ভবিষ্যতের বিজ্ঞান, জন্ম হয়েছিল
এক শতাব্দী আগেই:
জগদীশ চন্দ্র বসুর অবদান আধুনিক প্রযুক্তির এক বিস্ময়কর ভিত্তি,
যার জন্ম হয়েছিল এক শতাব্দী আগেই।
জগদীশ চন্দ্র বসু—
এই নামটা আমরা অনেকেই পাঠ্য বইয়ে পড়েছি।
কিন্তু খুব কম মানুষই বুঝে উঠতে পেরেছি,
তিনি আসলে কতটা বড় মাপের দূরদর্শীসম্পন্ন বিজ্ঞানী ছিলেন।
- আজ আপনি হাতে যে স্মার্টফোনটা ধরেছেন।
- যে Wi-Fi সিগন্যাল বাতাসে ভেসে এসে আপনার স্ক্রিনে তথ্য পৌঁছে দিচ্ছে।
- যে মোবাইল নেটওয়ার্ক মুহূর্তে মুহূর্তে আপনার কণ্ঠস্বরকে মাইলের
পর মাইল দূরে পাঠিয়ে দিচ্ছে।
এই সবকিছুর পেছনে যে মৌলিক পদার্থবিদ্যা কাজ করে, তার পরীক্ষামূলক ভিত্তি তৈরি
হয়েছিল এক শতাব্দীরও বেশি আগে কলকাতার এক নিভৃত পরীক্ষাগারে।

বিজ্ঞানের ইতিহাসে কিছু মানুষ আছেন,
যাদের কাজ তাঁদের সময়ের সঙ্গে তাল মেলাতে পারেনি— কারণ সেই কাজ
সময়ের অনেক আগেই জন্ম নিয়েছিল।
আচার্য জগদীশচন্দ্র বসু ছিলেন সেই বিরল শ্রেণীর বিজ্ঞানীদের একজন।
- সে সময় পৃথিবী জানতো না “ওয়্যারলেস ইন্টারনেট” কি?
- জানতো না “সেমিকন্ডাক্টর” শব্দটার অর্থ।
- জানতো না ভবিষ্যতে মানুষ তারহীনভাবে তথ্য আদান-প্রদান করবে।
কিন্তু একজন মানুষ জানতেন— রেডিও তরঙ্গ শুধু তাত্ত্বিক ধারণা নয়,
এরা বাস্তবে কাজ করে, দেয়াল ভেদ করে দূরে থাকা যন্ত্রকে সক্রিয় করতে পারে,
এবং একদিন পুরো মানব সভ্যতার যোগাযোগ ব্যবস্থার ভিত হয়ে দাঁড়াতে পারে।
এই কারণেই নোবেল পুরস্কার প্রাপ্ত পদার্থবিদ স্যার নেভিল মট (পড়ুন) মন্তব্য করেছিলেন—
জগদীশচন্দ্র বসু নিজের সময়ের থেকে বহু দশক এগিয়ে, এবং আধুনিক সেমিকন্ডাক্টর
বিজ্ঞানের আগেই এই আচরণের মৌলিক ইঙ্গিত তিনি তুলে ধরেছিলেন।
এই মন্তব্যটা কোন আবেগপ্রবণ জাতীয়তাবাদী দাবি নয়।
এটা এসেছে এমন একজন বিজ্ঞানীর কাছ থেকে, যিনি নিজে সেমিকন্ডাক্টর ও সলিড-স্টেট
ফিজিক্সে কাজ করে ১৯৭৭ সালে নোবেল পুরস্কারে সম্মানিত হয়েছিলেন।
ইতিহাস জগদীশচন্দ্র বসুকে নোবেল পুরস্কার দেয়নি।
কিন্তু ইতিহাসের পরবর্তী অধ্যায়গুলো একের পর এক প্রমাণ করেছে—
তাঁর কাজ ছিল নোবেল স্তরেরও ঊর্ধ্বে।

এই লেখায় আমরা—
- আবেগ নয়।
- মিথ নয়।
- গল্প নয়।
শুধু প্রামাণ্য বিজ্ঞান আর ইতিহাসের আলোয় বুঝে নেওয়ার চেষ্টা করব,
কেন জগদীশচন্দ্র বসুকে আজও নোবেল ছাড়াই অমর বলে মনে করা হয়।
রেডিও তরঙ্গ: যেখানে বসু
ভবিষ্যৎকে ছুঁয়ে ফেলেছিলেন
আজকের সমস্ত ওয়্যারলেস প্রযুক্তির ভিত্তি একটা সাধারণ বাস্তবতার উপর দাঁড়িয়ে—
(দেখুন) ইলেক্ট্রোম্যাগনেটিক তরঙ্গ বিশেষ করে রেডিও ও মাইক্রোওয়েভ।
১৯ শতকের শেষ দিকে এই তরঙ্গগুলোর অস্তিত্ব নিয়ে তাত্ত্বিক আলোচনা চললেও
উচ্চ ফ্রিকোয়েন্সি রেডিও তরঙ্গ নিয়ে বাস্তব পরীক্ষা-নিরীক্ষা তখনও খুব সীমিত।
এই প্রেক্ষাপটে জগদীশ চন্দ্র বসুর অবদান ও কলকাতায় বসে যে কাজগুলো তিনি করেন,
তা সত্যিই ব্যতিক্রমী।

- তিনি নিজে এমন যন্ত্র তৈরি করেন যার সাহায্যে— উচ্চ ফ্রিকোয়েন্সি রেডিও তরঙ্গ
উৎপন্ন করা যায়। - সেই তরঙ্গের প্রতিফলন বিচ্ছুরণ ও পোলারাইজেশন পরীক্ষা করা যায়।
- তরঙ্গ কিভাবে বিভিন্ন বাধা অতিক্রম করে, তা পর্যবেক্ষণ করা যায়।
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হল—
এই কাজগুলো কেবল তাত্ত্বিক গবেষণার মধ্যেই সীমাবদ্ধ ছিল না।
১৮৯৭ সালে লন্ডনের (দেখুন) Royal Institution-এ, বিশ্বের তৎকালীন অন্যতম মর্যাদাপূর্ণ
বৈজ্ঞানিক মঞ্চে, জগদীশ চন্দ্র বসু পাবলিক ডেমনস্ট্রেশনের মাধ্যমে দেখিয়ে দেন—
- রেডিও তরঙ্গ দেওয়াল ভেদ করে যেতে পারে।
- দূরে রাখা যন্ত্রকে সক্রিয় করতে পারে।
- এবং তারহীনভাবে শক্তি ও সংকেত পরিবহন সম্ভব।

(মানুষ যখন সাফল্যের শিখরে পৌঁছতে শুরু করে, তখন সে ‘সাফল্য’
একটা ছাঁকনির মতন হয়ে যায়।
কে সেই সাফল্যে প্রকৃত আনন্দ পেল, কে শুভাকাঙ্ক্ষী।
আর কেউ বা ভিতরে ভিতরে ঈর্ষাকাতর হয়ে পড়ল।
সবগুলোই ছেঁকে বেরিয়ে আসে।
মহামানব স্বামী বিবেকানন্দ, নেতাজী সুভাষ চন্দ্র বসু—
কাউকেই ছাড়েনি এই ঈর্ষার আগুন।
তবে শেষ পর্যন্ত কি হয়েছিল স্বামী বিবেকানন্দের?
পড়ুন– Click: স্বামী বিবেকানন্দের বিশ্বজয়ের আড়ালে এক
অজানা যন্ত্রণার ইতিহাস!)
এই প্রদর্শনী কোনো ব্যক্তিগত দাবি বা স্থানীয় পরীক্ষাগারের ঘটনা নয়—
এটা ছিল ইউরোপের বৈজ্ঞানিক মহলে সরাসরি স্বীকৃত, প্রামাণ্য ও নথিভুক্ত এক
ঐতিহাসিক বিজ্ঞান প্রদর্শন।
আজকের ভাষায় বললে—
তিনি তখনই দেখিয়ে দিয়েছিলেন Wireless Signal Propagation-এর বাস্তব পদার্থবিদ্যা।
আজকের Wi-Fi বা 5G-এর সাথে
বসুর কাজের সম্পর্ক কি?
এখানে একটা বিষয় পরিষ্কার করা জরুরী।
জগদীশচন্দ্র বসু Wi-Fi, Bluetooth বা 5G আবিষ্কার করেননি।
এই প্রযুক্তিগুলো এসেছে বহু দশক পরে, জটিল ইঞ্জিনিয়ারিং ও প্রোটোকলের মাধ্যমে।
কিন্তু আধুনিক যোগাযোগ ব্যবস্থায় জগদীশ চন্দ্র বসুর অবদান হল—
এইসব প্রযুক্তির নিচে যে মৌলিক পদার্থবিদ্যা কাজ করে,
তার পরীক্ষামূলক ভিত্তি তৈরি করা।
আজকের Wi-Fi বা 5G—
- রেডিও ও মাইক্রোওয়েভ তরঙ্গ ব্যবহার করে।
- অ্যান্টেনার মাধ্যমে তরঙ্গ পাঠায় ও গ্রহণ করে।
- তরঙ্গের প্রতিফলন ও শোষণ নিয়ন্ত্রণ করে।

এই প্রতিটা স্তরে যে ফিজিক্স কাজ করে, তার অনেকটাই বসু তাঁর সময়েই
পরীক্ষাগারে দেখিয়ে দিয়েছিলেন।
এই কারণেই তাঁকে আধুনিক ওয়্যারলেস যোগাযোগের ইতিহাসে
একজন পথপ্রদর্শক বিজ্ঞানী হিসেবে গণ্য করা হয়।
অ্যান্টেনা ও রিসিভার: বসুর নীরব অবদান
ওয়্যারলেস যোগাযোগের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অংশ হলো রিসিভার—
যে যন্ত্রটা সিগন্যাল ধরে এবং তাকে অর্থবহ তথ্যে রূপান্তর করে।
জগদীশচন্দ্র বসু এই জায়গায় অসাধারণ কাজ করেছিলেন।
তিনি নিজের ডিজাইন করেন—
- Waveguide.
- Horn Antenna.
- Dielectric Lens.
এবং এগুলো ব্যবহার করে রেডিও তরঙ্গকে নিয়ন্ত্রণ ও ডিটেক্ট করেন।

তিনি এমন ডিটেক্টর তৈরি করেন, যেগুলো উচ্চ ফ্রিকোয়েন্সির তরঙ্গ গ্রহনে কার্যকর ছিল।
এই ডিভাইসগুলো আধুনিক রিসিভার এর মত নয়, কিন্তু কার্যগত দিক থেকে এগুলোকে
আধুনিক অ্যান্টেনা ও রিসিভারের পূর্বসূরী বলা যায়।
এই কারণেই অনেক গবেষকের মতে, ওয়্যারলেস কমিউনিকেশনের প্রাথমিক পর্যায়ে
বসুর ডিটেক্টর ও পরীক্ষাগুলো গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছিল।
সেমিকন্ডাক্টর: যেখানে বসু সত্যিই
সময়ের অনেক আগেই
পৌঁছে গিয়েছিলেন
আজকের ডিজিটাল সভ্যতা দাঁড়িয়ে আছে সেমিকন্ডাক্টর প্রযুক্তির ওপর।
ট্রানজিস্টর, চিপ, প্রসেসর—
সবকিছুর মূলে রয়েছে P-type ও N-type সেমিকন্ডাক্টরের আচরণ।
এই ধারণাগুলো আনুষ্ঠানিকভাবে ২০ শতকের মাঝামাঝিতে বিকশিত হলেও,
আধুনিক বিজ্ঞানে জগদীশ চন্দ্র বসুর অবদান অনন্য বা অতুলনীয়।
কিন্তু তার বহু আগেই জগদীশচন্দ্র বসু এমন কিছু পরীক্ষামূলক ফলাফল তুলে ধরেছিলেন
যেগুলো সেমিকন্ডাক্টারের মৌলিক আচরণের সঙ্গে আশ্চর্যজনকভাবে মিলে যায়।
এখন এই ধারণা চুরি করা হয়েছিল কিনা তা যুক্তি-তর্ক সাপেক্ষ।
কারণ: ধারণা চুরি ইতিহাস বা বর্তমানের এক কমন ব্যাপার।

তিনি বিভিন্ন ক্রিস্টাল পদার্থ ব্যবহার করে দেখান—
- কিছু সংযোগ একদিকে বিদ্যুৎ প্রবাহ সহজে হতে দেয়।
- উল্টোদিকে প্রবাহ বাধাগ্রস্ত হয়।
- আলো ও তাপের প্রভাবে বৈদ্যুতিক বৈশিষ্ট্য বদলে যায়।
আজ আমরা জানি—
এগুলোই সেমিকন্ডাক্টরের Rectifying ও Sensitivity Behaviour.
বসু এগুলোকে আধুনিক পরিভাষায় ব্যাখ্যা করেননি, কারন সেই ভাষা তখনও তৈরি হয়নি।
কিন্তু তাঁর পরীক্ষাগুলো স্পষ্টভাবে দেখায়—
তিনি সেমিকন্ডাক্টর আচরণের পরীক্ষামূলক ইঙ্গিত অনেক আগেই পেয়ে গিয়েছিলেন।
স্যার নেভিল মটের মন্তব্যের গুরুত্ব:
এই প্রেক্ষাপটেই নোবেল জয়ী পদার্থবিদ স্যার নেভিল মট মন্তব্য করেছিলেন—
জগদীশচন্দ্র বসু তাঁর সময়ের থেকে অন্তত বহু দশক এগিয়ে,
এবং আধুনিক সেমিকন্ডাক্টর বিজ্ঞানের বহু ধারনা তিনি অনেক আগেই ইঙ্গিত
আকারে তুলে ধরেছিলেন।
এই মন্তব্যের গুরুত্ব এখানেই—
- এটা কোনো রাজনৈতিক বক্তব্য নয়।
- কোনো আবেগপ্রবণ জাতীয় গর্বও নয়।
এটা এসেছে এমন একজন বিজ্ঞানীর কাছ থেকে, যিনি নিজের সেমিকন্ডাক্টর ফিজিক্সের
বিকাশে কেন্দ্রীয় ভূমিকা পালন করেছিলেন।
(এই একটা বাক্যেই লুকিয়ে আছে শতকোটি ভারতীয়র
জেদ আর বিজ্ঞানীদের নিঃশব্দ বিপ্লবের ইতিহাস–
আমেরিকার না: ভারতের বিশ্বজয়…
যখন বিশ্বের মহাশক্তিরা ভারতের সম্ভাবনাকে তুচ্ছজ্ঞান করে
সাহায্যের সব দরজা বন্ধ করে দিয়েছিল, ভারত তখন সেই চরম
অপমানকেই বানিয়েছিল মহাশূন্যে পাড়ি দেওয়ার জ্বালানি।
কিভাবে?
কি হয়েছিল সে সময়ে?
পড়ুন– Click: ভারতের DNA: আমেরিকা যদি ভুলে যায়, দোষ ভারতের নয়!)
জগদীশ চন্দ্র বসুর অবদান:
তাহলে নোবেল পুরস্কার
কেন পেলেন না?
এই প্রশ্নটা প্রায় অনিবার্য।
একজন বিজ্ঞানী—
- যিনি ওয়্যারলেস কমিউনিকেশনের মৌলিক ফিজিক্স দেখিয়েছেন।
- যিনি সেমিকন্ডাক্টর আচরনের প্রাথমিক ইঙ্গিত দিয়েছেন।
- আন্তর্জাতিক মানের গবেষণা যিনি প্রকাশ করেছেন।
তিনি কেন নোবেল পুরস্কার পেলেন না?
এর পিছনে কয়েকটা বাস্তব কারণ আলোচনা করা হয়—
১. ঔপনিবেশিক বাস্তবতা
ইউরোপের বাইরে হওয়া গবেষণা তখন, অনেক ক্ষেত্রেই গুরুত্ব পেত না।
২. পেটেন্টে অনাগ্রহ
বসু বিশ্বাস করতেন— বিজ্ঞান মানবজাতির জন্য, ব্যক্তিগত মালিকানার জন্য নয়।
৩. ক্রেডিট সিস্টেমের সীমাবদ্ধতা
তাঁর কাজ ব্যবহার হয়েছে, কিন্তু বহু ক্ষেত্রে কৃতিত্ব নিঃসংকোচে অন্যদের ঝুলিতে গেছে।
জগদীশ চন্দ্র বসুর অবদান,
নোবেল ছাড়াও অমর:
নোবেল প্রাইজ কাউকে বড় বিজ্ঞানী বানায় না।
কখনও কখনও বড় বিজ্ঞানীরাই প্রমাণ করে দেন— নোবেল কি মিস করেছে।
জগদীশচন্দ্র বসু সেই মানুষদের একজন।
আজ—
- আপনার মোবাইল সিগন্যাল।
- আপনার Wi-Fi সংযোগ।
- আমাদের স্মার্ট ডিভাইসের চিপ।
সবকিছুই দাঁড়িয়ে আছে সেই মৌলিক ফিজিক্স এর উপর, যা তিনি এক শতাব্দীরও বেশি আগে
পরীক্ষাগারে দেখিয়ে দিয়েছিলেন।
তিনি নোবেল ছাড়াই অমর।
কারণ তাঁর কাজ আজও জীবিত—
আর আমাদের ভবিষ্যৎ আজও তার উপর দাঁড়িয়ে।
বিজ্ঞানের অন্তরালে:
সত্যের জয়জয়াকার
জগদীশ চন্দ্র বসু মূলত ৫ মিলিমিটার (৬০ গিগাহার্টজ) তরঙ্গদৈর্ঘ্যের অত্যন্ত উচ্চ
ফ্রিকোয়েন্সির তরঙ্গ নিয়ে কাজ করেছিলেন।
আশ্চর্যের বিষয় হল– আজকের অত্যাধুনিক 5G প্রযুক্তি ঠিক এই ‘মিলিমিটার ওয়েভ’
ব্যবহার করেই কাজ করে।
অর্থাৎ আমরা আজ যা নিয়ে গর্ব করছি, তার বীজ তিনি বপন করেছিলেন এক
শতাব্দী আগেই।
আবার ইতিহাসে রেডিও আবিষ্কারের কৃতিত্ব অনেক সময় কেবল গুগলিয়েলমো
মার্কোনিকে দেওয়া হয়।
কিন্তু সত্য এই যে, তখন তিনি সিগন্যাল রিসিভ করার জন্য ব্যবহার করেছিলেন
বসুর উদ্ভাবিত ‘মার্কারি কোহেরার’ (Mercury Coherer).
অথচ সেই কৃতিত্বের ভাগীদার বসুকে করা হয়নি।
এই বৈজ্ঞানিক অবিচার সত্ত্বেও তিনি ছিলেন অবিচল, কারণ তাঁর লক্ষ্য খ্যাতি নয়,
সত্যের অনুসন্ধান।
যেখানে বিজ্ঞান ও দর্শন
মিলেমিশে একাকার:
সবশেষে ভাবলে অবাক হতে হয়, একজন মানুষ একই জন্মে ঠিক কতটা প্রতিভার
অধিকারী হতে পারেন!
জগদীশ চন্দ্র বসু কেবল বেতার তরঙ্গ বা সেমিকন্ডাক্টরের জনক ছিলেন না;
তিনি ছিলেন সেই বিরল বিজ্ঞানী, যিনি পদার্থবিজ্ঞানের কঠিন সমীকরণ থেকে বেরিয়ে
এসে জীবনের স্পন্দন খুঁজেছিলেন উদ্ভিদের মধ্যেও।
এক হাতে তৈরি করেছেন ক্রেস্কোগ্রাফের মত সূক্ষ্ম যন্ত্র, অন্য হাতে প্রমাণ করেছেন–
লোহা কিংবা উদ্ভিদেরও ক্লান্তি আছে, বেদনা আছে।

আজকের যুগে আমরা যেখানে একটা বিষয় নিয়ে পড়তেই হিমশিম খাই,
সেখানে এক শতাব্দী আগে তিনি পদার্থবিজ্ঞান ও জীববিজ্ঞানের সীমানা মুছে দিয়েছিলেন।
তাঁর এই বহুমুখী প্রতিভা কেবল বুদ্ধিমত্তার পরিচয় নয়,
বরং এটা ছিল এক গভীর দার্শনিক অন্তর্দৃষ্টি।
তিনি বিশ্বাস করেছিলেন এই মহাবিশ্বের জড় আর জীব—
সবকিছুর মূলেই রয়েছে এক অবিচ্ছেদ্য একতা।
পরমাণুর স্পন্দন থেকে শুরু করে গাছের পাতায় প্রাণের শিহরণ, সবখানেই তিনি
দেখেছিলেন একই অখন্ড সত্য।
ইতিহাসের পাতায় তাঁর নাম হয়তো কোন বিশেষ পদকের তালিকায় নেই,
কিন্তু বিজ্ঞানের প্রতিটা স্পন্দনে, প্রতিটা তারহীন বার্তায় এটা প্রতিটা সজীব প্রাণকোষের
গবেষণায় স্যর আচার্য জগদীশচন্দ্র বসু বেঁচে থাকবেন এক পরম বিস্ময় হয়ে।
২১ শতকের এই ডিজিটাল পৃথিবীতে দাঁড়িয়ে আমরা সশ্রদ্ধ চিত্তে
শুধু এটুকুই বলতে পারি— পৃথিবী আপনাকে চিনতে দেরি করেছে ঠিকই,
কিন্তু আপনার রেখে যাওয়া আলোতেই আজ আলোকিত
আমাদের বর্তমান এবং ভবিষ্যৎ।
শেষ কথা:
ইতিহাস সব সময় তৎক্ষণাৎ ন্যায্য হয় না।
কিন্তু সত্য শেষ পর্যন্ত নিজের জায়গা ঠিকই খুঁজে নেয়।
স্যর আচার্য জগদীশচন্দ্র বসু এর জ্বলন্ত প্রমাণ।
(গত এক দশকে— “জলবায়ু পরিবর্তন ও বৃক্ষরোপণ” বা “গাছ লাগান পৃথিবী বাঁচান”—
এই বাক্যটা প্রায় নৈতিক মন্ত্রে পরিণত হয়েছে।
স্কুলের অনুষ্ঠান থেকে কর্পোরেট CSR, সোশ্যাল মিডিয়া ক্যাম্পেইন থেকে
রাজনৈতিক বক্তৃতা— সব জায়গাতেই গাছ লাগানোই যেন
জলবায়ু সংকটের চূড়ান্ত সমাধান।
কিন্তু এখানেই সবচেয়ে বিপজ্জনক ভুলটা হচ্ছে।
প্রযুক্তি আমাদের বাঁচাবে, এই আশ্বাস কতটা সত্যি?
গাছ লাগিয়েও কি আদতে রক্ষা পাবো আমরা?
আমাদের এতদিনের সাধের পৃথিবী বাঁচবে?
পড়ুন– Click: জলবায়ু সংকট চরমে: গাছ লাগালেও কি শেষ রক্ষা পাবো আমরা?)
(Articlesবাংলা – আমাদের, আপনাদের পরিবার।
ইমেল আইডি দিয়ে আমাদের সাথে যুক্ত হন।
ফলে যখনই এই ব্লগে কোনো নতুন লেখা পোস্ট করা হবে,
সবার আগে আপনিই পাবেন নোটিফিকেশন।
লেখাটা ভালো লাগলে,
শেয়ার করে বন্ধুদের পড়ার সুযোগ করে দিন।
মূল্যবান মন্তব্যে জানান কেমন লাগলো।)
Articlesবাংলা Bangla Articles, Quotes & Prose-Poetry / বাংলা প্রবন্ধ, উক্তি ও গদ্য-কবিতা।

