ভারতের প্রাচীন আবিষ্কার: যেগুলোর কৃতিত্ব লুঠ করা হয়েছে!

ভারতের প্রাচীন আবিষ্কার:

যেগুলোর কৃতিত্ব লুঠ করা হয়েছে!

ভুল কি শুধু মানুষই করে?

না– ভুল ইতিহাসও করে।

সময়ের পুরু চাদরের নিচে চাপা পড়ে থাকে অনেক সত্যি।
কিন্তু দুর্ভাগ্যজনকভাবে ওপরে উঠে আসে এমন সব নাম, যাদের সঙ্গে সেই সত্যির সম্পর্ক খুবই সামান্য।

ইতিহাস কখনও ইচ্ছাকৃত, কখনও অনিচ্ছাকৃতভাবে ভুলকে স্থায়ী করে দেয়;
আর সঠিকটাকে হারিয়ে যাওয়া ছায়ার মতো অদৃশ্য করে ফেলে।
ইতিহাসের এই খেলাটা ভারী অদ্ভুত।

জ্ঞান এক নদীর মতো–
এটা এক উৎস থেকে জন্ম নেয়, এরপর বহু দেশের পথে বয়ে যায়।
ভাষা বদলায়, রূপ পাল্টায়, আর কখনও কখনও সেই নদীর নামই অন্য নামে ঢেকে দেওয়া হয়।
স্রোত তাতে থাকে ঠিকই, কিন্তু উৎস হারিয়ে যায়।

ভারতের ক্ষেত্রেও ঘটনাটা ঠিক এভাবেই ঘটেছে।

বিজ্ঞান, গণিত, সার্জারি, ধাতুবিদ্যা– অসংখ্য অগ্রগামী ধারণা জন্ম নিয়েছিল এখানেই;
কিন্তু সময়, অনুবাদ, রাজনৈতিক ক্ষমতা আর সভ্যতার উত্থান-পতনে অনেক আবিষ্কারের নাম গিয়ে জুড়েছে অন্য জাতির হাতে।

আজ আমরা সেই “হারানো উৎস”-গুলোকে আবার আলোয় এনে তুলব।
ভুলে যাওয়া, আড়াল হয়ে যাওয়া, অথবা ভুলভাবে অন্যের নামে প্রতিষ্ঠিত সেই আবিষ্কারগুলোকে সহজ ভাষায়, পরিষ্কার ব্যাখ্যা এবং দৃঢ় প্রমাণসহ দেখে নেব।

১. পাইথাগোরাসের (পিথাগোরাস) উপপাদ্য:

সূত্রটা আগেই লেখা বৌধায়নের

গণিতের ক্লাসে আমরা সবাই শিখেছি–
কর্ণের বর্গ= লম্বের বর্গ + ভূমির বর্গ, যা “Pythagoras Theorem” বলে পরিচিত।

কিন্তু এর বহু আগেই–
খ্রিস্টপূর্ব ৭০০-৫০০ সময়কালে, ভারতের (বিস্তারিত পড়ুন)) বৌধায়ন শুল্বসূত্রে একই সম্পর্ক স্পষ্টভাবে লেখা ছিল।
এমনকি জ্যামিতিক প্রমানও তিনি দিয়েছেন।

শুল্বসূত্রের মূল উদ্দেশ্য ছিল যজ্ঞবেদী নির্মাণের মাপ নির্ধারণ করা,
আর সেখানে কর্ণ-প্রান্ত-লম্বের বর্গের সঠিক নীতি ব্যাখ্যা করা হয়েছে।

গ্রিক গণিতবিদ পাইথাগোরাস পরে একই নীতিকে জনপ্রিয় করেন,
কিন্তু উৎস হিসেবে ভারতের নাম দীর্ঘদিন আলোচনায় আসেনি।
পরে আধুনিক ইতিহাসবিদরা দেখিয়েছেন– গণিতের এই মূল সূত্রে ভারতের দাবিটা যথেষ্ট শক্তিশালী।

২. ফিবোনাচ্চি সিরিজের আগে ছিল

ভারতের “মাত্রা-মেরু” পদ্ধতি

ফিবোনাচ্চি সিরিজের সংখ্যা-ক্রম (১, ১, ২, ৩, ৫, ৮…), যা আজ বলা যায় পুরো পৃথিবীর স্কুল বইয়ে আছে।
কিন্তু এই ধারণা প্রথম এসেছে ভারতের ছন্দশাস্ত্রে।

(বিস্তারিত পড়ুন) পিঙ্গল, খ্রিস্টপূর্ব প্রায় ২০০ সালের দিকে, মাত্রার সংযোজন নিয়ে কাজ করতে গিয়ে
“মাত্রা-মেরু” নামে একটা সংখ্যা-ক্রম ব্যবহার করেন।
এই ক্রমের গঠন পদ্ধতিই পরবর্তীকালে ফিবোনাচ্চির সাথে মিলেছে।

পশ্চিমে ফিবোনাচ্চি সিরিজ বিখ্যাত হয় ১৩শ শতকে, অর্থাৎ ভারতীয় ধারণাটা
এর প্রায় দেড় হাজার বছর আগের।


(এ যেন মহাজগতের ৫ টা দরজা–

যার প্রতিটাতে লেখা আছে পৃথিবীর সম্ভাব্য সমাপ্তির গোপন সংকেত।

দার্শনিকভাবে ভাবলে এই ধ্বংস সবচেয়ে ব্যঙ্গাত্মক।
মানবজাতি নিজের বুদ্ধিতেই নিজেদের সমাধি খোঁড়ে।

পড়ুন– Click: পৃথিবী ধ্বংসের সম্ভাব্য ৫ টা কারণ!)

৩. সুশ্রুতের সার্জারি:

আধুনিক অপারেশনের ভিত্তি

চিকিৎসাশাস্ত্রে ভারতের অবদান অনন্য, অসাধারণ।
সুশ্রুত সংহিতা, খ্রিস্টপূর্ব ৬০০-৫০০ সময়ের, বিশ্বের অন্যতম প্রাচীন শল্যচিকিৎসা-গ্রন্থ।
এখানে বর্ননা করা হয়েছে:

  • নাক পুনর্গঠন (Rhinoplasty)
  • ছানি অপারেশন (Cataract Surgery)
  • প্রসবজনিত অস্ত্রপ্রচার
  • হাড় জোড়া।
  • রোগের শ্রেণিবিন্যাস।
  • ১০০+ সার্জিক্যাল যন্ত্রের বিবরণ।

পরবর্তী সময়ে আরব চিকিৎসকরা সুশ্রতের গ্রন্থ আরবি ভাষায় অনুবাদ করেন।
ইউরোপে এই জ্ঞান পৌঁছায় মধ্যযুগে।

পরে আধুনিক সার্জারি ইউরোপে বেড়ে উঠলেও এর মূল ধারণা সুশ্রুতের গ্রন্থে ছিল,
যা দীর্ঘদিন জনপ্রিয় ইতিহাসে অদৃশ্য থেকে গেছে।

ছানি অপারেশন আজও আধুনিক সার্জারির গুরুত্বপূর্ণ অংশ।
কিন্তু এর আদিম রূপটা বিস্তারিতভাবে বর্ণনা করেছিলেন দেখুন ডিটেইল) সুশ্রুত

তিনি কাউচিং (Couching) পদ্ধতির কথা লিখেছেন, যেখানে চোখের লেন্স স্থানচ্যুত করে দৃষ্টিশক্তি ফিরিয়ে আনা হত।

আরবি অনুবাদের মাধ্যমে এই পদ্ধতি মধ্যপ্রাচ্যে পৌঁছায়।
ইউরোপে বহু চিকিৎসক এই পদ্ধতি ব্যবহার করলেও উৎস হিসেবে ভারতের নাম ঘুণাক্ষরেও উল্লেখ করা হত না।

৪. Wootz Steel: বিশ্বখ্যাত Damascus Steel

এর আসল উৎস

দক্ষিণ ভারতের প্রাচীন লৌহকাররা তৈরি করতেন এমন এক স্টিল,
যার শক্তি ও ধার ছিল অবিশ্বাস্য– এর নাম (বিস্তারিত পড়ুন) Wootz Steel.

এই ইস্পাত আরব বণিকেরা রপ্তানি করত, এবং মধ্যপ্রাচ্যের কারিগররা এই স্টিল দিয়ে বানাতেন বিখ্যাত “Damascus Sword”– যার ওপরের অনন্য ঢেউ খেলানো নকশা আজও কিংবদন্তি।

অনেকেই মনে করেন Damascus Steel মধ্যপ্রাচ্যের আবিষ্কার।
কিন্তু প্রকৃতপক্ষে ইস্পাতটা ভারতেরই প্রযুক্তিতে তৈরি ছিল।

ব্রিটিশ ধাতুবিদ Michael Faraday-ও গবেষণায় দেখিয়েছেন Wootz Steel-ই এ প্রযুক্তির ভিত্তি।
Wootz Steel হল বিশ্বের উচ্চ-কার্বন ইস্পাতের প্রাচীনতম উদাহরণ।

৫. শূন্য (০):

অঙ্কের ভিত্তি যার জন্ম ভারতেই

আজকের গণনার মূল স্তম্ভ হল “শূন্য।”
এটা শুধু একটা সংখ্যা নয়– একটা সংখ্যা-পদ্ধতি।

ব্রম্ভগুপ্ত,
৬০০ সালের কাছাকাছি ( বিস্তারিত পড়ুন) ব্রাম্ভস্ফুটসিদ্ধান্ত গ্রন্থে শূন্যকে সংখ্যা হিসেবে সংজ্ঞায়িত করেন এবং যোগ, বিয়োগ, গুণ, ভাগের নিয়ম প্রথম লিখে দেন।

পরে এই ধারণা আরব গণিতবিদরা গ্রহণ করেন এবং বিশ্বজুড়ে ছড়ায় “Arabic Numerals” নামে।
যদিও উৎস ছিল ভারত, অনেকদিন সেই স্বীকৃতি ঢেকে যায়।

৬. চতুরঙ্গ: Chess- এর ভারতীয় উৎস

আজকের আন্তর্জাতিক খেলা Chess বা দাবা মূলত ভারতের চতুরঙ্গ নামের খেলা থেকে জন্ম।

গুপ্ত যুগে এটা চারটে সামরিক বিভাজনের রূপক ছিল– হাতি, ঘোড়া, রথ, পদাতিক।
পারস্যে এটা পৌঁছে শতরঞ্জ নামে এবং পরে ইউরোপে ছড়িয়ে পড়ে Chess হিসেবে।

যদিও এখন স্বীকৃতি প্রতিষ্ঠিত– তবু বহু বছর পারস্যকেই উৎস মনে করা হত।

৭. জিঙ্ক রিফাইনিং: রাজস্থানের প্রাচীন প্রযুক্তি

উদয়পুরের কাছে Zawar Mines- এ পাওয়া গেছে হাজার বছরের পুরনো জিঙ্ক গলানোর ভাটি।

এগুলো বিশ্বের প্রাচীনতম জিঙ্ক-রিফাইনিং প্রযুক্তির প্রমাণ।
ধাতুবিদ্যার এই বিশাল অগ্রগতি ভারতে অনেক আগেই ঘটেছিল অনেক আগেই,
কিন্তু ইউরোপে এই শিল্প শুরু হয় ১৭শ শতকে।

পরে ইউরোপের এই প্রযুক্তি “Modern Invention” হিসেবে পরিচিত হয়, যদিও ভারতের প্রাচিন পদ্ধতি এর আগেই প্রতিষ্ঠিত হয়ে গেছিল।

ভারতীয় আবিষ্কার কেন অন্যের নামে গেল?

এই প্রশ্নটাই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। এর কয়েকটা কারণ:

অনেক জ্ঞান মুখে মুখে বা সংস্কৃত গ্রন্থে ছিল।

পরে গ্রন্থগুলোর অনুবাদ যখন গ্রিক, আরবি বা ইউরোপীয় ভাষায় হল,
তখন উৎসের ব্যাখ্যা হারিয়ে গেল।

বাণিজ্যিক যাত্রাপথে নাম বদলে যাওয়া

আমাদের অনেক আবিষ্কার আরবরা রপ্তানি করেছিল।
তাদের মাধ্যমে ইউরোপে পৌঁছে নতুন নামে সেগুলো পরিচিত হয়।

ঔপনিবেশিক যুগ

এই সময়ে ভারতীয় প্রযুক্তির কৃতিত্বকে গুরুত্ব দেওয়া হয়নি।
বরং ইউরোপের “উন্নত সভ্যতা”-র ভাবনা প্রচারিত হওয়ায় অনেক ভারতীয় আবিষ্কার ইতিহাসের পিছনে চলে যায়।

গবেষণার অভাব এবং ভুল ব্যাখ্যা

অনেক পশ্চিমা গবেষক প্রাচীন ভারতীয় গ্রন্থের তারিখ বা অর্থ সঠিকভাবে অনুবাদ করতে পারেননি, ফলে উৎসটা অস্পষ্ট হয়ে গেছে।

আজ কেন এগুলো নতুন করে আলোচনায়?

কারণ বর্তমান গবেষণা, প্রত্নতাত্ত্বিক প্রমাণ এবং আন্তর্জাতিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর তুলনামূলক বিশ্লেষণ এখন পরিষ্কারভাবে দেখিয়েছে–

ভারত ছিল জ্ঞান, গণিত, ধাতুবিদ্যা, সার্জারি এবং যুক্তিবিদ্যার অন্যতম প্রাচীন কেন্দ্র। 

এগুলো গর্ব বা অতিশয় উক্তি নয়– এগুলো গবেষণার তাজা ফসল।

শেষ পর্যন্ত সত্যিটাই টেকে

ইতিহাস যতবারই ঢেকে রাখুক, প্রমাণের আলো শেষমেশ আসল উৎসের দিকেই ফিরে যায়।

ভারতের সেই বিস্মৃত আবিষ্কারগুলো আজ আবার জেগে উঠছে–
গবেষণার মুঠোয় ধরে রাখা নতুন সত্যির সাথে।

যে জ্ঞানকে একসময় অন্যের নামে সাজানো হয়েছিল, তা এখন নিজের ঘরে নিজের পরিচয় ফিরে পাচ্ছে।

কারণ সত্যিকে দেরি করানো যায়, কিন্তু পরাজিত করা যায় না। 
ভারতের হারানো কৃতিত্বও তাই ফিরে আসছে মাথা উঁচু করে।

(আপনি কি আপনার শিশুকে
পড়াশোনা, শৃঙ্খলা, আচরণ–
এসবের জন্য নিয়মিত চাপ দেন?

বুঝে বা না-বুঝে প্রায়ই বকেন, ধমক দেন, তুলনা করেন বা সোজা পথে আনার জন্য কঠোর হন?
তবে থামুন…

পড়ুন– Click: আপনি কি আপনার শিশুকে পড়াশোনা, শৃঙ্খলা, আচরণ– এসবের জন্য নিয়মিত চাপ দেন?)

 

(Articlesবাংলা – আমাদের, আপনাদের পরিবার।
ইমেল আইডি দিয়ে আমাদের সাথে যুক্ত হন।
ফলে যখনই এই ব্লগে কোনো নতুন লেখা পোস্ট করা হবে,

সবার আগে আপনিই পাবেন নোটিফিকেশন। 

লেখাটা ভালো লাগলে,
শেয়ার করে বন্ধুদের পড়ার সুযোগ করে দিন।
মূল্যবান মন্তব্যে জানান কেমন লাগলো।)

ইমেইল আইডি দিয়ে যুক্ত হন

We don’t spam! Read our privacy policy for more info.

About Articlesবাংলা

Welcome to Articlesবাংলা – a vibrant hub of words, ideas, and creativity. This website is the personal archive and creative expression of Tanmoy Sinha Roy, a passionate writer who has been exploring the art of writing for more than seven years. Every article, prose-poem, and quotation you find here reflects his journey, experiences, and dedication to the written word. Articlesবাংলা aims to inspire readers by offering thought-provoking insights, celebrating the richness of Bengali language and literature, and creating a space where ideas, imagination, and culture connect. Whether you are seeking literary reflections, prose-poems, diverse articles, or meaningful quotations, you are invited to explore, reflect, and be inspired.

Check Also

জলবায়ু পরিবর্তন ও প্রযুক্তির বিভ্রম এবং প্রাকৃতিক বিপর্যয়ের কাল্পনিক দৃশ্য।

জলবায়ু সংকট চরমে: গাছ লাগালেও কি শেষ রক্ষা পাবো আমরা?

গত এক দশকে— “জলবায়ু পরিবর্তন ও বৃক্ষরোপণ” বা “গাছ লাগান পৃথিবী বাঁচান”— এই বাক্যটা প্রায় …

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *