সবুজে লেখা এক নারীর নীরব অমরত্ব
মানুষের জীবন একদিন নিশ্চই থেমে যায়,
কিন্তু কিছু মানুষ চলে গিয়েও বেঁচে থাকেন তাঁদের কর্মে, আদর্শে;
আর পৃথিবীর জন্য রেখে যাওয়া এক গভীর বার্তায়।
Click: সালুমারাদা থিম্মাক্কা ঠিক তেমনই এক মানুষ।
কর্ণাটকের এই নিরহংকারী, পরিবেশসেবী নারী ১১৪ বছরের অবিরাম জীবনে,
আমাদের শিখিয়ে গেছেন– গাছ মানে শুধু পরিবেশ নয়,
গাছ মানে জীবন, শ্বাস, অস্তিত্ব এবং মানুষের প্রতি মানুষের নীরব এক অঙ্গীকার।

৩৮৪ টা বটগাছ;
আর প্রায় ৮ হাজারেরও বেশি অন্যান্য গাছ লাগানোর অসাধারণ কীর্তি,
তাঁকে বিশ্বপরিসরে “গাছের মা সালুমারাদা থিম্মাক্কা” বলে পরিচিতি করেছে।
১৪ নভেম্বর ২০২৫ এ তিনি পৃথিবী ছেড়ে চলে গেছেন অজানা ঠিকানায়;
অথচ তাঁর রোপিত প্রতিটা গাছ দাঁড়িয়ে আছে এক জীবন্ত স্মৃতিস্তম্ভ হয়ে।
যেখানে আমরা আজীবন টাকার পিছনে দৌড়ানোকে বেশি গুরুত্ব দিই,
সেখানে থিমাক্কা গুরুত্ব দিয়েছেন গাছের পিছনে দৌড়ানোর মধ্যে,
ভালোবেসেছেন গাছকে, মিশে গেছিলেন গাছের আত্মার সাথে;
যে কোনো দিন বিশ্বাসঘাতকতা করে না, প্রতারণা জানে না।
অথচ তিনি জন্মেছিলেন এক অতি সাধারণ কৃষক পরিবারে,
বাবা ছিলেন চাষী, আর বিবাহিত জীবন,
তাও কাটিয়েছেন দীনমজুর স্বামীর সাথে।
তবুও তাঁর হাতে রোপণ করা প্রতিটা চারা পেয়েছে অতল মমতা,
পেয়েছে তাঁর স্পর্শ, ছায়া, তাঁর নিঃশব্দ প্রাণবোধ।
হয়তো আজ প্রতিটা গাছ নিভৃতে কাঁদছে, মর্মর পাতায় ডাকছে–
“ফিরে এসো মা!”
আমাদের আর কে এভাবে ভালোবাসবে, যত্ন করবে, আগলে রাখবে?
(“যার টাকা আছে, তার কাছে আইন খোলা আকাশের মত,
আর যার কাছে টাকা নেই, তার কাছে আইন মাকড়সার জালের মত।”
আমরা সাধারণ মানুষ– তাই ভবিষ্যতের বিপদের কথা মাথায় রেখে,
আইনের কিছু মৌলিক জিনিস জেনে রাখা ভালো।
পড়ুন– Click: আইনের খুঁটিনাটি– না জানলে পড়তে পারেন বিপদে! )
গাছের মা সালুমারাদা থিম্মাক্কাঃ
এক কৃষাণীর পথচলা
কর্ণাটকের শুকনো, অনাবৃষ্টি-প্রবণ অঞ্চল গুব্বি তালুক–
এই মাটিতেই জন্ম থিম্মাক্কার।
আনুষ্ঠানিক শিক্ষা ছিল না, বড় কোনো সুযোগ-সুবিধাও নয়,
তবুও তাঁর মনের মধ্যে ছিল সরল কিন্তু অটল বিশ্বাসঃ
যেখানে ঈশ্বর নেই, সেখানে গাছ লাগাও–
অর্থাৎ নিজের হাতে তৈরি করো জীবনের আশ্রয়।
তাঁর ও স্বামী চিক্কাইয়্যার সন্তান হয় নি, বহু কষ্ট পেয়েছেন,
সমাজের কথা শুনেছেন…
কিন্তু থিমাক্কার একদিন বলেছিলেন–
“যাদের সন্তান নেই, তাঁরা গাছ লাগাও,
গাছই তোমার সন্তানের মতো বড় হবে।”
এই ভাবনাই তাঁকে প্রতিদিন;
৪ থেকে ৫ কিলোমিটার হাঁটিয়ে নিয়ে যেত শুকনো রাস্তার ধারে,
যেখানে তিনি বটের চারা লাগাতেন, জল দিতেন,
খড় দিয়ে ঢেকে দিতেন যাতে রোদে না মরে যায়।

সন্তান না থাকার বেদনা থেকেই জন্ম নিল– ৩৮৪ টা বটগাছ।
এক এক করে, বছর বছর।
এই যে প্রত্যাশাহীন, নিঃস্বার্থ, প্রতিদানহীন পরিচর্যা–
এটাই তাঁকে করে তুলেছিল “সালুমারাদা”–
অর্থাৎ রাস্তার সারি ধরে গাছ লাগানো নারী।
গাছের মা সালুমারাদা থিম্মাক্কাঃ
গাছ লাগানো মানে ভবিষ্যৎকে বাঁচানো
থিমাক্কার গল্প শুধু গাছ লাগানোর নয়;
এটা পরিবেশ ও মানুষের পরস্পরের গভীর সম্পর্কের গল্প।
আজকের পৃথিবীতে যখন নগরায়ণ, দূষণ ,বন উজাড়,
আমাদের অস্তিত্বকে হুমকির মুখে ফেলেছে,
থিমাক্কা দেখিয়ে গেছেন–
একজন মানুষও চাইলে পৃথিবী বদলাতে পারে।
বটগাছ কোনো সাধারণ গাছ নয়।
এর শিকড় মাটিকে ধরে রাখে, ছায়া দেয়, শত শত প্রাণীর আশ্রয় হয়,
ধুলো-ধোঁয়া কমায়, জায়গাকে ঠান্ডা করে–
সবচেয়ে বড় কথা, এটা টিকে থাকে প্রজন্মের পর প্রজন্ম।
তাঁর লাগানো গাছগুলো আজ শুধু গাছ নয়–
সেগুলোর প্রতিটা এক একটা পাঠশালা, যেখানে মানুষ শিখেছে ধৈর্য,
মমতা, দায়িত্ব, এবং পৃথিবীর প্রতি মানুষের কর্তব্য।
গাছের মা সালুমারাদা থিম্মাক্কাঃ
প্রকৃতি ও মানুষের মধ্যে
এক দার্শনিক যোগ
মানুষ হাজার বছর ধরে গাছের কাছে ঋণী,
কিন্তু আজ আমরা নিজেদের স্বার্থে প্রায় ভুলে গেছি সেই সম্পর্ক।
থিমাক্কার কাজ যেন আমাদের কানে ফিসফিস করে বলছে–
“প্রকৃতি ছাড়া মানুষের অস্তিত্ব নেই,
আর প্রকৃতির যত্ন নেওয়া মানে নিজের অস্তিত্ব বাঁচানো।”
দর্শনে বলা হয়–
মানুষের প্রকৃত চরিত্র বোঝা যায় তার প্রকৃতির প্রতি আচরণে।
থিম্মাক্কা নিজের হাতে প্রমাণ করেছেন যে, প্রকৃত দয়া শুধু মানুষের জন্য নয়,
জড় হয়ে থাকা সেই গাছ-পালার জন্যেও, যাদের উপর দাঁড়িয়ে আছে আমাদের জীবন।
তিনি কখনও বক্তৃতা দেননি, কখনও সোশ্যাল মিডিয়ার আলোই দেখেননি।
তিনি ছিলেন এক “নীরব দার্শনিক।”
তাঁর দর্শন ছিল হাতে, কাজের ভিতর, আওয়াজে নয়।
( হঠাৎ, দূর থেকে হাওয়ায় ভেসে এল এক তীক্ষ্ণ অথচ মধুর,
সুরেলা কণ্ঠ–
“তখন তোমার একুশ বছর বোধহয়,
আমি তখন অষ্টাদশীর ছোঁয়ায়।
লজ্জা জড়ানো ছন্দে কেঁপেছি,
ধরা পড়েছিল ভয়….”
পড়ুন– Click: আরতী মুখার্জী– আলো-ছায়ার অন্তরালের কাহিনি! )
গাছের মা সালুমারাদা থিম্মাক্কাঃ
গাছ মানে আলো–
এক বিস্মৃত সত্যের পুনরাবিষ্কার
আমরা গাছকে দেখি প্রয়োজন হিসেবে–
অক্সিজেন দেবে, ফল দেবে, কাঠ দেবে;
কিন্তু থিমাক্কার চোখে গাছ ছিল এক সচেতন পরম বন্ধুর মতো।
প্রতিটা চারা তাঁর কাছে ছিল সন্তান।
প্রকৃতির সঙ্গে এই আবেগের সম্পর্কই আজ হারিয়ে যাচ্ছে।
আমরা ভেবে উঠতে পারছি না–
- গাছ মানে ছায়া
- গাছ মানে বৃষ্টি
- গাছ মানে খাবার
- গাছ মানে নদীর জন্ম
- গাছ মানে পাখির বাসা
- গাছ মানে মাটির শক্তি
- গাছ মানে জীবনের নিরাপত্তা
মানুষ যত উন্নত হচ্ছে, ততই দূরে সরছে সেই মূল সত্য থেকে।
থিমাক্কা আমাদের শিখিয়ে গেলেন–
গাছ লাগানো মানেই ধর্ম, গাছ বাঁচানো মানেই সাধনা।
গাছের মা সালুমারাদা থিম্মাক্কাঃ
পদ্মশ্রী– সম্মান ও দেশের কৃতজ্ঞতা
২০১৯ সালে ভারতের রাষ্ট্রপতি তাঁর হাতে তুলে দেন পদ্মশ্রী।
শিক্ষা না থাকা, সাধারণ গ্রামীণ নারীকে এই সম্মান দেওয়া হয়,
তাঁর জীবনব্যাপী পরিবেশসেবার জন্য।

ভারতের রাস্তায় সারি সারি যেসব বটগাছ আজও দাঁড়িয়ে আছে–
সেগুলো তাঁর পরিশ্রম, নীরব কান্না, তাঁর স্নেহ-মমতা আর শ্বাস-প্রশ্বাসের সাক্ষী।
তিনি একবার বলেছিলেন–
“আমি গাছ লাগিয়েছি, কারণ পৃথিবীকে কিছু দিয়ে যেতে চেয়েছিলাম।”
এই বাক্য আজ এক দর্শনে পরিণত হয়েছে।
যেখানে মানুষ নিজেকে নয়, পরবর্তী প্রজন্মকে ভাবতে শেখে।
আজকের পৃথিবী কি এই দর্শন ভুলে যাচ্ছে?
নগরায়ণের চাপে গাছ কাটা এখন এক অতি স্বাভাবিক ঘটনায় পরিণত হয়েছে।
বাড়ি বানাতে গাছ কাটি, রাস্তা বানাতে গাছ কাটি, ইমারত তুলতে গাছ কাটি।
এরপর আবার কৃত্রিম অক্সিজেন সিলিন্ডার কিনে জীবন বাঁচাতে চাই।
মানুষ যতই প্রযুক্তি নির্ভর হোক,
গাছের শিকড় ছাড়া মানুষ বাঁচতে পারবে না।
থিম্মাক্কার মৃত্যু আমাদের মনে করিয়ে দেয়, গাছ কাটার আগে ভেবে দেখুন–
এটাই হয়তো আপনার শেষ শ্বাসের একমাত্র ভরসা।
কারণ ধনীরা কিছুদিন বেঁচে থাকলেও, সাধারণ মানুষের যন্ত্রণা কিন্তু পদে পদে।
একটা গাছ রোপণ করা হল, পৃথিবীকে আপনার নীরব প্রতিশ্রুতি যে–
আপনি এখনও বাঁচতে চান, মানবজাতিকে বাঁচিয়ে রাখতে চান।
গাছের মা সালুমারাদা থিম্মাক্কাঃ
আমাদের করণীয়–
আমরা কি রেখে যাব?
থিম্মাক্কা কোনো বক্তৃতা বা ভাষণ রেখে যান নি।
কোনো বই বা রাজনৈতিক বক্তব্য ছেড়ে যাননি–
তিনি রেখে গেছেন জীবনের এক গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব।
আজ আমরা যদি সত্যিই তাঁকে সম্মান জানাতে চাই, তবে–
- প্রতি বছর অন্তত একটা করে গাছ লাগানো
সেটা বটগাছ না হোক, তবে দীর্ঘস্থায়ী গাছ লাগানো জরুরি। - লাগানো গাছের দেখভাল করা
চারা লাগানোই কাজ নয়, তাকে বাঁচানোই প্রকৃত কাজ। - শিশুদের গাছের সাথে বন্ধুত্ব শেখানো
প্রজন্মকে প্রকৃতি থেকে বিচ্ছিন্ন হতে দেবেন না। - কম ব্যবহার, বেশি সংরক্ষণ
জল ও সম্পদের অপচয় কমানো প্রকৃতির প্রতি সম্মান। - পরিবেশ বিষয়ে নিজে সচেতন হওয়া ও অন্যকে করা
দায়িত্ববান মানুষ মানেই প্রকৃত পরিবেশরক্ষক।
গাছেদের মায়ের স্মৃতিতে,
পৃথিবীর কাছে নতুন অঙ্গীকার
সালুমারাদা থিম্মাক্কা আমাদের শিখিয়ে গেলেন–
- গাছ কেবল বেঁচে থাকার উপায় নয়, জীবনের অর্থও তৈরি করে।
- মহৎ কাজ করতে গেলে শিক্ষিত হওয়াটা জরুরী নয়;
ভাষণ, প্রচার প্রয়োজনীয় নয়। - সময় নেই, সুবিধে, সাহায্য নেই– এগুলো শুধু তৃতীয় হাত।
- অভাব, দুঃখ-যন্ত্রণায় থেকেও পৃথিবীর জন্যে কিছু করা যায়।
- সমাজের, মানুষের উপকার নিঃশব্দেও করা যায়।
- ফাঁকা ড্রামের আওয়াজ বেশিই থাকে সর্বদাই।
- মহান কাজে লক্ষ্য স্থির থাকলে, কোনও বাধাই বাধা নয়।
আজ তিনি আমাদের ছেড়ে চলে গেছেন অজানায়;
কিন্তু তাঁর লাগানো গাছে বাতাস যখন দোল খায়, তখন মনে হয়–
তিনি এখনও দাঁড়িয়ে আছেন, রাস্তায় দাঁড়িয়ে ছায়া দিচ্ছেন মানুষকে, ভবিষ্যতকে।
একজন নারী, যার ঘরে সন্তান ছিল না,
তিনি পৃথিবীকে দিয়ে গেলেন হাজারো সবুজ সন্তান।
আমরা কি অন্তত একটা সন্তানের দায়িত্ব নিতে পারি না?

থিম্মাক্কার প্রতি বিনম্র শ্রদ্ধা জানিয়ে আজ আমাদের প্রতিশ্রুতি হোক–
যেখানে একজন থিমাক্কা শেষ করেন,
সেখান থেকে আরও থিম্মাক্কা জন্ম নিতেই পারে;
থিম্মাকার বীজ আজও আছে এ পৃথিবীতেই।
(এরপর মহাধর্মসম্মেলনের এক কর্মকর্তার উদ্দেশ্যে প্রফেসার রাইট লিখলেনঃ
“ইনি (স্বামীজি) এমন একজন ব্যক্তি যে,
আমেরিকার সমস্ত প্রফেসারের পান্ডিত্য এক করলেও,
এঁর পান্ডিত্যের সমান হবে না।”
পড়ুন– Click: স্বামী বিবেকানন্দ– বিশ্বমঞ্চে আলোড়ন সৃষ্টির সেই মুহুর্ত!)
(Articlesবাংলা – আমাদের, আপনাদের পরিবার।
ইমেল আইডি দিয়ে আমাদের সাথে যুক্ত হন।
লেখাটা ভালো লাগলে,
শেয়ার করে বন্ধুদের পড়ার সুযোগ করে দিন।
মন্তব্যে জানান কেমন লাগলো।)
Articlesবাংলা Bangla Articles, Quotes & Prose-Poetry / বাংলা প্রবন্ধ, উক্তি ও গদ্য-কবিতা।




