মায়ের দর্শন নাকি ব্যবসার শো রুম?

দক্ষিণেশ্বর থেকে নৈহাটি– ভক্তির কৌতুকের খোঁজে…

দেবীর দরবারে প্রবেশ, পকেট ফাঁকা

পশ্চিমবঙ্গের বিখ্যাত মন্দিরগুলো– দক্ষিণেশ্বর, কালীঘাট, তারাপীঠ,
নৈহাটির বড় মা– শুনলেই মনটা ভক্তি-শ্রদ্ধায় পূর্ণ হয়ে ওঠা স্বাভাবিক।

শুনলেই মনে হয় আমরা দেবীর কাছেই আছি।
কিন্তু বাস্তবতা মাঝে মাঝে এসে বলে– “হায়! হায়! ভক্তি আর ব্যবসার মধ্যে রেখা কোথায় গেল?”

আজকাল অনেক মন্দিরে দর্শন মানে প্রার্থনা নয়, বরং লাইনে দাঁড়িয়ে পকেটের ক্যালকুলেটর চালানো।
ভক্তরা আসে প্রণাম করতে, শান্তি পেতে, কিন্তু বেরিয়ে যায় বিল ও রসিদ নিয়ে মাথা ঘামিয়ে।
পুরোহিত বা মন্দির কর্তৃপক্ষের দৃষ্টি বেশিরভাগ সময়ে ভক্তদের চেহারা নয়,
বরং পকেটের দিকে থাকে।
“বিশেষ ভোগ?– QR স্ক্যান করেছেন কি?”
এই প্রশ্নগুলো শুনে মনে হয়, মায়ের দর্শন নয়, প্রাইস লিস্টের শো রুমে আমরা ঢুকেছি। 

দক্ষিণেশ্বর: মায়ের বার্তা না মার্কেটিং মেসেজ?

দক্ষিণেশ্বর কালীমন্দির পবিত্র ইতিহাসের ধারক।
কিন্তু আজ এখানে গেলে চোখে পড়ে– প্রসাদের জন্য আলাদা স্টল, ফুল-লাড্ডুর দোকান, “প্রাইম দর্শন” প্যাকেজ, বিশেষ ভোগ প্যাকেজ।

ভক্তরা দাঁড়িয়ে আছেন মায়ের দর্শনের জন্য, আর পাশেই পুরোহিত বা পুরোহিত সহযোগী হাসিমুখে বলেন–

“ভোগ নিবেদনের জন্য বিশেষ প্যাকেজ নিতে চান?”

মায়ের আশীর্বাদ দরকার আছে কি না, নাকি ব্র্যান্ডেড ভোগের টিকিটের জন্য লাইনে দাঁড়াতে হবে– এই প্রশ্ন তখন ভক্তদের মাথায় ঘুরপাক খাচ্ছে।
শুধু (দেখুন) দক্ষিণেশ্বর, নৈহাটির বড় মা নয়, কোলকাতার আশেপাশের অনেক
মন্দিরেও প্রায় একই দৃশ্য।

দর্শন মানে ধ্যান নয়; দর্শন মানে বিলের খাতা, QR কোড এবং স্টল ভিজিটের তালিকা।

কালীঘাট: ভক্তি নাকি VIP লাইনের লড়াই?

কালীঘাট মন্দিরে ভক্তি আছে প্রচুর।
কিন্তু আজকাল এখানে দর্শন মানে অধিকাংশ সময় “VIP দর্শন, বিশেষ স্লট, প্রাইম ভোগ।”
ভক্তরা লাইনে দাঁড়ান,
আর মন্দিরের ভিতর থেকে কেউ ফিসফিস করে বলে বসেন–
“৫০০ টাকা দিলে, একেবারে কাছ থেকে দর্শন করিয়ে দেব।”

ফলে দর্শন হয়ে যায় পকেটের দিকে চোখ রেখে দর্শন।
কেউ আশীর্বাদ নিতে আসে, কেউ প্রশ্ন করে– “কত টাকা দিতে হবে?”

ফলে আজ আর মনে হয় না, আমরা শান্তিপূর্ণভাবে মায়ের চরণে নিজেকে অর্পণ করতে যাচ্ছি– বরং মনে হয়, যেন কর্পোরেট ইভেন্টে অংশগ্রহণ করছি।


(হঠাৎ অসুস্থতা, দুর্ঘটনা বা প্রাণসংকটের মুহূর্তে

আমরা আতঙ্কে অনেক সময়ে ভুল সিদ্ধান্ত নিই।
অনেক সময় হাসপাতালের কথাই চূড়ান্ত মেনে নিয়ে নীরবে সব সহ্য করি–
কারণ রোগীই তখন আমাদের দুর্বলতা।

পড়ুন– Click: হাসপাতাল, আইন আর রোগী:
যে সত্যগুলো না জানলে আপনি সর্বশান্ত হতে পারেন!)

তারাপীঠ: পুণ্য না, ফ্র্যাঞ্চাইজি যেন!

(দেখুন) তারাপীঠ মন্দিরে মা তারার আরাধ্যা বহু বছর ধরে চলে আসছে।
কিন্তু আজকাল দর্শন মানে এক ধরনের প্যাকেজ ট্যুর মনে হয়,
যেখানে চোখে পড়ে প্রায় প্রতিটা পদে “স্পেশাল অফার” বা “এক্সক্লুসিভ সার্ভিস।”

যেখানে একসময় ভক্তরা কেবল প্রণাম করতেন, ভক্তিতে পূর্ণ হতেন, আশীর্বাদ নিতেন,
মাকে নিজের মনের কথা বলতেন।
এখন সেখানে চোখে পড়ে বাজেট চার্ট, স্টল লেভেল এবং হেডার বোর্ড–
মায়ের দর্শন নয়, যেন প্রাইভেট শপিং মলে দর্শন।

মন্দিরে ভক্তরা দাঁড়িয়ে আছে শ্রদ্ধার সঙ্গে, কিন্তু কিছুক্ষণের মধ্যেই দেখা গেল
দু-তিন জোড়া চোখ ক্লোজ সার্কিট ক্যামেরা হয়ে ঘুরছে চারিদিকে।

  • জামাকাপড় কার দামি?
  • কার গায়ে গয়না বেশি।
  • কার স্কিন চকচকে।
  • কে চার চাকায় করে নামলো।

অর্থাৎ ধনী লোকের সব প্রয়োজনীয় লক্ষণ।
ঠিক সেই মুহূর্তেই সময় অযথা নষ্ট না করে কেউ বিনয়ী ও মৃদু স্বরে বলে উঠলো–
“বিশেষ দর্শন, প্রাইম ভোগ চাইলে একটু ফরমালিটি মেনে নিতেই হবে।”

মানে বিষয়টা এমন–
সব কিছু মেনে নিয়েও যে মা-কে একটু কাছ থেকে পাওয়ার জন্য রাজি,
সে-ই আসল বা অন্যতম ভক্ত; বাকিরা সাধারণ।

ফলে ভক্তদের মনে আসে–
“আমরা কি মায়ের চরণে নিজেদের সত্যিই নিবেদন করছি, নাকি ক্রেডিট কার্ডের মাধ্যমে “ভক্তি এক্সপেরিয়েন্স কিনছি?”

আর ভক্তরা তাজ্জব হয়ে ভাবেন–
“মায়ের দর্শনে এত কিছু জটিলতা, রাজনীতি, ব্যবসা।
এর পরেও তো আমরা সব সার্ভিস কিনে দাঁড়িয়ে আছি!”

আজও বহু ভক্ত নিঃস্বার্থভাবে প্রণাম করেন,
আজও বহু পুরোহিত নীরবে সেবা করেন, মন্দির কর্তৃপক্ষ সহযোগীতা করেন–
কিন্তু সেই নিঃশব্দ সত্যিগুলো ক্রমে ঢেকে যাচ্ছে কিছু সংখ্যক মানুষের
ঝলমলে ব্যবস্থাপনায়।

ভক্তির সংবেদনশীলতা: লুটের নিখুঁত অস্ত্র

যেহেতু ভক্তি মানুষের মনে অত্যন্ত সংবেদনশীল একটা জায়গা,
তাই সেই অনুভূতিটাকেই অস্ত্র বানিয়ে কিছু শ্রেণীর মানুষ এভাবে
দিনের পর দিন ধরে লুটছে।

ভক্তি তো আর প্রশ্ন করে না।
হবে, আরও বাড়বে।
কেন?

  • কারণ ভগবানের কোনো প্রতিবাদ নেই।
  • দেবী নীরব।
  • দেওয়াল চুপ।

ভক্তদের চোখের জল, বুকের যন্ত্রণা এসব হিসেবের খাতায় লেখা হয় না।

সুতরাং যারা লুটছে, তারা জানে– এখানে কেউ প্রতিবাদ করবে না।
মানুষ নিজেই নীরব, আর এই নীরবতার মধ্যেই ব্যবসা ফুলে-ফেঁপে ওঠে।

ভক্তি, ভয় আর সুবিধার নীরব চুক্তি

এই লুট শুধু টাকার নয়, এই লুট ভয়েরও।
ভক্তরা ভয় পান–

  • কিছু না দিলে যদি মা রাগ করেন?
  • লাইনে দাঁড়িয়ে থাকলে যদি দর্শন ঠিকঠাক না হয়?
  • পাশ কাটিয়ে গেলে যদি আশীর্বাদ অসম্পূর্ণ থেকে যায়?

এই ভয়টা জন্মায় ভক্তির ভিতরেই।
আর সেই ভয়ের উপর দাঁড়িয়েই গড়ে ওঠে এক অদ্ভুত নীরব চুক্তি–
ভক্ত প্রশ্ন করবে না, কর্তৃপক্ষ ব্যাখ্যা দেবে না।

এখানে কেউ জোর করে কিছু নেয় না।
সবকিছুই “ইচ্ছায়” হয়।
কিন্তু সেই ইচ্ছার জন্ম কোথায়?
ভক্তির ভিতরে ঢুকিয়ে দেওয়া ভয় আর অপরাধবোধে।

মন্দিরে ঢুকলে কেউ বলে না–
“না দিলে দর্শন পাবেন না।”
বরং বলা হয়–
“এভাবে করলে আরও ভালো হবে।”
আর মানুষ তো ভালোই চায়–
আরও কাছে, আরও গভীর, আরও  নিশ্চিত আশীর্বাদ।

ভগবান বনাম ব্যবস্থাপনা

  • ভগবান কিছু বলেন না।
  • তিনি কোনো নোটিশ বোর্ড টাঙান না।
  • তিনি কোনো রেট চার্ট ঝোলান না।

কিন্তু তাঁর নামেই বেমালুম চলে সবকিছু।
আর এটাই সবচেয়ে নিরাপদ ব্যবসা।

  • এখানে কাস্টমার অভিযোগ করতে পারে না,
    কারণ অভিযোগ করলে তাকে বলা হয়–
    “ভক্তি কম।”
  • এখানে রিটার্ন পলিসি নেই,
    কারণ আশীর্বাদ মাপা যায় না।
  • এখানে ক্ষতির হিসেব নেই,
    কারণ বিশ্বাসের ক্ষত রসিদে ওঠে না।
  • পুলিশ এখানে নেই।
  • আদালত নেই।
  • সবচেয়ে বড় ভগবানের কোনো রিপ্লাই নেই।

এই নীরবতাই তাদের লাইসেন্স।

দেবী নীরব, প্রশ্ন আমাদের

দক্ষিণেশ্বর হোক, কালীঘাট হোক, তারাপীঠ বা নৈহাটির বড় মা–
দেবীরা সবাই নীরব।
তাঁরা কখনও বলেননি–
“আমার নামে লুট করো।”

  • এই লুট মানুষের তৈরি।
  • এই ব্যবসা মানুষের বানানো।
  • দেবী এখানে অপরাধী নন–
    তিনি অনেক সময় শুধু অজুহাত।

ভক্তি যদি চোখ বন্ধ করে দেয়,
তবে কেউ না কেউ সেই অন্ধকারে হাত ঢোকাবেই।
কারণ অন্ধ বিশ্বাস মানেই নিরাপদ সুযোগ।

প্রশ্নগুলো তাই দেবীর কাছে নয়।
প্রশ্নগুলো আমাদের নিজেদের কাছে–

  • আমরা কি ভক্ত থাকবো,
    না সচেতন ভক্ত হিসেবে নিজেকে গড়ে তুলবো?
  • আমরা কি বিশ্বাস রাখবো,
    না বিশ্বাসের নামে দুর্বলতা আর ভয়কে লু্টের লাইসেন্স দিয়ে দেব?

কারণ দেবী নীরব থাকতে পারেন–
তাঁর নীরবতায় কোনো অপরাধ নেই।
কিন্তু মানুষ যদি চুপ থাকে,
তাহলেই এই শো-রুম, এই প্যাকেজ, এই লুট চিরস্থায়ী হয়ে থেকে যাবে।

শেষ প্রশ্নটা তাই থেকেই যায়–

“এ কি দর্শন,
না দর্শনের নাম করে মানুষের দুর্বলতার এক মনস্তাত্বিক ব্যবসা?” 

(বি: দ্র: এই আর্টিকেলে কোনো ব্যক্তিগত মন্দির,
কোনো নির্দিষ্ট পুরোহিত বা কোনো মন্দির কর্তৃপক্ষকে অপমান, আঘাত বা ছোট করে
দেখানোর উদ্দেশ্য নেই।
এখানে যে উদাহরণগুলো তুলে ধরা হয়েছে,
সেগুলো কোনো নির্দিষ্ট ব্যক্তি বা মন্দিরকে লক্ষ্য করে নয়–
বরং বেশ কয়েক বছর ধরে, কিছু ধর্মীয় স্থানে গড়ে ওঠা একটা ব্যবস্থাগত প্রবণতা ও অভিজ্ঞতার প্রতিফলন মাত্র।

এই লেখা কারও বিশ্বাসে আঘাত করার জন্য নয়;
বরং ভক্তি-শ্রদ্ধা ও ব্যবস্থাপনার মধ্যবর্তী সীমারেখা নিয়ে প্রশ্ন তোলার একটা সচেতন প্রয়াস মাত্র।)

(সে ব্যথা দিয়ে সতর্ক করে না,
হঠাৎ কোনো অ্যালার্ম বাজায় না,
বরং স্বাভাবিক ছদ্মবেশে নীরবে জায়গা করে নেয়।

সে আসে ধীরে।
অদৃশ্য পায়ে হাঁটে।
একটা কোষের সামান্য ভুল দিয়ে শুরু হয়–
একটা ভুল, যাকে আমরা গুরুত্ব দিই না।

পড়ুন– Click: আপনার শরীর কি কোনো সংকেত দিচ্ছে?
চিনে নিন সেই গোপন শত্রুকে!)

(Articlesবাংলা – আমাদের, আপনাদের পরিবার।
ইমেল আইডি দিয়ে আমাদের সাথে যুক্ত হন।
ফলে যখনই এই ব্লগে কোনো নতুন লেখা পোস্ট করা হবে,

সবার আগে আপনিই পাবেন নোটিফিকেশন। 

লেখাটা ভালো লাগলে,
শেয়ার করে বন্ধুদের পড়ার সুযোগ করে দিন।
মূল্যবান মন্তব্যে জানান কেমন লাগলো।)

ইমেইল আইডি দিয়ে যুক্ত হন

We don’t spam! Read our privacy policy for more info.

About Articlesবাংলা

Welcome to Articlesবাংলা – a vibrant hub of words, ideas, and creativity. This website is the personal archive and creative expression of Tanmoy Sinha Roy, a passionate writer who has been exploring the art of writing for more than seven years. Every article, prose-poem, and quotation you find here reflects his journey, experiences, and dedication to the written word. Articlesবাংলা aims to inspire readers by offering thought-provoking insights, celebrating the richness of Bengali language and literature, and creating a space where ideas, imagination, and culture connect. Whether you are seeking literary reflections, prose-poems, diverse articles, or meaningful quotations, you are invited to explore, reflect, and be inspired.

Check Also

জলবায়ু পরিবর্তন ও প্রযুক্তির বিভ্রম এবং প্রাকৃতিক বিপর্যয়ের কাল্পনিক দৃশ্য।

জলবায়ু সংকট চরমে: গাছ লাগালেও কি শেষ রক্ষা পাবো আমরা?

গত এক দশকে— “জলবায়ু পরিবর্তন ও বৃক্ষরোপণ” বা “গাছ লাগান পৃথিবী বাঁচান”— এই বাক্যটা প্রায় …

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *