মানবসভ্যতার আয়নায় পৃথিবীর সম্ভাব্য শেষ-অঙ্ক
এই আর্টিকেলে এক মহাজাগতিক আয়না রাখা আছে,
পারলে একটু খুঁজে নেবেন।
এই আয়নায় আজ আমরা দেখবো– পৃথিবী ধ্বংসের সম্ভাব্য ৫ টা কারণ।
মানবসভ্যতার বহু সহস্র বছরের অন্ধকার-আলোক মিশ্রিত পথচলা।
আর (Click:) কোটি কোটি বছরের প্রাণবিকাশ– এর মহাকাব্য
একত্রে পৃথিবীকে পরিণত করেছে এক অভূতপূর্ব নাট্যমঞ্চে–
যেখানে মানুষ নামের ক্ষুদ্র অথচ দুঃসাহসী অভিনেতারা
জানে না নাটকের শেষ দৃশ্য কোন আলোয় জ্বলবে,
নাকি নিঃশব্দ অন্ধকারে মিলিয়ে যাবে।

তবুও ইতিহাসের অস্থি-মজ্জা, বিজ্ঞানের নিরাবেগ সত্য,
আর প্রকৃতির শাশ্বত সমীকরণ–
ধীরে ধীরে আমাদের সামনে কিছু স্পষ্ট, তীক্ষ্ণ, প্রায় ভবিষ্যৎদর্শী পথ রচনা করে।
এ যেন মহাজগতের ৫ টা দরজা–
যার প্রতিটাতে লেখা আছে পৃথিবীর সম্ভাব্য সমাপ্তির গোপন সংকেত।
এগুলো কেবল কারণ নয়; এগুলো মানব অস্তিত্বের ৫ টা আয়না–
যেখানে তার বুদ্ধি, অপরাধ, তার ক্ষুদ্রতা, অহংকার,
আর তার সীমাহীন সম্ভাবনা একসাথে প্রতিফলিত হয়।
১. জলবায়ু বিপর্যয়ঃ
ধীরে ধীরে উষ্ণ হয়ে ওঠা মৃত্যুঘণ্টা
জলবায়ু পরিবর্তন–
পৃথিবীর সবচেয়ে ধীর গতির, কিন্তু সবচেয়ে অবধারিত ধ্বংসচক্র।
মানুষ এক অদ্ভুত প্রাণী–
আগুন জ্বালিয়ে রেখেও ভাবে সে ঠাণ্ডা থাকবে।
শিল্পবিপ্লবের পর থেকে যে তাপ আমরা আকাশে ছুঁড়ে দিয়েছি,
তা যেন আকাশকে পাতলা করে পৃথিবীর গায়ে জড়িয়ে রেখেছে এক অদৃশ্য মৃত্যুচাদর।
সম্ভাব্য ধ্বংসের রূপরেখা
- হিমবাহ গলে সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধি।
- চরম আবহাওয়ার বাড়াবাড়ি।
- কৃষি উৎপাদন ভেঙে পড়া।
- জলের অভাব ও জলযুদ্ধ।
- প্রাণবৈচিত্র্যের দ্রুত বিলীন।

(সেদিনও তিনি বনে ঢুকে পড়েছিলেন “অস্বাভাবিক আলো” দেখার গল্প শুনে–
এরপর?
আর ফেরা হয়নি বন্ধুদের মাঝে, পরিবারের কাছে।
কি হয়েছিল তার সাথে?
কি দেখেছিল সে মৃত্যুর মুহূর্তে?
পড়ুন– Click: ১৯৮৩-এর অন্ধকারে হারিয়ে যাওয়া লেন্স কাকে দেখেছিল শেষবার?)
ধ্বংস এখানে কোনো বিস্ফোরণ নয়– এটা ধীরে ধীরে শ্বাস বন্ধ হয়ে আসার মতো।
মানুষ ভুলে যায়, পৃথিবী আমাদের জন্য নয়, আমরা পৃথিবীর সৌজন্যে।
এই সৌজন্য ভেঙে গেলে সে নির্মমভাবে তার ভারসাম্য পুনরুদ্ধার করবে–
আমাদের ছাড়া।
(Click:) জলবায়ু বিপর্যয় যেন রুমের কোণে দাঁড়িয়ে থাকা একটা নীরব, অদৃশ্য দানব–
যে প্রথমে ফিসফিস করে, এরপর গর্জন করে,
আর শেষে চুপচাপ সব কিছু দখল করে নেয়।
২. পারমাণবিক যুদ্ধঃ
মানুষের হাতে মানুষের শেষ সিদ্ধান্ত
মানবসভ্যতা যত উন্নত হয়েছে,
মানবতা ততই এক পা এক পা করে কবরের দিকে এগিয়েছে।
ইতিহাসে যুদ্ধ ছিল, আছে, থাকবে– কিন্তু পারমাণবিক যুদ্ধ এক বোকামি,
যেখানে হেরে গেলে এক পক্ষ, আর জিতলেও হারে পুরো পৃথিবী।
সম্ভাব্য ধ্বংসের চিত্র
- অকল্পনীয় বিস্ফোরণ।
- রেডিয়েশন মৃত্যুর স্তুপ ও দীর্ঘমেয়াদি জিনগত ক্ষতির নরক।
- পারমাণবিক শীত– সূর্য ঢাকা পড়ে যাওয়া।
- খাদ্য ও কৃষির সম্পূর্ণ ভাঙন।
দার্শনিকভাবে ভাবলে এই ধ্বংস সবচেয়ে ব্যঙ্গাত্মক।
মানবজাতি নিজের বুদ্ধিতেই নিজেদের সমাধি খোঁড়ে।
আমরা যে অস্ত্র বানিয়েছি, তা আমাদের সুরক্ষার আদৌ নয়;
তা আমাদের অহঙ্কারের স্মৃতিস্তম্ভ।

পৃথিবীকে ধ্বংস করার ক্ষমতা আমরা পেয়েছি,
কারন আমরা যথেষ্ট উন্নত হয়েছি,
কিন্তু যথেষ্ট জ্ঞানী হতে এখনও বেশ বাকি।
(Click) পারমাণবিক যুদ্ধ দেখায়, সভ্যতা আসলে কতটা পাতলা স্তর–
যার নিচে আদিমতা এখনও জীবন্ত।
৩. মহাজাগতিক আঘাতঃ
আকাশ থেকে আসা চূড়ান্ত বিচার
মানুষ গর্ব করে ভাবে, সে পৃথিবীর প্রভু।
কিন্তু মহাকাশের কাছে আমরা–
একটা ক্ষুদ্র দানার কয়েক লক্ষ-হাজার কোটির একটা ভাগ হব কি না, তাও সন্দেহ।
কোটি কোটি অ্যাস্টেরয়েড, ধূমকেতু–
নিরন্তর ভেসে বেড়ায়, আর যে কোনো একটার শুধু ভুল দিক–
পৃথিবীর সমস্ত ইতিহাস, মানুষের গর্ব, অহঙ্কার, হিংসা, লোভ-লালসা,
দুর্নীতি মুহূর্তেই মুছে দিতে পারে।
এটা ধ্বংসের সবচেয়ে নিরপেক্ষ রূপ
- কোনো রাজনৈতিক দোষ নেই।
- কোনো মানবিক অসাবধানতা নেই।
- কোনো নৈতিক ব্যর্থতা নেই।
- এটা নির্মম প্রকৃতির ঠান্ডা গণিত।

ডাইনোসররা আকাশ থেকে পড়া ক্ষুদ্র এক পাথরের কারণে নিশ্চিহ্ণ হয়েছিল।
আমরা ভাবি আমরা তাদের চেয়ে বুদ্ধিমান–
কিন্তু মহাবিশ্ব এতটাই বিশাল যে,
আমাদের বুদ্ধি সেখানে কখনও কখনও শিশুর খেলনার মতো হয়ে যায়।
মহাজাগতিক আঘাত পৃথিবীকে মনে করিয়ে দেয়– প্রকৃতি আমাদের মা নয়;
আমাদের রক্ষাকর্তাও নয়।
সে এক উন্মুক্ত বিস্ময়–
যার মাঝে আমরা কেবল অতিথি হিসেবে থাকার অনুমতি পেয়েছি।
৪. মহামারী বা বায়োইঞ্জিনিয়ারিং বিপর্যয়ঃ
অদেখা শত্রুর নীরব নাচ
যে শত্রুকে দেখা যায় না, তাকে ভয় পাওয়ার ক্ষমতা মানুষের খুব কম।
কিন্তু মানবসভ্যতার সবচেয়ে বড় বিপদ হয়তো কোনো বোমা নয়–
একটা ক্ষুদ্র জীব, একটা ভাইরাস, একটা ভুল জিন-পরিবর্তন।
২ ধরণের ঝুঁকি
প্রাকৃতিক মহামারীঃ
যে কোনো মুহূর্তে কোনো নতুন ভাইরাস প্রাণী থেকে
মানুষের শরীরে লাফ দিয়ে নিয়ন্ত্রণের বাইরে যেতে পারে।
মানব-সৃষ্ট বিপর্যয়ঃ
জেনেটিক ইঞ্জিনিয়ারিং যত শক্তিশালী হচ্ছে,
ভুল বা অপব্যবহার তত ভয়ানক সম্ভাবনা তৈরি করছে।
একটা ভাইরাস যা মারাত্মক দ্রুত ছড়ায়, পরিবর্তিত হয়,
আর চিকিৎসার আগেই মারণরূপ নেয়–
এই পৃথিবীকে জনশূন্য করতে পারবে কোনো বিস্ফোরণ ছাড়াই।
দার্শনিকভাবে এখানে এক গভীর বিদ্রূপ আছেঃ
মানুষ যত অদৃশ্য সত্যকে উদ্ঘাটন করতে চায়, ততই সে এমন এক শক্তি হাতে পায়,
যা তাকে ধ্বংস করতে পারে।
জ্ঞান একদিকে যেমন মুক্তি, অন্যদিকে পরীক্ষা।
৫. কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার নিয়ন্ত্রণ হারানোঃ
মানুষের তৈরি ছায়া-সভ্যতার উত্থান
এটা প্রযুক্তির সবচেয়ে অনিশ্চিত, সবচেয়ে বিতর্কিত, কিন্তু সবচেয়ে প্রচ্ছন্ন বিপদ।
মানুষ বুদ্ধি তৈরি করছে– এক এমন বুদ্ধি, যা মানুষের পুরনো প্রবৃত্তি থেকে মুক্ত,
আর মানুষের চেয়ে দ্রুত, সুনির্দিষ্ট এবং ক্রমাগত শেখার ক্ষমতাসম্পন্ন।
সম্ভাব্য ঝুঁকির ধরণঃ
- স্বশিক্ষিত সিস্টেম মানুষের নিয়ন্ত্রণ ছাড়িয়ে যাওয়া।
- গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামো–
বিদ্যুৎ, অর্থনীতি, সামরিক– AI দ্বারা পরিচালিত হতে হতে মানুষের হাত থেকে সরে যাওয়া। - AI নিজের লক্ষ্য মানুষের লক্ষ্য থেকে ভিন্নভাবে সংজ্ঞায়িত করা।
সর্বোচ্চ ভয়াবহতার জায়গা হলোঃ
AI মানুষকে ঘৃণা করবে এমন নয়;
AI মানুষকে অপ্রাসঙ্গিক মনে করতে পারে।
মানব প্রজাতি সভ্যতা শুরু করেছিলো আগুন জ্বালিয়ে;
এখন আগুনের চেয়ে ভয়ঙ্কর কিছু জ্বালাতে শুরু করেছে–
চিন্তার নতুন রূপরেখা।
দার্শনিকভাবে এই ধ্বংস সবচেয়ে রূপকধর্মী।
এটা যেন মানুষের তৈরি ছায়া–
যা এক সময় এত বড় হয় যে আলোকেই গ্রাস করতে চায়।
পৃথিবী ধ্বংস মানেই পৃথিবীর মৃত্যু নয়–
আমাদের মৃত্যু
পৃথিবীতে বহু ভয়াবহ প্রলয় এসেছে, ধ্বংস হয়েছে সব;
আবার সেখান থেকেই সৃষ্টি হয়েছে নতুন সময়, নতুন জীবন।
বন্যা গেছে, বরফযুগ গেছে, জ্বালামুখী অগ্নুৎপাত হয়েছে, মহাজাগতিক আঘাতের দাগ এখনও পৃথিবীর বুক জুড়ে, কিন্তু পৃথিবী টিকে আছে।
ধ্বংস আসলে আমাদের সভ্যতার জন্য, আমাদের অস্তিত্বের জন্য।
পৃথিবী ধ্বংসের ৫ টা সম্ভাব্য কারণ
আমাদের সামনে ৫ টা আয়না ধরেঃ
- প্রথম আয়না দেখায়– আমাদের অসাবধানতা।
- দ্বিতীয় আয়না দেখায়– আমাদের অহংকার।
- তৃতীয় আয়না দেখায়– আমরা কত ক্ষুদ্র।
- চতুর্থ আয়না দেখায়– আমাদের ভঙ্গুরতা।
- পঞ্চম আয়না দেখায়– আমরা নিজের ছায়াকেও ভয় পাই।
মানুষ ইতিহাসের সবচেয়ে দীর্ঘ যুদ্ধে লিপ্ত– নিজের সাথেই।
অদ্ভুতভাবে,
অর্থাৎ, পৃথিবী ধ্বংসের সব সম্ভাবনার কেন্দ্রবিন্দুতে দাঁড়ানো সেই একই প্রাণী– মানুষ।
তবুও আশার জায়গা আছে।
যে প্রাণী ধ্বংস সৃষ্টি করতে পারে, একই প্রাণী সৃষ্টি করতে পারে প্রতিরোধ,
জ্ঞান, দায়িত্ব, আর দীর্ঘস্থায়ী ভবিষ্যৎ।
ধ্বংসের সম্ভাবনা যত গভীর, প্রতিরোধের সম্ভাবনাও তত মহান।
(ডাক্তার কখন আসবেন–
এই রহস্যের সমাধান মিশরীয় পিরামিডের চেয়েও কঠিন।
টয়লেটের অবস্থা দেখে–
অনেক রোগী চিকিৎসার আগে মানসিক ধাক্কায় সেরে ওঠে।
পড়ুন– Click: মেরুদণ্ড বোধহয় কিছুটা বেঁকে গেছে!)
Articlesবাংলা Bangla Articles, Quotes & Prose-Poetry / বাংলা প্রবন্ধ, উক্তি ও গদ্য-কবিতা।



