ভেজাল– এক নিঃশব্দ ঘাতক!

খাদ্য থেকে জ্বালানিঃ ভেজালের অদৃশ্য বিস্তার

আমাদের দৈনন্দিন জীবনে আজ “ভেজাল” শব্দটা বেশ জনপ্রিয়,
ও দুর্ভাগ্যজনকভাবে গভীর অর্থবহনকারী।
অন্যদিকে বলা যায়–
এটা শুধু একটা সুপরিচিত শব্দই নয়,
বরং অত্যন্ত বাস্তব, প্রভাবশালী এবং উদ্বেগজনক– একটা ক্রমবর্ধমান বাস্তবতা,
যা প্রতিদিন আমাদের সিদ্ধান্ত, নিরাপত্তা ও বিশ্বাসকে চ্যালেঞ্জের মুখে ফেলে।
ভেজাল– এক নিঃশব্দ ঘাতক!
বাজারে গেলে– দুধ, তেল, মশলা, মিষ্টি ইত্যাদি প্রায় বহু ক্ষেত্রেই কোনো না কোনো,
কখনও না কখনও ভেজালের অভিযোগ শোনা যায়।
এমনকি তিরুপতির (Click:)”বালাজি“-এর মতো এক পবিত্র মন্দিরের জনপ্রিয় প্রসাদ–
লাড্ডু, এতে পর্যন্ত ঘি এর পরিবর্তে পাম অয়েল, পাম কার্নেল অয়েল সহ;
বেশ কিছু ক্ষতিকারক রাসয়নিক উপাদান দীর্ঘ ৫ বছর ধরে মেশানোর সাম্প্রতিক খবর,
আগুনের মতো ছড়িয়ে পড়েছে দেশবাসীর মধ্যে।
এই মর্মান্তিক ও হতবাক করা সংবাদ লক্ষ লক্ষ ভক্তের ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাত করেছে।

যদিও মন্দির কমিটির প্রাক্তন চেয়ারম্যান এ ঘটনাকে এক বড়সড় অভিযোগ, মিথ্যে ও  রাজনৈতিক প্রচার বলে উল্লেখ করেছেন।

সে যাই হোক–  বিশেষত খাদ্যের বিশুদ্ধতা নিয়ে দুশ্চিন্তা ক্রমেই যেন আমাদের বাড়ছে।
কিন্তু সমস্যা এখানেই থেমে নেই।

আমরা যেসব জিনিসকে খাদ্যের মতো ঘনঘন কেনাকাটা করি না–
যেমন গাড়ির জ্বালানি তেল, ওষুধ প্রভৃতি,
সেগুলো সম্পর্কেও আমরা অনেক সময় দুশ্চিন্তা মুক্ত থাকি।
পেট্রোল বা ডিজেল ভরার সময় শুধু মিটার ‘০’ থেকে শুরু,
বা ১১০ কিংবা ৫০৩ টাকার তেল নিচ্ছি ভেবে নিশ্চিন্তে ফিরে যাই।
ভেবে বসি– “ঠিক মতো তেলই তো দিচ্ছে!”

কিন্তু কি ধরণের তেল, আমরা আমাদের পরিশ্রম করা টাকার বিনিময়ে পাচ্ছি,
তাতে বিশুদ্ধতার পরিমাণ ঠিক কতটা,
এ বিষয় আমরা বিশেষ মাথা এখনও ঠিক ঘামাই না, বা ঘামাতে যে হতে পারে,
এ ধারণাও আমাদের মধ্যে ব্যাপকভাবে আসেনি।

এই লেখায় প্রথমে খাদ্যে ভেজালের কিছু সহজ উদাহরণ তুলে ধরা হবে।
এরপর দেখানো হবে, খাদ্য থেকে অনেক দূরের বিষয় মনে হলেও–
পেট্রোল-ডিজেলের মধ্যেও কিভাবে ভেজাল ঢুকে পড়ছে।
কি দিয়ে ভেজাল করা হয়, এর ফল কি, এবং খুব সহজেই তা চিহ্নিত করতে পারি।

(পাঞ্জাবের এক গ্রাম থেকে উঠে আসা এক তরুণ–
যার স্বপ্ন ছিল না দুর্দান্ত কথা বলা, না ছিল কোনো বিশেষ সম্পর্ক;
না ছিল টাকা বা পরিচয়।
ছিল কেবল এক ধরণের নীরব আগুন।

এই আগুনই পরে হয়ে গেল বলিউডের সবচেয়ে উজ্জ্বল শিখা।
পড়ুন– Click: ধর্মেন্দ্রঃ এক জীবনের পর্দা নামলে যে নীরবতা রয়ে যায়!)

আইন আছে, নজরদারি অন্ধ–

তাই ভেজালের বাড়বাড়ন্ত

খাদ্য আমাদের বেঁচে থাকার সবচেয়ে মৌলিক উপাদান।
আর সেই খাদ্যেই যখন ভেজাল মেশে, তখন সমস্যাটা শুধু আর পেটের সীমায় থাকে না–
তা ছড়িয়ে পড়ে স্বাস্থ্যে, অর্থনীতিতে, এবং সমাজের প্রতিটা স্তরে,
এমনকি অনেক ক্ষেত্রে এটা জীবন-মৃত্যুর প্রশ্ন পর্যন্ত তৈরি করতে পারে।
ভারতে খাদ্য নিরাপত্তার দায়িত্বে রয়েছে–
FSSAI (Food Safety and Standards Authority of India).
যারা নিয়ম, মানদণ্ড ও পরীক্ষার কাঠামো ঠিক করে।
কাগজে-কলমে এই ব্যবস্থা শক্তিশালী হলেও,
বাস্তবে এর নজরদারি এখনও পুরোপুরি কার্যকর নয়।

শহরের বড় কোম্পানিগুলো নিয়ম মানলেও,
গ্রামাঞ্চল বা স্থানীয় বাজারে অনেক বিক্রেতা FSSAI-এর আওতার বাইরে কাজ করে যায়।
নমুনা পরীক্ষা, হঠাৎ পরিদর্শন ও কঠোর শাস্তির প্রয়োগ না থাকায়,
ভেজালকারীরা অনেক সময়ই ধরা-ছোঁয়ার বাইরে রয়ে যায়।
তাই নিয়ম আছে– কিন্তু এর বাস্তবায়ন আজও ঠিক কার্যকরী নয়।

দুধে জল বা ক্ষতিকর রাসয়নিক

  • দুধকে ঘন দেখাতে স্টার্চ মেশানো হয়।
  • পরিমাণ বাড়াতে জল মেশানো হয়।
  • রঙ ও গন্ধ ঠিক রাখতে কখনও কখনও রাসয়নিক যোগ করা হয়।

তেলে নিম্নমানের তেল মেশানো

  • সরিষা বা নারকেল তেলের সঙ্গে পাম ওয়েল বা খোলা সস্তা তেল মিশিয়ে মারাত্মক ভেজাল করা হয়।
  • এতে স্বাদ নষ্ট হয়।
  • তেমনি দীর্ঘমেয়াদে শরীরের জন্য মারাত্মক ক্ষতিকর।

মশলায় রঙ বা গুঁড়ো মিশ্রণ

  • হলুদ বা মরিচের গুঁড়োয় কৃত্রিম রঙ।
  • কাঠের গুঁড়ো কিংবা সস্তা অন্য গুঁড়ো মেশানো হয়।
  • যা আমাদের শরীরের জন্য বিষ সমতুল্য।

এই উদাহরণগুলো দেখায়– খাদ্যে ভেজাল এখন একটা স্বাভাবিক ব্যাপার,
কিন্তু পরিবেশে ছড়িয়ে আছে নীরব মহামারীর মতো।
কিন্তু যে বিষয়ে আমরা আরও কম ভাবি– তা হলো জ্বালানিতে ভেজাল।

জ্বালানিতে ভেজালঃ অদৃশ্য কিন্তু ভয়ঙ্কর

খাদ্যের ভেজাল আমরা কোনোভাবে বুঝতে পারি– রঙ, গন্ধ বা স্বাদের ভুল থেকে।
কিন্তু পেট্রোল বা ডিজেল, যা আমরা চোখে দেখেও বুঝিনা, মুখেও দিই না।
এর গুণগত মান যাচাই সে কারণেই আরও কঠিন হয়ে পড়ে।

পেট্রোল পাম্পে গিয়ে আমরা সাধারণত–
১১০, ২১৫ বা ৫২২ টাকার মতো নির্দিষ্ট পরিমাণ তেল ভরি,
কারণ এতে আমরা নিশ্চিত হই যে অপারেটর টাকা কম-বেশি দেখাতে পারবে না।
মিটার শূন্য থেকে শুরু হলেই মনে হয়– সব ঠিক আছে।

কিন্তু সত্যিটা হলো– মিটার শূন্য থাকা মানে শুধু পরিমাণ সঠিক।
এতে তেলের গুণগত মান সম্পর্কে কোনো নিশ্চয়তা পাওয়া যায় না।

অনেক অঞ্চল থেকেই নথিভুক্ত অভিযোগ পাওয়া গেছে যে–
পেট্রোলের সাথে কেরোসিন বা অতিরিক্ত ইথানল মিশিয়ে এর মান কমানো হয়।
ডিজেলের ক্ষেত্রেও বিভিন্ন সময় নিম্নমানের মিশ্র তেল ব্যবহারের প্রমাণ পাওয়া গেছে।

পেট্রোল-ডিজেলে কি দিয়ে ভেজাল করা হয়?

পেট্রোলে ভেজালের সাধারণ উপাদান

কেরোসিনঃ

  • সবচেয়ে প্রচলিত ভেজাল।
  • দামের পার্থক্য বেশি।
  • অকটেন কমায়, ইঞ্জিন নষ্ট করে। 

ন্যাপথাঃ

  • পেট্রোলের সঙ্গে মিশে যায়।
  • সস্তা, তাই ভেজালে ব্যবহৃত। 
  • ইঞ্জিনে নক ও অতিরিক্ত গরম সৃষ্টি করে।

অতিরিক্ত ইথানলঃ (মাত্রার বেশি) 

  • আইনগতভাবে ১০%-২০% পর্যন্ত অনুমোদিত (রাজ্যভেদে)।
    এর বেশি হলে–
  • রাবার সিল নষ্ট করে।
  • ফুয়েল পাম্প ক্ষতিগ্রস্ত হয়।
  • মাইলেজ কমে যায়।

রঙ ও গন্ধ মেলানো সলভেন্টঃ

  • সস্তা সলভেন্ট ব্যবহার করে পেট্রোলের মতো দেখানো হয়।
  • গাড়ির পিস্টন ও ইনজেক্টর ক্ষতিগ্রস্ত হয়।

লাইট মিনারেল অয়েলঃ (LMO)

  • পেট্রোলের মতো দেখতে।
  • খুব সস্তা।
  • ব্যবহারে ইঞ্জিনের আয়ু দ্রুত কমে। 

ডিজেলে ভেজালের উপাদান

কেরোসিনঃ

  • ডিজেলেও মেশানো হয়।
  • সান্দ্রতা কমিয়ে ইঞ্জিনে চাপ সৃষ্টি করে। 

বর্জ্য তেল/ রিফাইন্ড ওয়েস্ট অয়েলঃ

  • সবচেয়ে বেশি ব্যবহৃত ভেজাল।
  • কালো ধোঁয়া বাড়ায়।
  • ইঞ্জিনকে দ্রুত ক্ষতিগ্রস্ত করে।

ফার্নেস অয়েলঃ (FO) 

  • ভারী ও সস্তা তেল।
    ডিজেলের মধ্যে মেশালেঃ
  • নকিং।
  • কার্বন জমা।
  • ইঞ্জিন স্টল।

লাইট ডিউটি ইন্ডাস্ট্রিয়াল অয়েলঃ 

  • শিল্পে ব্যবহৃত সস্তা তেল।
  • ডিজেলের সঙ্গে মিলিয়ে চেহারা একই করা যায়।

এগুলো শুধু তেলের শক্তি কমিয়ে দেয় না, ইঞ্জিনের গভীরে কার্বন জমা করে,
মাইলেজ নষ্ট করে এবং শেষ পর্যন্ত গাড়ির আয়ুকে ভয়ঙ্করভাবে কমিয়ে দেয়।

কিভাবে বুঝবেন তেল ভেজাল কি না?

পেট্রোলের ডেনসিটি বা ঘনত্ব

  • পেট্রোলের সঠিক ডেনসিটি থাকে– ৭২০ থেকে ৭৭৫ কেজি/মিটার৩ এর মধ্যে।
  • এর কম হলে, তেল পাতলা– ভেজাল সন্দেহ।
  • বেশি হলে তেলে ভারী কিছু মেশানো আছে– সেটাও ভেজাল। 

ডিজেলের ডেনসিটি

  • ডিজেলের ডেনসিটি হয়– ৮২০ থেকে ৯০০ কেজি/মিটার৩ এর মধ্যে ওঠা নামা করে ( মান এবং তাপমাত্রাভেদে ভিন্ন হতে পারে)। 
  • এর কম বা বেশি হলে, তা মানসম্মত নয়। 

রঙ ও গন্ধ

  • পেট্রোল স্বচ্ছ এবং হালকা গন্ধযুক্ত হয়।
  • ডিজেল সাধারণত হালকা হলুদাভ।
  • অস্বাভাবিক রঙ-ধুলোবালি-তলানি থাকলে সন্দেহ হওয়া উচিৎ।

কেন সচেতন হওয়া জরুরি?

  • ইঞ্জিনের আয়ু কমে যায়।
  • জ্বালানি খরচ বেড়ে যায়।
  • এক্সহাস্ট থেকে কালো ধোঁয়া বের হয়।
  • দূষণ বাড়ে।
  • গাড়ি স্টল বা ব্রেকডাউন হওয়ার সম্ভাবনা বাড়ে।
  • দীর্ঘমেয়াদে হাজার হাজার টাকা বাড়তি খরচ। 
  • এক কথায়– ভেজাল তেল নিলে ক্ষতি তিন দিকেই।
    অর্থ, ইঞ্জিন ও পরিবেশ। 

খাদ্যের মতো জ্বালানিও আজ ভেজালের শিকার।

আমরা মিটার শূন্য থেকে শুরু দেখেই নিশ্চিন্ত হয়ে যাই–
এটাই আমাদের অবচেতন মনের একটা বড় ভুল।
তেলের বিশুদ্ধতা যাচাই করা এখন সময়ের দাবি।

সচেতন থাকুন, তেলের ডেনসিটি অবশ্যই দেখে নিন।
ভালো ও অনুমোদিত পাম্প বেছে নিন–
কারণ নিরাপদ জ্বালানিই নিরাপদ যাত্রা, নিরাপদ ইঞ্জিন এবং নিরাপদ পরিবেশ ও ভবিষ্যৎ।

(কিন্তু ভারত?
AQI গাঢ় লালঃ ভারতের ভবিষ্যত কি তবে ভয়ঙ্কর?
আজ ভারতের অনেক শহরেই AQI, Hazardous লেভেল ছুঁই ছুঁই,
পশ্চিমবঙ্গও এর বাইরে নয়…
পড়ুন– Click: AQI গাঢ় লালঃ ভারতের ভবিষ্যত কি তবে ভয়ঙ্কর?)

(Articlesবাংলা – আমাদের, আপনাদের পরিবার।
ইমেল আইডি দিয়ে আমাদের সাথে যুক্ত হন।

লেখাটা ভালো লাগলে,
শেয়ার করে বন্ধুদের পড়ার সুযোগ করে দিন।
মন্তব্যে জানান কেমন লাগলো।)

Join Our Newsletter

We don’t spam! Read our privacy policy for more info.

About Articlesবাংলা

Welcome to Articlesবাংলা – a vibrant hub of words, ideas, and creativity. This website is the personal archive and creative expression of Tanmoy Sinha Roy, a passionate writer who has been exploring the art of writing for more than seven years. Every article, prose-poem, and quotation you find here reflects his journey, experiences, and dedication to the written word. Articlesবাংলা aims to inspire readers by offering thought-provoking insights, celebrating the richness of Bengali language and literature, and creating a space where ideas, imagination, and culture connect. Whether you are seeking literary reflections, prose-poems, diverse articles, or meaningful quotations, you are invited to explore, reflect, and be inspired.

Check Also

শেখ হাসিনার মৃত্যুদণ্ড: বিচারের পাল্লায় ফাঁসির দড়ি ও ন্যায়বিচার, বাংলাদেশের রাজনৈতিক বিতর্কের প্রতীকী চিত্র।

শেখ হাসিনার মৃত্যুদণ্ডঃ বিচার নাকি প্রতিশোধ?

শেখ হাসিনার মৃত্যুদণ্ডঃ বিচার নাকি প্রতিশোধ? বাংলাদেশে সম্প্রতি (Click:) সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার বিরুদ্ধে ঘোষিত …

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *