শৈশব ছেড়ে অন্য মাটির আমন্ত্রণে
ও বাবা–
তোমার সেই ছোট্ট পুতুল,
যে আঙুল ধরে প্রথম হাঁটা শিখেছিল,
আজ তার পায়ের নিচে অন্য মাটির আমন্ত্রণ।
এ ঘর, এই উঠোন, এই ধুলোর গন্ধ–
এ মাটিতে আর সেভাবে ফেরা হবে না।
যেখানে বিদায় শব্দ হেরে যায়
এই যে সিঁদুর-দানের মুহূর্ত–
আমি হঠাৎ বুঝলাম,
মানুষের জীবনের কিছু বিচ্ছেদ
“বিদায়” শব্দে কখনও বোঝানো যায় না।
এগুলো ঘটে আত্মার গভীর স্তরে,
এক অদৃশ্য অঞ্চলে–
যেখানে সব যুক্তি থেমে যায়,
আর কান্নাগুলো নিজেদের প্রমাণ করে।
শেষ আশ্রয় ছেড়ে আনুষ্ঠানিক উচ্ছেদ
বাবা–
আজ শুধু ঘর ছাড়ছি না;
আমার জীবনের প্রথম আশ্রয় থেকে
এক নীরব, অথচ নির্মম উচ্ছেদের পথে হাঁটছি।
এ যেন এক দার্শনিক পর্ব, এক অদ্ভুত নিয়ম,
যেখানে নিজের জন্ম-ঘরের দরজা
নিজেকেই আস্তে করে বন্ধ করতে হয়।
কেউ শেখায় না,
তবুও সবাই কোনো এক প্রাচীন নিয়তির নির্দেশে
এই পথ ধরে হেঁটে যায়।
স্মৃতিঃ ছবি নয়, গভীর ক্ষতের মতো ব্যথা
তোমার বুকে মাথা রাখলে বুঝি–
স্মৃতি আসলে ছবি নয়,
সে এক শ্বাসরুদ্ধকারী ব্যথা,
যা গভীর ক্ষতের মতো নীরবে জমে থাকে।
জ্বরের রাতে তোমার হাতের উষ্ণতা–
আমার বিরুদ্ধে দাঁড়ানো সমস্ত পৃথিবীর
সবচেয়ে নিরাপদ প্রতিরোধ ছিল।
আজ মনে হচ্ছে–
সে দিনগুলো ছিল যেন অন্য জন্মের ঘটনা।
(আমি সেই বাক্যটাকেই একটা ঘর বানিয়ে রেখেছি।
যদিও তার দরজা নেই, জানালা নেই,
তবুও হাওয়া ঢোকে;
তোমার নামে সাজানো স্মৃতির সুগন্ধ নিয়ে।
পড়ুন– Click: দশ বছর!)
জীবনের প্রথম পাঠঃ
পড়ে গেলে পৃথিবী ভাঙে না
মনে পড়ে বাবা?
সাইকেল শেখার প্রথম দিন–
আমি পড়ে কাঁদছিলাম,
আর তুমি চোখের ভিতর দিয়ে বলেছিলে,
“পড়ে গেলে পৃথিবী ভাঙে না।”
আজ বুঝছি–
তুমি আসলে বোঝাতে চেয়েছিলে ভবিষ্যৎ।
বলতে চেয়েছিলে-
“একদিন আমাকে ছেড়েও দাঁড়াতে হবে।”

কিন্তু বাবা,
সে দিনটা এত তাড়াতাড়ি আসবে–
ভাবিনি কখনও।
বাবাঃ অস্তিত্বের নীরব কেন্দ্র
তুমি শুধু বাবা নও–
তুমি ছিলে আমার অস্তিত্বের নীরব কেন্দ্র,
যার চারপাশে আমি ঘুরেছি গভীর নিশ্চিন্তে।
আজ সেই কেন্দ্রের বাইরে পা রাখতে হচ্ছে–
এ কি সত্যিই মুক্তি?
মুক্তি যদি সত্যি এটাই হয়,
তবে কেন এতে এত মিষ্টি ব্যথা,
যার তীব্রতায় হৃদয়ে হাহাকার ওঠে?
কেঁপে যায় গোটা শরীর?
বিয়েঃ শুরু, কিন্তু নিঃশব্দ বিয়োগ
বলে–
বিয়ে নাকি নতুন শুরু।
কিন্তু আমার কাছে আজ এটা বরং
এক অনর্গল বিয়োগের সমীকরণ।
প্রতিটা যোগে
অতীতের সবচেয়ে প্রিয় অংশটুকু
নিঃশব্দে বিয়োগ হয়ে যাচ্ছে।
বড় হওয়া আসলে কি বাবা,
নতুন ঘর পাওয়া?
না,
নিজের ভিতরের শিশুটাকে
ধীরে ধীরে চোখের জলে ভাসিয়ে বিদায় দেওয়া।
কাঁকন-ধরা স্মৃতির ভিতরে
লুকিয়ে থাকা অসহয়তা
এই যে কাঁকন পরা আমার হাত–
এ হাতই একদিন তোমার আঙুল আঁকড়ে
পৃথিবীর নিরাপত্তা শিখেছিল।
আজ তা অন্য কারো ছায়া পাবে,
কিন্তু তার গভীরে জমে থাকা অসহায় স্মৃতিগুলো
চিরকাল তোমার হয়ে থাকবে।
যেভাবে শিকড় গাছ ত্যাগ করে না–
আমিও পারব না, বাবা।
বিচ্ছেদের তীব্রতাঃ
মৃত্যু নয়, তবু মৃত্যুর মতোই
বাবা, আমি যাচ্ছি–
তোমাকে পিছনে ফেলে নয়,
ভিতরে বহন করে।
ব্যথার যে অংশ আমি লুকিয়ে রেখেছি–
তার নামই তো “তুমি।”
তুমি কি দেখছো বাবা–
কিছু বিচ্ছেদ আছে
যা দেহ থেকে (Click:) আত্মাকে আলাদা করে দেয়,
যদিও তা মৃত্যু নয়,
শ্বাস থাকে,
কিন্তু জীবনের ভিতর কোনো এক কক্ষ
চিরতরে নিভে যায়।

শিকড় হারানোর নিঃশব্দ মুহূর্ত
আমি তো এখনও বেঁচে আছি, বাবা–
কিন্তু আজ মনে হচ্ছে
আমার ভিতরের শক্তিগুলো
যেন ধীরে ধীরে ভেঙে পড়ছে।
কেউ টেনে নিয়েছে অন্য ঠিকানায়।
নিশ্চয়তার বুকে তীব্র ফাটল–
আর সেই ফাটলই যেন আজ
বুকের মধ্যে মহাশূন্য খুলে দিয়েছে।
তুমি ছাড়া পৃথিবী এত বড়,
এত অচেনা–
কখনও লাগেনি।
অদৃশ্য আত্মচ্ছেদের শেষ দরজা
এই বিদায় কোনো অনুষ্ঠানের নয়–
এ এক অদৃশ্য আত্মচ্ছেদ।
যেখানে শরীর সামনে হাঁটে,
কিন্তু আত্মা ফিরে তোমার দরজায়
নিঃশব্দে দাঁড়িয়ে থাকে।
আর আত্মা–
শেষবারের মতো নিংড়ানো সেই ডাক দেয়–
“বাবা….. (Click:) তোমার সেই ছোট্ট পুতুল!“
(কিভাবে একই চোখে চোখ রেখেও,
একদিন মানুষ অপরিচিত হয়ে যায়।
যে চোখে তুমি একদিন ভবিষ্যৎ গড়ার স্বপ্ন দেখেছিলে;
আজ সেই চোখই মুখের উপর নির্মমভাবে দরজা বন্ধ করে দেয়।
পড়ুন– Click: প্রেমের দ্বৈত নীতি– এক মহাজাগতিক পরিহাস!)
(Articlesবাংলা – আমাদের, আপনাদের পরিবার।
ইমেল আইডি দিয়ে আমাদের সাথে যুক্ত হন।
ফলে যখনই এই ব্লগে কোনো নতুন লেখা পোস্ট করা হবে,
সবার আগে আপনিই পাবেন নোটিফিকেশন।
লেখাটা ভালো লাগলে,
শেয়ার করে বন্ধুদের পড়ার সুযোগ করে দিন।
মন্তব্যে জানান কেমন লাগলো।)
Articlesবাংলা Bangla Articles, Quotes & Prose-Poetry / বাংলা প্রবন্ধ, উক্তি ও গদ্য-কবিতা।




