যাদের কথা শোনা যায় না,
কিন্তু ভুলে দেশ কাঁপে
আমাদের দেশ, আমাদের রাজ্য–
খবরে যাদের আমরা প্রতিদিন দেখি, তারা নেতা-মন্ত্রী।
কখনও হাস্যরস, কখনও বিতর্ক, কখনও হালকা ক্যাজুয়াল মন্তব্য।
ক্যামেরার সামনে দাঁড়িয়ে তাঁরা কথা বলেন অতীত, বর্তমান আর ভবিষ্যৎ নিয়ে।
অনেক সময় দায়িত্বের চেয়ে শব্দই বেশি থাকে।
কিন্তু ঠিক সেই সময়েই–
ক্যামেরার বাইরে, আলোছায়ার গভীরে,
কিছু মানুষ নিঃশব্দে এমন কাজ করে যাচ্ছেন,
যাদের একটা ভুল মানে শুধু ব্যক্তিগত মৃত্যু নয়–
একটা শহর, একটা সীমান্ত, কখনও একটা দেশের পতন।

তাদের কাজের শব্দ শোনা যায় না,
কিন্তু তার প্রতিধ্বনি ইতিহাসের গতিপথ বদলে দেয়।
তারা ভুল নামে বাঁচে, ভুল মুখে হাসে–
শুধু সঠিক সিদ্ধান্তের জন্য।
তাদের কাছে দেশপ্রেম কোনো স্লোগান নয়,
কোনো মঞ্চের ভাষণ নয়–
এটা প্রতিদিনের মৃত্যুঝুঁকি নিয়ে বেঁচে থাকার নাম।
একটা তথ্য, এক মুহূর্তের দেরি, একটুখানি সন্দেহ–
সবকিছু শেষ করে দিতে পারে।
তবু তারা থাকে,
কারণ রাষ্ট্র দাঁড়িয়ে থাকে এই নীরবতার উপরই।
তারা স্পাই– রাষ্ট্রের অদৃশ্য স্নায়ুতন্ত্র।
রাষ্ট্র যাদের নাম জানে না,
কিন্তু জীবন দিয়ে চেনে
- একজন স্পাইয়ের নাম কখনও ইতিহাসের পাতায় ওঠে না।
- তাদের পদক থাকে না কোনো প্যারেডে।
- তাদের সন্তান স্কুলে গিয়ে বলতে পারে না–
“আমার বাবা দেশের জন্য কাজ করেন।”
কারণ সত্যটা ভয়ঙ্কর–
তাদের অস্তিত্বই একটা গোপন।

রাষ্ট্র জানে তারা আছে,
কিন্তু জনতা জানে না তারা কে।
এই অচেনা থাকা-ই তাদের প্রথম ত্যাগ।
যেখানে একটা তথ্যের দাম–
কয়েক হাজার প্রাণ।
তারা বেঁচে থাকে এমন এক পরিচয়ে,
যেটা সত্য নয়,
কিন্তু প্রয়োজন।
স্পাই মানে সিনেমা নয়
সিনেমায় স্পাই মানে স্টাইল, গ্ল্যামার, জয়।
বাস্তবে স্পাই মানে–
একটা ফোন কল,
একটা কাগজের টুকরো,
একটা নীরব চোখের ইশারা।

একটা ভুল তথ্য মানে–
ভুল সিদ্ধান্ত।
ভুল সিদ্ধান্ত মানে–
ভুল আক্রমণ, ভুল প্রতিরক্ষা।
আর এর ফল–
কয়েক হাজার পরিবারে হাহাকার!
তাই স্পাইয়ের কাছে তথ্য নয়,
তথ্যের নির্ভুলতাই একমাত্র অস্ত্র।
দিনে তারা সাধারণ মানুষ।
একজন দোকানদার, একজন ড্রাইভার, একজন ছাত্র, একজন অফিসকর্মী।
রাতে?
তারা দেশের তীক্ষ্ণ চোখ।

(স্টেডিয়ামে সবচেয়ে কম ছিল চার হাজার টাকার টিকিট,
যা এই রাজ্যে কম কিছু নয়।
এটা কারো এক মাসের বাজার,
কারো মেয়ের কোচিং ফি,
আবার কারো বাবার রক্তচাপের ওষুধ।
পড়ুন– Click: VIP-হ্যাংলামো আর ইগোর মহাযজ্ঞে,
সেদিন মেসিও ছিল ক্ষমতার প্রসাদ!)
যে রাস্তায় আপনি হেঁটে যান নির্বিঘ্নে,
সেই রাস্তায় কেউ আগে হেঁটে গেছে সন্দেহ নিয়ে।
আপনি নিশ্চিন্তে ঘুমান,
কারণ কেউ জেগে থাকে ভয় নিয়ে।
ধরা পড়লে– কোনো গল্প নেই
একজন (দেখুন) স্পাই ধরা পড়লে গল্প শেষ হয় না–
গল্প শুরুই হয় না।
- কোনো সংবাদ শিরোনাম হয় না।
- কোনো প্রতিবাদ হয় না।
- কোনো পতাকা অর্ধনমিত হয় না।
- শুধু কোথাও একটা ফাইল বন্ধ হয়ে যায়।
- কিছু নাম কেটে দেওয়া হয়।
- আর কয়েকটা মানুষ সারাজীবন অপেক্ষা করতে শেখে।
রাষ্ট্র তখনও দাঁড়িয়ে থাকে।
কারণ দাঁড়িয়ে থাকতেই হয়।
বিশ্বাস যেখানে বিলাসিতা
স্পাইদের দুনিয়ায় বিশ্বাস মানে বিলাসিতা।
কারণ এখানে শত্রু সবসময় বাইরে থাকে না–
অনেক সময় সে বসে থাকে পাশের চেয়ারে।
একটা হাত মেলানো,
এক কাপ চা,
একটা সাধারণ আলাপ–
সবকিছুর মধ্যেই লুকিয়ে থাকে প্রশ্ন:
“সে কি সত্যিই যেটা বলছে, সেটাই?”

ওরা জানে, সবচেয়ে ভয়ঙ্কর আঘাত আসে পরিচিত মুখ থেকেই।
তাই এখানে বন্ধুত্ব নেই, শুধু যাচাই আছে।
ভরসা নেই, আছে সন্দেহ।
এই সন্দেহই ওদের বাঁচিয়ে রাখে,
বিশ্বাস নয়।
পরিবার– সবচেয়ে বড় ত্যাগ
স্পাইয়ের সবচেয়ে বড় শত্রু বন্দুক কিংবা বোমা নয়–
পরিবার।
কারণ সন্তান যখন জিজ্ঞেস করে,
“তুমি কি কাজ করো?”
উত্তরটা দিতে গিয়ে কেঁপে ওঠে হৃদপিণ্ড।
মা জানে না ছেলে কোথায়।
স্ত্রী জানে না, স্বামী ঠিক কিসের জন্য ঘর ছাড়ে।
আর বাবা জানে না–
যে ছেলেকে সে মানুষ করে তুলেছে,
সে সেই কবে থেকেই সম্পূর্ণ একা।

রাষ্ট্র ওদের শেখায়–
নিজের মানুষদের কাছেই সবচেয়ে বড় মিথ্যে বলতে হয়।
কারণ সত্য বললেই বিপদ।
সত্য বললেই মৃত্যুর ছোবল।
দেশপ্রেম এখানে নিঃশ্বাসের ঝুঁকি
এখানে দেশপ্রেম কোনো স্লোগান নয়।
কোনো পতাকা ওড়ানো, ধ্বনি তোলা নয়।
কোনো মঞ্চের ভাষণ, তাও নয়।
এখানে দেশপ্রেম মানে–
ভুল নামে বেঁচে থাকা।
ভুল পরিচয়ে হাসা।
নিজের মানুষকে অচেনা ভান করা।

ওরা জানে–
একদিন সত্য বেরোলে,
গুলিটা ফুটো করবে ওদেরই বুক।
তবু ওরা কাজ করে।
কারণ কেউ না কেউ তো করবেই।
নেতা বদলায়, ছায়া থাকে
নির্বাচন আসে যায়।
নেতা বদলায়।
স্লোগান বদলায়।
কিন্তু সীমান্ত বদলায় না।
শত্রু বদলায় না।
হুমকি বদলায় না।
আর তাই–
স্পাই বদলায় না।

ওরা ক্ষমতার পক্ষে কাজ করে না।
ওরা অস্তিত্বের পক্ষে কাজ করে।
বিজয় মানে কিছুই না হওয়া
বাস্তবে বিজয় মানে বেঁচে ফেরা নয়।
বিজয় মানে–
কিছুই না হওয়া।
- কোনো বিস্ফোরণ হলো না।
- কোনো হামলা হলো না।
- কোনো খবরই হলো না।
এই ‘কিছু না হওয়াই’
ওদের সবচেয়ে বড় সাফল্য।
নীরবতার শপথ
এই মানুষগুলো কোনো কাগজে সই করে শপথ নেয় না।
ওদের শপথ হয় জীবনের সঙ্গে–
“আমি থাকবো,
কিন্তু আমাকে কেউ জানবে না।”
একটা রাষ্ট্র যত বড়ই হোক,
তার সবচেয়ে শক্তিশালী চুক্তিটা লেখা থাকে
এই নীরবতার মধ্যেই।
এই নীরবতা ভাঙা মানেই–
শুধু একজন নয়,
একটা ব্যবস্থার মৃত্যু।

ওরা জানে,
একদিন হয়তো কেউ বলবে–
“এটা তো দুর্ঘটনা ছিল।”
“এটা তো স্বাভাবিক মৃত্যু।”
আর রাষ্ট্র মাথা নেড়ে চুপ করে থাকবে।
এই চুপ করে থাকাটাই
ওদের পাওনা সম্মান।
আমরা যখন নিরাপদে থাকি
আমরা যখন নিশ্চিন্তে ট্রেন ধরি,
যখন সকালে খবরের কাগজে শুধু রাজনীতি পড়ি,
যখন রাতের খাবার শেষে শান্তির ঘুমে যাই–
তখন কোথাও কেউ জেগে থাকে।
নিজের নাম ভুলে, নিজের ভয় চেপে।

রাষ্ট্রের মানচিত্রে ওদের জায়গা নেই।
কিন্তু রাষ্ট্রের অস্তিত্বে ওরাই ভিত্তি।
ওরা আলো চায় না।
কোনো উপসংহার নেই
এই লেখা কোনো শ্রদ্ধাঞ্জলি নয়।
কারণ ওরা শ্রদ্ধা চায় না।
এই লেখা একটা স্মরণ–
যে রাষ্ট্র শুধু ভাষণে চলে না।
রাষ্ট্র চলে সেই মানুষগুলোর উপর,
যাদের কথা শোনা যায় না,
কিন্তু যাদের একটা সামান্য ভুলেও রাষ্ট্র কেঁপে উঠতে পারে।
ওরা সেই মানুষ–
যাদের অস্তিত্ব প্রমাণিত হয় কেবল তখনই,
যখন কিছুই ঘটে না।
(যার ছায়া আপনি দেখেন না ,
কিন্তু তার টানেই আপনার হাত…
আপনি ভাবছেন আপনি স্বাধীন,
কিন্তু আপনার স্বাধীনতার উপর…
পড়ুন– Click: ভারতের মাথার উপর ঘুরছে অদৃশ্য এক হাত–
যার ছায়াও ধরা যায় না!)
(Articlesবাংলা – আমাদের, আপনাদের পরিবার।
ইমেল আইডি দিয়ে আমাদের সাথে যুক্ত হন।
ফলে যখনই এই ব্লগে কোনো নতুন লেখা পোস্ট করা হবে,
সবার আগে আপনিই পাবেন নোটিফিকেশন।
লেখাটা ভালো লাগলে,
শেয়ার করে বন্ধুদের পড়ার সুযোগ করে দিন।
মূল্যবান মন্তব্যে জানান কেমন লাগলো।)
Articlesবাংলা Bangla Articles, Quotes & Prose-Poetry / বাংলা প্রবন্ধ, উক্তি ও গদ্য-কবিতা।
