লেখা।
- কবিতা, গল্প, প্রবন্ধ
- দু-চারটে বাংলা সিনেমা।

এর বাইরে?
সেখানেই শুরু হয় এক গভীর শূন্যতা।
- বিজ্ঞান চর্চা এখনও প্রান্তিক ও সীমাবদ্ধ।
- দর্শনচর্চা মূলধারায় প্রায় নেই বললেই চলে।
- প্রযুক্তি ও গবেষণার ভাষা হিসেবে বাংলা কার্যত নেই।
ফলে অজান্তেই একটা বিপজ্জনক ধারণা আমাদের মনে গেঁথে গেছে–
বাংলা ভাষা যেন শুধু অনুভূতির জন্য, কাজের জন্য নয়।
এই ধারণা আজ আর ব্যক্তিগত নয়;
এটা সামাজিকভাবে স্বীকৃত, প্রায় সু-প্রতিষ্ঠিত এক বিশ্বাসে পরিণত হয়েছে।
এই প্রবণতা চললে
বাংলার ভবিষ্যৎ কোথায়?
এই পরিমাণটাই যদি আমাদের মাতৃভাষার প্রতি কর্তব্য হয়,
এইটুকুই যদি প্রকৃত ভালোবাসা ও আবেগ হয়–
তবে একদিন এমন সময় আসবে,
যেদিন বাংলা ভাষা হয়তো বেঁচে থাকবে সমাজের এক কোণায় গিয়ে।
বাংলা থাকবে–
- উৎসবে।
- (দেখুন) আবৃত্তিতে।
- নস্টালজিয়ার লেখায়।

কিন্তু থাকবে না–
- গবেষণার টেবিলে।
- নীতি নির্ধারণে।
- ভবিষ্যৎ নির্মাণের ভাষা হিসেবে।
বাংলা ভাষায় বড় কিছু করা, বাংলায় বিশ্বমানের কাজ ভাবা–
আজ যেন তা কেবল এক স্বপ্ন।
কিন্তু প্রশ্নটা এখানে:
মাতৃভাষায় কি সত্যিই বড়
কিছু করা যায় না?
এই জায়গাতেই সবচেয়ে বড় ভুল।
ইতিহাস আমাদের শেখায়–
মাতৃভাষায় চিন্তা করেই মানুষ সবচেয়ে বড় কাজগুলো করেছে।
ডঃ এ পি জে আব্দুল কালাম:
মাতৃভাষা ভিত্তি, ইংরাজি বাহন
ভারতরত্ন প্রাপ্ত মহান বিজ্ঞানী ডঃ এ পি জে আব্দুল কালাম–
ভারতের মিসাইল কর্মসূচির প্রধান স্থপতি।
তবে মানসিক গঠন, মূল্যবোধ ও চিন্তার ভিত তৈরি হয়েছিল
নিজের মাতৃভাষা তামিল সংস্কৃতির উপর।
তিনি ইংরাজিতে কাজ করেছেন– কারণ বিজ্ঞানচর্চার ভাষা তাই।
কিন্তু চিন্তা, কল্পনা, নৈতিকতা– সবই এসেছে মাতৃভাষার ভিত থেকে।
তিনি নিজেই বলেছেন–
“মাতৃভাষা মানুষকে চিন্তা করতে শেখায়।”
(পৃথিবীর সবচেয়ে পরিষ্কার, সবচেয়ে নিঃশব্দ, সবচেয়ে সুন্দর জায়গায়গুলোর
একটা– সুইজারল্যান্ডের (দেখুন) ডাভোস।
কিন্তু কোনো এক কারণে আজ World Economic Forum Davos hypocrisy
বলতে মানুষ বাধ্য হচ্ছে, কেন?
বরফে মোড়া পাহাড়, নিঃশ্বাস নিলে মনে হয় অক্সিজেনও VIP.
এই জায়গাতেই বসে প্রতিবছর পৃথিবীর সবচেয়ে ক্ষমতাশালী মানুষেরা বলেন–
পড়ুন– Click: World Economic Forum: পৃথিবী বাঁচাবে বলে যারা এসেছিল,
তারাই পৃথিবী পুড়িয়ে গেল!)
আইনস্টাইন ও জার্মান ভাষা:
বিজ্ঞান মাতৃভাষাতেই জন্ম নেয়
বিশ্ববিজ্ঞান বদলে দেওয়া মানুষটা–
অ্যালবার্ট আইনস্টাইন।
আইনস্টাইনের সমস্ত মৌলিক কাজ, গবেষণা ও তত্ত্ব জন্ম নিয়েছে নিজের
মাতৃভাষা জার্মান ভাষায়।
আর ইংরাজি অনুবাদ তাঁর সেই কাজকে বিশ্বব্যাপী ছড়িয়ে দিয়েছে।
অর্থাৎ এটা বলা যেতে পারে– আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি পেতে গেলে ইংরাজিই
সবচেয়ে প্রভাবশালী বাহন।
এটাও প্রমাণ করে–
মহান চিন্তা ভাষা দেখে হয় না, কিন্তু মাতৃভাষাই তার প্রথম আশ্রয়।
আইজ্যাক নিউটন:
চিন্তা মাতৃভাষায়, প্রকাশ
আন্তর্জাতিক ভাষায়
আইজ্যাক নিউটনের Principia Mathematica লেখা হয়েছিল ল্যাটিনে–
কারণ তখন ল্যাটিন ছিল বিজ্ঞানচর্চার ভাষা।
কিন্তু নিউটনের চিন্তা, কল্পনা, গণনা–
সবকিছুই হয়েছিল তাঁর নিজস্ব ভাষাগত পরিবেশে।
ল্যাটিন ছিল বাহন, চিন্তা ছিল মাতৃভাষায় গড়া।
অর্থাৎ ভাষা বদলেছে, কিন্তু চিন্তার উৎস বদলায়নি।
ম্যাডাম কুরি: পোলিশ মনের ভিত
ফরাসি ভাষার সাফল্য
দু’বার নোবেলজয়ী বিজ্ঞানী মারি কুরি
পোলিশ ভাষা ও সংস্কৃতির ভিতেই বড় হয়েছেন।
পরবর্তীতে ফরাসিতে কাজ করলেও, তাঁর গবেষণার জেদ,
অধ্যবসায় ও মানসিক শক্তি মাতৃভাষাগত চর্চা থেকেই এসেছে।
জাপান: মাতৃভাষায় বিজ্ঞান
করে বিশ্ব জয়
জাপান প্রমাণ করেছে–
মাতৃভাষা কোনো বাধা নয়।
তারা বিজ্ঞান, প্রযুক্তি, চিকিৎসা–
সব ক্ষেত্রেই নিজেদের ভাষায় শিক্ষা ও গবেষণার ভিত তৈরি করেছে।
ইংরাজি শিখেছে,
কিন্তু নিজেদের ভাষাকে পিছনে ঠেলে দেয়নি।
হিব্রু ভাষা: মৃত ভাষা থেকে
আধুনিক প্রযুক্তি
হিব্রু একসময় প্রায় মৃত ভাষা ছিল।
আজ সেই ভাষাতেই ইসরায়েল–
- বিশ্বমানের প্রযুক্তি।
- মেডিক্যাল গবেষণা।
- সামরিক উদ্ভাবন।
সবকিছু করছে।
এটা প্রমাণ করে–
ভাষা দুর্বল নয়, দুর্বল হয় সদিচ্ছা।
পরিভাষা সংকট:
আমাদের বড় অজুহাত
আমরা অনেকেই বলি, “বাংলায় তো বিজ্ঞানের সব শব্দ নেই,
বা “প্রযুক্তির কথা বাংলায় বলা কঠিন।” কিন্তু ব্যবহারের মাধ্যমেই তো ভাষা সমৃদ্ধ হয়।
আমরা যদি বাংলায় বিজ্ঞান বা প্রযুক্তি চর্চাই না করি, তবে নতুন শব্দ তৈরি হবে কিভাবে?
পরিভাষা তৈরি না হওয়া ভাষার দুর্বলতা নয়, বরং আমাদের চর্চার অভাব।
তাহলে সমস্যাটা কোথায়?
সমস্যা বাংলা নয়।
সমস্যা আমাদের মানসিকতায়।
আমরা বাংলা ভাষাকে দিয়েছি–
- আবেগ।
- স্মৃতি।
- নস্টালজিয়া।
কিন্তু দিইনি–
- ক্ষমতা।
- গবেষণা।
- ভবিষ্যৎ নির্মাণের দায়িত্ব।

আমরা চাই বাংলা বাঁচুক, কিন্তু চাই না বাংলা নেতৃত্ব দিক।
ইংরাজি কেন প্রভাবশালী ভাষা
সর্বশেষ:
সিদ্ধান্ত আমাদের হাতেই।
ইংরাজি থাকবে।
ইংরাজি প্রয়োজন আছে।
কিন্তু ইংরাজিকে তুলে ধরতে গিয়ে
যদি আমরা মাতৃভাষাকেই নিচে নামাই–
তবে অদূর ভবিষ্যতে একদিন আমাদের পরিচয় হবে একটা ভাষাহীন প্রজন্ম।
তাই আসুন, অন্তত দৈনন্দিন জীবনে যতটুকু সম্ভব আমরা যেন
শুদ্ধ বাংলা শব্দ ব্যবহার করি এবং আমাদের সন্তানদের বাংলায় চিন্তা করতে
অ স্বপ্ন দেখতে উৎসাহিত করি।
ভাষার মর্যাদা কেবল উদযাপনে নয়, তার নিয়মিত ব্যবহারে।
(এখন MOF কি? এর ভবিষ্যৎ প্রয়োগ ঠিক কিভাবে হবে?
MOF কোন পথে যাবে, তা ঠিক করবে মানুষই।
এই আবিষ্কার যেন আমাদের শেখায়–
সভ্যতা শুধু আবিষ্কার দিয়ে বাঁচে না,
বাঁচে সেগুলো কিভাবে ব্যবহার করা হয় তার উপর।
কি হবে তবে MOF এর ভবিষ্যৎ?
এই প্রযুক্তি কি আমাদের অস্তিত্বকে পৃথিবী ধ্বংসের
হাত থেকে আদৌ বাঁচাতে পারবে?
পড়ুন– Click: MOF কি? যে আবিষ্কার বদলে দেবে পৃথিবীর ভাগ্য,
যদি রাজনীতি না হয়!)
(Articlesবাংলা – আমাদের, আপনাদের পরিবার।
ইমেল আইডি দিয়ে আমাদের সাথে যুক্ত হন।
ফলে যখনই এই ব্লগে কোনো নতুন লেখা পোস্ট করা হবে,
সবার আগে আপনিই পাবেন নোটিফিকেশন।
লেখাটা ভালো লাগলে,
শেয়ার করে বন্ধুদের পড়ার সুযোগ করে দিন।
মূল্যবান মন্তব্যে জানান কেমন লাগলো।)
Articlesবাংলা Bangla Articles, Quotes & Prose-Poetry / বাংলা প্রবন্ধ, উক্তি ও গদ্য-কবিতা।


