জাপানের সেই গ্রাম–
যেখানে সবাই আপনার দিকে তাকিয়ে আছে,
কিন্তু কেউ বেঁচে নেই!
ভাবুন তো– আপনি জাপানের (দেখুন) Shikoku দ্বীপ-এর দুর্গম পাহাড়ি পথে ঘুরতে বেরোলেন।
হঠাৎ এক অচেনা গ্রামের নাম শুনলেন: Nagoro.
যা Iya valley, Tokushima Prefecture- এ অবস্থিত।
কেউ একজন বললেন– “খুব সুন্দর জায়গা…কিন্তু একটু অদ্ভুত।”
আপনি কৌতুহলে পা বাড়ালেন।

গ্রামে ঢোকার আগে দূর থেকে প্রথম দেখলেন–
মনে হচ্ছে এক বৃদ্ধ লোক বাগানের ফুল গাছে জল দিচ্ছে, বাতাসে তার জামা দুলছে।
সামান্য কিছুটা এগিয়ে দেখলেন–
তিনজন নারী বোধহয় রাস্তার ধারে বসে কি যেন গল্প করছে,
পাশে একটা ছোট মেয়ে স্কুলব্যাগ কাঁধে নিয়ে, গাছের দিকে দাঁড়িয়ে কিছু দেখছে।
একটু দূরে একটা জামা-কাপড়ের দোকান থেকে একজন মহিলা বাইরের দিকে উঁকি দিচ্ছে, যেন কিছুক্ষণ ধরে কারো অপেক্ষায় তাকিয়ে আছে।

সব মিলিয়ে গ্রামটা অদ্ভুত সজীব।
কিন্তু…
আপনি সেখান থেকে হঠাৎই যা অনুভব করলেন, তাতে যেন সাময়িক স্তব্ধ হয়ে গেল আপনার হৃদপিণ্ড।
যারা নড়ে না– অথচ আপনাকে চুপচাপ দেখছে
আপনি এতক্ষণ যাদের দেখলেন, তারা কেউ একটুও নড়ছে না।
- নারীদের ঠোঁট– চুপচাপ, জমাট বাঁধা।
- ছোট মেয়েটার চোখ– অস্বাভাবিকভাবে স্থির হয়ে আছে।
- বৃদ্ধ লোকটা সেই যেখানে দাঁড়িয়ে ছিলেন– সেখান থেকে এক ফোঁটাও নড়েনি।
কাছে আসতেই যেন এক সজোরে ধাক্কা খেলেন আপনি।
মানুষের আকার, মানুষের মুখ–
কিন্তু ভিতরে প্রাণ নেই; আছে শুধুই তুলো, কাপড় আর প্লাস্টিক।
এতক্ষণ যাদের দেখছিলেন… এরা সবই পুতুল!
ঠিক সেই মুহূর্তেই একজন বৃদ্ধা আপনার কাছে এগিয়ে এসে বললেন–
“এ গ্রামে এখন জীবিত আছে প্রায় ৩০ জনের কিছু বেশি-কম।
যারা একসময় মানুষ ছিল, এখন তারা সব স্মৃতি-পুতুল হয়ে দাঁড়িয়ে আছে।”
এই গ্রাম এমন এক রহস্যময়, এমন নিঃশব্দ,
যেন কোনো এক অজানা আতঙ্কের কালো ছায়া গোটা গ্রামটাকে গিলে নিতে চায়।
কেন তৈরি হলো এই পুতুল-গ্রাম?
আপনার কৌতুহল এবারে এর মাত্রার সীমা অতিক্রম করে গেল।
আপনি বৃদ্ধাকে জিজ্ঞাসা করে বসলেন–
“কিভাবে মারা গেল সবাই?”
দীর্ঘনিঃশ্বাস ফেলে, বৃদ্ধা একবার আকাশের দিকে তাকালেন, যেন পুরনো বিশেষ কিছু মনে করতে চাইলেন।
- “৩০০ জন মতন মানুষ ছিল এই গ্রামে।
- কেউ মারা গেল বয়সে।
- কেউ শহরে চলে গেল কাজের খোঁজে।
- নতুন শিশুর জন্মহার ছিল ভীষণ কম।
- কেউ আর ফিরে আসেনি।
- এভাবে স্কুল বন্ধ হয়ে গেল, দোকান, ঘর-বাড়িগুলো ফাঁকা হল।
গ্রামটা ধীরে ধীরে খালি হতে লাগলো… যেন গ্রামটার নিঃশ্বাস বন্ধ হয়ে আসছিল।”
গ্রামটাকে বাঁচিয়ে রাখার জন্য মানবিকতা উজাড় করে, যে বৃদ্ধা এই অনন্য নজির গড়েছেন…তিনি–
(ভারতের ক্ষেত্রেও ঘটনাটা ঠিক এভাবেই ঘটেছে।
পড়ুন– Click: ভারতের প্রাচীন আবিষ্কার: যেগুলোর কৃতিত্ব লুঠ করা হয়েছে!)
স্মৃতি বাঁচানোর পুতুল– Tsukumi Ayano
(দেখুন বিস্তারিত) Nagoro গ্রামের এই অবিশ্বাস্য ঘটনা এক নারীর হাত ধরে সম্ভব হয়েছে–
Tsukumi Ayano.
যখন গ্রামে মানুষ কমতে শুরু করল, স্কুল বন্ধ হয়ে গেল, দোকান-ঘর বন্ধ হয়ে গেল, তখন Ayano বুঝলেন– গ্রাম ধীরে ধীরে নিঃশব্দ, জনশূন্য হয়ে যাবে।
একাকীত্ব ও অবসাদে এই গ্রামটা সাদা-কালো হয়ে যাবে, নিস্প্রাণ হয়ে উঠবে।
তিনি নিজে থাকতেন একা, কিন্তু প্রতিটা মানুষের মুখ তার মনে ছিল।
তাই প্রথমে তৈরি করলেন একটা Scarecrow (ধানক্ষেত বা বাগানে পাখি বা প্রাণীদের ভয় দেখানোর জন্য তৈরি করা মানুষের মতো পুতুল)– পুরনো জামা দিয়ে।
কিন্তু যখন সেটা রাস্তার ধারে দাঁড়ালো, গ্রামে আসা কেউ প্রথমে ভেবেছিল,
“কেউ দাঁড়িয়ে আছে।”
আর এটাই ছিল তার শুরু, নিঃশব্দ বিপ্লবের।
Ayano এরপর ক্রমশ বানাতে লাগলেন জীবন-আকারের পুতুল।
স্কুলের ছাত্র, শিক্ষক, কৃষক, দোকানদার, বৃদ্ধা, শিশু– এভাবে প্রতিটা পুতুলে তিনি বসালেন মানুষের মতন মুখ, ভঙ্গি এবং স্মৃতি (বিস্তারিত দেখুন)– (Tokyo Weekender) দশকের পর দশক ধরে Nagoro হয়ে উঠল এক পুতুল-গ্রাম।

আজ প্রায় ৩০০ থেকে প্রায় ৪০০ পুতুল গ্রামে ছড়িয়ে আছে, যেখানে জীবিত মানুষের সংখ্যা কমে প্রায় ৩০ জনের কিছু বেশি-কম,
সেখানে তাদের স্মৃতিতে পুতুলের সংখ্যা প্রায় ১০ গুণ বেশি।
নিস্তব্ধতার মধ্যে দিয়ে আসা গা ছমছম
Nagaro-তে হঠাৎ দাঁড়িয়ে পুতুলেরা যেন চোখ দিয়ে আপনাকে পর্যবেক্ষণ করছে।
- রাস্তায় হাঁটতে হাঁটতে অনুভব করবেন– চারিদিক নিঃশব্দ, কিন্তু উপস্থিতি প্রবল।
- শিশুর খেলা নেই, বাগানের পাখি ছাড়া কেবল বাতাসের ফিসফিস।
- এখানাকার স্কুলের ক্লাসরুম, যা আগে শিশুদের উল্লাসে ভরপুর ছিল, এখন শুধু পুতুলের বসা, দাঁড়ানো।
- রাস্তায়, ঘরে, মাঠে, নদীর ধারে– সব পুতুল।

তাদের দৃষ্টিতে স্থিরতা, নিস্তব্ধতা আর কেমন যেন একধরণের ভৌতিক আত্মার ছায়া।
- কেউ বলছে– রাত হলে যেন গ্রাম জীবিত হয়ে ওঠে– পুতুলেরা যেন শ্বাস নিচ্ছে।
- কেউ বলছে– কোনো কোনো পুতুল আবার নাকি চোখের পাতাও ফেলে।
কিন্তু বাস্তবে এগুলো স্থির স্মৃতির সংকেত বহন করে চলেছে, যা Ayano- এর ভালোবাসা ও আবিষ্কারের মাধ্যমে মৃত মানুষদের প্রতিচ্ছবি ধরে রাখে।
অস্তিত্ব কি শুধু জীবন্ত?
Nagoro শুধুই একটা গ্রাম নয়; এটা এক দার্শনিক পরীক্ষা।
- মানুষ চলে গেলে, কি তাদের অস্তিত্ব চলে যায়?
- স্মৃতি কি বেঁচে থাকতে পারে?
- পুতুল কি শুধুই প্লাস্টিক ও তুলোর তৈরি, নাকি সেখানে কিছু মানবিক আত্মা লুকিয়ে আছে?
Ayano- এর পুতুলগুলো বলে–
“যদি আমাদের মনে রাখো, আমরা বেঁচে আছি।”
Nagoro দেখায় যে, সময়ের সাথে জীবন বদলায়, মানুষ চলে যায়, কিন্তু স্মৃতি;
চুপচাপ, নিঃশব্দে বেঁচে থাকে।
নীরব স্মৃতির শেষ আলো
Nagoro- তে দাঁড়ালেই প্রথম যে অনুভূতিটা আপনাকে গ্রাস করে,
তা হল এক অদ্ভুত উপস্থিতির টান।
মানুষ নেই, কিন্তু মানুষের অনুপস্থিতির চাপে গ্রামটা যেন ভারী হয়ে আছে।
বাতাসে যেন অসংখ্য অদেখা গল্পের ওজন।
রাস্তার ধারে, ভাঙা ঘরের সামনে কিংবা পুরনো স্কুলের দরজায় দাঁড়ানো পুতুলগুলোর মুখ এমনভাবে সাজানো যে মনে হয়–
তারা ঠিক এখনই কিছু বলতে চেয়েছিল, কিন্তু থেমে গেছে।

Ayano জানতেন, মানুষ একদিন চলে যাবে;
কিন্তু স্মৃতিগুলো যদি প্রতীকী আকারে টাটকা করে রাখা যায়,
তবে তা হবে এক অনন্য মনস্তত্ত্ব।
তিনি বুঝেছিলেন স্মৃতিগুলোও যদি ধীরে ধীরে মনের ক্যানভাস থেকে মুছে যায়,
তবে গ্রামের আত্মাটাই হারিয়ে যাবে।
সেই একাকিত্ব থেকেই জন্ম নিয়েছিল তার পুতুল-অভিযান।
আজ সারা গ্রাম জুড়ে ছড়িয়ে থাকা প্রায় ৪০০ পুতুল যেন সেই মানুষগুলোর আর কোনোদিন না ফেরার কর্তব্য পালন করছে।
এরা কেউ কথা বলেনা, নড়ে না, কিন্তু বেঁচে থাকার সতেজ অনুভূতি বহন করে।
তাই এই গ্রাম এক আতঙ্ক নয়, বরং এক গভীর উপলব্ধি–
যতদিন কেউ কাউকে মনে রাখে,
পৃথিবীর কোনো প্রান্ত থেকেই সে পুরো হারিয়ে যায় না।
(আপনি কি আপনার শিশুকে
পড়াশোনা, শৃঙ্খলা, আচরণ–
এসবের জন্য নিয়মিত চাপ দেন?
বুঝে বা না-বুঝে প্রায়ই বকেন, ধমক দেন,
তুলনা করেন বা সোজা পথে আনার জন্য কঠোর হন?
জানেন কি হতে পারে ভবিষ্যতে?
পড়ুন– Click: আপনি কি আপনার শিশুকে পড়াশোনা, শৃঙ্খলা, আচরণ–
এসবের জন্য নিয়মিত চাপ দেন?)
(Articlesবাংলা – আমাদের, আপনাদের পরিবার।
ইমেল আইডি দিয়ে আমাদের সাথে যুক্ত হন।
ফলে যখনই এই ব্লগে কোনো নতুন লেখা পোস্ট করা হবে,
সবার আগে আপনিই পাবেন নোটিফিকেশন।
লেখাটা ভালো লাগলে,
শেয়ার করে বন্ধুদের পড়ার সুযোগ করে দিন।
মূল্যবান মন্তব্যে জানান কেমন লাগলো।)
Articlesবাংলা Bangla Articles, Quotes & Prose-Poetry / বাংলা প্রবন্ধ, উক্তি ও গদ্য-কবিতা।

