World Economic Forum: পৃথিবী বাঁচাবে বলে যারা এসেছিল, তারাই পৃথিবী পুড়িয়ে গেল!

ডাভোসে পৃথিবী বাঁচানোর আলোচনা

আর আকাশে ধোঁয়ার উৎসব

পৃথিবীর সবচেয়ে পরিষ্কার, সবচেয়ে নিঃশব্দ, সবচেয়ে সুন্দর জায়গায়গুলোর
একটা– সুইজারল্যান্ডের (দেখুন) ডাভোস
কিন্তু কোনো এক কারণে আজ World Economic Forum Davos hypocrisy
বলতে মানুষ বাধ্য হচ্ছে, কেন?

পড়ুন।

বরফে মোড়া পাহাড়, নিঃশ্বাস নিলে মনে হয় অক্সিজেনও VIP.
এই জায়গাতেই বসে প্রতিবছর পৃথিবীর সবচেয়ে ক্ষমতাশালী মানুষেরা বলেন–

  • “পৃথিবী বিপদে আছে।”
  • “কার্বন কমাতে হবে।”
  • “পরিবেশ বাঁচাতে হবে।”

আর ঠিক সেই মুহূর্তেই আকাশের দিকে তাকালে দেখা যায়–
একটার পর একটা প্রাইভেট জেট নামছে।
ঠিক যেন পৃথিবী বাঁচানোর নয়, পৃথিবী পোড়ানোর আন্তর্জাতিক মেলা।

World Economic Forum:

উদ্দেশ্য মহৎ, আগমন ভয়ঙ্কর

World Economic Forum (WEF) হলো এমন এক জায়গা,
যেখানে–

  • বিশ্বের বড় বড় রাষ্ট্রনেতা।
  • কর্পোরেট বস।
  • ধনকুবের।
  • চিন্তাবিদরা একত্রিত হন।

আলোচনার বিষয়–

  • জলবায়ু পরিবর্তন।
  • কার্বন নিঃসরণ।
  • গ্রিন এনার্জি।
  • ভবিষ্যৎ পৃথিবী।

শুনতে মনে হয়,
এই সভা শেষ হলে পৃথিবী নিজেই একটা গাছ হয়ে যাবে।

কিন্তু সমস্যা শুরু হয় তাঁরা যখন সেখানে পৌঁছান।

২০২২: এক সপ্তাহে ১০৪০টা প্রাইভেট জেট

২০২২ সালে (পড়ুন) ডাভোস সম্মেলন-এর সময়,
মাত্র এক সপ্তাহে ডাভোস ও আশেপাশের বিমানবন্দরগুলোতে ১০৪০ টা প্রাইভেট
জেট অবতরণ করেছিল।
World Economic Forum-এর এই আসরে এত গুরুত্বপূর্ণ মিটিং হবে বলে
বড় বড় ব্যাক্তিরা প্রাইভেট জেটে আসেন ঠিকই, কিন্তু এর পরিবেশগত মূল্য
অনেক বেশি।

১০৪০, সংখ্যাটা শুনে প্রথমেই মনে হয়–
“হ্যাঁ হ্যাঁ, এত গুরুত্বপূর্ণ মিটিং, বড় লোক তো আসবেই।”

কিন্তু একটু থামুন।
একটা প্রাইভেট জেট মানে কি?

দেখুন: Davos Summit 2025

World Economic Forum:

প্রাইভেট জেট বনাম

সাধারণ মানুষের জীবন

একটা প্রাইভেট জেট মানে শুধু বিলাস নয়।
এটা মানে–
অল্প কয়েকজন মানুষের আরামের জন্য, অস্বাভাবিক পরিমাণ
জ্বালানি পোড়ানো।

এটা মানে– একটা যাত্রা, যার খরচটা দেয়,

  • পৃথিবীর বাতাস।
  • পাহাড়।
  • আর ভবিষ্যৎ।

একটা প্রাইভেট জেট উড়লে, তার ধোঁয়া কেবল আকাশে মিশে যায় না,
সেটা মেশে সাধারণ মানুষের জীবনের সঙ্গে।

  • যে মানুষটা সাইকেল চালায়।
  • যে ব্যক্তিটা বাসে ঝুলে অফিসে যায়।
  • যে মানুষটা শুনে এসেছে–
    “কার্বন কমানো আপনার দায়িত্ব।”

অথচ World Economic Forum ডাভোসের মঞ্চে যারা ভাষণ দেন,
তাদের যাতায়াতই পরিবেশের সবচেয়ে বেশি ক্ষতি করে।

World Economic Forum:

হিসেবটা যখন কবিতা হয় না

প্রাইভেট জেটের পরিবেশগত প্রভাব যে ভয়াবহ–
এটা কোনো মতামত নয়, এটা তথ্য।

International Council on Clean Transportation (ICCT)-এর একটা গবেষণায়
দেখা গেছে–
একটা বড় বা উচ্চ-ব্যবহৃত প্রাইভেট জেট বছরে প্রায় ৮০০ টনের কাছাকাছি গ্রিনহাউস গ্যাস (CO2) নির্গত করতে পারে।

এই পরিমাণ দূষণ মানে কি?
মানে প্রায় ১৭৭ টা সাধারণ গাড়ির এক বছরের মোট কার্বন নিঃসরণের সমান।

অর্থাৎ–
একটা জেট যা করে, তা করতে ১৭৭ টা সাধারণ গাড়িকে একসাথে
রাস্তায় নামতে হবে।

  • এখানে কোনো রূপক নেই।
  • কোনো কবিতা নেই।
  • একটা খাঁটি হিসেব।

“প্রতি মানুষ প্রতি কিলোমিটার”–

আসল সত্যটা এখানেই

অনেক সময় বলা হয়–
“বিমান তো অনেক মানুষ নিয়ে যায়, তাহলে সমস্যা কোথায়?”

সমস্যাটা লুকিয়ে আছে Per Passenger-Kilometre হিসেবের ভিতরে।

গবেষণা অনুযায়ী–
একটা সাধারণ গাড়ি প্রতি কিলোমিটারে গড়ে ২০-২০০ গ্রাম Co2 নির্গত করে।
অথচ একটা প্রাইভেট জেট একই হিসেবে ৩৫০-৭০০ গ্রাম Co2 ছড়াতে পারে।

কারণ খুব সোজা–
প্রাইভেট জেটে যাত্রী কম, কিন্তু জ্বালানি খরচ ভয়ঙ্কর বেশি।

ফলাফল?
একজন মানুষকে প্রাইভেট জেটে এক কিলোমিটার এগিয়ে নিতে
পৃথিবীকে অনেক বেশি মূল্য চোকাতে হয়।

পরিবেশ রক্ষার ভাষণ,

আগমনে কার্বন বিস্ফোরণ

এখন ভাবুন–

যারা মঞ্চে উঠে বলেন–

  • “আপনাদের কম গাড়ি চালাতে হবে।”
  • “আপনাদের প্লাস্টিক ব্যবহার কমাতে হবে।”
  • “কার্বন ফুটপ্রিন্ট কমিয়ে আনতে হবে।”

তারাই–
শেয়ার করা ফ্লাইট নয়, ট্রেন নয়, ভিডিও কনফারেন্স তো দূরের কথা–
সোজা নিজস্ব প্রাইভেট জেট।
কারণ–
“সময় বাঁচাতে হবে।”

হ্যাঁ, সময় বাঁচাতে গিয়ে ভবিষ্যৎটাই না বাঁচলে সময় দিয়ে কি হবে?
সেটা কেউ বলে না।

World Economic Forum ডাভোস:

আধুনিক যুগের

সবচেয়ে দামি নাট্যমঞ্চ

ডাভোস কি তবে আসলে এক নাট্যমঞ্চ?

মঞ্চের ভিতরে–

  • পরিবেশ নিয়ে গভীর চিন্তা।
  • জলবায়ু নিয়ে চোখ কপালে তোলা।
  • কার্বন নিঃসরণ নিয়ে মাথার চুল উঠে যাওয়া।
  • ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য দীর্ঘশ্বাস।

মঞ্চের বাইরে–

  • আকাশে জেটের সারি।
  • পাহাড়ের উপর ধোঁয়ার চাদর।
  • এক সপ্তাহে স্বাভাবিক সময়ের তুলনায়
    কয়েকগুণ বেশি কার্বন নিঃসরণ।

এটা যেন ঠিক এমন–
আগুনের সামনে দাঁড়িয়ে কেউ বলছে,
“আগুন খুব খারাপ জিনিস।”

আর পিছনে তাঁর হাতেই দেশলাই।

সবচেয়ে বড় প্রশ্ন:

পৃথিবী বাঁচানো মানে কাকে বাঁচানো?

পৃথিবী বাঁচানো বলতে অনেক সময় বোঝানো হয়–

“আমাদের জীবনযাপন ঠিক থাকবে, কিন্তু দোষটা আপনাদের।”

আপনি–

  • AC কমান।
  • লাইট বন্ধু করুন।
  • সাইকেল চালান।

আর ওনারা–

  • জেট ওড়াবেন।
  • পাঁচতারা হোটেলে পরিবেশ সম্মেলন করবেন।
  • এরপর বলবেন– “আমরা সবাই দায়ী।”

হ্যাঁ, দায়ী তো সবাই।
কিন্তু ধোঁয়ার পরিমাণটা কি সমান?


(বিদেশিরা ভারতে এসে খুব স্বচ্ছন্দে একটা বাক্য ব্যবহার করে–

“Indians have no civic sense.”
এই বাক্যটা তারা বলে এমন ভঙ্গিতে, যেন সভ্যতা কোনো আন্তর্জাতিক এয়ারপোর্টে ইমিগ্রেশনের সময় সিল মারা হয়।

যেন ইউরোপ বা আমেরিকার মাটিতে জন্মালেই মানুষ স্বয়ংক্রিয়ভাবে ভদ্র,
সংবেদনশীল ও নৈতিক হয়ে যায়।
আর এদিকে খাঁচার ভিতর ভারত– বাইরে সভ্যতার সার্টিফিকেট।

পড়ুন– Click: খাঁচার ভিতর ভারত, বাইরে সভ্যতার সার্টিফিকেট!)

সাধারণ মানুষের কার্বন বনাম

অভিজাতদের কার্বন

একজন সাধারণ মানুষ সারাজীবনে যতটা কার্বন ছড়ায়–

ডাভোসের ওই এক সপ্তাহে কয়েকজন বিশেষ অতিথি একাই
তার সমান বা বেশি ছড়িয়ে দিয়েছেন।

কিন্তু দোষটা যাবে–

  • স্ট্রয়ের দিকে।
  • প্লাস্টিকের চামচের দিকে।
  • আপনার পুরনো বাইকের দিকে।

প্রাইভেট জেট?
ওটা নাকি “নেসেসারি ইভিল।”

আসল সমস্যা: কথার সঙ্গে কাজের ফাঁক

World Economic Forum ডাভোস আমাদের একটা জিনিস
পরিষ্কার করে শেখায়–

সমস্যা পরিবেশ সচেতনতার অভাব নয়।
সমস্যা হলো–

যারা সবচেয়ে বেশি জানে,
তারাই সবচেয়ে কম মানে।

আর যারা সবচেয়ে কম জানে,
তাদের উপরই সবচেয়ে বেশি নিয়মের ভার চাপানো হয়।

ভবিষ্যৎ প্রজন্ম কি দেখবে?

হয়তো একদিন আমাদের সন্তানরা পড়বে–

“একসময় মানুষ জলবায়ু পরিবর্তন নিয়ে ভয় পেত।
তারা মিটিং করত।
সেই মিটিংয়ে যেতে গিয়ে, পৃথিবীকে আরও গরম করে দিত।”

আর ইতিহাসের বইয়ের নিচে লেখা থাকবে–
“পরামর্শ ভালো ছিল, প্রয়োগ হয়নি।” 

  • (যারা মৃত্যুর গন্ধকে পরিচিত সুবাসের মতো গ্রহণ করে।
  • কালো অন্ধকারের বুকে ছুরি চালিয়ে এগিয়ে যায়। 
  • ঝড়ের মুখোমুখি দাঁড়িয়ে তাকে মুঠোয় চেপে ধরে দৌড়ায়।
  • আর বিস্ফোরণের হৃদপিণ্ড কাঁপানো শব্দকে,
    হৃদয়ের স্পন্দনের সাথে তাল মিলিয়ে নেয়।

পড়ুন– Click: ভারতের Top 10 কমান্ডো বাহিনী এবং কেন?)

World Economic Forum:

আয়নায় তাকানোর সময়

ডাভোস আমাদের শেখায়–

পৃথিবী বাঁচাতে শুধু সম্মেলন লাগে না,
নিজেদের অভ্যাস বদলাতে হয়।

নইলে–

পৃথিবী বাঁচানোর সবচেয়ে বড় শত্রু হয়ে দাঁড়ায়
পৃথিবী বাঁচানোর মিটিংই।

কারণ–
যদি পৃথিবী সত্যিই সবার হয়, তাহলে দায়িত্বটাও
সব শ্রেণীর জন্য সমান হওয়া উচিৎ।

নচেৎ–
এই সভাগুলো শুধু থাকবে একটা সুন্দর নামের
নিচে ভীষণ ব্যয়বহুল এক ব্যঙ্গচিত্র। 

নৈতিকতা, নীতি নয়–

আচরণই আসল পরীক্ষা

এই লেখার শেষে এসে ডাভোসকে আর আলাদা করে কাঠগড়ায় দাঁড়
করানোর দরকার পড়ে না।
কারণ প্রশ্নটা কোনো একটা সম্মেলন, শহর বা সংস্থার নয়।
প্রশ্নটা বিশ্বব্যবস্থার নৈতিক মানদণ্ড নিয়ে।

আজ পৃথিবী এমন এক সময়ে দাঁড়িয়ে, যেখানে সমস্যা চেনা, সমাধান জানা,
এমনকি বক্তৃতাও প্রস্তুত।
কিন্তু অভাব শুধু একটাই– নিজের ক্ষেত্রে সেই সমাধান প্রয়োগ করার সাহস।

পরিবেশ রক্ষা–

  • কোনো পোস্টার ক্যাম্পেইন নয়।
  • কোনো স্লোগান নয়।
  • না কোনো বাৎসরিক ইভেন্টও।

এটা প্রতিদিনের সিদ্ধান্ত– কে কতটা ছাড় দেবে নিজের সুবিধা থেকে।
আর ঠিক এখানেই ফাঁকটা ধরা পড়ে যায়।
কারণ সুবিধা ছাড়ার প্রশ্ন এলে, পৃথিবী বাঁচানো হঠাৎই হয়ে যায় “পরিস্থিতি-সাপেক্ষ।”

ভবিষ্যৎ প্রজন্ম আমাদের বিচার করবে ভাষণ দিয়ে নয়, অভ্যাস দেখে।
তারা দেখবে– ক্ষমতা হাতে থাকলে আমরা কি করেছি।
আমরা কি সত্যিই দায়িত্ব ভাগ করে নিয়েছিলাম, না কি দায়িত্বের গল্প শুনিয়ে ভারটা
নামিয়ে দিয়েছিলাম দুর্বলদের ঘাড়ে?

পৃথিবী কোনো কর্পোরেট প্রেজেন্টেশন নয়, যেখানে স্লাইড বদলালেই বাস্তব বদলে যায়।
এটা বদলায় তখনই, যখন নীতি আর আচরণের মাঝখানের দূরত্বটা কমে।

সেই দূরত্বই আজ সবচেয়ে বড় কার্বন ফুটপ্রিন্ট।


(লোভ প্রতিটা মানুষের ভিতরেই কম-বেশি থাকে,

কিন্তু যখন সেই লোভ, এর সীমা ভেঙে অমানবিক হয়ে ওঠে।

যখন ক্ষমতার নেশা সম্পদের উপর ঝাঁপিয়ে পড়ে।
যখন অন্যের ঘর, জমি, শিল্প, সভ্যতা– সবই কেবল দখলের লক্ষ্য হয়ে যায়,
ঠিক তখনই ইতিহাস জন্ম দেয় পোশাকে উন্নত,
অথচ ভিতরে ভয়াবহ এক বিদেশি জাতিকে– ব্রিটিশ।  

পড়ুন– Click: ইংরেজ ভারতে না আসলে, আজ বিশ্বের সুপার পাওয়ার হতো ভারত!)


(Articlesবাংলা – আমাদের, আপনাদের পরিবার।
ইমেল আইডি দিয়ে আমাদের সাথে যুক্ত হন।

ফলে যখনই এই ব্লগে কোনো নতুন লেখা পোস্ট করা হবে,
সবার আগে আপনিই পাবেন নোটিফিকেশন। 

লেখাটা ভালো লাগলে,
শেয়ার করে বন্ধুদের পড়ার সুযোগ করে দিন।
মূল্যবান মন্তব্যে জানান কেমন লাগলো।)

ইমেইল আইডি দিয়ে যুক্ত হন

We don’t spam! Read our privacy policy for more info.

About Articlesবাংলা

Welcome to Articlesবাংলা – a vibrant hub of words, ideas, and creativity. This website is the personal archive and creative expression of Tanmoy Sinha Roy, a passionate writer who has been exploring the art of writing for more than seven years. Every article, prose-poem, and quotation you find here reflects his journey, experiences, and dedication to the written word. Articlesবাংলা aims to inspire readers by offering thought-provoking insights, celebrating the richness of Bengali language and literature, and creating a space where ideas, imagination, and culture connect. Whether you are seeking literary reflections, prose-poems, diverse articles, or meaningful quotations, you are invited to explore, reflect, and be inspired.

Check Also

জলবায়ু পরিবর্তন ও প্রযুক্তির বিভ্রম এবং প্রাকৃতিক বিপর্যয়ের কাল্পনিক দৃশ্য।

জলবায়ু সংকট চরমে: গাছ লাগালেও কি শেষ রক্ষা পাবো আমরা?

গত এক দশকে— “জলবায়ু পরিবর্তন ও বৃক্ষরোপণ” বা “গাছ লাগান পৃথিবী বাঁচান”— এই বাক্যটা প্রায় …

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *