১৯৩১ সালের কোলকাতায় নিখোঁজ হওয়া এক হিসাবরক্ষকের গল্প।
সে সরকারি নথিতে মৃত, কিন্তু পরিবারের কাছে আজও জীবিত।
তাই পড়ুন– নিখোঁজের দিন: যে মানুষ নথিতে মৃত, চিঠিতে জীবিত!
নিখোঁজের দিন
১৯৩১ সালের এক বর্ষার সকাল।
উত্তর কোলকাতার একটা সরু গলি তখনও ভেজা।
ইসমাইল নামে এক তরুণ সেদিন ঘর থেকে বেরিয়েছিল।
বয়স ত্রিশের কাছাকাছি, পেশায় হিসাবরক্ষক।
কথা কম বলত, কিন্তু হিসাব কখনও ভুল করত না।
হাতে ছিল একটা বাদামি ফাইল।

সে বলেছিল সন্ধ্যায় ফিরবে।
কিন্তু সে আর ফেরেনি।
থানায় নিখোঁজ ডায়েরি হলো।
খোঁজ চলল কিছুদিন।
দিন গড়াল, বছর পেরোল।
তারপর সময় কাজটা নিজের হাতে তুলে নিল।
বছর পেরোতে পেরোতে শেষে সরকারি খাতায় লেখা হলো–
ইসমাইল নিখোঁজ নয় মৃত।
যে শহর ভুলে যেতে জানে
দেখুন: কোলকাতা শহর স্মৃতি ধরে রাখে, আবার ভুলতেও জানে।
প্রতিদিন মানুষ আসে-যায়।
একজন হারিয়ে গেলে আরেকজন এসে জায়গা নেয়।
শহরের গতি কাউকে অপেক্ষা করতে শেখায় না।
ইসমাইলের পরিবার অপেক্ষা করেছিল।
প্রথমে উৎকণ্ঠা, পরে ক্লান্তি।

প্রতিবেশীরা ধীরে ধীরে কথা বলা কমিয়ে দেয়।
খবরের কাগজে নাম ওঠে না।
শহর নিজের গতিতে এগিয়ে চলে।
যেমন সে সবসময়ই চলে।
মানুষের অভাব শহরকে থামায় না।
অপেক্ষা
অপেক্ষা এক ধরনের নীরব প্রার্থনা।
কিসের জন্য অপেক্ষা–
ফেরার জন্য, না মৃত্যুর নিশ্চিতকরণের জন্য–
পরিবার নিজেরাও জানত না।
প্রথম কয়েকমাস অপেক্ষার সঙ্গে ছিল উৎকণ্ঠা।
প্রতিটা পায়ের শব্দে মনে হতো সে ফিরছে।
প্রত্যেকটা অপরিচিত কণ্ঠে নাম শুনতে চাওয়া হতো।
সময় গড়ানোর সাথে সাথে উৎকণ্ঠা বদলে যায় ক্লান্তিতে।
অপেক্ষা তখন আর প্রশ্ন নয়– দৈনন্দিন অভ্যাস হিসাবে দাঁড়ায়।
এই অভ্যাস মানুষকে ভাঙে, আবার চলতে শেখায়।
ইসমাইলের মা প্রতিদিন দরজার দিকে তাকাতেন।
এই তাকিয়ে থাকা একসময় অভ্যাস হয়ে যায়।
অভ্যাসের ভিতরেই মানুষ সবচেয়ে বেশি ভাঙে।
দশ বছর পরে
১৯৪১ সালের শরৎকালে,
যখন যুদ্ধের গুজব আর রেশনের ভয় শহরের বাতাসে,
ঠিক সেই সময় সে বাড়িতে একটা চিঠি আসে।
প্রাপক– ইসমাইল।
প্রেরকের ঠিকানা লেখা নেই।
খাম খুলতেই সবাই থমকে যায়।
হাতের লেখা পরিচিত।
কালির চাপ, বানানের ভুল, বাক্যের ভঙ্গি–
পরিবারের কেউ সন্দেহ করেনি।
এটা ইসমাইলের লেখা।
অথচ এই সময় সরকারি নথিতে সে মৃত।

কাগজের শ্বাস
চিঠি শুধু শব্দ নয়।
কাগজে গন্ধ থাকে, ভাঁজে থাকে সময়।
পরিবারের মনে হয়েছিল–
মানুষটা যেন কাগজের ভিতরে শ্বাস নিচ্ছে।
এই অনুভূতির কোনো সরকারি স্বীকৃতি নেই।
চিঠির ভাষা
চিঠির ভাষা শান্ত।
কোনো আতঙ্ক নেই, কোনো আবেগের বিস্ফোরণ নেই।
কয়েকটা সাধারণ কথা–
শরীর ভালো, কাজ চলছে, চিন্তা কোরো না।
মায়ের কথা জিজ্ঞেস করা।
বোনের পড়াশোনা কেমন চলছে জানতে চাওয়া।
শেষে লেখা–
“আমি ঠিক আছি।”
সই– ইসমাইল।
তারিখ– যে তারিখে নথি অনুযায়ী সে মৃত।
যাচাই
পরিবার চিঠি নিয়ে যায় পোস্ট অফিসে।
স্ট্যাম্প পরীক্ষা হয়।
ছাপ, কাগজ, সময়– সব মিলছে।
পুলিশ আসে।
তদন্তের পর তারা জানায়, চিঠি জাল নয়।
কোলকাতা থেকেই পাঠানো হয়েছে।

এর পরে তারা আর এগোয় না।
এই সময় প্রশ্ন করা মানেই নজরে আসা।
(কিন্তু এই দৃশ্যের আড়ালে–
পৃথিবীর চারপাশে, কক্ষপথে, আজ ভাসছে এক দৃশ্যহীন বিশৃঙ্খলা।
তাই পড়ুন সেই ভয়াবহ বাস্তব: মহাকাশে আবর্জনার ভয়ঙ্কর সত্য।
পড়ুন– Click: মহাকাশে আবর্জনার ভয়ঙ্কর সত্য–
যা ভবিষ্যতে ডেকে আনতে পারে বিপদ, যার জন্য আমরা প্রস্তুত নই!)
কাগজে মৃত্যুর অনুমান
থানার পুরনো ফাইল খোলা হয়।
নিখোঁজের রিপোর্ট।
তারপর মৃত্যুর অনুমান।
কোনো দেহ নেই।
কোনো প্রত্যক্ষ সাক্ষী নেই।
শুধু সময়ের চাপ আর প্রশাসনিক সুবিধা।
নথি বলে– মানুষটা মৃত।
কিন্তু চিঠি জানায়– ইসমাইল বেঁচে আছে।
নথি বনাম অভিজ্ঞতা
কাগজে নথি থাকে।
সত্য থাকে মানুষের অভিজ্ঞতায়।
দুটো সবসময় এক হয় না।
ইতিহাস প্রায়ই নথির পক্ষে দাঁড়ায়।
অভিজ্ঞতা হারিয়ে যায়, মুখ বন্ধ হয়ে আসে।
শহরের গুঞ্জন
পাড়ায় কানাঘুষো ছড়ায়।
কেউ বলে গুপ্তচরের গল্প।
একদল বলে প্রেমের জন্য পালানো।
আবার কারও মতে রাষ্ট্র জানে।

এই কথাগুলো কেউ জোর দিয়ে বলে না।
আধা-স্বরে বলা হয়।
কারণ জোরে বলা মানেই ঝামেলা ডেকে আনা।
গল্প বাড়ে।
সত্য পাতলা হয়।
ভয় আর কৌতুহল পাশাপাশি হাঁটে।
ইতিহাসের ছায়া
ব্রিটিশ আমলে বহু মানুষ হঠাৎ উধাও হয়েছিল।
রাজনৈতিক নজরদারি ছিল।
নীরব কাজ ছিল।
নাম মুছে ফেলার ইতিহাস ছিল।
ইসমাইল কি সেই ইতিহাসেরই এক নাম?
নাকি সে নিজেই নিজের পরিচয় মেরে ফেলেছিল?
পরিচয়ের প্রশ্ন
একজন মানুষ কি নিজের পরিচয় মেরে ফেলতে পারে?
নাম বদলে, শহর বদলে, জীবন বদলে?
রাষ্ট্রের চোখে মৃত হওয়া কি কখনও নিরাপত্তা?
হাতের লেখা
বিশেষজ্ঞরা বলেন– হাতের লেখা নকল করা যায়।
কিন্তু অনুভূতি?
বাক্যের ছন্দ?
শব্দের ফাঁক?
চেনা নীরবতা?
পরিবার ভুল করেনি।
চিঠির ভিতরে ছিল তাদের মানুষ।
নৈতিক দ্বিধা
পরিবার কি সত্য জানার অধিকারী?
নাকি অজানা শান্তি বেশি নিরাপদ?
সত্য কখনও আশীর্বাদ নয়।
কখনও বোঝা।
সময়ের দ্বন্দ্ব
চিঠির তারিখ পরিবারকে সবচেয়ে বেশি অস্বস্তিতে ফেলেছিল।
কারণ তারিখ কেবল একটা সংখ্যা নয়–
তারিখ মানে সময়ের ঘোষণা।
সরকারি নথি বলছে, এই তারিখে ইসমাইল মৃত।
কিন্তু চিঠি বলছে, এই তারিখেই সে বেঁচে ছিল।
সময় কি সত্যিই একরৈখিক?
নাকি সময়ও ক্ষমতার ভাষা শেখে?
একজন মানুষ কি একই সঙ্গে
এক জায়গায় মৃত,
আর অন্য জায়গায় জীবিত হতে পারে?
নথির সময় চলে ক্যালেন্ডারে।
স্মৃতির সময় চলে অনুভূতিতে।
এই দুই সময় কখনও একসাথে হাঁটে না।

পরিবার বুঝতে পেরেছিল–
চিঠিটা শুধু খবর নয়,
এটা সময়ের বিরুদ্ধে একটা নীরব আপত্তি।
ইসমাইল হয়তো জানত,
তার অস্তিত্ব প্রশ্নের মুখে।
তাই সে সময়কে সাক্ষী বানিয়েছিল।
নীরবতার ওজন
চিঠি আসার পরে পরিবার কথা বলা কমায়।
তারা জানে– প্রশ্ন বিপদ ডেকে আনে।
ব্রিটিশ শাসনে নীরব থাকা নিরাপদ।
তারা চিঠি লুকিয়ে রাখে আলমারির তলায়।
চিঠির পরে আর কিছু আসেনি।
কোনো ব্যাখ্যা নেই, কোনো স্বীকারোক্তি নেই।
নীরবতা জমে থাকে।
নীরবতা কখনও উত্তর দেয় না– শুধু ভার বাড়ায়।
সম্ভাবনার দরজা
হয়তো ইসমাইল বেঁচে ছিল, হয়তো ছিল না।
হয়তো সে অন্য নামে, অন্য শহরে কাজ করছিল।
হয়তো রাষ্ট্র তাকে আড়াল করেছিল।
সব সম্ভাবনা খোলা থাকে।
পাঠকের দায়
আপনি কি বিশ্বাস করবেন?
নথি, না অনুভূতি?
কাগজ, না স্মৃতি?
একটা চিঠি কি মৃত্যুকে অস্বীকার করতে পারে?
শেষ ভাবনা
একটা চিঠি ইতিহাস বদলায় না।
কিন্তু প্রশ্ন রেখে যায়।
রাষ্ট্র মানুষকে সংখ্যা ভাবে।
ফাইলের নম্বর, কেসের তারিখ, একটা সিদ্ধান্ত।
পরিবার মানুষকে অনুভব ভাবে।
দরজার দিকে তাকিয়ে থাকা,
পরিচিত সেই হাতের লেখা,
আর আজীবন বয়ে বেড়ানো অসম্পূর্ণ অপেক্ষা।
এই দুইয়ের মাঝখানে পড়ে যায় জীবন।
এই গল্পে কোনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেই।
কারণ সিদ্ধান্ত দিলে রহস্য মরে যায়।
ইসমাইলের গল্প কেবল অতীত নয়।
এটা আমাদের সময়ের আয়না।
আজও মানুষ নিখোঁজ হয়।
ফাইল বন্ধ হয়।
পরিবার অপেক্ষা করে।

আর কোনো এক রাতে–
কেউ দরজায় শব্দ শোনে।
সেই শব্দ সত্য কিনা,
নাকি কেবল স্মৃতি–
তা নিশ্চিত করে কেউ বলতে পারে না।
বি: দ্র: এই লেখা একটা কাল্পনিক গল্প,
তবে ইতিহাসে ছড়িয়ে থাকা বহু বাস্তব নিখোঁজের ছায়া এতে রয়ে গেছে।
(একটা তথ্য, এক মুহূর্তের দেরি, একটুখানি সন্দেহ–
সবকিছু শেষ করে দিতে পারে।
তবু তারা থাকে,
কারণ রাষ্ট্র দাঁড়িয়ে থাকে এই নীরবতার উপরই।
পড়ুন– Click: রাষ্ট্রের অদৃশ্য স্নায়ুতন্ত্র:
যাদের একটা মাত্র ভুল মানে শুধু ব্যক্তিগত মৃত্যু নয়,
এমনকি দেশের পতন!)
(Articlesবাংলা – আমাদের, আপনাদের পরিবার।
ইমেল আইডি দিয়ে আমাদের সাথে যুক্ত হন।
ফলে যখনই এই ব্লগে কোনো নতুন লেখা পোস্ট করা হবে,
সবার আগে আপনিই পাবেন নোটিফিকেশন।
লেখাটা ভালো লাগলে,
শেয়ার করে বন্ধুদের পড়ার সুযোগ করে দিন।
মূল্যবান মন্তব্যে জানান কেমন লাগলো।)
Articlesবাংলা Bangla Articles, Quotes & Prose-Poetry / বাংলা প্রবন্ধ, উক্তি ও গদ্য-কবিতা।




